কাটা হাত


ভদ্রলোকের নাম মোহাম্মদ তমিজুজ্জামান।ছোটবেলায় বন্ধুরা ডাকত তরমুজ।মা বাবা ডাকতেন তমিজ।ইস্কুলের হেডমাষ্টার সাহেব ডাকতেন তমিজউদ্দিন।

তমিজুজ্জামানের তাতে কিছুই যায় আসত না।তাকে কে কি ডাকল না ডাকল সেই দিকে দৃষ্টি দেবার কোন ইচ্ছাই তার কোনদিন হয় নি।তিনি একা থাকেন।একাই ঘুরেন।একাই ফিরেন।

ছোটবেলায় সবাই যখন বন্ধুবান্ধব নিয়ে গল্প গুজব করত তমিজুজ্জামান একা একা আঙ্গুলে কী সব গোনাগোনি করতেন।ঠোট কামড়ে গভীর চিন্তায় নিবিষ্ট মনে হিশাব করতেন কী যেন।

বড় হওয়ার পর ও তার সেই অভ্যাস যায় নি।

বিয়ে করেন নি।সন্তানাদি নেই।খালি বাসায় একা থাকেন।

আজ ফিরে এসেছেন গ্রামের বাড়ি থেকে।ক্লান্ত শরীরে মোবাইলের চার্জারটা ব্যাগ থেকে বের করার জন্য হাত ঢুকাতেই তিনি চমকে উঠেন।বরফ শীতল কি যেন হাতে ঠেকছে।নেড়েছেড়ে গ্লাভসের মত কিছু মনে হল।তমিজুজ্জামান ব্যাগ থেকে বের করে প্রায় আঁৎকে উঠেন।অন্যকেউ হলে নির্ঘাৎ চিৎকার করে উঠত।।

একটা কাটা হাত।হাতের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা।কব্জি থেকে কাটা। তবে কোন রক্ত লাগানো নেই।

ষ্টেশন থেকে কিছুটা পথ একটা সিএনজি তে করে এসেছিলেন তমিজুজ্জামান।মোট পাচঁজন ছিল সেই সি এনজি তে।তাদের কেউ কি হাতটা ঢুকিয়ে দিল?তমিজুজ্জামান ভাবেন, হাত ঢুকিয়ে দেবার মানে কি?এরা কী মানুষের হাত পা কেটে কেটে নিয়ে ঘুরে আর যার তার ব্যাগে ঢুকিয়ে দেয়?

তমিজুজ্জামান কাটা হাতটাকে টেবিল লাইটের আলোতে নিয়ে দেখতে লাগলেন।হাতটা লম্বা ধরনের।পামিস্ট দের ভাষায় বলা যায় পানি হাত মানে ওয়াটার হ্যান্ড।নিশ্চয়ই এই লোক করিৎকর্মা ছিল।কোন সাহিত্যিক শিল্পী বা কবি টাইপের কিছু হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।এই সব হাতের লোকদের থিয়েটারে ভাল করার অনেক সুযোগ থাকে।তমিজুজ্জামান হাত দেখার একটি বইতে পড়েছেন।

লোকটা খুব উচ্চাখাঙ্কী ছিল মনে হয়।বৃহস্পতির বলয়টা দেখা যাচ্ছে ভালই।তবে সে রাজনীতিতে ভাল করত।হাতের মধ্যে হেপাটিকা নেই কোথাও।অসম্ভব ভাল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিল এই লোক।তমিজুজ্জামান খুব উৎসাহ পান।লাইটের তার চোখ চক চক করে উঠে।তিনি গভীর আগ্রহ নিয়ে হাত দেখছেন।লোকটার হাতে সূর্য  রশ্মি আছে।এটা চিন্তার কথা। অনেকে বলেছেন এই রশ্মি থাকলে জীবনে স্ক্যান্ডাল থাকতে পারে!তবে সূর্য রশ্মিতে ক্রস নেই এটা ভাল।তমিজুজ্জামান খুশি হন।সূর্য রশ্মির ক্রস আর্থিক ক্ষতি ও হতাশার প্রতীক।

লোকটার হাতের আংগুল  গুলো লম্বা।এটাও ভাল দিক।

তমিজুজ্জামান হাতটা উলটে পালটে দেখেন।ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে।প্রায় সারারাত হাত টা নিয়ে পরে থাকেন মোহাম্মদ তমিজুজ্জামান।

ঘুমিয়ে পড়েন হাত দেখতে দেখতেই শেষ রাতের দিকে।পরদিন অফিসে জরুরী মিটিং নয়টায়।সেদিকে তার কোন খেয়ালই ছিল না।

কিন্তু পরদিন ঠিকই তিনি আট টায় ঘুম থেকে উঠেন।তমিজুজ্জামান জীবনে কখনো ঘড়িতে এলার্ম না দিয়ে ঘুম থেকে উঠেন নি এত সকালে। এই প্রথম উঠলেন।এর পিছনেও ছোট একটা কারণ আছে।

সকালে তিনি অনুভব করেন বরফ শীতল কোন বস্তু তার মুখের উপর পড়ে আছে।ঠান্ডায় তার মুখ জমে যাচ্ছে।কাঁপতে কাপঁতে তমিজুজ্জামান উঠে দেখেন তার মুখের উপর কাটা হাত।ঠান্ডায় প্রায় জমে আছে।

তমিজুজ্জামান কিছুটা ভয় পেলেন।ভাবলেন হাতটাকে ফেলে দিতে হবে আজই কোথাও।হাত মুখ ধুয়ে এসে হাতটাকে নিজের হাতে নিলেন।কিন্তু আশ্চর্য! এখন ঠান্ডা নেই।অনেকটাই গরম।কিছু বুঝতে না পেরে টেবিলের দিকে থাকাতেই তমিজুজ্জামান দেখলেন টেবিলের উপর ধোঁয়া উঠা চায়ের কাপ!

কাটা হাতটাকে তিনি কিছুটা ভয়ের সাথেই টেবিলে ফেলে দিলেন।তখনই প্রথম লক্ষ্য করলেন, টেবিলে মানুষ যেমন আংগুল দিয়ে শব্দ করে ঠিক তেমনি ঠক ঠক শব্দ করছে কাটা হাত!

                                                (১৭/১০/১১, ১২ টা ৩০)

Share
আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। লিংক শেয়ার করুন, তাতে অন্যরা পড়ার সুযোগ পাবেন।

Related Posts

Leave A Comment