আমার বইয়েরা শুধুমাত্র অন্তঃসারশূন্য থ্রিলার নয় – ড্যান ব্রাউন

দ্য দা ভিঞ্চি কোড  (২০০৩) ড্যান ব্রাউনের সবচেয়ে জনপ্রিয় বই, যা এখনো সমালোচনা আর বুদ্ধিভিত্তিক বিতর্ক উশকে দিয়ে চলেছে। সর্বাধিক বিক্রি হওয়া উপন্যাসদের একটি এই উপন্যাস। ড্যান ব্রাউনের এই স্বাক্ষাতকার নিয়েছেন ইশানী দত্তগুপ্ত। প্রকাশিত হয়েছিল টাইমস অব ইন্ডিয়াতে। সেখান থেকে এই স্বাক্ষাতকার বাংলায় ভাষান্তরিত করা হল।

MADRID, SPAIN - MAY 31: (Photo by Juan Naharro Gimenez/Getty Images)

ড্যান ব্রাউন, মাদ্রিদ, স্পেন : ( জুয়ান নাহাররো গিমেনেজ/ গেটি ইমেজ)

 


আপনার বইয়ে বিভিন্ন ধরনের বিষয় আছে – ইতিহাস, ধর্ম, প্রতীক, ক্রিপ্টোলজি। বইগুলোকে কি থ্রিলারের শ্রেণীভুক্ত করা যায়, না আপনি পপুলার ফিকশনের ভিন্ন ধরনের কোন ধারা (জনরা) তৈরী করেছেন?


আমি আসলে ধারা (জনরা) নিয়ে ভাবি না, আমি যেরকম বই পড়তে ভালোবাসি সেরকম বইই লিখতে পছন্দ করি। আমি একটু দ্রুত গতিশীল জিনিস পছন্দ করি তাই মনে হয় এগুলো থ্রিলার। আমি শিখতে পছন্দ করি তাই আমার বইয়ে শেখার অনেক কিছু থাকে। আমি শিল্প এবং দর্শন পছন্দ করি, তাই আমার কাহিনীগুলোর মধ্যে দার্শনিক উপাদানও আছে। আমার পাঠককূল অনেক বৈচিত্রময় – মহিলা, পুরুষ, বৃদ্ধ, তরুনেড়া, বিজ্ঞানী এবং ধর্মযাজকেরা আছেন।


আপনার বইগুলোর বাইবেলীয় প্লট আছে এবং ইতিহাসের অনেক কিছুই কল্পনাপ্রসূত। আপনার গবেষণার মূল চ্যালেঞ্জগুলো কী কী ছিল?


ইতিহাসের দিকে দেখতে গেলে একজন লেখকের মূল চ্যালেঞ্জ হল বুঝা কোনটা ইতিহাস আর কোনটা মিথ। যেহেতু আপনি ইতিহাসের অনুমানের উপর চোখ রাখছেন, এবং অনেক ক্ষেত্রে তা হয়ে যায় অনুমানেরও অনুমান। আপনি ফিকশন লেখক বা নন ফিকশন লেখক যাই হোন না কেন, নিজের বিচার ক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে। বুঝতে হবে আপনার কাছে কি মনে হয়। আমি যখন দ্য দা ভিঞ্চি কোড লেখলাম তখন নিজেকে বললাম, যিশু সম্পর্কে এই গল্পই আমার কাছে বেশী বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, বাইবেলের গল্পের থেকে।


আপনার চরিত্রগুলো এবং প্লট পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান ধর্মকে প্রশ্ন করল এবং তাও আপনি বিস্ময়কর সাফল্য পেলেন...


অনেক মানুষের একই প্রশ্ন আছে। এটা কোন যাদু নয়। আমি শুধু তাই জোরে বলেছি যা অনেক মানুষের মাথায় ছিল। এবং এটা শুধু খ্রিস্টানিটির জন্য নয় – সব ধর্মেই এমন জিনিস আছে, যা দেখে আধুনিক মানুষেরা মাথা চুলকায়।


আমরা কি কখনো আপনাকে হিন্দুইজম নিয়েও একই ধরনের অনুসন্ধান করতে দেখতে পাবো?


করতে আমার ভালো লাগবে কিন্তু এখন আমি ভারতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট জানি না। রবার্ট ল্যাংডন (ড্যান ব্রাউনের সবচেয়ে সফল চরিত্র, হার্বার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক) ক্রিস্টিয়ানিটির একজন বিশেষজ্ঞ, কিন্তু সব কিছু সম্ভব। হয়ত কিছু সময় লাগবে।


২৪ ঘন্টার ফরম্যাট এবং সাহিত্যিক গুপ্তধন সন্ধান আপনার সিগনেচারে পরিণত হয়েছে। ভারতে আপনার ক্ষুদ্র ভ্রমণে আপনি এরকম কোন সাহিত্যিক গুপ্তধন পেয়েছেন কী?


আমরা মসলার বাজারে গিয়েছিলাম (চাদনী চক), এক দারুণ অভিজ্ঞতা। রঙ, মানুষ, মসলা এবং পুরো এলাকার স্পন্দন। লাল কেল্লা দেখলাম, অসাধারন সুন্দর। আমি এর সম্পর্কে ইতিহাসে অনেক পড়েছিলাম। বড় জামে মসজিদও দেখলাম। খ্রিস্ট্রান চার্চ সার্ভিসেও গিয়েছিলাম। এবং ভারতীয় অনেক ভক্তদের সাথে দেখা হল। ভারতীয় মানুষের উদ্দীপনা আমাকে সব সময় মুগ্ধ করে।


আপনি বলেছেন আপনার উপন্যাসগুলোর মাধ্যমে আপনি এক ধরনের আধ্যাত্মিক ভ্রমণের মধ্যে আছেন, আপনি কি এই ধরনের ভ্রমণ খ্রিস্টিয়ানিটির বাইরে গিয়ে করবেন?


যদি বলেন, হিন্দু প্রতীক নিয়ে ভারতীয় ব্যকগ্রাউন্ডে কাজ করার কোন আগ্রহ আমার আছে কি না? আমি আনন্দের সাথে করব। আমি পৃথিবীর এই অংশ নিয়ে দারুণ মুগ্ধ – মানুষের উষনতা, ইতিহাসের সমৃদ্ধতা এবং হিন্দুত্ব, যা অনেক ধর্মের উৎস। এটা অনেক সুন্দর দর্শন, সুন্দর জীবনবিধান- আমি এটা নিয়ে লিখতে আনন্দ বোধ করব। আমাকে অনেক অনেক অনেক বেশী জানতে হবে যা আমি এখন জানি তার থেকে। এবং আমি শিখতে শুরু করেছি।


আপনি আপনার নতুন বই নিয়ে কাজ করছেন। কবে আমরা সেটি পড়তে পারব?


ভবিষ্যতবানী করতে জানি না, গবেষণা করছি এবং শীঘ্রই লিখতে শুরু করব। কয়েক বছর হবে হয়ত।


ড্যান ব্রাউনের একটি সাধারন দিন কেমন?


যখন লেখি তখন ৪ টায় ঘুম থেকে উঠে আমার ডেস্কে লিখতে বসি। ১০ বা ১১ টা পর্যন্ত কাজ করি, তারপর ব্রেক নিয়ে লাঞ্চ করি। তারপর কিছু ব্যায়াম, টেনিস বা গলফ খেলি বা শারিরিক ব্যায়াম। শেষ বিকেলের দিকে ব্যবসা বিষয়ক কাজ হয়, প্রকাশকদের সাথে কথা বলি, বা আইনজীবি অথবা চলচ্চিত্রের লোকদের সাথে। এবং তারপর রাতে স্ত্রীকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে বের হই অথবা সে রাঁধে অথবা আমাদের বন্ধুরা আসে; একেবারে সাধারণ জীবনযাপন।


একজন লেখক হিসেবে  ৫২ টি ভাষার লোকেরা আপনাকে পড়ছেন। আপনি কি কোন ক্ষমতা অনুভব করেন? পপুলার ফিকশনের একজন বৈশ্বিক প্রভাবশালী লেখকে পরিণত হওয়াটা কি আপনার কাছে গুরুত্বপুর্ন?


পাঠককূল থাকা মানেই দায়িত্ব। একটা জিনিস বলার আগে আমাকে ভাবতে হয়। আমার বইয়ের কিছু উদ্দেশ্য থাকতে হয়, শুধুমাত্র অন্তঃসারশূন্য থ্রিলার নয়। তারা অর্থপূর্ন কিছু বলে। যেভাবে আমি ইনফার্নোতে বলেছি অধিক জনসংখ্যা বা জনসংখ্যা বিস্ফোরন নিয়ে। এটা এমন কিছু যা নিয়ে আমি অনেক চিন্তিত। লস্ট সিম্বলে প্রাচীন রহস্য এবং প্রাচীন জ্ঞান নিয়ে বলেছি – আমি একে দায়িত্ব হিসেবে দেখি। অর্থপূর্ন কিছ বলা এবং চিন্তার খোরাক জোগানো।


৫২ টি ভাষা, ২০০ মিলিয়নেরও বেশী কপি বিক্রি এবং প্রায়ই বছরে সবচেয়ে বেশী আয় করা লেখকদের একজন হওয়া- এগুলো আপনার কাছে কেমন?


এটা শুনতে আশ্চর্য লাগতে পারে কিন্তু আমি বলব এটা আসলে খুব বেশী না। আমি এমন লোক না যার উদ্দেশ্য টাকা, এরকম হলে আমি আর লেখতাম ন। ইয়ট রেইস খেলতাম অথবা তাই করতাম যা ধনী লোকেরা করে। কিন্তু আমি এবং আমার স্ত্রী আমরা আমাদের প্যাসন নিয়ে ভাবি। আমরা দ্রুত গতির গাড়ি, দামী জুয়েলারি এবং এই সমস্ত জিনিস নিয়ে ভাবি না। আমরা একটি বাড়ি তৈরী করেছি। শিল্প এবং স্থাপত্যের মিশেলে, ডিজাইন আমরাই করেছি। আমরা চেয়েছিলাম এটা আমাদের অন্যতম বিলাশ দ্রব্যই হোক, শিল্প সুষমার অংশ একটি বাড়ি এবং তাতে বসবাস করা। এটাই আমাদের বাড়ি নিউ ইংল্যান্ডে, বোস্টনের কাছে। এর স্থাপত্যে প্রতীক আছে, আছে গোপন পথ। এটা তৈরী করা ছিল দারুন মজার।


আপনি বলেছেন বিজ্ঞান এবং ধর্ম আপনার বইগুলোকে গাঠনিক রূপ দিয়েছে। ফিকশন লেখকদের ক্ষেত্রে এই দুই বস্তু তাদের লেখায় ব্যবহার করা কেমন গুরুত্বপূর্ন বলে মনে করেন? এই সীমারেখাগুলো মাঝে মাঝে কি ফিকশনের লেখককে কোনঠাসা করে ফেলতে পারে?


আমি একমত, এটা সম্ভব। পৃথিবীটাকে অনুসন্ধান করার অনেক নতুন নতুন যন্ত্রপাতি আমাদের দিয়েছে বিজ্ঞান। এবং অনেক ক্ষেত্রে করেছে আমাদের বেশী সৃষ্টিশীল। কীভাবে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হয় তা আমাদের দেখিয়েছে। গবেষণায় রত বিজ্ঞানীদেরও সৃষ্টিশীল হতে হয়। যদিও তারা বিভিন্ন তথ্যের কঠিন দুনিয়ায় কাজ করেন কিন্তু তবুও তাদের প্রয়োজন হয় বৃত্তের বাইরে গিয়ে চিন্তা করার। এভাবেই বিজ্ঞাব ও প্রযুক্তি উন্নতি লাভ করে।


ভবিষ্যতে নন-ফিকশন লেখক হিসেবে নিজেকে দেখেন কি?


হয়ত। এই মুহুর্তে আমার এমন কোন চিন্তা নেই। আমি আমার বই উত্তেজনাকরভাবে যেসব আইডিয়া পরিবেশন করি তা আপনি কাঠখোট্টা নন-ফিকশন বইয়ে পেতে পারেন। আমার বইয়ে পাঠকেরা মজার সাথে তা পড়ে। কিন্তু যখন আপনি বই শেষ করবেন তখন দান্তে, ফ্লোরেন্স বা জনসংখ্যা বিস্ফোরণ বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কে কিছু জানতে পারবেন।


আপনার প্রধান চরিত্র রবার্ট ল্যাংডনে নিজের কিছু কি দেখতে পান?


সে এমন একজন মানুষ যা আমি হতে চাইব। আমার শিল্প, ইতিহাস, কোডে আগ্রহ তার মতো। কিন্তু সে আমার চেয়ে অনেক সাহসী এবং তার জীবন অনেক বেশী উত্তেজনাকর।


প্রকাশনার জন্য এমাজন ভালো না খারাপ?


স্বল্প দামের বইদের মতো ইবুক থাকবে। ইবুকের একটা ভালো জিনিস পাঠক এবং লেখককে কাছাকাছি আনে এবং খারাপ দিক হলো মূল্য একেবারে কমিয়ে অবমূল্যায়ন করে ফেলে। আমার বিশ্বাস আছে এগুলোর সমাধান হয়ে যাবে। প্রকাশকেরা এবং এমাজন একে অন্যের উপর নির্ভরশীল এবং তারা একটি উপায় বের করে ফেলবে। আমি এ নিয়ে বেশী চিন্তা করি না কারণ আমি একজন সৃষ্টিশীল ব্যক্তি। আমি শুধু বই লেখি এবং প্রকাশকের হাতে পৌছে দেই। আমার কোন সরাসরি মত নেই এ ব্যাপারে তবে আশা করি পারস্পারিক সমঝোতার ভিত্তিতে একটা পথ বের হবে।


টম হ্যাংকস রবার্ট ল্যাংডন চরিত্রে অভিনয় করায় অনেকে খুশি না। এ ব্যাপারে আপনার ভাবনা?


টম হ্যাংকস ল্যাংডন চরিত্রে অসাধারণ। তিনি অনেক বুদ্ধিমান, বুদ্ধিভিত্তিকভাবে আগ্রহী এবং তার সেন্স অব হিউমর অসাধারন, যা ল্যাংডনেরও আছে। জীবিত শ্রেষ্ট আমেরিকান অভিনেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তিনি ল্যাংডন চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলে আমি সম্মানিত বোধ করি।


ভবিষ্যতে এই চরিত্রে অন্য কাউকে দেখেন কি?


আমি অতো ভাবি নি। ল্যাংডনের বয়স বাড়ছে না কিন্তু আমাদের সবার বাড়ছে দূর্ভাগ্যজনকভাবে। আমার ডিজিটাল ফর্ট্রেস নিয়ে আমেরিকায় একটা টিভি শো হয়েছে। এবং হয়ত, হয়ত আমরা দ্য ভিঞ্চি কোডের মিউজিক্যাল বলিউডীয় ভার্সন করতে পারি যাতে একজন ভারতীয় অভিনেতা হবেন ল্যাংডন।

Share
আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। লিংক শেয়ার করুন, তাতে অন্যরা পড়ার সুযোগ পাবেন।

Related Posts

Leave A Comment