by

অবন্তীর মৃত্যু

অবন্তীর মৃত্যু

মুরাদুল ইসলাম

      অধ্যায়সমূহ


 

প্রথম অধ্যায়

টিটো মিয়া মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “স্যার আমি বাড়িত যাইতে চাই। জরুরী খবর আসছে।”

রহমান সাহেব মনযোগের সাথে তার পড়ার টেবিলে ঝুঁকে কিছু একটা পড়ছিলেন। তিনি মাথা না তুলেই জিজ্ঞেস করলেন, “কবে?”

“আইজই স্যার। এক্ষনি যাইতে হবে।”

রহমান সাহেব এবার তাকালেন টিটো মিয়ার দিকে। ভালো বাবুর্চী হিসেবে তার নাম এলাকাতে ছড়িয়ে পড়েছে। আশপাশের কয়েক বাড়িতে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে রান্নার ডাকও পড়েছিল।

রহমান সাহেব বললেন, “টাকা পয়সা কিছু লাগবে?”

টিটো মিয়া বলল, “জি না স্যার।”

“আসবে কবে?”

“ঠিক নাই স্যার। কাজটা শেষ হইলেই চইলা আসব।”

“ঠিক আছে যাও। সাবধানে যেও।”

টিটো মিয়া চলে গেল। রহমান সাহেব আবার পড়ায় মন দিলেন।

এর প্রায় আধঘন্টা পর ঘরে এসে ঢুকলেন সমীরবাবু। বললেন, “রহমান ভাই, আপনি ঘরে বসে কী করছেন! জলদি বাইরে আসেন।”

রহমান সাহেব মুখ না তুলেই জিজ্ঞেস করলেন, “কেনো? কী হয়েছে?”

সমীরবাবু বললেন, “আপনার বাসার পাশের দেয়ালঘেরা বাড়িটার পিছনের জঙ্গলে একটা লাশ পাওয়া গেছে। মেয়ের লাশ। মেয়েটা নাকী এই এলাকারই।”

রহমান সাহেব এবার মাথা তুলে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি জানলে কীভাবে?”

সমীরবাবু বললেন, “আমি আপনার এখানে এসেই দেখলাম মানুষের ভীড়। পুলিশ এসেছে। মানুষ গিয়ে জড়ো হচ্ছে। আপনি চলুন। গিয়ে দেখতে হবে।”

রহমান সাহেব তার চশমা ঠিক করে উঠে দাঁড়ালেন। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে মুখে নিলেন। তাতে আগুন দিতে দিতে ডাকলেন তার কাজের লোক হায়দারকে।

হায়দার এসে দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার, ডাকছেন?”

রহমান সাহেব বললেন, “আমরা একটু বাইরে যাচ্ছি। এখানে নাকী খুন হয়েছে?”

হায়দার বলল, “জ্বি স্যার। জঙ্গলের কাছে। নতুন যে লোকটা আইছে তার বাড়ীর পিছেই।”

“নতুন লোক?”

“জ্বি । নামটা যেন কী ভুইলা গেছি।”

“আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি এদিকটা খেয়াল রেখো। আমরা আসছি।”

রহমান সাহেব এবং সমীরবাবু ঘর থেকে বের হলেন। তখন বেলা দুটো হবে। চমৎকার রৌদ্রজ্জ্বল দিন। শরতের আকাশ নীল হয়ে আছে।

রহমান সাহেব এবং সমীরবাবু রাস্তা ধরে হেটে ঘটনাস্থলে পৌছে গেলেন মিনিট তিনেকের মধ্যে।

পুলিশের লোকেরা লাশটার পাশে আছে। মানুষেরাও ভীড় করেছে। বড় বড় শালগাছের জঙ্গলের এই জায়গায় একটা বেশ ছোট পুকুরের মত। পানিতে শেওলা ধরেছে। তবে অগভীর এই পুকুরের পানি স্বচ্ছ। পুকুরটার পাশের খোলা জায়গায় সবুজ ঘাসের মধ্যে পড়ে আছে লাশটা।

নিচের দিকে রাখা মাথা। অর্থাৎ যেন উপুর হয়ে শুয়ে আছে। লাশ একটি নীল চাদরে ঢাকা। লাশের কারণে চাদরের কাছে জমে যাওয়া রক্তের স্রোত। লাশের গলা কাটা কিন্তু মাথা ধড় থেকে আলাদা হয় নি। কাটা অংশটা যাতে সহজে দেখা না যায় এজন্যই হয়ত খুনী উপুর করে ফেলে রেখে গেছে।

রহমান সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লাশটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তিনি সিগারেট ফেলে দিয়ে এগিয়ে গেলেন লাশের একেবারে কাছে। পাশে ঘুরে দেখলেন লাশের মুখের বা দিকে নাকের কাছে কিছুদিনের পুরনো আঘাতের চিহ্ন। ভীড় করা মানুষেরা কিছুটা দূরে ছিল পুলিশের কারণে। কিন্তু রহমান সাহেবের লক্ষ সেদিকে নয়। তিনি লাশের একেবারে কাছে গিয়ে নিচু হয়ে বসে গভীরভাবে দেখতে লাগলেন। পকেট থেকে রুমাল বের করে তা দিয়ে ধরে চাদরটা একটু সরালেন। লাশের বা হাতটা দেখা গেল। কব্জিতে কাটা।

একজন পুলিশ বেশ তড়িঘড়ি করে ছুটে এসে বলল, “আপনি এখানে কী করছেন? লাশের কাছে আসবেন না। সরে যান।”

রহমান সাহেব চাদর ছেড়ে দিয়ে বসা থেকে উপরে পুলিশের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “যে মারা গেছে তার পরিচয় কি বের হয়েছে?”

পুলিশ বলল, “না। এখনো জানা যায় নি।”

রহমান সাহেব বললেন, “কীভাবে মারা গেল?”

পুলিশ বলল, “দেখতেই তো পাচ্ছেন গলা কেটে খুন করা হয়েছে।”

রহমান সাহেব উঠে পড়লেন। তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশটা দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করলেন, “কে প্রথম দেখেছিল লাশটা?”

পুলিশ বলল, “আপনি এত কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন? লাশ কি আপনার পরিচিত? যদি পরিচিত না হয় তাহলে এত কথা বলবেন না প্লিজ। একটু সরে দাঁড়ান। আমাদের কাজ আমাদেরকেই করতে দিন।”

রহমান সাহেব বললেন, “সে ঠিক আছে। তবে আমি শুধু জানতে চাচ্ছিলাম এরকম জায়গায় লাশ পড়ে আছে তা হঠাৎ কে দেখতে পেল? সচরাচর তো এদিকে কেউ আসে না।”

পুলিশ অফিসার বলল, “স্কুলপড়ুয়া একটি ছেলে নাম তমাল লাশটি প্রথম দেখতে পেয়েছিল। সে বাড়িতে গিয়ে তার বাবাকে জানায়। তার বাবা আহমদ সাহেব আমাদের ফোন দিয়েছিলেন।”

রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “আহমদ শরীফ?”

পুলিশ অফিসার বলল, “হ্যা। আহমদ শরীফ। এর বেশি কিছু আপনাকে আর বলা যাচ্ছে না। দয়া করে আপনি সরে দাঁড়ান।”

রহমান সাহেব পুলিশ অফিসারকে ধন্যবাদ জানিয়ে মানুষেরা যেখানে ভীড় করেছে সেখানে সরে গেলেন। সমীরবাবু এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কী দেখলেন?”

রহমান সাহেব কোন উত্তর না দিয়ে লাশের চারপাশের দিকটা ভালো করে দেখছিলেন। একপাশে ছোট পুকুরটি। পুকুরের কাছে শালবন। লাশের সরাসরি সামনের দিকে রহমান সাহেবের পাশের বাসার সীমানা প্রাচীর। প্রায় নয় ফুট উঁচু প্রাচীরটির এক অংশে বিরাট এক গর্ত। সে গর্ত দিয়ে একজন মানুষ অনায়াসে চলাচল করতে পারবে।

রহমান সাহেব উঠে গেলেন সে প্রাচীরের গর্তটির কাছে। ভেতরে তাকিয়ে দেখলেন বেশ খোলা জায়গা। মাঠের মত। সেখানে সবুজ ঘাস এবং একটি দোলনা আছে। হঠাৎ তার চোখ পড়ল উপরের দিকে। দোতলার বারান্দায় চশমা পড়া একটা লোক পাইপ মুখে তার বাড়ির পিছনের ভীড়টাকে দেখছিলেন।

রহমান সাহেবের পাশে এসে দাঁড়িয়ে সমীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু কি বুঝতে পারলেন?”

রহমান সাহেব পালটা প্রশ্ন করলেন, “তোমার মোবাইলটা দাও। আবু তুরাব সাহেবকে একটা ফোন করতে হবে।”

সমীরবাবু তার ফোনটা এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, “কোন আবু তুরাব?”

ফোনে নাম্বার ডায়াল করতে করতে রহমান সাহেব বললেন, “চিনবে না।”

তারপর ফোনে বললেন, “আবু তুরাব সাহেব বলছেন?......হ্যা। আপনি এখন কোথায় আছেন?”

ওপাশ থেকে কিছু একটা বললেন আবু তুরাব সাহেব।

রহমান সাহেব বললেন, “আপনি তাড়াতাড়ি চলে আসুন শালবনের ছোট পুকুরটার পাশে। সেখানে আপনার মেয়ে অবন্তীর লাশ পাওয়া গেছে।”

তারপর তিনি ফোনটা কেটে সমীরবাবুকে বললেন, “চলো একটা জায়গায় যেতে হবে। এই চমৎকার দিনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটা দেখতে খুব ভালো ছিল। তাকে কে যে এমন বিভৎসভাবে খুন করল!”

সমীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাবেন?”

রহমান সাহেব বললেন, “মেয়েটার লাশ প্রথম দেখতে পেয়েছে তমাল নামের একটা ছেলে। ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়ে বোধহয়। আমার কয়েক বাসা পাশেই তারা থাকে। এদের সাথে কথা বলে দেখতে হবে ব্যাপারটা কী? এরকম একটা মেয়েকে বিভৎসভাবে কে খুন করল তা জানতে হবে।”

সমীরবাবু বললেন, “চলুন তাহলে। আপনার কী মনে হয়? কে খুন করতে পারে?”

রহমান সাহেব বললেন, “এখন কিছুই বলতে পারছি না। তবে খুনটা বেশিক্ষণ আগে হয় নি। লাশ এখনো সতেজ। খুব সম্ভবত বারোটার দিকে করা হয়েছে।”

গলির রাস্তা ধরে হেটে তারা আবার আসলেন মূল রাস্তায় এবং সেখান থেকে হেটে একটা বাসায় ঢুকে কলিং বেল চাপলেন রহমান সাহেব। একটা লোক বের হয়ে এল। ভদ্রলোকের বয়স হবে ত্রিশের কাছাকাছি।

ভদ্রলোক বললেন, “রহমান সাহেব, আপনি? ভেতরে আসুন।”

রহমান সাহেব ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, “হ্যা শরীফ সাহেব। এসেছিলাম কয়েকটা ব্যাপার নিয়ে আপনার এবং তমালের সাথে কথা বলতে।”

আহমদ শরীফ সমীরবাবুকে দেখিয়ে বললেন, “আর ইনি?”

রহমান সাহেব বললেন, “ইনি আমার কলিগ।”

আহমদ শরীফ বললেন, “আপনারা নিশ্চয়ই লাশটার ব্যাপারে জানতে এসেছেন। কিন্তু আসলে আমি কিছুই জানি না। তমাল আমাকে এসে বলল আর আমি দেখে পুলিশকে ফোন দিলাম।”

রহমান সাহেব বললেন, “তমালকে একটু ডাকুন।”

আহমদ শরীফ তার ছেলেকে ডাকলেন। তমাল এসে বসল তার বাবার পাশে।

রহমান সাহেব তমালকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, তুমি কী দেখেছিলে?”

তমাল বলল, “একটা মৃতদেহ পড়ে আছে।”

“কীভাবে দেখলে তুমি?”

“আমি খেলছিলাম। বল বাইরে গেল। তখন বল আনতে গিয়ে দেখেছি।”

“কোথায় খেলছিলে তুমি?”

এই প্রশ্নের উত্তর তমাল দেয়ার আগেই তার বাবা আহমদ শরীফ বললেন, “আসলে ও প্রায়ই রফিক আমজাদ সাহেবের বাসায় যেত। তিনি মাস দুয়েক হল এসেছেন আমাদের এলাকায়। আপনি হয়ত চিনবেন। আপনার বাসার পাশেই উনার বাসা। তমাল এবং সরকার সাহেবের ছেলে অন্তু প্রায়ই স্কুল শেষে উনার বাসার পিছনের মাঠে গিয়ে খেলত। উনি ওদের খুব পছন্দ করেন। গল্প টল্প বলেন।”

রহমান সাহেব তমালের চোখের দিকে তাকিয়ে একটু দৃঢ়ভাবে আবার জিজ্ঞেস করলেন, “সত্যি করে বলো কী দেখেছিলে তুমি?”

তমালের মুখ তখন সামান্য কেঁপে উঠল। সে তার বাবার দিকে তাকাল তখন। রহমান সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছিলেন তার মুখের অভিব্যক্তি। সে তার বাবার মুখের দিকে কয়েকবার তাকিয়ে বলল, “একটা লাশ পড়ে আছে।”

আহমদ শরীফ বললেন, “পুলিশ একবার এসব জিজ্ঞেস করে গেছে। এমনিতেই ও ছোট মানুষ। বুঝেনেইতো, যা দেখেছে তার মানসিক চাপ নেয়ার মত সামর্থ ওর নেই।”

রহমান সাহেব বললেন, “তা ঠিক বলেছেন। তমাল, যাও। তুমি খেলো গিয়ে।”

তমাল উঠে চলে গেল। যাবার সময়ও সে তার বাবার দিকে তাকাচ্ছিল।

আহমদ শরীফ বললেন, “আপনারা চা কফি কিছু খাবেন?”

রহমান সাহেব বললেন, “না। এখন কিছু খাচ্ছি না শরীফ সাহেব। তবে এই খুনের ব্যাপারটা কী সেটা আমি জানার চেষ্টা করব। তাই আপনার কাছে আরো আসতে হতে পারে।”

আহমদ শরীফ বললেন, “সে আসবেন। কোন সমস্যা নেই।”

রহমান সাহেব বললেন, “আচ্ছা আরেকটা প্রশ্ন, লাশটা দেখে আপনি তো চিনতে পেরেছিলেন?”

“তা তো অবশ্যই। চিনবো না কেন।”

“লাশটা দেখে কি তুরাব সাহেবকে জানিয়েছিলেন?”

এই প্রশ্নে মনে হল আহমদ শরীফ কিছুটা বিব্রত হলেন। বিব্রত কন্ঠে তিনি বললেন, “না আসলে আমি এতটাই চাপের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম যে কী করব বুঝে উঠতে পারি নি। পুলিশকে জানিয়েছিলাম। পুলিশ যখন চলে এল, লোকজন জমতে শুরু করল তখন আমি ফিরে এলাম বাসায়। অবন্তীর মৃত্যু আমার জন্যও একটা বড় ধাক্কা।”

রহমান সাহেব বললেন, “তা তো অবশ্যই। সে তো আপনাদের ব্যাংকেই ইন্টার্নী করছিল?”

আহমদ শরীফ বললেন, “হ্যা। আমাদের ব্যাংকেই।”

রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “তার মৃত্যুর ব্যাপারে আপনার কী মনে হয়? কে খুন করতে পারে?”

আহমদ শরীফ বললেন, “দেখুন এ ব্যাপারে আমি কিছুই বলতে পারছি না।”

রহমান সাহেব আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তার কি কোন বয়ফ্রেন্ড অর্থাৎ ছেলে বন্ধু টন্ধু ছিল?”

আহমদ শরীফ উত্তর দিলেন, “স্যরি। এটাও আমি বলতে পারছি না।”

রহমান সাহেব বললেন, “আচ্ছা শরীফ সাহেব। উঠি আজকে।”

রহমান সাহেব এবং সমীরবাবু উঠে পড়লেন। আহমদ শরীফ সাহেবের বাসা থেকে বের হয়ে নিজের বাসায় আসতে আসতে সমীরবাবু আরেকটা সিগারেট ধরালেন। কয়েক টান দিয়ে ধোঁয়া ছাঁড়তে ছাঁড়তে বললেন, “মানুষ অবচেতনে অন্য মানুষকে হত্যা করতে চায়। কিন্তু সাধারণত অন্যকে হত্যা করা যায় না। তাই নিজেকেই হত্যা করতে মনস্থ করে। কিন্তু নিজেকেও তো একবারে হত্যা করা একটা কঠিন কাজ। সুতরাং, সিগারেট খাওয়া ধরে। প্রতিটি সিগারেটে নিজেকে একটু একটু করে হত্যা করা।”

সমীরবাবু বললেন, “কিন্তু এই খুনটার ব্যাপারটা কী আসলে? কিছুই তো বুঝতে পারছি না আমি।”

রহমান সাহেব ধোঁয়া ছাঁড়তে ছাঁড়তে বললেন, “তুমি কি বুঝতে চাও?”

সমীরবাবু বললেন, “এটা কী বলেন রহমান ভাই! অবশ্যই বুঝতে চাই। কে এই নৃশংস খুন করল তা জানতে হবে না!”

রহমান সাহেব বললেন, “তাহলে এই মেয়ে অর্থাৎ অবন্তীর খুব কাছের বন্ধু কারা আমাকে খোঁজ নিয়ে একটু জানাও। ওর বাবা নিশ্চয়ই এতক্ষণে ঘটনাস্থলে চলে গেছেন। আমি ওদের বাসায় একবার যাবো কাল।”

সমীরবাবু বললেন, “ঠিক আছে। তাহলে আমি কাল সকালেই আপনাকে জানাচ্ছি।”

তারা হাটতে হাটতে এসে গিয়েছিলেন বাসার সামনে। হায়দার গেটের কাছেই ছিল। সে রহমান সাহেবকে দেখে বলল, “স্যার, পুলিশের লোক আসছিলেন আপনার লগে কথা কইতে। আমি কইছি আপনি বাসায় নাই। তিনি কইলেন আপনে যেন আইজ কাইলের মইধ্যে থানায় গিয়ে একবার দেখা করেন।”

দ্বিতীয় অধ্যায়

সন্ধ্যার পর রহমান সাহেব গেলেন তার পাশের বাসার লোকটির সাথে দেখা করতে। এই ভদ্রলোক এখানে উঠে এসেছেন তিনি আবছাভাবে খবর পেয়েছিলেন মাস দুয়েক আগে। রহমান সাহেব কলিং বেল বাজিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। দ্বিতীয়বার বাজাতে যাবেন এর আগেই দরজা খুলে গেল।

বাসার ভদ্রলোক দরজা খুলে স্বাভাবিকভাবে বললেন, “কেমন আছেন?”

ভদ্রলোকের বয়স হবে পঞ্চাশ এর উপরে। তার মাথায় সামান্য চুল। পাকা গোফ। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মুখে পাইপ। পরনে বেশ ঝোলা একটি ফতুয়া এবং সাদা প্যান্ট।

রহমান সাহেব উত্তর দিলেন, “ভালো। আপনার সাথে একটা ব্যাপারে কিছু কথা বলার জন্য এসেছিলাম।”

ভদ্রলোক বললেন, “আসুন, ভেতরে আসুন।”

রহমান সাহেব ভেতরে প্রবেশ করার পর তিনি হাত বাড়িয়ে বললেন, “আমার নাম রফিক আমজাদ। প্রায় দু মাস হল আমি আপনার প্রতিবেশী। আপনার কথা অনেক শুনেছি। বিশেষ করে মিশরীয় সেই দামী মূর্তি বাঁচানো এবং ফেরত দেয়ার কথাটা। আপনার সাথে দেখা করার ইচ্ছা ছিল।”

রহমান সাহেব হাসিমুখে হাত মেলালেন। তারপর বসে বললেন, “আমি আসলে এসেছি আপনার সাথে পরিচিত হতে এবং খুনটার ব্যাপারে কিছু কথা বলতে।”

“তাহলে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ? খুনটা না হলে আপনি নিশ্চয়ই আসতেন না। হা হা।”

“না, কথা সেটা নয়। আসলে আমি অনেক ব্যস্ত থাকি।”

“আমার এই জিনিসটা নেই। একেবারেই নেই। ব্যস্ততা আমার কাছ থেকে ছুটি নিয়ে চলে গেছে বহুকাল আগেই।”

“এটা তো খুব ভালো ব্যাপার। আপনি কী করেন?”

“আমি আসলে এখন কিছুই করি না বলতে গেলে। এককালে ঠুকঠাক লেখালেখি করতাম।”

“মানে আপনি লেখক?”

“তা বলা যায় হয়ত।”

“কি লেখেন? গল্প উপন্যাস?”

“না। ওসব ছেড়ে দিয়েছি।”

“ছাড়ার পেছনে কী কোন কারণ আছে?”

“আছে। তবে সেটা বললে লোকে বিশ্বাস করে না। আপনাকেই যদি বলি আপনি বিশ্বাস করবেন না।”

“বলেই দেখুন। আমার কিছুটা আগ্রহ হচ্ছে। লেখকদের সাথে আমার বিশেষ দেখা স্বাক্ষাত হয় না।”

“ওকে। তাহলে বলছি। কয়েকটি উপন্যাস লিখেছিলাম। মানুষের গল্প নিয়ে কাহিনী। প্রধান কিছু চরিত্র নির্মান, তাদের পিছনের কিছু কাহিনী এবং তাদের নিয়ে আরো কিছু কাহিনী। হয়ে গেল উপন্যাস। চলল বেশ ভালোই। এরকম কয়েকটি লেখার পরেই একটা ব্যাপার আমার নজরে আসে। প্রায় সব থ্রিলার উপন্যাসেই কিছু ছোট খাট চরিত্র তৈরী করেছি আমি। যেগুলো সম্পর্কে আমি নিজেই কিছু জানিনা। প্রধান চরিত্রদের নিয়ে দুইশ পেজ লেখা হলেও এদের বিষয়ে দশ লাইনও নেই। কিন্তু এদের অনেককেই আমি মেরে ফেলেছি গল্পের থ্রিল আনতে। মাঝে মাঝে খুব নির্মমভাবে। যেমন মনে পড়ে একটি মেয়েকে হত্যা করিয়েছিলাম আরেকটি চরিত্র দিয়ে। মেয়েটির মাথা কেটে রাখা হয়েছিল একটি মূর্তির সামনে। কি মর্মান্তিক!

ব্যাপারটা আমার মনে লাগল। আমি লক্ষ করলাম গল্পের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আমার পক্ষপাতিত্ব নজিরবিহীন। প্রধান চরিত্রদের জীবনের সমস্যা, লক্ষ্য, সাফল্য ইত্যাদি চিহ্নিত করে আমি তাদের একটি সমাধানে নিয়ে গেছি। যাতে গল্প যেখানে শেষ হয়েছে এর পরেও তাদের জীবনে অনেক সম্ভাবনা রয়ে যায়। কিন্তু সেই সব ছোট ছোট চরিত্রকে আমি এনেছি নির্দয় অবহেলায়। গল্পের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে এ আমার বড় পাপ। একজন পক্ষপাতদুষ্ট পাপী সৃষ্টিকর্তা কখনো সৃষ্টির মত মহৎ কাজ করতে পারেন না। সে যুক্তিতেই আমি লেখালেখি প্রায় বন্ধ করে দেই।

কিন্তু লোকে আমার এই কথা বিশ্বাস করে না। তারা কী যেন মনে করে। আমি ঠিক ভালোমত বুঝি না। অবশ্য বুঝা না বুঝায় কিছু যায় আসে না। কখনো কারো কথায় কোন কাজ করিনি বা কোন কাজ করা থেকে বিরত হই নি। সুতরাং, যে যা ইচ্ছা বলুক।”

রহমান সাহেব রফিক আমজাদের লেখালেখি ছেড়ে দেয়ার অদ্ভুত কারণ মনযোগ শুনলেন।

রফিক আমজাদ জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন এই লোক তো অদ্ভুত?”

রহমান সাহেব বললেন, “না। অবশ্যই না। একেকজন মানুষ একেক রকম। আপনার গল্প উপন্যাস লেখা ছেড়ে দেয়ার কারণটা বেশ লাগল। এখন কী করেন তাহলে?”

রফিক আমজাদ বললেন, “উপন্যাস একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি। বড় পরিসরের লেখায় সব চরিত্রের ব্যাপারে ঠিকমত নজর দেয়া সম্ভব হয় না। অন্তত আমার ব্যাপারে তা অসম্ভব। তবে গল্প লিখছি। বছরে একটা কিংবা দুটা। কিন্তু আসলে কিছুই এখন আর মনমত হয় না। যা প্রকাশ করতে চাই, যা আমার ভিতরে ঘটে চলেছে তার এক দশমাংশও যদি প্রকাশ করতে পারতাম!”

রহমান সাহেব বললেন, “গল্প উপন্যাস কিংবা এই ধরনের লেখালেখির ব্যাপারে আমার জানাশোনা বেশি না। ফিকশন পড়া হয় না। তবে আপনার কথা শোনে আপনার বইগুলো পড়ার ইচ্ছে হচ্ছে।”

রফিক আমজাদ উঁড়িয়ে দেয়ার মত করে বললেন, “থাক। ওসব পড়ে লাভ নেই। ওগুলো গার্বেজ। একসময় খেয়ালের বসে লিখে ফেলেছিলাম। কিন্তু ওগুলো আসলে কিছুই হয় নি।”

“তবুও ওগুলো তো আপনারই লেখা।”

“এখন আমি ওগুলোকে অস্বীকার করি। এরকম হয়, টলস্টয় অস্বীকার করেছিলেন তার বিখ্যাত দুই উপন্যাসকে, গগোল করেছিলেন। আমিও করছি। এ রাইটার শুড অলওয়েজ বি জাজড বাই হিজ বেস্ট পেজস। বোর্হেসের কথাটা বললাম। ওগুলো পড়লে আপনি আমাকে ওগুলোর অনুপাতে বিচার করা শুরু করবেন। তা হবে আমার মত একজন লেখকের জন্য বড় বেদনাদায়ক।”

“তাহলে আপনার ভালো একটা লেখা পড়ব।”

“সেটা পড়তে পারেন। একটা গল্প লেখছি বছর তিনেক ধরে। মাঝখানে এসে আটকে আছি। এটা শেষ করতে পারলেই আপনাকে দেখাব। ভালো সাহিত্য আসলে সহজে হয় না। একটি উৎকৃষ্ট সাহিত্যের জন্য জীবন দিয়ে দিতে হয়। ফাউস্টের উপকথায় যেমন শয়তানকে আত্মা দেয়ার চুক্তি করেছিল লোকটা ঠিক সেরকম। জীবনটাই সাহিত্যকে দিয়ে দিতে হয়। কয়েকটা গল্পের জন্য, কয়েকটা কবিতার জন্য কিংবা একটা দুটা উপন্যাসের জন্য। একা একা থাকতে হয়। নিঃসঙ্গতার বড় প্রয়োজন। ঝোলা কাঁধে বৌ ছেলে নিয়ে সুখে থেকে কবিতা লেখা যায় না বলেছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। খুব সত্যি কথা।”

“আপনি কি কবিতাও লিখেন?”

“আসলে কবিতাই তো মূল। আমি জীবনে একটা সার্থক কবিতা লিখতে গিয়ে কত কিছু লিখে ফেললাম। কত কথা বলে ফেললাম। কত অক্সিজেন নিঃশেষ করে বানিয়ে দিলাম কার্বন ডাই অক্সাইড।”

রহমান সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “আজ আপনার বাড়ির পিছনে একটা খুন হয়েছে জেনেছেন নিশ্চয়ই?”

রফিক আমজাদ বললেন, “হ্যা। পুলিশ এসেছিল কয়েকবার। জিজ্ঞেস করল আমি কিছু দেখেছি কী না এসব। আমি আমার রুমেই থাকি বেশিরভাগ সময়। বারান্দায় কিংবা বাইরে যাওয়া হয় না। কোনও কোন দিন রুম থেকেই বের হই না।”

“আমার মনে হয় খুনটা বারোটার দিকে হয়েছে। আপনি কিছু দেখেন নি? মানে এই সন্দেহজনক কিছু?”

“বারোটার দিকে আমি মনে হয় রুমে ছিলাম। ঘড়ি ব্যবহার করি না অনেকদিন। তাই সঠিক টাইম বলতে পারছি না। তারপর তমাল নামের ছেলেটা এল। ওরা প্রায়ই আসে। তমাল এবং আরেকটা ছেলে। কী যেন নাম...”

“অন্তু।”

“হ্যা, অন্তু। এরা দুজন আসে। কোনওদিন আমার সাথে গল্প করে। কোনও দিন তারা ঐ পিছনের মাঠে খেলে।”

“আজ তমালের সাথে আপনার দেখা হয়েছিল?”

“হ্যা। দেখা হয়েছিল। সে বলল, দাদু গল্প শুনব। আমি বললাম, আমি তখন তাকে ভিয়েতনামের একটি লোককথার গল্প বলেছিলাম। পরে তার বন্ধু আর আসে নি। সে একা একাই পিছনের মাঠে খেলতে যায়।”

“আপনি কি লাশ দেখতে গিয়েছিলেন?”

“না। ওসব আমার ভালো লাগে না। মানুষের ভীড় একেবারে অসহ্য মনে হয়।”

রহমান সাহেব বললেন, “ঠিক আছে রফিক সাহেব। আজ তাহলে উঠি। আরেকদিন আরো কথা হবে।”

রফিক আমজাদ সাহেব বললেন, “খুনটির ব্যাপারে কিছু জানতে পারলে আমাকে জানাবেন।”

রহমান সাহেব বললেন, “অবশ্যই।”

তিনি রফিক আমজাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার ঘর থেকে বের হলেন। গেটের কাছে এসে তিনি দেখতে পেলেন গ্যারেজের কাছে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে। বয়স পঁচিশ হবে।

তিনি ছেলে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কে?”

ছেলেটি বলল, “আমি সুফিয়ান। স্যারের বাসায় কাম করি।”

রহমান সাহেবের মনে পড়ল ছেলেটিকে হায়দারের সাথে দেখেছেন দুয়েকবার।

রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি আজকে দুপুরের দিকে সন্দেহজনক কিছু দেখেছ?”

সুফিয়ান বলল, “দেখি নাই স্যার। পুলিশ আইসা জিজ্ঞাস করে গেছে। কিন্তু আমি তখন কামে ছিলাম বাগানে।”

রহমান সাহেব বললেন, “তোমার স্যার কোথায় ছিলেন?”

সুফিয়ান বলল, “স্যারের কথা ঠিক কইতে পারি না। তয় দুপরের দিকে তার রুমে আছিলেন না।”

রহমান সাহেব ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “কীভাবে জানলে? তুমি তো বাগানে কাজ করছিলে?”

সুফিয়ান বলল, “পিওন চিঠি নিয়া আইল। তখন দিতে গেছিলাম।”

রহমান সাহেব বললেন, “তিনি অন্যরুমে ছিলেন না?”

সুফিয়ান চুপ করে রইল।

রহমান সাহেব বললেন, “উত্তর দাও। তাকে অন্য রুমগুলোতে খুঁজেছিলে?”

সুফিয়ান কাঁপা কন্ঠে বলল, “খুঁজি নাই স্যার। তাড়া ছিল।”

রহমান সাহেব দৃঢ় কন্ঠে ধমকের সুরে বললেন, “মিথ্যা বলো না সুফিয়ান। সত্যি করে বলো তাকে অন্য রুমগুলোতে খুঁজেছিলে কী না?”

সুফিয়ান প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল ভয়ে।

রহমান সাহেব তাকে অভয় দিয়ে বললেন, “তুমি যা বলবে তা আর কেউ জানবে না। নির্ভয়ে বলো।”

সুফিয়ান ভয়ে ভয়ে বলল, “খুজছিলাম স্যার। উনারে পাই নাই।”

রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “তখন কয়টা বাজে?”

সুফিয়ান বলল, “ঘড়ি দেখি নাই। আন্দাজ এগারোটা বারোটা।”

“তমাল ছেলেটা এর কত সময় পরে এল?”

“আন্দাজ এক ঘন্টা।”

“সে আর তার বন্ধু কি প্রায়ই আসে?”

“জ্বি স্যার। ডেইলি আসে। খেলে আর স্যারের গল্প হুনে। অবন্তী আফাও গল্প কইত।”

“অবন্তী গল্প বলত তুমি কীভাবে জানলে?”

“আফায় আইতেন এইখানে। তমাল অন্তু ভাইয়াদের লগে দেখা অইলে তাদের লগে কথা কইতেন।”

“অবন্তী এখানে কেন আসত?”

“জানি না স্যার। স্যারের লগে কী জানি কথা কইত।”

“কতদিন পর পর আসত?”

“এই সপ্তা দশদিন।”

“তোমার স্যার রে সে কী বলে ডাকত?”

“তা শুনি নাই। তবে উনি আইলে স্যারের লগে তার রুমে বইয়া কী জানি করতেন। আমার তখন ডিস্টাব করা নিষেধ আছিল।”

“অবন্তী মেয়েটাকে তোমার কেমন লাগত?”

“আফা বড় ভালো আছিলেন। তারে যে এইভাবে দেখতে অইব আমি জিন্দেগীতে ভাবি নাই।”

“রফিক সাহেবকে তোমার কেমন লাগে?”

ইতস্তত করে সুফিয়ান বলল, “স্যাররে আমি ভয় পাই।”

“ভয় পাও কেন?”

সুফিয়ান ভয়ার্ত মুখে তাকিয়ে রইল।

এই সময় দু তলার সামনের বারান্দা থেকে রফিক সাহেবের ডাক এল, “সুফিয়ান, এই সুফিয়ান!”

রহমান সাহেব সুফিয়ানকে বললেন, “আচ্ছা। ঠিক আছে। এ ব্যাপারে পরে তোমার সাথে কথা হবে।”

সুফিয়ান দৌড়ে যেতে যেতে চিৎকার করে বলল, “আইতেছি স্যার।”

রহমান সাহেব ইতস্তত ভাবতে ভাবতে রফিক আমজাদের বাসা থেকে বের হলেন। আকাশে তখন আঁধখাওয়া চাঁদ উঠেছে। তিনি চলতে লাগলে আবু তুরাব সাহেবের বাসার দিকে। সে বাসা একটু দূরে। তবে হেটে যেতে পাঁচ মিনিটের বেশি লাগবে না।

তৃতীয় অধ্যায়

রহমান সাহেব গেলেন আবু তুরাব সাহেবের বাসায়। আবু তুরাবের সাথে তার সামান্য পরিচয় ছিল। একই এলাকাতে থাকার দরুন মাঝে মাঝে দেখা স্বাক্ষাত হত।

মেয়ের মৃত্যুতে আবু তুরাব ভেঙে পড়েছেন। তার ছেলে দুটি দেশের বাইরে থাকে। এই একটিই মেয়ে। পড়ালেখা বেশ ভালো ছিল। এছাড়া সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মকান্ডেও জড়িত ছিল।

রহমান সাহেব দেখলেন আবু তুরাব বেশ গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। কারো সাথে কথা বলছেন না।

রহমান সাহেব তার রুমে প্রবেশের আগে দরজায় ঠোকা দিয়ে বললেন, “তুরাব সাহেব, কেমন আছেন?”

আবু তুরাব রহমান সাহেবকে দেখে কিছুটা অবাক হয়েছেন বুঝা গেল। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আসুন। আপনি কখন এলেন?”

রহমান সাহেব বললেন, “এই তো এসেছি।”

আবু তুরাব একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

রহমান সাহেব তার পাশে বসে বললেন, “আপনার জানামতে মেয়ের কি কোন শত্রু ছিল?”

আবু তুরাব রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “না। আমার এই মেয়েটাকে তো আপনি চিনতেন। বলেন এমন মেয়ের কোন শত্রু থাকতে পারে?”

তারপর হঠাৎ করেই আবু তুরাব সাহেব ঢুকরে কেদে উঠলেন। তিনি হয়ত দীর্ঘক্ষণ ধরে কান্না আটকে আছেন। রহমান সাহেব তার হাত ধরে স্বান্তনা দিতে বললেন, “ভাই কেঁদে কী হবে। শান্ত হোন।”

কান্নারত অবস্থাতেই প্রায় উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন আবু তুরাব। তিনি বললেন, “আমার দুই ছেলে চলে গেছে দেশের বাইরে। মেয়েটাকে নিয়ে ছিলাম দেশে। কী জন্য ছিলাম? এই দেশ আমার মেয়েটাকে নিরাপত্তা দিতে পারল না। দিনেদুপুরে খুন করে চলে গেল শুওরের বাচ্চারা। আমিও ছেড়ে দেব না। সব’কটাকে আমি দেখে নেবো। শুওরের বাচ্চারা আমার সাথে না পেরে...”

এমনভাবে কথাটা বললেন তিনি যেন মনে হল তিনি জানেন কে বা কারা খুন করেছে।

কিন্তু রহমান সাহেব এ ব্যাপারে আর কোন প্রশ্ন করলেন না। তার মনে হচ্ছিল এটা প্রশ্ন করার মত সঠিক পরিবেশ না। তিনি আবু তুরাব সাহেবের রুম থেকে উঠে গেলেন ড্রয়িং রুমে। সেখানে একটি ছেলে বসা ছিল। ত্রিশের মধ্যে হবে বয়স।

রহমান সাহেব তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “পুলিশ কি এসেছিল?”

ছেলেটি বলল, “হ্যা। অবন্তীর রুম সার্চ করে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে গেছে।”

রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী?”

ছেলেটি বলল, “রুদ্র, আমি তুরাব সাহেবের ভাতিজা।”

“এখানেই থাকো?”

“হ্যা।”

“তোমার বাবা মা?”

“উনারা আমি ছোট থাকতে একটা দূর্ঘটনায় মারা যান। তারপর থেকে আমি চাচার এখানেই আছি।”

“ওকে। অবন্তীর রুমটা কী আমি একটু দেখতে পারি?”

“চলুন।”

রুদ্র রহমান সাহেবকে নিয়ে অবন্তীর রুমে গেল। খুব সাধারণ একটা রুম। একটা টেবিলে ল্যাপটপ। টেবিলের উপরে বেশ কিছু বাংলা, ইংরেজি কবিতার বই। বইগুলো রহমান সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। পাবলো নেরুদা, শক্তি, বুকোস্কি, কীটস থেকে শুরু করে আরো বিভিন্ন কবিদের বই। রহমান সাহেব বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখলেন।

তারপর রুদ্রকে জিজ্ঞেস করলেন, “পুলিশ কী কী নিয়ে গেছে?”

রুদ্র উত্তর দিল, “কিছু কাপড় চোপড়। কম্পিউটারে অনেকক্ষণ খুঁজে একটি ফাইল নিয়ে গেছে যা এখানে খোলা যাচ্ছিল না।”

রহমান সাহেব বললেন, “ওর লাশটা ময়না তদন্ত শেষে কবে ফেরত দেবে?”

রুদ্র বলল, “তিনদিন পর।”

রহমান সাহেব টেবিলের একপাশে রাখা ছোট কালো অদ্ভুতদর্শন মূর্তি হাতে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলেন, “অবন্তীর কী কোন ছেলে বন্ধু ছিল?”

এই প্রশ্নে দপ করে যেন জ্বলে উঠল ছেলেটির মুখ। কিন্তু সে খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করল। বেশ তেঁতোভাবে উত্তর দিল, “সে আমি কী করে বলব। ওসব আপনি ইচ্ছে হলে খুঁজে বের করুন গিয়ে।”

উত্তর দিয়ে সে রুম থেকে চলে গেল। রহমান সাহেব তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা চিন্তা করার চেষ্টা করলেন। ছেলেটার এমন প্রতিক্রিয়ার কারণ কী?

রুমে বেশি কিছু দেখার ছিল না। রহমান সাহেব আবু তুরাব সাহেবের বাসা থেকে বের হলেন। আগেরবার রফিক সাহেবের বাসার কাজের লোকের কাছে বেশ কিছু তথ্য পেয়েছিলেন। তাই এই বাসাতেও বের হয়ে তিনি দেখছিলেন আশপাশে কোন কাজের লোক টোক দেখা যায় কি না।

প্রায় খসখসে গলায় এক বৃদ্ধ লোক তার পিছন থেকে জিজ্ঞেস করল, “কি স্যার? কারে খুঁজেন?”

রহমান সাহেব পিছনে ফিরে দেখলেন আবু তুরাব সাহেবের বৃদ্ধ দারোয়ান। রহমান সাহেব বললেন, “কাউকে না। তুমি তুরাব সাহেবের এখানে কতদিন কাজ করছ?”

খসখসে কন্ঠে লোকটা বলল, “অনেকদিন স্যার। আমি তুরাব ভাইয়ের গেরামের লোক। ছোডকালে আমরা এক লগে ফুটবল খেলছি।”

রহমান সাহেব বললেন, “উনার ছেলে দুটি শেষ কবে এসেছিল দেশে?”

খসখসে কন্ঠে দারোয়ান বলল, “স্যার ওরা তো আসে না। বড়লোকের ছাওয়াল। বিদেশে বিয়া সাদী করছে। দেশে আসব কোন দুক্কে। মাইয়াটা বড় ভালো আছিল।”

রহমান সাহেব বললেন, “অবন্তীর কথা বলছেন?”

দারোয়ান বলল, “হ। মাইয়াটা আমারে সম্মান দিত। ওর বাপের ছোডকালের বন্ধু ছিলাম বইলা। কইত চাচা আপনের কাজ করা লাগব না। আমি কইতাম আমি তো কাম শখে করি রে মা। কাম না কইরা থাকলে দুইদিনে মইরা যামু।”

রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “উনার ছেলেদের সাথে কীরকম সম্পর্ক?”

দারোয়ান বলল, “আবু তুরাব ছেলেদের দেশে আনার অনেক চেষ্টা করছে। কিন্তু ওরা আইব না। সব তকদির। আল্লার মাইর বুঝা বড় দায়।”

“তাহলে দেশে উনার যে এত বড় ব্যবসা তা কী উনিই দেখা দেখাশোনা করতেন?”

“হ। একাই। আর কিছু দেখত তার ভাইস্তা। আল্লার মাইর বুঝা বড় দায়।”

“বার বার এ কথা বলছেন কেন?”

“মানে বড় বিশাল স্যার। এইসবের মালিক তো ছিল পোলাটার বাপ আবু হাশেম। তারপর একদিন সে আর তার বউ দুইজনে মইরা গেল এক্সিডেন্টে। আর তখন শোনা গেল সব কিছুর মালিক আবু তুরাব। এখন আল্লার লীলা দেখেন, আবু হাশেমের পোলাই এখন সব কিছুর মালিক হইব।”

“তার মানে অবন্তী বেঁচে থাকলে সেই তো মালিক হতো?”

“হ। কিন্তু হে তো আর বাইচা নাই। আর থাকলেও তার লগে বিয়া হইত পোলাটার। এমনই কথাবার্তা চলতেছিল।”

“অবন্তীর কি মত ছিল বিয়েতে?”

“স্যার, আমি আর কইতে পারুম না। অনেক কিছু কইয়া ফেলছি কথায় কথায়। মনে কিছু নিয়েন না।”

লোকটা হনহন করে চলে গেল।

রহমান সাহেব আবু তুরাবের বাসা থেকে বের হয়ে চললেন তার নিজের বাসার দিকে। বাসায় গিয়ে ফোন দিলেন সমীরবাবুকে।

সমীরবাবু জানালেন অবন্তীর একটা বেস্ট ফ্রেন্ড তার সাথে ইন্টার্নী করছে একই ব্যাংকে। মেয়েটির নাম স্বর্না। মক্তবগলি নামে একটা জায়গা থাকে।

রহমান সাহেব এই কথায় বেশ অবাক হলেন। অবন্তীর বেস্ট ফ্রেন্ড তার সাথে কাজ করলে আহমদ শরীফের তা জানার কথা। কারণ তিনিও একই ব্যাংকে কাজ করেন। কিন্তু তিনি তা লুকালেন কেন?

রহমান সাহেব হায়দারকে বললেন চা দিতে। সে চা দিতে এলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুই তো সারাদিন এদিকেই থাকিস। অবন্তীর সাথে এলাকার কার কার বেশি কথা হত বল তো?”

হায়দার ঘাড় চুলকে বলল, “স্যার, অবন্তী আফায় তো অফিসে যাইত সকালে। আমাদের বাসার সামনে দিয়া হাইটা গিয়া গলির মাথার রিকশায় উঠত। প্রায়ই দেখা যাইত। তবে আজ দেখি নাই।”

রহমান সাহেব বললেন, “আজ দেখবি কীভাবে। আজ তো ছুটি।”

হায়দার আবার ঘাড় চুলকে বলল, “তা ঠিক। তবে স্যার, শরীফ সাবের লগে উনারে দেখা যাইত।”

“কোথায়?”

“মাঝে মাঝে রিকশায়। আর উনার বাড়িতেও যাইতেন। পোলাটারে খুব মায়া করতেন।”

“কোন পোলা? তমাল?”

“হ্যা স্যার। তমালের লগে প্রায়ই উনারে খেলতে দেখছি।”

“কোথায়? আমাদের পাশের বাসায় নতুন যে উঠেছেন উনার বাসার পিছনের খোলা জায়গায়?”

“ওইখানেও দেখছি। আর...”

“আর কী?”

“স্যার, বেয়াদবী না নিলে বলতাম।”

“বেয়াদবীর কী আছে, বল।”

“উনারে একদিন রাইতে শরীফ সাবের বাসায় দেখছি।”

“কীভাবে দেখলি?”

“আমি ছাদে গেছিলাম। তখন রাইত প্রায় দুইটা। আমাদের ছাদ থেইক্যা শরীফ সাবের বাসা দেখা যায়। বাসার গেট দিয়া বাইর হইয়া যাইতে দেখছি অবন্তী আফারে।”

“অন্ধকারে ঠিকঠাক দেখেছিস তো?”

“হ্যা স্যার। শিওর না হইলে আপনারে বলতাম না। আর স্যার আরেকটা ছেলেরে আফার সাথে তর্ক করতে দেখছি।”

“কয়দিন আগে? ছেলেটা দেখতে কেমন?”

“ছেলেটারে এলাকায় মাঝে মাঝে দেখা যাইত। মাথার চুল কোঁকড়া আর লম্বা। দশ বারোদিন আগে গলির মুখে অবন্তী আফার সাথে তারে তর্ক করতে দেখছি।”

রহমান সাহেব এবার চিন্তায় পড়ে গেলেন। মেয়েটার সাথে শরীফ সাহেবের তাহলে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেটা তিনি বললেন না কেনো? আবার তার ছেলেই প্রথম মৃতদেহটি দেখেছে। তিনিই ফোন দিয়ে পুলিশকে জানিয়েছেন কিন্তু অবন্তীর বাবাকে জানান নি।

আর এই ছেলেটি কে যার সাথে অবন্তীর কথা কাটাকাটি হয়েছিল?

এছাড়া রফিক আমজাদের ব্যাপারটা চিন্তার উদ্রেক করে। এই লোক মাস দুয়েক হল এখানে এসেছে। এর সাথে সপ্তাহ দশদিন পর পর মেয়েটার কী এমন কথা থাকতে পারে?

আর আবু তুরাব কাদের কথা ইঙ্গিত করলেন? তার কোন শত্রু নিশ্চয়ই? কিন্তু তার কেনো এত দৃঢ়ভাবে মনে হল তার শত্রুরাই কাজটা করেছে।

আরেকটি ব্যাপার যা রহমান সাহেবকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলল তা হল, রুদ্র ছেলেটা এমন প্রতিক্রিয়া দেখাল কেন? দারোয়ানের কথা যদি সত্যি হয় তাহলে বিষয় সম্পত্তি বিষয়ে তার ক্ষোভ কি তুরাব আলীর উপরে ছিল? সে ক্ষোভের আঁচ কি অবন্তীর উপরে পড়তে পারে?

রহমান সাহেব ভাবলেন, সাধারণ চিন্তায় মনে হয় ক্ষোভের আঁচ পড়তে পারে না। কারণ আবু তুরাবের ছেলে দুটো আসবে না দেশে। সুতরাং মেয়েটি মালিক হবে আবু তুরাবের সব সম্পত্তির। মেয়েটির বিয়ের কথা চলছিল রুদ্র ছেলেটির সাথে। সুতরাং, প্রকারান্তে রুদ্রই আবার মালিক হত সব কিছুর। ফলে ক্ষোভের আঁচ অবন্তীর উপর পড়ার কথা না এবং বিয়ে উপলক্ষ্যে সে ক্ষোভও থাকার কথা না। কিন্তু অবন্তী কি বিয়েতে রাজী ছিল? সে যদি অন্য কাউকে ভালোবেসে থাকে সেক্ষেত্রে কি ধরে নেয়া যায় না রুদ্রের ক্ষোভের পূনর্জন্ম?

রহমান সাহেব আর ভাবতে পারলেন না। তিনি ঠিক করলেন আগামী কাল অবন্তীর বান্ধবী স্বর্নার সাথে কথা বলবেন। তার থানায়ও যেতে হবে। তারা কী পেল কিংবা অবন্তীর কম্পিউটার থেকে যে লকড ফাইলগুলো নিয়ে গিয়েছিল সেগুলো খুলতে পারল কি না জানা দরকার।

চতুর্থ অধ্যায়

পরদিন সকালে সমীরবাবু এসেছিলেন। রহমান সাহেব তাকে সাথে নিয়ে গেলেন থানায়। থানার ওসি শফিউল্লাহ খান রহমান সাহেবকে দেখেই চিনে ফেললেন। খুশি কন্ঠে বললেন, “আরে আপনি তো রহমান সাহেব! আপনাকে নিয়ে দৈনিক রপান্তরে যে ফিচারটা বেরিয়েছিল তা পড়েছি আমি। দারুণ কাজ করেছেন ভাই। আপনার মত মানুষ দেখা যায় না।”

রহমান সাহেব সামান্য হেসে হাত মেলালেন। তারপর সমীরবাবুর সাথে ওসির পরিচয় করিয়ে দিতে বললেন, “ইনি সমীরবাবু। আমার কলিগ ও বন্ধু।”

ওসি শফিউল্লাহ বললেন, “আপনারা বসুন। চা খান।”

ওসি একজনকে ডেকে চায়ের অর্ডার দিলেন। তারপর বললেন, “এবার বলুন কী জন্য এসেছেন? আপনাকে কোনরূপ সাহায্য করতে পেলে কৃতার্থ হব।”

রহমান সাহেব বললেন, “আমি আসলে এসেছিলাম অবন্তীর খুনের ব্যাপারে। আমার পাশের বাসার পিছনেই ওকে পাওয়া গেল। পুলিশ কাল গিয়েছিল আমার বাসায়। আমাকে পায় নি। বলে এসেছিল যেন আমি দেখা করি। তাই আজ চলে এলাম।”

ওসি সাহেব বললেন, “সেই খুনটা আপনার বাসার কাছেই হয়েছে জানা ছিলো না। আমি গতকাল শহরের বাইরে ছিলাম তাই যেতে পারিনি। তবে যা শুনেছি এবং ছবি দেখেছি তাতে মনে হল ঘটনা ভয়াবহ।”

রহমান সাহেব বললেন, “হ্যা। ভয়াবহই বলা যায়।”

ওসি সাহেব বললেন, “তা আপনি কি এর পিছনে লেগেছেন?”

রহমান সাহেব বললেন, “পিছনে লাগা আর কী! একটু খোঁজখবর নিচ্ছি। নিজের বাসার কাছে এমন খুন হয়ে গেল। হাত পা ঘুটিয়েও তো বসে থাকা যায় না। তাছাড়া মেয়েটা বেশ পরিচিত ছিল। সুতরাং, একটা খচখচানি মনের মধ্যে থেকেই যাবে।”

ওসি সাহেব বললেন, “তা ঠিক। তবে প্রথমে আপনাকে আমার কিছু প্রশ্ন করার আছে। গতানুগতিক ব্যাপার। আশা করছি কিছু মনে করবেন না।”

রহমান সাহেব বললেন, “মনে করার কী আছে। কেউই সন্দেহের বাইরে নয়।”

ওসি সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “মেয়েটাকে আপনি কীভাবে চিনতেন?”

রহমান সাহেব বললেন, “একই রোডে থাকত ওরা। আর ও বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িত ছিল। আমার ব্যাপারে এলাকাতে একটা কথা আছে আমার কাছে অনেক বই আছে। কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়। মেয়েটি আমার কাছে কয়েকবার এবসার্ড নাটকের উপরে বই নিতে এসেছে। এছাড়া এ বিষয়ে সামান্য দুয়েকবার আমাকে প্রশ্ন করেছিল। কিন্তু আমি সাধারণত কম কথা বলি তাই ওর সাথে বেশি কথা হয় নি কখনো।”

ওসি সাহেব বললেন, “ওর মৃত্যুর দিনে অর্থাৎ যেদিন ওর লাশ পাওয়া গেল সেদিন কি সন্দেহজনক কিছু দেখেছিলেন এলাকায়?”

রহমান সাহেব উত্তর দিলেন, “না, সেরকম সন্দেহজনক কিছু দেখি নি। আসলে সেদিন আমি রুম থেকে বের হয়েছি মেয়েটির মৃত্যুর কথা শুনে।”

ওসি সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কি কাউকে সন্দেহ হয়?”

রহমান সাহেব বললেন, “আপাতত না।”

একটা লোক চা দিয়ে গেল। ওসি শফিউল্লাহ হেসে বললেন, “এই আমার প্রশ্ন শেষ। এবার চলুন চা খাওয়া যাক।”

রহমান সাহেব চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, “কিন্তু আমার প্রশ্ন যে রয়ে গেল।”

ওসি সাহেব বললেন, “কী প্রশ্ন? যা প্রশ্ন আছে করুন। চা খেতে খেতে উত্তর দেই।”

রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “ময়নাতদন্তে কী পেলেন?”

ওসি সাহেব বললেন, “এখনি বাইরে বলা অবশ্য ঠিক না। তবে আপনি যেহেতু খোঁজখবর করছেন এবং আমি আপনাকে বিশ্বাস করি তাই বলছি, মৃত্যু শ্বাসনালী কাটার ফলে হয় নি। এর আগেই মেয়েটি মৃত ছিল। তরল বিষ পানে তার মৃত্যু হয়েছে। তার মুখে আরো দুয়েকটা আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে সেগুলো সম্ভবত করা হয়েছিল কিছুদিন আগে।”

রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “মেয়েটার গায়ে তো নীল ঐ চাদরটা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় নি। সুতরাং আমার প্রশ্ন ছিল তাকে খুন করার আগে কি নির্যাতন করা হয়েছে?”

ওসি সাহেব বললেন, “না। এরকম কোন আলামত পাওয়া যায় নি। তার গায়ে আর কোন আঘাতের চিহ্ন নেই। এমনকী মনে হয়েছে সে নিজ ইচ্ছায় শান্তভাবে বিষ পান করেছে। তবে ওর দু হাত কব্জিতে কাটা পাওয়া গেছে।”

রহমান সাহেব বললেন, “ওর জিনিসপত্র থেকে কি কোন ক্লু পেলেন?”

ওসি সাহেব বললেন, “না। এখনো পাওয়া যায় নি। কম্পিউটারের লকড ফাইলটা খোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।”

রহমান সাহেব তখন বললেন, “আপনাকে কি একটা সাহায্যের অনুরোধ করতে পারি?”

ওসি শফিউল্লাহ বলেন, “অবশ্যই। আমি আগেই বলেছি আপনাকে সাহায্য করতে পারলে আমি গর্বিত বোধ করব। বলুন কী সাহায্য?”

রহমান সাহেব বললেন, “সেই লকড ফাইলটার এক কপি আমাকে দিতে পারবেন? আমি খোলার চেষ্টা করব। আর যেই নীল চাদরটা দিয়ে লাশটা ঢাকা ছিল তা আমি একবার দেখতে চাই।”

ওসি সাহেব একটু চিন্তা করে বললেন, “ওকে। ফাইলটা দেয়া যাবে এবং চাদরটাও দেখতে পারবেন। চলুন আগে চাদরটা দেখা যাক।”

ওসি সাহেব রহমান সাহেব ও সমীরবাবুকে নিয়ে ভিতরের একটা রুমে গেলেন। সেখানে কাচের একটা বাক্সের মধ্যে চাদরটা রাখা ছিল। এই রুমে বিভিন্ন জায়গায় অবন্তীর বিভিন্ন জিনিস, দেয়ালে তার মৃত্যু নিয়ে বের হওয়া পত্রিকার রিপোর্ট ইত্যাদি সাঁটা আছে।

রহমান সাহেব তীক্ষ্ণভাবে চাদরটাকে দেখতে লাগলেন। কাচের বাক্সে এমনভাবে রাখা আছে যে পুরো চাদরটাই দেখা যায় দু পাশে গিয়ে। রহমান সাহেব দেখলেন চাদরের এক মাথায় সামান্য জমাট রক্ত লেগে আছে।

তিনি ওসি সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, “চাদরটা কি পরিষ্কার করা হয়েছে?”

ওসি সাহেব বললেন, “না না। পরিষ্কার করা তো অসম্ভব। ঠিক যেমন পাওয়া গেছে তেমনি রাখা আছে। ইচ্ছে হলে হাতে গ্লাভস পরে আপনি ছুঁয়েও দেখতে পারেন।”

রহমান সাহেব চিন্তিতভাবে বললেন, “না, তার আর দরকার হবে না। তবে গলা কাটলে ফিনকী দিয়ে রক্ত বের হবার কথা। সেক্ষেত্রে চাদরের এক অংশ পুরো ভিজে যেত। এছাড়া ঘটনাস্থলেও রক্তের পরিমাণ আমার কাছে কম মনে হয়েছে।”

ওসি সাহেব এই কথায় চিন্তিত মুখে চাদরের রক্ত লেগে থাকা অংশটি দেখতে দেখতে বললেন, “তা ঠিক বলেছেন। চাদরে রক্তের পরিমাণ এত কম হওয়ার কথা না। আর ঘটনাস্থলের যে ছবিগুলো আমি দেখেছি তাতে আপনার কথাই সঠিক বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এর কারণ কী হতে পারে?”

ওসি সাহেব তাকালেন রহমান সাহেবের মুখের দিকে। রহমান সাহেব ভ্রু কুঁচকে চিন্তা করতে লাগলেন কিছু একটা। তারপর বললেন, “লকড ফাইলটা খুলতে পারলে হয়ত কিছু বুঝা যাবে।”

সমীরবাবু বললেন, “ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। তবে আমার মনে হচ্ছে রক্তের স্রোত চাদরে ঠিক লাগতে পারে নি।”

রহমান সাহেব তার মোবাইলটা বের করে ওসি সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, “চাদরের ছবি তুলতে পারি?”

ওসি সাহেব বললেন, “যত ইচ্ছা তুলুন।”

রহমান সাহেব নীল চাদরের কয়েকটি ছবি তুললেন মোবাইল দিয়ে।

ওসি সাহেব বললেন, “আপনারা তাহলে আমার রুমে যান। আমি একটি পেনড্রাইভে করে ফাইলটার এক কপি নিয়ে আসছি।”

রহমান সাহেব ও সমীরবাবু ওসি সাহেবের রুমে গিয়ে বসলেন। এর মিনিট খানেকের মধ্যে ওসি সাহেব আসলেন ফাইলটা নিয়ে। রহমান সাহেবের হাতে দিতে দিতে বললেন, “খুলতে পারলে আমাকে জানাবেন।”

রহমান সাহেব বললেন, “অবশ্যই।”

সমীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আবু তুরাব সাহেব তো বড় ব্যবসায়ী। তার মেয়ের এরকম মৃত্যুতে পুলিশ প্রসাশনের উপর চাপ কেমন পড়েছে?”

ওসি শফিউল্লাহ বললেন, “পড়েছে বেশ ভালোভাবে। তুরাব সাহেব সন্দেহ করছেন তার কিছু ব্যবসায়ীক শত্রু কাজটা করে থাকতে পারে। তিনি বিস্তারিত বলেছেন। সেই অনুসারে আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। তবে এগুলো কখনোই বাইরে প্রকাশ করার মত না।”

রহমান সাহেব বললেন, “আপনি এমনিতেই যা করেছেন তা অনেক। ধন্যবাদ এবং পরে প্রয়োজন হল আবার যোগাযোগ করব।”

ওসি সাহেব হাসিমুখে হাত মিলাতে মিলাতে বললেন, “আপনারা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আবার আসবেন। আর যদি কোনদিন সন্ধ্যার পর ফোন দিয়ে বাসায় আসেন তাহলে অনেক খুশি হবো।”

থানা থেকে বের হয়ে রহমান সাহেব সমীরবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “অবন্তীর বান্ধবীর বাসায় যেতে হবে এখন।”

সমীরবাবু বললেন, “খুব বেশি দূরে না। মক্তবগলি রিকশায় এখান থেকে প্রায় দশ মিনিটের পথ।”

তারা একটি রিকশা নিলেন। রিকশায় সমীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কী বুঝলেন রহমান ভাই? কোন ক্লু কী বের করতে পেরেছেন?”

রহমান সাহেব চিন্তিত মুখে বললেন, “এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না।”

“যে বাসার নিচে খুন হল সে ভদ্রলোকের সাথে কথা বলেছেন?”

“হ্যা। গিয়েছিলাম ওখানে। ভদ্রলোক লেখক মানুষ। এছাড়া অবন্তীদের বাসায়ও গিয়েছিলাম একবার।”

“আমাকে একটা ফোন দিলেন না? ফোন দিলেই তো আমি চলে আসতাম।”

“তোমাকে ফোন দেই নি কারণ অন্য একটা কাজ দিয়েছি তোমাকে। কাজটা করলে কীভাবে?”

“প্রথমে খোঁজ নিলাম অবন্তী কোথায় পড়েছিল। মানে কোন ইউনিভার্সিটি, কোন ডিপার্টমেন্ট ইত্যাদি। ঐ ডিপার্টমেন্টে পড়ে আমার একটা পরিচিত মেয়ে বের হল। অবন্তীদের এক ব্যাচ জুনিয়র। সেই জানাল বান্ধবী মেয়েটার কথা। কিন্তু অবন্তী মেয়েটা যে আপনার বাসায়ও এসেছিল তা আমি জানতাম না!”

“মাত্র দুয়েকবার এসেছে নাটক নিয়ে কিছু বই নিতে। এবসার্ড নাটকের কয়েকটা ব্যাপার জানতে চেয়েছিল। আর বেশি কিছু না। আর মেয়েটাকে আমি মাসে একবার, দুবার দেখতাম গলি দিয়ে হেটে যাচ্ছে। শি ওয়াজ বিউটিফুল।”

রিকশা একটা জায়গায় আসতেই সমীরবাবু বললেন, “থামো থামো।”

তারপর রহমান সাহেবকে আঙ্গুল দিয়ে একটা বাসা দেখিয়ে বললেন, “এই ৪৭/এ নাম্বার বাসাটা। এটাই।”

রহমান সাহেব ও সমীরবাবু রিকশা থেকে নামলেন। সমীরবাবু ভাড়া চুকিয়ে দিলেন।

৪৭/এ নাম্বার বাসা কলিংবেল চাপলে একটা মধ্যবয়স্ক লোক এসেছে দরজা খুলে দিল।

রহমান সাহেব বললেন, “এটা কি স্বর্নাদের বাসা?”

ভদ্রলোক রহমান সাহেবের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললেন, “হ্যা। কিন্তু আপনি কি রহমান সাহেব? মানে মিশরের মূর্তিটা আপনার কারণেই রক্ষা পেয়েছিল?”

রহমান সাহেব সামান্য হেসে বললেন, “এটা কি সারা শহরের লোক জেনে ফেলল!”

সমীরবাবু বললেন, “পত্রিকাগুলোতে প্রথম পাতায় ছবিসহ ছেঁপেছিল তো।”

ভদ্রলোক হাসিমুখে বললেন, “আপনার মত এত বড় লোক আমার বাড়িতে। কী মনে করে? আসুন, ভিতরে আসুন।”

রহমান সাহেব ও সমীরবাবু ভিতরে গিয়ে বসলেন। রহমান সাহেব বললেন, “আসলে একটা ছোট প্রয়োজনে এসেছি আপনার কাছে।”

“আমার কাছে প্রয়োজন! কী ব্যাপার বলুন তো?”

“আপনি কি স্বর্নার বাবা?”

“হ্যা, স্বর্না আমার ছোট মেয়ে।”

“আপনি হয়ত জানেন স্বর্নার খুব ভালো বন্ধু অবন্তী খুব নির্মমভাবে খুন হয়েছে গতকাল। আমরা এসেছিলাম স্বর্নার সাথে একটু কথা বলতে।”

“আমি শুনেছি, মানে ঐ পত্রিকায় পড়েছি ব্যাপারটা। আসলেই সাংঘাতিক। তবে স্বর্না এ ব্যাপারে কিছু বলে নি। সে ঘরেই আছে। আপনারা বসুন। আমি তাকে ডেকে দিচ্ছি।”

ভদ্রলোক উঠে চলে গেলেন। এর মিনিট দুয়েক পর স্বর্না এল। রহমান সাহেবের সামনেই বসল। মেয়েটা দেখতে খুব ভালো। অবন্তীর মতই বয়স হবে। পঁচিশ কিংবা ছাব্বিশ।

রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি তো অবন্তীর বন্ধু?”

স্বর্না বলল, “হ্যা। অবন্তী আর আমি ভালো বন্ধু ছিলাম।”

“কবে থেকে তোমাদের এই বন্ধুত্ব?”

“কলেজ লাইফ থেকেই। আমরা একসাথে কলেজে পড়েছি। তারপর ইউনিভার্সিটিতে।”

“তুমি অবন্তীর মৃত্যুর খবরটা কীভাবে জানতে পারলে?”

“টিভির নিউজের মাধ্যমে।”

“তোমার জানামতে ওর কি এমন কোন শত্রু ছিল যে এরকম কাজ করতে পারে?”

“আমি সঠিক বলতে পারব না।”

“ওর কি কোন বয়ফ্রেন্ড ছিল?”

স্বর্না একটু ইতস্তত করে বলল, “ছিল। কিন্তু প্রায় তিনমাস আগে ওদের ব্রেক আপ হয়ে যায়।”

“কেন সেটা কি তুমি জানো?”

“সঠিক কারণ জানি না। তবে কোন সমস্যা ছিল মনে হয়।”

“ছেলেটার নাম ঠিকানা দিতে পারবে?”

“হ্যা। সেও আমাদের সাথে ইউনিভার্সিটিতে ছিল। নাম হাবিব আশরাফ।”

“ছেলেটা কেমন?”

“কেমন মানে?”

“মানে ভালো না খারাপ?”

“স্বাভাবিক। ভালো এবং খারাপ দুটোই।”

“তোমরা তো একসাথে ব্যাংকে ইন্টার্নী করছিলেন। সেখানে আহমদ শরীফ নামে কাউকে চিনতে?”

“হ্যা। উনার সাথে অবন্তীর ভালো সম্পর্ক ছিল।”

“তুমি কী করে জানলে?”

“ক্যান্টিনে আমরা প্রায়ই একসাথে খেতাম। অবন্তী প্রায়ই উনার সাথে অফিসে আসত কিংবা অফিস থেকে যেত। তারা একই এলাকায় থাকতেন।”

“ঠিক আছে। তুমি তাহলে অবন্তীর বয়ফ্রেন্ড ছেলেটার এড্রেসটা লিখে দাও।”

স্বর্না একটা কাগজে ঠিকানা লিখতে লিখতে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি খুনটা নিয়ে তদন্ত করছেন?”

রহমান সাহেব এর উত্তরে একটু হেসে বললেন, “একটু খোঁজ নিয়ে দেখছি।”

স্বর্নার বাবা চা নিয়ে আসলেন।

স্বর্না রহমান সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, “আমি কি এবার যেতে পারি?”

রহমান সাহেব বললেন, “হ্যা। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।”

স্বর্নার বাবা চা এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, “আসলে আবু তুরাব সাহেবের সাথে আমাদের ফ্যামিলির সম্পর্ক অনেক পুরনো। ভদ্রলোক যে এভাবে দুর্দশার মধ্যে পড়বেন কে জানত? একবার যেতে হবে উনার ওখানে।”

সমীরবাবু বললেন, “উনার কি বড় কোন শত্রু টত্রু আছে?”

স্বর্নার বাবা বললেন, “তা কার নেই বলুন। এই যে আমি সামান্য এক ছোট ব্যবসায়ী কিন্তু আমারই কত শত্রু। আর আবু তুরাব সাহেব তো একজন বিরাট ব্যবসায়ী। তার শত্রু থাকবে না!”

রহমান সাহেব কোন কথা বললেন না। কী যেন চিন্তা করতে করতে তিনি চা টা শেষ করে স্বর্নার বাবাকে বিদায় জানিয়ে উঠে পড়লেন।

স্বর্নাদের বাসা থেকে বের হয়ে রহমান সাহেব বললেন, “সমীর একটা সিগারেট দাও। মাথা কাজ করছে না। বেশ বড় একটা জট দেখতে পাচ্ছি।”

সমীরবাবু পকেটে হাত দিয়ে বললেন, “সিগারেট কিনতে হবে। ওই পাশের টঙ দোকানে চলুন।”

তারা রাস্তার অন্য পাশের এক কোনে এক টঙ দোকানে গিয়ে সিগারেট কিনলেন। সিগারেট ধরিয়ে কয়েকটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে রহমান সাহেব স্বর্নাদের গেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মেয়েটা কিছু একটা লুকিয়েছে। কিন্তু সেটা কী আমি বুঝতে পারছি না।”

সমীরবাবু বললেন, “কিন্তু আমি তো সেরকম কিছু আভাস পাই নি।”

রহমান সাহেব একমনে সিগারেটে কয়েকটা টান দিলেন। ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, “সমীর, এবার তোমাকে একটা বেশ জটিল কাজ করতে হবে।”

সমীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কী কাজ?”

রহমান সাহেব বললেন, “তুমি এখানে আমার সাথে বসে থাকবে। স্বর্না মেয়েটা আজ কালের মধ্যে কারো সাথে দেখা করবে বলে আমার বিশ্বাস। সে ব্যক্তিটা কে তা জানা প্রয়োজন।”

সমীরবাবু অবাক হয়ে বললেন, “কিন্তু আপনি কেমন করে জানলেন?”

রহমান সাহেব বললেন, “কেমন করে জানলাম তা আমি তোমাকে বুঝাতে পারব না সমীর। তবে মেয়েটি একটি বড় সত্য লুকিয়েছে এবং সে অবন্তীর বন্ধু হলেও তাদের মধ্যে একটা প্রতিযোগীতার ভাব ছিল। সুন্দরী মেয়েরা সাধারণত পরস্পরের ভালো বন্ধু হয় না, প্রতিযোগী হয়।”

সমীরবাবু বললেন, “কিন্তু মেয়েটা যদি বাইরে না বের হয়?”

রহমান সাহেব বললেন, “যদি না বের হয় তাহলে অন্য কথা। তবে আমার যেহেতু সন্দেহ হচ্ছে সুতরাং ব্যাপারটা দেখতেই হবে। স্বর্নার বাবার কথাও আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করি নি। আবু তুরাব সাহেবের ফ্যামিলির সাথে পুরনো সম্পর্ক হলে তার মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে সে দিনই তার সাথে দেখা করার কথা। দুই বাসার দুরত্ব রিকশায় বিশ মিনিটেরও কম হবে। কিন্তু স্বর্নার বাবা দেখা করেন নি। এর অর্থ দাঁড়ায় পুরনো সম্পর্ক আছে ঠিক কিন্তু তাতে মরচে পড়েছে। মরচেটা কী কারণে তাও জানা দরকার।”

সমীরবাবু বললেন, “ঠিক আছে। বসে আরেক কাপ চা খাওয়া যাক।”

রহমান সাহেব বললেন, “খাওয়া যায়। টঙ দোকানের চা আর বাসার চায়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য।”

এরপর একের পর এক চা সিগারেট চলল। রহমান সাহেব এক প্যাকেট সিগারেট একটার পর একটা টেনে শেষ করলেন। চা কিছুক্ষণ পর পর এক কাপ। দোকানে মানুষজন একেবারে নেই বললেই চলে। সুতরাং, এ ধরনের দুই কাস্টমার পেয়ে চায়ের দোকানদার ছেলেটা খুশিই ছিল।

সমীরবাবু একবার বলেছিলেন, “রহমান ভাই, সিগারেট কম খান। এত বেশি খেলে তো ক্ষতি হবে?”

রহমান সাহেব বললেন, “তোমার শহরের নির্মল বাতাস বলে যাকে ডাকো এতে সীসা ভর্তি। সিগারেট না খেলেও ক্ষতি হবে।”

প্রায় দুই ঘন্টা বসার পর সমীরবাবু বললেন, “রহমান ভাই, এবার উঠা যাক। আরেকদিন না হয়...”

রহমান সাহেব তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আরেকদিন বলে কিছু নেই। আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ এখানে বসে থাকা। এতে একটা জিনিস প্রমাণও হয়ে যাবে। যদি মেয়েটা না বের হয় কিংবা যেরকম ধারণা করেছি সেরকম কোন কিছু জানা না যায় তাহলে বুঝা যাবে আমার ষষ্ট ইন্দ্রিয় দূর্বল, যার উপর বিশ্বাস করা যায় না।”

এই কথার একটু পর দোতলার বারান্দায় স্বর্না এসে দাঁড়াল। দোতলার বারান্দা থেকে চায়ের দোকানের ভেতরটা দেখা যাবার কথা না। তবুও রহমান সাহেব আরেকটু ভেতরে চলে গেলেন।

তিনি সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, “শী ইজ ওয়েটিং।”

সমীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কার জন্য?”

রহমান সাহেব কোন উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে রইলেন।

প্রায় মিনিট বিশেক পর একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।

একটা সাদা গাড়ি এসে থামল স্বর্নাদের বাসার সামনে। রহমানের সাহেবের চোখ চকচক করে উঠল।

গাড়িটা থেকে বের হল একটা ছেলে। রহমান সাহেব ছেলেটাকে চিনলেন। ছেলেটি গাড়ি থেকে নেমে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।

রহমান সাহেব সিগারেট ফেলে বললেন, “চলো এবার উঠা যাক।”

সমীরবাবু বললেন, “কিন্তু ছেলেটা কে? এখানে ঘটনা কী?”

রহমান সাহেব বললেন, “একটু পরে জানবে। আপাতত চায়ের দোকানদারকে টাকা দেয়া দরকার।”

রহমান সাহেব দোকানদারকে টাকা দিয়ে বের হয়ে খুব দ্রুত একটা রিকশা নিলেন। রিকশায় উঠে আবার সমীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “ছেলেটা কে?”

রহমান সাহেব বললেন, “ছেলেটা হচ্ছে আবু তুরাব সাহেবের ভাতিজা। ওর নাম রুদ্র। অবন্তীর সাথে তার বিয়ের কথা হচ্ছিল।”

সমীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু ছেলেটা এখানে কী করে?”

রহমান সাহেব বললেন, “সেটাই তো প্রশ্ন।”

রিকশা চলছিল রহমান সাহেবের বাসার দিকে।

পঞ্চম অধ্যায়

দুপুরবেলায় খাবার পর হাত পা ছড়িয়ে বসে রহমান সাহেব পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছিলেন। তখন তার কাজের লোক হায়দার এসে বলল, “স্যার, শরীফ সাবের ঘরে যে কাজ করত মবিন সে তো নাই।”

রহমান সাহেব মুখ তুলে বললেন, “নাই মানে?”

হায়দার বলল, “নাই মানে স্যার শরীফ সাব তারে বাইর কইরা দিছেন একমাস আগে। এমনিতেই সে বেশি বাইর হইত না। কাল আপনার সাথে কথা বলার পর আমি তারে ফোন দিছিলাম। তখন শুনলাম সে আর শরীফ সাবের বাসায় কাজ করে না।”

“সে এখন কোথায় থাকে?”

“খরাদিপাড়ায় একটা বস্তিতে থাকে। রিকশা চালায়।”

রহমান সাহেব একটু চিন্তা করে বললেন, “তার সাথে কথা বলা দরকার। তাকে ফোন দিয়ে বস্তিতে থাকতে বলো এবং আমাকে সেখানে নিয়ে যাও।”

হায়দার বলল, “এখন যাবেন স্যার?”

রহমান সাহেব বললেন, “হ্যা, এখন।”

হায়দার শরীফ সাহেবের কাজের লোকটাকে ফোন দিল। তারপর জানাল সে এখন রিকশা নিয়ে বাইরে আছে। সন্ধ্যার পর বস্তিতে ফিরবে। সুতরাং রহমান সাহেব ঠিক করলেন সন্ধ্যার পরে যাবেন খরাদিপাড়ার বস্তিতে।

রহমান সাহেব বাসার বারান্দায় বের হয়ে দেখলেন বাসার সামনে একটা ছোট ছেলে ফুটবল নিয়ে একা একা খেলছে। রহমান সাহেব নিচে নেমে এলেন। ছেলেটার কাছাকাছি গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কি অন্তু?”

অন্তু খেলতে খেলতে বলল, “হ্যা।”

রহমান সাহেব বললেন, “কোথায় গিয়েছিলে?”

“তমালদের ওখানে।”

“তমাল আসে নি?”

“না।”

“কেন?”

“তার বাবা বাইরে বের হতে নিষেধ করেছেন। সে লাশ দেখেছিল তো তাই।”

রহমান সাহেব অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, “লাশ! কীরকম?”

অন্তু রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, “পিছনের পুকুরের পাশে অবন্তী আন্টির লাশ পড়ে ছিল।”

“এটা তোমাকে তমাল বলেছে?”

“হ্যা।”

“আর কী বলেছে?”

“সে দৌড়ে গিয়ে তার বাবাকে বলেছিল। তারপর তার বাবা তাকে রুমে আটকে রেখে বাইরে যান। তখন সে একা একা কাঁদছিল। এরপর পুলিশ এসেছিল।”

রহমান সাহেব আর কোন প্রশ্ন করলেন না। ছেলেটি বল নিয়ে খেলতে খেলতে চলে গেল।

সন্ধ্যার পর তিনি হায়দারের সাথে যান খরাদিপাড়ার বস্তিতে। সেখানে শরীফ সাহেবের বাসায় কাজ করত যে ছেলেটা তাকে পাওয়া গেল। ছেলেটির নাম মবিন। বয়স আঠারো উনিশ হবে।

রহমান সাহেব তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কয়বছর শরীফ সাহেবের ওখানে কাজ করেছ?

মবিন বলল, “সাড়ে চাইর বছর।”

রহমান সাহেব বললেন, “তোমাকে হঠাৎ কেন কাজ থেকে ছাড়িয়ে নিলেন শরীফ সাহেব?”

মবিন বলল, “আমি জানি না স্যার। শরিফ স্যারের তখন মেজাজ মর্জি ভালো ছিল না।”

“মেজাজ মর্জি ভালো ছিল না কেন?”

“ম্যাডামের সাথে তখন তার ঝগড়া হইত। তারপর ম্যাডাম চলে গেলেন।”

“ম্যাডাম মানে শরীফ সাহেবের স্ত্রী?”

“জ্বি, শান্তা ম্যাডাম।”

“তোমার ম্যাডাম কি আর আসেন নি?”

“জ্বি না। উনি একেবারেই চলে গিয়েছিলেন।”

“কেন গিয়েছিলেন তুমি জানো?”

“জ্বি না। আমি বলতে পারবো না।”

“তুমি অবন্তীকে চিনতে?”

“জ্বি। উনাকে চিনতাম।”

“কীভাবে চিনতে?”

“উনি স্যারের সাথে বাসায় আসতেন। ম্যাডাম চলে যাবার পর তমাল ভাইয়া কান্নাকাটি করত, খাইতে চাইত না। তখনো আসতেন।”

“তোমার স্যার শরীফ সাহেব কেমন মানুষ?”

“উনি খুব ভালো মানুষ। আমারে কাজ থেকে ছাড়াইয়া দিছেন এজন্য আমার কোন দুঃখ নাই। এই শহরে আমার যখন কিছুই ছিল না তখন স্যার আমারে কাজ দিয়া সাহায্য করছেন। স্যার কোনদিন আমারে ধমক পর্যন্ত দেন নাই।”

“অবন্তী কেমন মেয়ে ছিল বলে তোমার ধারণা?”

“আপাও ভালো ছিলেন। উনার খবর পাইয়া আমার খারাপ লাগছে। ভালা মানুষ বেশিদিন বাঁচে না।”

তারপর রহমান সাহেব তার মোবাইলে তোলা নীল চাদরের ছবি বের করে মবিনের সামনে ধরে বললেন, “এই চাদর কি চিনতে পারো?”

মবিন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর কাঁপা কন্ঠে বলল, “জ্বি না স্যার। চিনি না।”

রহমান সাহেব মবিনের সাথে কথা বলে খরাদিপাড়া বস্তি থেকে বের হলেন হায়দারকে সাথে নিয়ে। তারা যখন একটি রিকশা নিচ্ছিলেন তখন হায়দার আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “ওই দেখেন স্যার!”

রহমান সাহেব হায়দারের নির্দেশিত দিকে তাকালেন। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোতে বেশ দূর দিয়ে একটা ছেলেকে রিকশা করে চলে যেতে দেখা গেল। রহমান সাহেব একপাশ দেখেই ছেলেটাকে চিনলেন। তার বাবুর্চী টিটো মিয়া!

তিনি আস্তে করে বললেন, “টিটো মিয়া এখানে কী করে?”

তারপর রিকশায় উঠে সমীরবাবুকে একটা ফোন দিয়ে বললেন, “সমীর, জানতে পারলাম আহমদ শরীফ সাহেবের স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়েছে মাস দুয়েক আগে। মেয়েটির নাম শান্তা। খুঁজে দেখো তো একে পাওয়া যায় কী না।”

সমীরবাবু এক ঘন্টার মধ্যে আহমদ শরীফের প্রাক্তন স্ত্রীর খোঁজ বের করে ফেললেন। তিনি ফোন দিয়ে জানালেন মেয়েটির নাম শান্তা ইসলাম। বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী সাইফ ইসলামের কন্যা। ভদ্রমহিলা নারীবাদী একটি এনজিওতে কাজ করেন।

সেদিন রাতে খাবার পর বিছানায় একটা বই হাতে শুয়ে রহমান সাহেব বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখন হায়দার বলল, “স্যার, একটা কথা আছে। আগে মনে হইছিল তেমন কিছু না। কিন্তু আইজ টিটোরে দেইখা মনে হইল আপনারে কওন দরকার।”

রহমান সাহেব বললেন, “বলে ফেল।”

হায়দার বলল, “টিটো মিয়া ছুরি হাতে অবন্তী আফার বাসার সামনে যাইত। আমি কয়েকবার দেখছি।”

রহমান সাহেব চমকে উঠলেন। তিনি বললেন, “তাহলে আগে বলিস নি কেন? ছুরি হাতে কেন যেত?”

হায়দার বলল, “সে তুরাব সাবের বাসায় রানতে গেছিল কয়েকদিন। আমি ভাবছিলাম ছুরি নিয়া হয়ত কোন কাজে যায়। কিন্তু তিন চাইরদিন দেখছি সে কোমড়ে ছুরি গুইজা নিয়া যায়। নিয়া অবন্তী আফাদের বাসার গেটের সামনে হাটাহাটি করে। আবার আইসা তার বিছনার নিচে লুকায়া রাখে।”

রহমান সাহেব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তখন তার মনে পড়ল অবন্তীর লাশ যখন পাওয়া যায় এর কিছুক্ষণ পরেই টিটো মিয়া ছুটি নিয়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু আজ তাকে তিনি খরাদিপাড়া বস্তির পাশের রাস্তা দিয়ে যেতে দেখেছেন। অর্থাৎ সে তার গ্রামে যায় নি।

ষষ্ট অধ্যায়

পরদিন ছিল ছুটির দিন। রহমান সাহেব সমীরবাবুকে সাথে নিয়ে গেলেন শান্তা ইসলামের এপার্টমেন্টে। ভদ্রমহিলা বেশ অবাক হলে্ন রহমান সাহেবকে দেখে। তিনি বললেন, “আমি আপনাকে পত্রিকায় দেখেছি। কী দরকারে এসেছেন বলুন?”

তিনি হয়ত ভেবেছিলেন নারী নির্যাতন বিষয়ক কোন সাহায্যের জন্য গিয়েছেন রহমান সাহেব।

রহমান সাহেব যখন বললেন, “আমি আসলে অবন্তী নামের যে মেয়েটা খুন হল সে ব্যাপারে একটু খোঁজখবর করছি। আপনার কাছে সে ব্যাপারেই কিছু তথ্য জানতে এলাম।”

ভদ্রমহিলা কাটা কাটা স্বরে জবাব দিলেন, “কোথাকার কে খুন হয়েছে সে ব্যাপারে আমি কী তথ্য দিতে পারি আপনাকে?”

রহমান সাহেব বললেন, “সে কোথাকার কে না। আপনারা একই এলাকাতে ছিলেন দীর্ঘদিন।”

ভদ্রমহিলা জবাব দিলেন, “ওসব দিন আমি ওই এলাকাতেই ফেলে এসেছি। এসব নিয়ে কোন ধরনের আলাপের ইচ্ছা আমার নেই।”

রহমান সাহেব বললেন, “কিন্তু আপনি তো নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, নারী উন্নয়ন এসব নিয়ে কাজ করেন। একটা মেয়ে এভাবে নির্মমভাবে খুন হয়ে গেল এতে কী আপনার কোন দায়িত্ব নেই। প্রতিবেশীর কথা না হয় বাদই দিলাম।”

ভদ্রমহিলা রুক্ষভাবে জবাব দিলেন, “আপনাদের সমস্যাটা হল আপনারা সব কিছু জেনারালাইজ করে ফেলেন। নারী উন্নয়ন নিয়ে কাজ করি বলে দুনিয়ার সব মার্ডার কেস নিয়ে আমাকে কাজ করতে হবে এটা কেমন কথা? এর জন্য পুলিশ আছে, গোয়েন্দা বিভাগ আছে।...এবং শখের তদন্তকারীরা আছেন যারা কিছু করতে পারা তো দূরের কথা উলটো অন্য মানুষদের পরিবারের বিভিন্ন ঘটনা খুঁড়তে শুরু করেন। এতে তারা বিকৃত আনন্দ উপভোগ করেন।”

স্পষ্টই কথাটা বলা হয়েছে রহমান সাহেবকে উদ্দেশ্য করে। সমীর বাবু বলতে যাচ্ছিলেন, “দেখুন, আপনি যা ভাবছেন তা নয়...” কিন্তু রহমান সাহেব তাকে থামিয়ে দিলেন।

ঠান্ডা স্বরে রহমান সাহেব বললেন, “তাহলে আপনি বলছেন অবন্তীর মৃত্যুর সাথে আপনার পরিবারের গোপন কোন ঘটনার সংযোগ আছে?”

ভদ্রমহিলা যেন রেগে ফেটে বললেন। তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, “আমি এ কথা বলি নি। কখনো বলিনি। আপনি যদি ভাবতে চান তাহলে ভাবুন। এবং দয়া করে এখান থেকে চলে যান।”

রহমান সাহেব তরল কন্ঠে বললেন, “অবশ্যই যাবো। কিন্তু আপনার সাবেক স্বামীর সাথে অবন্তীর মেলামেশা, আপনার বাড়িতে গভীর রাতে তার আগমন ইত্যাদি বিষয় জেনে যে প্রশ্নের অবতাড়না হয়েছিল মনে, আপনার সাথে কথা বলে তার উত্তর পেয়ে গেলাম।”

রহমান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। সমীরবাবুও উঠলেন। তারা দুজন যখন দরজার কাছাকাছি পৌছে গেলেন তখন ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন, “দাঁড়ান! জেনেছেন যখন পুরোটা জেনে যান।”

রহমান সাহেব আবার ফিরে এলেন। ভদ্রমহিলা যেন ভেঙে পড়েছেন। তার শক্ত সমর্থ রুপ এখন আর নেই।

তিনি কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, “আমি দুঃখিত উত্তেজিত হয়ে অনেক কথা বলে ফেলেছি আপনাকে। ব্যাপারটা আমার জন্য স্পর্শকাতর। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।”

রহমান সাহেব বললেন, “বুঝতে পারছি। আপনি বলুন।”

ভদ্রমহিলা একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বলতে লাগলেন, “নিজের স্বামী সন্তানকে নিজের চোখের সামনে যখন অন্য একটা মেয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে দৃশ্য সহ্য করার মত ক্ষমতা আমার ছিল না। কিন্তু আমি সে দৃশ্য দেখতে শুরু করেছিলাম। একটু একটু করে অবন্তী আমার স্বামী এবং সন্তানকে যেন কেড়ে নিচ্ছিল আমার কাছ থেকে। আমার ছেলে আমার চেয়ে বেশি ওকে পছন্দ করত। আমার মনে হত আমার স্বামীও ওকে পছন্দ করত। একবার রাতে আমাদের ঝগড়া হল। ভয়ে তমাল ভাত খেল না সে রাতে। বার বার চিৎকার করে বলছিল অবন্তী আন্টি খাইয়ে না দিলে সে ভাত খাবে না। আমার রাগ সেদিন সপ্তমে চড়ল। ছেলেটাকে কষে দুই চড় দিয়েছিলাম। সেই চড়ের শব্দ এখনো আমার কানে বাজে। মনে হয় মা হিসেবে আমি যে ব্যর্থ, অবন্তীর কাছে পরাজিত তা জেনে হাততালি দিচ্ছে সারা পৃথিবী।”

রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর?”

ভদ্রমহিলা বলল, “তারপর আর কী! সেরাতে শেষপর্যন্ত শরীফ অবন্তীকে নিয়ে এসেছিল। তার হাতে খেয়েই ছেলেটা ঘুমাতে যায়। সেদিনই আমি বুঝে নিলাম ওদের তো আমাকে দরকার নেই। কী দরকার উটকো ঝামেলা হয়ে থাকার? সহ্য হল না এসব। তাই চলে এলাম এবং ডিভোর্স দিলাম।”

রহমান সাহেব বললেন, “আপনাকে আর একটা প্রশ্ন করব।”

তিনি তার মোবাইল ফোনটা বের করে নীল চাদরের ছবিটা বের করে বললেন, “এ চাদর চিনতে পারেন?”

ভদ্রমহিলা রহমান সাহেবের মোবাইলটা হাতে নিলেন। ছবিগুলো মনযোগের সাথে জুম করে দেখলেন। তারপর বললেন, “হ্যা। আমরা নেপাল গিয়েছিলাম বিয়ের পর। এটা সেখান থেকেই কেনা।”

রহমান সাহেব বললেন, “আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এখন আমরা উঠছি।”

রহমান সাহেব ও সমীরবাবু শান্তা ইসলামের বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা নিলেন। সমীরবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, “রহমান ভাই, এবার কী হবে? শরীফ সাহেব কেন কাজটা করল?”

রহমান সাহেব গম্ভীরভাবে বললেন, “আরো জানতে হবে। আমার যতটুকু মনে হচ্ছে শরীফ সাহেবের সাথে অবন্তীর সম্পর্ক ছিল নিছক বন্ধুত্বের। সে তমালকে খুব স্নেহ করত। তবে শরীফ সাহেব এই বন্ধুত্বের ব্যাপারটা কীভাবে দেখতেন তা জানা গেলে ভালো হত।”

একটু পর রহমান সাহেব রিকশাওয়ালাকে বললেন, “মজুমদার পাড়ায় যাও।”

সমীরবাবু বললেন, “মজুমদার পাড়ায় কী?”

রহমান সাহেব বললেন, “অবন্তীর সাবেক বয়ফ্রেন্ড ছেলেটার সাথে কথা বলা দরকার। ওর নামটা যেন কী?”

সমীরবাবু বললেন, “হাবিব আশরাফ। তবে ছেলেটা কি এর সাথে জড়িত?”

রহমান সাহেব বললেন, “দেখা যাক। আর ছেলেটার সম্পর্কে যা জানতে পেরেছি তাতে মনে হয়েছে ও যথেষ্ট ভয়বংকর। মারামারি করার জন্য তিনবার জেলে ছিল।”

মজুমদার পাড়ায় হাবিবের বাসা খুঁজে পেতে বেশি বেগ পেতে হল না। রহমান সাহেবকে দেখে হাবিবও চিনতে পারল। ছেলেটা বেশ সুদর্শন তবে তার মুখ দেখে মনে হল তার ঘুম হয় নি কয়েকদিন। মাথার চুল কোঁকড়া এবং লম্বা। তার রুমের অবস্থা অগোছালো। রহমান সাহেব ও সমীরবাবু বসলেন একপাশে চেয়ার টেনে। ছেলেটা বসল খাটে।

রহমান সাহেব হাবিবকে জিজ্ঞেস করলেন, “অবন্তীর সাথে তোমার কতদিনের সম্পর্ক?”

হাবিব বলল, “এই পাঁচ বছর।”

“হঠাৎ সম্পর্ক ভেঙে গেল কেন?”

হাবিব ইতস্তত করে বলল, “আসলে ওই ভেঙে দিয়েছে। বলল, আমার প্রতি আর কোন আগ্রহ অনুভব করছে না।”

“হঠাৎ কেন তার এরকম মনে হল?”

“ও ইন্টার্নী করার জন্য বাংকে জয়েন করার পরই। তারপর সে আস্তে আস্তে বদলে যেতে শুরু করে।”

“তুমি নিশ্চয়ই এরপর খোঁজখব নিয়েছ কেন সে তোমার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। কোন সমস্যা না হলে আমাকে বলতে পারো। হয়ত তার মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে তোমার তথ্য সাহায্য করতে পারে।”

হাবিব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি ওকে সত্যিও অনেক ভালোবাসতাম। তাই ও যখন বলল আমার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে এবং ব্রেক আপ করল তখন আমি কিছু খোঁজখবর নিয়েছি। বাসায় ওর বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছিল। এছাড়া ম্যানেজার শরীফ সাহেবের প্রতি হয়ত ও দূর্বল হয়ে পড়েছিল। শরীফ সাহেবের ছেলেটার কথা অনেক বলত।”

রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি জানতে কার সাথে ওর বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছিল?”

হাবিব বলল, “হ্যা। ওর চাচাতো ভাই রুদ্র।”

“তুমি কি স্বর্নাকে চেন?”

“হ্যা। ও অবন্তীর বান্ধবী।”

“ওর সাথে রুদ্রের কী সম্পর্ক?”

“তাদের দুই পরিবারের সম্পর্ক অনেক আগে থেকে। শুনেছি যখন অবন্তীর বাবা এত বড় ব্যবসায়ী হন নি তখনো তাদের ভালো সম্পর্ক ছিল।”

“আর কিছু কী?”

“আর কিছু আছে কি না আমি জানি না।”

“স্বর্নার সাথে অবন্তীর সম্পর্ক কেমন ছিল?”

“আমি তো দেখেছি ভালোই। তবে স্বর্না বলেছি অবন্তীর বাবা বড় ব্যবসায়ী হবার পর বেশ অহংকারী হয়ে উঠেন। এবং এরপর থেকে দুই পরিবারের সম্পর্ক আগের মত ছিল না। তবে এসবের মধ্যে অবন্তী এবং স্বর্নার বন্ধুত্বে কোন সমস্যা হয় নি। অন্তত আমি হতে দেখিনি।”

রহমান সাহেব বললেন, “আচ্ছা, যখন তুমি দেখলে অবন্তী বদলে যাচ্ছে তখন তোমার রাগ হয় নি?”

“হয়েছে।”

“তুমিই তো ওকে মুখে আঘাত করেছিলে?”

হাবিব থমকে দাঁড়াল। মুহুর্তের মধ্যে তার বদলে গেল তার মেজাজ। সে রুক্ষভাবে বলল, “তাতে আপনার কী? আর আপনিই বা এত কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?”

রহমান সাহেব বললেন, “আমি ওকে কে খুন করেছে জানতে চাই তাই।”

হাবিব বসা অবস্থা থেকে উঠে রাগী স্বরে বলল, “তাহলে যান খুঁজে বের করুন। আমাকে বিরক্ত করবেন না। আমার সাথে ওর কোন সম্পর্ক ছিল না। আপনি বৃথা সময় নষ্ট করছেন এখানে।”

রহমান সাহেব আর কিছু বললেন না। কোন কিছু জিজ্ঞেস করার মত পরিস্থিতি আর ছিল না।

তিনি এবং সমীরবাবু হাবিবের বাসা থেকে বের হয়ে রিকশায় উঠলেন। সমীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কীভাবে জানলেন ছেলেটাই অবন্তীর মুখে আঘাত করেছে?”

সমীরবাবু বললেন, “দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে আন্দাজে বলেছিলাম। ছেলেটা এমনিতেই মারমুখি। সুতরাং তার পক্ষে এটা খুব স্বাভাবিক।”

রহমান সাহেব বললেন, “ওর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল সম্প্রতি সে ইয়াবাখোরদের পাল্লায় পড়েছে।”

সমীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কীভাবে বুঝলেন?”

রহমান সাহেব বললেন, “প্রথমে বুঝেছি মুখ দেখে আর কথাবার্তা শুনে। আর শেষে উঠে আসার সময় রুমের টেবিলের সাথে লাগানো ড্রয়ারের দিকে চোখ পড়ল। সামান্য একটু খোলা ছিল। ভিতরে ইয়াবা ট্যাবলেট চিনতে আমার ভুল হয় নি।”

সমীরবাবু বললেন, “এইরকম নেশাখোর ছেলেরা মারাত্মক হয়। শহরের ছিনতাই, ডাকাতির বেশিরভাগই তো এরা করে নেশার টাকার জন্য।”

রিকশা চলছিল। রহমান সাহেব আস্তে করে বললেন, “টাকার জন্য অনেকে ব্ল্যাকমেইলও করে থাকে। অবন্তীর ক্ষেত্রে তা হয়েছে কী না কে জানে!”

সেদিন রাতে রহমান সাহেব পুরো ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলেন। যাদের যাদের নাম এই ঘটনার সাথে উঠে এসেছে তাদের সবার নাম একটা কাগজে লিখে তিনি গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হলেন। একসময় প্রায় অবসন্ন হয়ে পড়লেন তিনি। টেবিলে মাথা রেখে শুয়েছিলেন। তখন একটা পুরনো বইয়ের দিকে চোখ গেল তার। নাম এইনশেয়েন্ট ইজিপ্ট। বইটা তার পড়তে ইচ্ছা হল। হাত বাড়িয়ে বইটি নিয়ে কভারের ছবিটা দেখেই হঠাৎ করে তার মনে পড়ল অবন্তীর সেই লকড ফাইলটার কথা যা তিনি নিয়ে এসেছিলেন থানা থেকে। রহমান সাহেব পেনড্রাইভটি খুঁজতে লাগলেন। টেবিলে বইয়ের স্তুপ। পেনড্রাইভ টেবিলে পাওয়া গেল না। উলটো খুঁজতে গিয়ে কিছু বই পড়ে গেল মেঝেতে। রহমান সাহেব বিরক্ত হলেন। তিনি উঠে গিয়ে আলনায় ঝুলানো তার পাঞ্জাবীর পকেটে হাত দিয়ে পেনড্রাইভটি পেলেন।

নিজের ল্যাপটপে ফাইলটা খোলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু দেখাচ্ছে পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড। রহমান সাহেব ভ্রু কুঁচকে প্রায় মিনিট পাঁচেক তাকিয়ে রইলেন ল্যাপটপের স্ক্রিণের দিকে। এই সময়ে তিনি ভাবতে লাগলেন কী হতে পারে পাসওয়ার্ড।

টেবিলে যে কাগজে লেখা ছিল ঘটনায় উঠে আসা নামগুলো সে কাগজটা হাতে নিয়ে তিনি একটা লাল কালির কলম নিয়ে কিছু নাম কাটতে লাগলেন। কাটতে কাটতে কয়েকটি নাম রইল শেষ পর্যন্ত।

আহমদ শরীফ

হাবিব আশরাফ

তমাল

অন্তু

স্বর্না

রফিক আমজাদ

রহমান সাহেব প্রতিটি নাম দিয়ে চেষ্টা করবেন মনস্থ করলেন। প্রথমে কোন কারণ ছাড়াই দিলেন রফিক আমজাদ। কিন্তু ভুল পাসওয়ার্ড দেখাল।

রহমান সাহেব কিছুটা হতাশ হয়েই দ্বিতীয় বার চেষ্টা করলেন ‘তমাল’ নাম দিয়ে। ফাইল খুলে গেল।

রহমান সাহেব যেন প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। তার অবসন্নতা মুহুর্তেই মিলিয়ে গেল। তিনি বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে দেখলেন ওয়ার্ড ফাইলে লেখা কবিতা। মোট ৪২ টি কবিতা।

একেবারে নিচে লেখক পরিচিতিতে লেখাঃ

আমি অবন্তী শেজমু। এই কবিতাগুলো লিখেছি। জানিনা কেমন হল। জানিনা এগুলো কখনো প্রকাশিত হবে কি না।

রহমান সাহেব দেখলেন কবিতাগুলো বেশ ভালো। সবগুলো কবিতাতেই জীবনকে দেখা হয়েছে এবসার্ডিস্ট দৃষ্টিকোন থেকে। কোন কবিতাই প্রেম ভালোবাসা নিয়ে নয়। সাধারণত এ বয়সের ছেলে মেয়েরা প্রেম নিয়েই কবিতা লিখে। কিন্তু এই কবিতাগুলো বেশ পরিণত। কিন্তু এভাবে কবিতা লিখে অবন্তী পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখল কেন? আর অবন্তীর নাম যে এরকম অদ্ভুত তা রহমান সাহেব জানতেন না।

সপ্তম অধ্যায়

কবিতাগুলোর মধ্যে একটি কবিতা রহমান সাহেবের বেশি অদ্ভুত মনে হল। কবিতাটি হলঃ

বিবর্তীত গুইসাপ

মক্তবগলির ভেতরে

আমি একদা দেখেছিলাম একটি গুইসাপ

নিজেকে ধিক্কার দিতে দিতে

হয়ে যাচ্ছিল কুমির বিশেষ

এ এক দারুণ স্মৃতি

বলে বুঝানো যায় না

কল্পনা যেন ধরে না একে

ধরলেও ছেড়ে দেয়

তেল চকচকে শরীর কি তার?

যাইহোক, পরসমাচার,

সে কুমিরকে আজো দেখি

হঠাৎ হঠাৎ

রাজার গলি কিংবা খরাদিপাড়ায়

সে হয়ত আমাকে চিনতে পারে

তাই লুকিয়ে যাবার আগে ফিরে ফিরে তাকায়।

মক্তবগলি এবং খরাদিপাড়া জায়গা দুটির নিচে লাল কালি দিয়ে দাগ দিলেন রহমান সাহেব। অবন্তীর বান্ধবীর বাসা মক্তব গলিতে। খরাদিপাড়ার বস্তিতে থাকে আহমদ শরীফের প্রাক্তন কাজের লোক। এই দুই জিনিসের কি কোন সম্পর্ক আছে? এই কবিতা দিয়ে কি কিছু একটা বুঝানো হয়েছে?

পরদিন সকালে এসবই ভাবছিলেন তিনি। এমন সময় সমীরবাবু এলেন। তাকে ল্যাপটপের সামনে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “লকড ফাইলটা খুলতে পেরেছেন নাকী?”

রহমান সাহেব গম্ভীরভাবে বললেন, “খুলতে তো পেরেছি। কিন্তু এতে কবিতা লেখা। আমি কবিতার কিছুই বুঝতে পারছি না। এই দেখো একটা।”

রহমান সাহেব সমীরবাবুকে ল্যাপটপ এগিয়ে দিলেন। সমীরবাবু কবিতাটি পড়লেন। তারপর উৎসাহের সাথে বললেন। “কোন সমস্যা নাই। কবি শাখাওয়াত ঠাকুর আমার পরিচিত মানুষ। তার সাথে গেলেই সব অর্থ বেরিয়ে যাবে।”

রহমান সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন, “শাখাওয়াত ঠাকুর?”

সমীর বাবু বললেন, “জি। বিখ্যাত কবি। এটা তার ছদ্মনাম। এই নামেই পরিচিত। শুনেছি আসল নাম নাকী ছিল শাখাওয়াত মিয়া। অবশ্য এখন আর সে নামের অস্তিত্ব নেই।”

রহমান সাহেব বললেন, “তার কাছে গেলে উপকার হবে বলছ?”

সমীরবাবু উৎসাহের সাথে বললেন, “অবশ্যই। সে নিশ্চিত এগুলো কীরকম কবিতা এ সম্পর্কে আইডিয়া দিতে পারবে।”

রহমান সাহেব বললেন, “তার কাছে সব কবিতা নিয়ে যাবো না। শুধু গুইসাপের বিবর্তন নেব। দেখা যাক সে এ বিষয়ে কী বলে। ইন্টারেস্টিং হলে অন্যগুলোও দেখানো যাবে।”

সমীরবাবু বললেন, “তাহলে চলুন এখনি। বেশি বেলা হলে তাকে আর পাওয়া যাবে না।”

রহমান সাহেব বললেন, “ঠিক আছে। তুমি কবিকে ফোন দিয়ে দেখো তিনি আছেন কি না। আমি এটা প্রিন্ট করে ফেলি।”

রহমান সাহেব কবিতা প্রিন্ট করলেন। সমীরবাবু ফোন দিয়ে খোঁজ নিলেন। কবি বাসায় আছেন। সুতরাং রহমান সাহেব ও সমীরবাবু কবি শাখাওয়াত ঠাকুরের বাসায় রওনা হলেন।

শাখাওয়াত ঠাকুরের আলিসান বাড়িতে পৌছাতে আধঘন্টার মত লাগল। রহমান সাহেব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এই তোমার কবির বাড়ি? আমি তো জানতাম কবিদের বেশি টাকা পয়সা থাকে না।”

সমীরবাবু একটা গর্বিত হাসি দিয়ে বললেন, “ভাই জাতীয় পুরস্কার পাওয়া কবি। একেবারে হাই লেভেলে কানেকশন। সরকারের সাথে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণও করেছেন।”

রহমান সাহেব ও সমীরবাবু কবি শাখাওয়াত ঠাকুরের বাড়িতে প্রবেশ করলেন। কবির ড্রয়িং রুমের দেয়ালে নানা ধরনের দামী পেইন্টিং এ ভর্তি। বুঝাই যাচ্ছে কবি দারুণ শৌখিন লোক।

প্রায় মিনিট বিশেক পর সাদা পাঞ্জাবী এবং কাঁধে চাদর ঝোলানো কবি আসলেন। সমীরবাবু এগিয়ে গিয়ে হাত মেলাতে মেলাতে বললেন, “কেমন আছেন কবি?”

তারপর রহমান সাহেবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, “ ইনি রহমান ভাই। একটা কবিতা নিয়ে এসেছেন আপনার কাছে।”

রহমান সাহেব হালকা হেসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। কবি হাসিমুখে হাত মেলালেন।

তারপর বসে বললেন, “কবিতা নিয়ে দিনরাত মানুষ আসে। তরুণ কবি লেখকরা তো আমাকে তাদের কবিতা দেখাতে পারলে ধন্য হয়ে যায়। কিন্তু এত এত কবিতা নিয়ে আসে যে এখন আমি আর কাউকে ঢুকতে দেই না কবিতা নিয়ে। আপনি সমীরবাবুর পরিচিত এবং তিনি বললেন আপনি একটা কবিতার অর্থ বুঝতে চান। আপনার কেসটা ভিন্ন তাই আপনার ব্যাপারে না করতে পারি নি।”

রহমান সাহেব বললেন, “ধন্যবাদ।”

তারপর কবিতার কাগজটি বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “এটাই সেই কবিতা।”

কবি শাখাওয়াত ঠাকুর কাগজটি নিয়ে একপলক দেখলেন। তারপর বললেন, “আসলে ইদানীং ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। লেখার সময়ই পাই না। প্রাইম মিনিস্টারের অফিস থেকে প্রায়ই ফোন আসে। তখন আরেক ঝামেলা।”

সমীরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কেনো শাখাওয়াত ভাই?”

“আর বলো না। প্রাইম মিনিস্টার আমার কবিতার খুব ফ্যান। ডেকে নিয়ে গিয়ে লেখার খোঁজ খবর নেন। দেশের সাহিত্যের উন্নয়নে কী কী করা যায় এসব নিয়ে পরামর্শ নেন। তরুণ লেখকদের নিয়ে একটা প্রকল্প নিয়েছে সরকার। তাতে আবার আমাকেই বানিয়ে দেয়া হয়েছে প্রেসিডেন্ট। বলো তো, এতসব ঝামেলা কীভাবে সামাল দেই?”

রহমান সাহেব একবার সমীরবাবুর দিকে তাকালেন।

সমীরবাবু কবিকে সায় দিয়ে বললেন, “তা ঠিকই বলেছেন। লেখকদের তো প্রধান কাজই লেখা।”

কবি শাখাওয়াত ঠাকুর উৎসাহের সাথে বললেন, “একেবারে ঠিক বলেছ। কিন্তু মর্মান্তিক ব্যাপার হল আমাদের দেশে সেই মানের লেখক কোথায়। তাই আমাকেই বেশি ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। লেখালেখি সহ সাহিত্যের অন্য দশটা পাঁচটা জিনিসেও সময় দিতে হচ্ছে। আবার আরেক ঝামেলা আছে। বললে হয়ত বলবে বেশি বলছি।”

সমীরবাবু ভদ্রতার খাতিরে বললেন, “না ভাই। কী যে বলেন। ঝামেলাটা কী?”

হাসি হাসি মুখ করে কবি শাখাওয়াত ঠাকুর বললেন, “ওই যে পুরস্কার। জাতীয় পুরস্কার দিয়ে দিল তিনবার। তারপর পদক টদক দিচ্ছে তো প্রতিবছর। ছোট বড় সাহিত্য সংঘটনের পক্ষ থেকে সম্মাননা মাসে একটা লেগে আছেই। আমি আয়োজকদের বলি, “বাবারে, আমারে আর দেয়ার কী দরকার। অন্যদেরও কিছু দাও।” তখন তারা কী বলে শুনবে?”

সমীরবাবু বললেন, “কী?”

কবি বললেন, “বলে আর কাকে দেব। আপনাকে সম্মান দিয়ে আমরা গর্বিত হতে চাই।” এরকম অবস্থা আমার। আর সাহিত্য সম্মেলনগুলোতে সভাপতিত্বের দায়িত্ব তো আছেই। আমি না করলে শুনবে না। মাঝে মাঝে মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে চলে যাই।”

রহমান সাহেব বেশ বিরক্ত হচ্ছিলেন। তিনি বিরক্ত কন্ঠে বললেন, “কবি, আমাদের কবিতাটা আসলে কেমন?”

কবির তখন মনে হল কবিতাটার কথা। তিনি আরেকবার দেখে সরু চোখ করে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কি আপনার লেখা?”

রহমান সাহেব বললেন, “না। একটা মেয়ে লিখেছে। বয়স চব্বিশ পঁচিশ।”

কবি তখন বললেন, “হুম! পড়েই বুঝেছি কাঁচা হাতের লেখা। এই ধরনের কবিতাকে বলে বাজে কবিতা। আমি দেখেই বুঝেছি এটা যে লিখেছে কবিতা সম্পর্কে তার সামান্য ধারণাও নেই। কবিতার এক প্রধান বিষয় হচ্ছে ছন্দ। মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত এসব সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞাণের আবশ্যকতা আছে। এ নিয়ে আমার বই “ছন্দের পৃথীবিতে অঘ্রাণ” পড়ে দেখবেন। দুই বাংলায় ছন্দ নিয়ে এমন বিশদ আলোচনা করে কেউ লিখতে পারে নি।”

রহমান সাহেব বিরক্তি লুকানোর কোন চেষ্টা না করে ঝট করে উঠে পড়লেন। বেশ রুক্ষ গলায় বললেন, “ঠিক আছে কবি। আপনার সময় নষ্ট করলাম। আসি তবে।”

কবি শাখাওয়াত ঠাকুর বললেন, “দাঁড়ান দাঁড়ান আরেকটা বইয়ের নাম মনে পড়েছে। ‘দুরন্ত সাগরে আমি এক মীন’। আমার চতুর্দশপদী কবিতার সংকলন। এটি পড়লে আদর্শ কবিতা সম্পর্কে আপনার ধারণা আরো স্পষ্ট হবে। আর মেয়েটাকে বলবেন আমার সাথে যেন দেখা করে।”

রহমান সাহেব আর দাঁড়ালেন না। হনহন করে বেরিয়ে গেলেন।

সমীরবাবুও কবিকে বিদায় জানিয়ে বের হলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন রহমান সাহেব খেপেছেন।

তিনি বাইরে এসে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “স্যরি ভাই। আমি আসলে বুঝতে পারি নি কবি এভাবে কথা বলবেন। এর আগে তার সাথে একটু আধটু কথা হয়েছিল।”

রহমান সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে বললেন, “অযথাই সময় নষ্ট হল। আমার খারাপ লাগছে এই ভেবে যে এদের মত লোকই আমাদের প্রধান লেখক।”

বাসায় ফিরে গিয়ে রহমান সাহেব আর কোথাও বের হলেন না। সমস্ত ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে বসলেন আবার নতুন করে।

অষ্টম অধ্যায়

রহমান সাহেব সেদিন সারা রাত ঘুমাতে পারলেন না। তার চোখ লাল হয়ে গেল। সকালে চা খেয়ে তিনি গেলেন তার পাশের বাসায় লেখক রফিক আমজাদের বাসায়। রফিক আমজাদ তখন বাসার সামনের খোলা জায়গায় চেয়ারে বসে ছিলেন।

রহমান সাহেবকে দেখে বললেন, “আরে রহমান সাহেব! কেমন আছেন?”

রহমান সাহেব বললেন, “এই তো ভালো আছি। আপনার কী অবস্থা?”

রফিক আমজাদ বললেন, “আমার আর থাকা। বসুন।”

তারপর তার কাজের ছেলেকে ডেকে বললেন, “সুফিয়ান, রহমান সাহেবের জন্য চা নিয়ে আয়।”

রহমান সাহেব বসতে বসতে বললেন, “এই মাত্র চা খেয়ে এলাম। এখন আর খাবো না।”

রফিক আমজাদ বললেন, “আরে খান খান। সুফিয়ান ভালো পুঁদিনা পাতার চা বানায়।”

তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “তা কী মনে করে এলেন?”

রহমান সাহেব বললেন, “এলাম একটা ব্যাপার জানতে। আপনি কি জানতেন অবন্তী কবিতা লিখত?”

রফিক আমজাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “হ্যা। জানতাম কিছুটা। সে আমাকে কয়েকটা কবিতা দেখিয়েছিল। এবসার্ড কবিতা। ওর কবিতাগুলো দেখবেন?”

রহমান সাহেব বললেন, “নিশ্চয়ই।”

রফিক আমজাদ বললেন, “তাহলে চলুন আমার রুমে।”

রহমান সাহেব রফিক আমজাদ সাহেবের সাথে হেটে তার রুমে এলেন। বাসার দ্বিতীয় তলায় তার রুম।

রুমে পরিপাঠি করে বিভিন্ন ধরনের বই সাজানো। রহমান সাহেবের যেন বিপরীত তিনি। রহমান সাহেবের রুমে সব বই অগোছালো। একটা টান দিলে তিনটা পড়ে যায় এমন অবস্থা। আর রফিক আমজাদের বইগুলো একেবারে গোছালো এবং বেশিরভাগ বইই গল্প, উপন্যাস আর কবিতার। রহমান সাহেবের চোখ বই চেনে। তিনি একবার চোখ বুলিয়েই বুঝে নিলেন তার মত পড়ুয়া আরেকটি লোকের ঘর তিনি জীবনে প্রথমবারের মত দেখলেন।

রফিক আমজাদ একটা কাগজের ফাইলে করে এ ফোর সাইজের কয়েকটা কাগজ বের করে দিলেন রহমান সাহেবের হাতে। রহমান সাহেব হাতে নিয়ে দেখলেন লকড ফাইল ওপেন করে তিনি যেসব কবিতা দেখেছিলেন এগুলো তাদেরই কয়েকটি। কিন্তু তিনি রফিক সাহেবকে বললেন না যে তিনি কবিতাগুলো আগে পড়েছেন।

জিজ্ঞেস করলেন, “কবিতাগুলো আপনার কেমন মনে হয়?”

রফিক আমজাদ বললেন, “মোটামোটি লেগেছিল। তবে এখন পড়লে হয়ত আরো ভালো লাগবে। ওর মৃত্যুর পর কবিতাগুলোতে মহত্ত্ব যুক্ত হয়েছে। আরো কবিতা আমাকে দেখিয়েছিল। সব ক’টা দিয়ে ওর নামে একটা বই করতে পারলে বেশ হত। পৃথিবীর সাহিত্য ভালো কিছু পেত।”

রহমান সাহেব বললেন, “মৃত্যুর পর মহত্ত্ব যুক্ত হয় কীভাবে?”

রফিক আমজাদ একটু হেসে বললেন, “তা আপনি বুঝবেন না। প্রকৃত কবিরাই কেবল তা অনুভব করতে পারেন। কবিতা বুঝার জিনিস না। কবিতা অনুভবের ব্যাপার।”

রহমান সাহেব কাগজটা টেবিলে রাখতে গিয়ে দেখতে পেলেন প্রায় বারো ইঞ্চি লম্বা একটি মূর্তি। কিছুটা বানরের মত মূখ। গায়ের রঙ কিছুটা নীলের মত।

রহমান সাহেবের মূর্তিটা দারুণ লাগল। তিনি মূর্তিটি হাতে নিয়ে বললেন, “এ ধরনের একটা মূর্তি অবন্তীর বাসায় দেখেছিলাম।”

রফিক আমজাদ বললেন, “অবন্তী ওটা আমার কাছ থেকেই নিয়েছিল। একটা অকশন থেকে কিনেছিলাম। মূর্তিটা কিন্তু খুব দামী।”

রহমান সাহেব তখন হঠাৎ করে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসলেন।

রহমান সাহেব বললেন, “তা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। আচ্ছা, অবন্তী যেদিন মারা যায় সেদিন দুপুরে আপনি বাসায় ছিলেন না। কোথায় ছিলেন?”

এমন অতর্কিত প্রশ্ন রফিক আমজাদ প্রত্যাশা করেন নি।

তবুও বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে স্বাভাবিকভাবে বললেন, “আপনি জানলেন কীভাবে? নিশ্চয়ই সুফিয়ান বলেছে। হা হা। আমার ব্যাপারে এরকম গোয়েন্দাগিরি করলে আরো অদ্ভুত অদ্ভুত তথ্য পাবেন। যেমন, প্রতি পূর্নিমার গভীর রাতে আমি শালবনের ভিতরে চলে যাই।”

রহমান সাহেব বললেন, “কিছু মনে করবেন না। আগ্রহ হচ্ছিল জানতে কোথায় ছিলেন তাই জিজ্ঞেস করলাম।”

রফিক আমজাদ বললেন, “ধরুন তখন আমি ছাদে ছিলাম। আগেই বলেছি ঘড়ি ব্যবহার করি না। তাই সভ্য মানুষদের মত বলতে পারি না বারোটায় ওখানে ছিলাম, একটায় সেখানে ছিলাম। যাইহোক, সুফিয়ান নিচে চা নিয়ে এসেছে বোধহয়। চলুন নিচে যাওয়া যাক।”

রহমান সাহেব রফিক আমজাদের সাথে নিচে নামলেন। পুঁদিনা পাতার চা পান করলেন।

চা খেতে খেতে রফিক আমজাদ বললেন, “আমি শুনেছি আপনার বইয়ের সংগ্রহ বেশ বিশাল। এখানকার এই খুন টুনের ঝামেলা যখন আপনার শেষ হবে তখন একবার আপনার বাসায় যাবো। আপনার মত মানুষের সাথে কথা বলতেও আরাম। পৃথিবীতে মানুষ আছে অনেক, কিন্তু কথা বলার মত মানুষ বড় অল্প।”

রহমান সাহেব রফিক আমজাদের ওখানে চা শেষ করে তার বাসা থেকে বের হয়ে হেটে গেলেন আহমদ শরীফের বাসায়। শরীফ সাহেব তখন ড্রয়িং রুমে বসে টিভিতে খবর দেখছেন।

রহমান সাহেবকে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি আবার কী মনে করে?”

রহমান সাহেব বললেন, “আপনার সাথে সামান্য কথা বলতে এলাম। কিছু কথা আপনি মনে হয় আমাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলেন।”

অবাক কন্ঠে শরীফ সাহেব বললেন, “মানে?”

রহমান সাহেব বললেন, “মানে অবন্তীর সাথে আপনার বেশ ভালো পরিচয় ছিল এসব আর কী!”

শরীফ সাহেব বেশ রাগী কন্ঠে বললেন, “ভালো পরিচয় থাকার অর্থ এই হয় না যে আমি ওকে খুন করেছি।”

রহমান সাহেব বললেন, “আমি বলছি না আপনি খুন করেছে। তবে আমি যতটুকু জানি ততটুকু জানলে পুলিশ এতক্ষণে আপনাকে হাজতে ঢুকাত।”

শরীফ সাহেব বললেন, “কী বলছেন এসব যা তা! অবন্তীদের পারিবারিক সমস্যা ছিল। ওর বাবা ওকে বিয়ে দিতে চাইছিলেন তার চাচাত ভাই রুদ্রের সাথে। এসব নিয়ে ওদের ঝামেলা হচ্ছিল। তাছাড়া ওর বাবার ব্যবসায়ীক শত্রুরা আছে। ওর বয়ফ্রেন্ড নাক ফাটিয়ে দিয়েছিল ঘুষি মেরে। আপনি প্লিজ ওসব নিয়ে খোঁজ নিন। আর আমার বাসায় আর আসবেন না। প্লিজ ।”

রহমান সাহেব কিছুটা হাসলেন। তারপর বললেন, “এই কথাগুলো আপনি প্রথমেই বলে ফেললে আমার অনেক শ্রম বেঁচে যেত। যাইহোক, আমি অবন্তীদের বাসাতেই যাবো এখন। ভালো থাকবেন।”

রহমান সাহেব যখন শরীফ সাহেবের বাসা থেকে বের হচ্ছেন তখন আহমদ শরীফের বাসার গেট দিয়ে ঢুকছেন ওসি শফিউদ্দিন। শফিউদ্দিন রহমান সাহেবকে দেখে হাসিমুখে বললেন, “আর আপনাকে কষ্ট করতে হবে না রহমান সাহেব। অপরাধীকে আমরা খুঁজে পেয়েছি। ঐ নীল চাদরটা এই শরীফ সাহেবেরই ছিল।”

রহমান সাহেব অবাক হওয়ার মত করে বললেন, “তাই নাকী?”

শফিউদ্দিন বলতে লাগলেন, “ব্যাটা খুব স্মার্ট। খুন করে নিজেই ফোন দিয়েছে। দাঁড়ান ওকে ধরতে হবে এখন।”

শফিউদ্দিন গিয়ে কয়েকবার কলিংবেল চাপলেন। কিন্তু কেউ দরজা খুলল না। এর পাশে একজন পুলিশ সদস্য চিৎকার করে বলল, “স্যার, পিছনের দেয়াল টপকে পালাচ্ছে।”

শফিউদ্দিন নির্দেশ দিলেন, “পিছনের দিকে যাও। একে ধরতে হবে।”

রহমান সাহেবকে বললেন, “যাই রহমান সাহেব। দেখি ব্যাটা পালিয়ে যায় কতদূর।”

পুলিশ সদস্যরা একে একে দেয়াল টপকে দৌড় দিল পালাতে থাকা শরীফ সাহেবের পিছু পিছু। শরীফ সাহেব গিয়ে ঢুকলেন শালবনে। পুলিশ সদস্যরা পিছু পিছু দৌড়ে প্রবেশ করল শালবনে।

রহমান সাহেব সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তিনি অবন্তীদের বাড়িতে গিয়ে দেখলেন সে বৃদ্ধ দারোয়ান বসে আছে গেটের কাছে। রহমান সাহেব তার কাছে গিয়ে বললেন, “তুমি আমার আরো কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে?”

বৃদ্ধ খসখস গলায় বলল, “স্যার, আমি এখানে দীর্ঘদিন ধইরা কাজ করতেছি। খামকা উলটা পালটা কথা কইয়া বিপদে পড়তে চাই না।”

রহমান সাহেব বললেন, “তুমি বিপদে পড়বে না। তুমি কি চাও না অবন্তীর খুনী ধরা পড়ুক?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “কন কি জানতে চান।”

রহমান সাহেব বললেন, “তুমি স্বর্নাকে চেন?”

বৃদ্ধ বলল, “অবন্তী মা’র বন্ধু? হ চিনি। ওরা আমগো পাশের গ্রামের। ওর বাপের নাম আফতাব। আবু হাশেমের বন্ধু আছিল।”

রহমান সাহেব বললেন, “হ্যা, আমি শুনেছি উনাদের দুই পরিবারের বন্ধুত্ব ছিল।”

বৃদ্ধ বলল, “আবু হাশেম মরার আগে যখন ছোট ব্যবসায়ী আছিল তখন তার পোলার লগে আফতাবের মাইয়ার বিয়া দিব কথা দিছিল। তারপর তো আতকা সে মইরা গেল। এখন আল্লার কী লীলা দেখেন। হয়ত সেই মাইয়ার সাথেই পোলাটার বিয়া হবে।”

রহমান সাহেব বললেন, “পোলা বলতে আপনি রুদ্রের কথা বলছেন?”

বৃদ্ধ বলল, “হ।”

রহমান সাহেব আর কোন কথা বললেন না। তিনি হেটে বাসায় চলে আসলেন। যা তথ্য পাওয়ার আপাতত তিনি পেয়ে গেছেন। এবার কিছুটা চিন্তা করতে হবে।

বাসায় গিয়ে তিনি প্রথম তার ল্যাপটপ নিয়ে বসলেন। লেখক রফিক আমজাদ নাম দিয়ে সার্চ ইঞ্জিনে খুঁজলেন। প্রচুর তথ্য এল লেখক রফিক আমজাদ বিষয়ে। তিনি একজন জনপ্রিয় রহস্য উপন্যাস লেখক ছিলেন। তারপর হঠাৎ করেই লেখা ছেড়ে দেন। অনেকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন “তিনি কেন লেখা ছেড়ে দিলেন” এই বিষয়টাকে।

বিভিন্ন আর্টিকেল পড়ে যা বুঝা গেল তা হল, বিশেষজ্ঞরা বলেছেন লেখক রফিক আমজাদ ডিল্যুশনাল। তিনি লেখালেখি নিয়ে এতই চিন্তা করতেন, এতই তিনি এর ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলেন যে এর পরে তিনি ডিল্যুশনাল হয়ে যান।

এই কথাটা রহমান সাহেবের অদ্ভুত লাগল। তার মনে হল রফিক আমজাদ এবং অবন্তীর বাড়িতে একই ধরনের মূর্তি পাওয়ার কথা। রহমান সাহেব উঠে গিয়ে তার পুরনো এইনশেন্ট ইজিপ্ট বইটা নিয়ে প্রাচীন মিশরের দেবদেবীর মূর্তিগুলোর সাথে রফিক আমজাদ ও অবন্তীর রুমে দেখা সেই মূর্তিটাকে মেলাতে চাইলেন।

খুঁজতে খুঁজতে তিনি একটি ছবি পেলেন। যা তার দেখা ঐ মূর্তিগুলোর সাথে হুবহু মিলে গেল। মূর্তিটির নাম শেজমু। প্রাচীন মিশরের মৃত্যুদন্ড, হত্যা, রক্ত ও সুগন্ধীর দেবতা।

অশুভ শক্তিতে যারা বিশ্বাস করে তাদের কেউ কেউ সে শক্তির সাহায্য পেতে এরকম মারাত্মক দেবতার উপাসনা করে। এদের উপাসনাতে রক্ত অপরিহার্য।

রহমান সাহেবের সামনে অনেক জটই খুলে যেতে লাগল। তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। লকড ফাইলে অবন্তীর নামের পিছনে লাগানো ছিল শেজমু।

এই সময় তার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ওসি শফিউদ্দিন ফোন দিয়েছেন। রহমান সাহেব রিসিভ করতেই শফিউদ্দিন বললেন, “ব্যাটা ধরে পড়েছে। দেখতে চাইলে থানাতে চলে আসুন।”

রহমান সাহেব ঠান্ডা স্বরে বললেন, “আপনারা ভুল ব্যক্তিকে ধরেছেন। মূল অপরাধী বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছে।”

ওসি ওপাশ থেকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী বলছেন এসব? আমরা ওর চাদরটা পেয়েছি লাশের উপরে।”

রহমান সাহেব বললেন, “লাশের উপরে কারো চাদর পাওয়ার মাধ্যমেই প্রমাণ হয় না সে খুন করেছে। চাদরটা যে তার তা আমি আপনাদের আগেই জেনেছি।”

ওসি বললেন, “তাহলে কে অপরাধী?”

রহমান সাহেব বললেন, “তাকে ধরতে হলে পুলিশ নিয়ে আমার বাসায় চলে আসুন। আর শরীফ সাহেবকেও নিয়ে আসবেন। লোকটা নিরপরাধ।”

মিনিট দশেকের মধ্যে গাড়ি নিয়ে পুলিশ এল। রহমান সাহেব সমীরবাবুকে ফোন দিয়েছিলেন। তিনিও চলে এলেন।

রহমান সাহেব বাসার বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওসি গাড়ি থেকে নেমে বললেন, “কে খুনী? আপনার কাছে কী প্রমাণ আছে?”

রহমান সাহেব বললেন, “খুনী পাশের বাসার রফিক আমজাদ। লোকটা ডিল্যুশনাল। মানসিকভাবে অসুস্থ। সে মিশরীয় প্রাচীন দেবতা শেজমুর উপাসনা করে। তার ধারণা শেজমুকে খুশি করতে পারলে পৃথিবীর শ্রেষ্ট সাহিত্যকর্ম তৈরীতে শেজমু তাকে সাহায্য করবে। এজন্যই সে অবন্তীকে খুন করেছে। শেজমুর উপাসনা করতে তার তাজা রক্তের দরকার। এ কারণেই ঘটনাস্থলে রক্তের পরিমান কম ছিল। আর প্রথমে লাশটি উলঙ্গ অবস্থায় পড়ে ছিল। শরীফ সাহেবের সাথে অবন্তীর ছিল বেশ ভালো পরিচয়। তাই তিনি এটা মেনে নিতে পারেন নি সবাই অবন্তীর মৃতদেহ এভাবে দেখবে। সুতরাং তিনি চাদর দিয়ে লাশটি ঢেকে দেন। তিনি নির্দোষ।”

গাড়িতে হাতকড়া পরা অবস্থায় শরীফ সাহেব ছলছল চোখে তাকিয়ে ছিলেন রহমান সাহেবের দিকে।

পুলিশ নিয়ে ওসি শফিউদ্দিন রফিক আমজাদের ঘরে গিয়ে তাকে ধরে আনলেন বাইরে। রফিক আমজাদ বিস্মিত চোখে বার বার বলছেন, “কী হচ্ছে এসব! কী হচ্ছে এসব!”

রহমান সাহেব সহ অন্যরাও গেলেন রফিক আমজাদের বাসার ভেতরের খোলা জায়গায়।

রহমান সাহেব বললেন, “ভদ্রলোকের রুমটা সার্চ করতে হবে।”

পুলিশ রফিক আমজাদের ঘর সার্চ করে পেল প্রায় এক লিটারের মত রক্ত। আরো কিছু অদ্ভুত কাগজপত্র। যেখানে বিভিন্নভাবে আঁকা দেবতা শেজমুর ছবি। অনেকগুলোতে শেজমুর সামনে মানুষ বলি দেয়া হচ্ছে এমন দৃশ্য। পুলিশ সদস্যরা এগুলো রফিক আমজাদের ঘরের বাইরে এনে জড়ো করল।

রহমান সাহেব একটি কাগজ নিয়ে মনযোগ দিয়ে পড়লেন যখন পুলিশেরা রফিক আমজাদের ঘর আরো খুঁজছিল।

রহমান সাহেব বললেন, “রফিক আমজাদ একজন লেখক। অবন্তী নিজেও কবিতা লিখত। তাই সে এসেছিল রফিক আমজাদের কাছে। রফিক আমজাদ মেয়েটাকে প্রভাবিত করল। সে শেজমুর প্রতি তাকে উৎসর্গ করতে চাইল। মাইন্ড কন্ট্রোলে সে সিদ্ধহস্ত। সুতরাং মেয়েটাকে সে রাজী করাতে পেরেছিল। এরপর তাকে বিষ এনে দিল। সম্ভবত অবন্তী নিজেই রফিক আমজাদের কথামত শেজমুর প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করতে বিষ পান করেছে। তারপর রফিক আমজাদ তার শরীর থেকে কব্জি কেটে রক্ত নিয়ে নেয়। খুনটাকে বিভৎস করতে এবং অন্যদিকে প্রভাবিত করতে সে অবন্তীর গলা কেটে রাখে এবং তার কাপড় খুলে নেয়।

তমাল হয়ত সেদিন খেলতে এসেছিল। সে লাশটি দেখতে পায়। তার বাবা আহমদ শরীফকে জানায়। তারপর আহমদ শরীফ লাশটাকে চাদর দিয়ে ঢেকে রেখে পুলিশকে খবর দেয়।

এই লেখক রফিক আমজাদ একজন ডিল্যুশনের মানসিক রোগী। তার অর্ধেক শেষ করা একটি গল্পের কথা সে আমাকে বলেছিল। আমি গল্পটা আজ পেয়েছি।

রহমান সাহেব একটি কাগজ সামনে ধরে বললেন, “এই সেই গল্প। অনেকটা কাব্যিক ঢঙে লেখা। এখানে যতটুকু আছে তাতে দেখা যাচ্ছে, দেবতা শেজমুর কাছে মানুষের রক্ত উৎসর্গ করে শক্তি চাইছেন একজন লেখক।”

রফিক আমজাদ নিরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওসি সাহেব রহমান সাহেবের কাছ থেকে গল্পটি নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। সমীরবাবুও এগিয়ে এসেছেন দেখতে।

তখন করুণ মুখভঙ্গি করে লেখক রফিক আমজাদ বললেন, “আপনারা বুঝতে পারছেন না। সাহিত্যের জন্য আসলেই দরকার এসব। শেজমু প্রতীজ্ঞা করেছেন রক্ত পেলে আমাকে দিয়ে তিনি একটি সার্থক গল্প লেখাবেন। বিশ্বাস করুন।”

তাকে টেনে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়।

পরদিন টিটো মিয়া ফিরে আসে। স্বাভাবিকভাবেই সে কাজকর্ম করছিল। রহমান সাহেব তাকে ডেকে বললেন, “টিটো মিয়া, তুমি ছুরি হাতে তুরাব সাহেবের বাড়িতে ঘুরঘুর করতে কেন বলো তো?”

প্রথমে টিটো মিয়া অবাক হয়ে গেল। তারপর বলল, “উনাদের বাসায় রানতে গিয়া আফার লগে পরিচয় হয়। উনি খুব ভালো ছিলেন। একদিন উনার লগে একটা ছেলেরে ঝগড়া করতে দেখছিলাম। সেইদিন ছেলেটা তারে মারতেছিল। আমারে দেইখা পরে চইলা যায়। আফারে তখন ছুরিটা দেয়ার কথা মনে হয়। আফারে বলছিলাম। তিনি হাইসা কইলেন ঠিক আছে দিও। তাই এইটা কামারের দোকান থেইকা কিইনা আনি। কিন্তু কয়েকবার সাথে নিয়া গিয়াও দেয়ার সুযোগ পাই নাই।”

রহমান সাহেব বললেন, “কিন্তু তুমি তো গ্রামের বাড়িতে যাও নাই। গিয়েছিলে কোথায়?”

টিটো মিয়া মাথা নিচু করে বলল, “শহরেই ছেলেটার খোঁজ করতেছিলাম স্যার। আমি মনে করছিলাম সেই আফারে খুন করছে। আফা খুব ভালো ছিলেন।”

টিটো মিয়ার শেষ কথাটায় রহমান সাহেব বিষন্ন হয়ে পড়লেন। তার চোখে ভেসে উঠল অবন্তী মেয়েটার মুখ। যত যাই হোক, তাকে আর ফেরানো যাবে না।

[highlight] -সমাপ্ত- [/highlight]

Share

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.