"মানুষের এতো নপর-চপর কিন্তু যখন ঘুমোয়, তখন যদি কেউ দাঁড়িয়ে মুখে মুতে দেয়, তো টের পায় না, মুখ ভেসে যায়। তখন অহংকার, অভিমান, দর্প কোথায় যায়?"- রামকৃষ্ণ

কয়েকটি কবিতা

ডুব

কোনও এক প্রভাতবেলায় সূর্য
উঠেছিল খুঁজতে বিকল্প সমাধান
সমস্ত সিগারেটের ধোঁয়ায় ধোঁয়ায়

ট্রায়াল এ্যান্ড এরর মেথডে অমীমাংসিত
ধোঁয়া-ওঠা চিমনির গল্প

অতঃপর ব্যর্থ হয়ে ব্যাঙের মত লাফ দিয়ে সূর্য
ডুবেছিল কুয়ায় কুয়ায়।

একজন বোকা লোক বিষয়ক ও প্রার্থনার পূর্বে ]

বৃষ্টি ও আবার লোডশেডিং হলে]

 

 

ত্বকি

ত্বকি ছেলেটার ছবির দিকে তাকাইয়া দেখলাম
ইয়া মাবুদ! ছেলে ক্যামন কইরা তাকাইয়া রয়!
আপনারা দেখেন নাই?
তার মুখের মইদ্যে ফুইটা উঠে একটা বিবর্ণ দেশ
একটা তপ্ত, গলিত হিংসার স্রোত
অমানুষিক নির্যাতনে কাতর এবং নিঃশেষ
ছেলেটারে কি আপনারা দেখেন না! নাকী?
এ যে মুখের মইদ্যে ধইরা আছে
এই দেশের সাম্প্রতিক সেলফি
বিষাদ, ঘৃণা ও হতাশায় মাখামাখি।

 

 

ভুল ছিল গণিতে

উড়ে আসছিল একটা গাঙচিল

উড়ে আসছিল একটি বাঁজ পাখি

উড়ে আসছিল একটু সবুজ বলগা হরিণ

উড়ে আসছিল তিনটি প্রজাপতি

ধেয়ে আসছিল তানপুরাটা

সঙ্গে নিয়ে তার জোড়াটা, হারিয়ে যাওয়া সাদা ঘোড়াটা

ধেঁয়ে আসছিল মশাদের সেনাপতি

সবকিছু ঠিকঠাক, মাছ দিয়ে ঢাকা শাক

ঝাঁক ঝাঁক শঙ্খের ধবনিতে

ভুল হল পাসওয়ার্ডে, আসলে ভুল ছিল গণিতে।

প্রথম প্রকাশঃ উত্তরাধিকার (কোন সংখ্যা ভুলে গেছি)

 

 

ঋতুবন্দনা

এ একটি ঋতু
বিষে ভরা ঋতু
হাত পাতে সকলের হাতে
মাঠে ও গঞ্জে যত লাল পিঁপড়া
জটলা করে তাহাদের সাথে
এ একটি ঋতু
বিষে ভরা ঋতু
ডুব দেয় সকলের পাতে।

 

 

রফিকুন্নবী বিষয়ক

রফিকুন্নবী সাহেব বাম পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে নিয়ে এলেন কিছু মৃত্যু পরওয়ানা। এনে আমার চোখের সামনে মেলে ধরলেন। আমি তাকে বললাম, স্যার আপনি ভুল পকেটে হাত ঢুকিয়েছেন। এখানে কয়েকটি রঙিন মার্বেল পাথর থাকার কথা ছিল। রফিকুন্নবী এবার অন্য পকেটে হাত ঢুকালেন। এবার তার হাতে উঠে এল কয়েকটি বিবসনা বিকেল।

তিনি কয়েকটি দীর্ঘশ্বাস বাক্সবন্দি করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এসব কী নীল পাথর? আমি তখন বাতাসে মিলিয়ে যেতে যেতে অনুভব করলাম আমার বস্ত্রখন্ড নির্মান করছে মাথার উপর আকাশ। সে আকাশের রঙ নীল ।

 

 

পবিত্র রজনী

সেজদায় নুয়ে পড়বে সব গাছ
সব পাহাড়
আজ সেজদায় হুমড়ি খেয়ে পড়বে বিশাল আকাশ
সেই সব বিশ্বাস বুকে নিয়ে
গোপন করে ভয় এবং ভক্তির নিঃশ্বাস
দেখে দেখে নিঃশেষ করেছি অনেক সন্ধ্যারাতের আকাশ
কালো রাত শেষে দিন হয়, কোমল সুপ্রভাত
আর আমার ভেতরের সেইসব দিন জুড়ে বীরদর্পে বসত করে
আরব্য রজনীর গন্ধমাখা, শবে বরাত ।

 

 

একটি উজ্জ্বল মাছের প্রতিবিম্ব দেখে

জ্বলন্ত চাঁদের নিচে
ঘুমিয়ে আছে ক্লান্ত নগর
শীতল জ্যোস্নায় প্লাবিত চরাচর
আর দর্পণে একটি উজ্জ্বল মাছ
তীক্ষ্ণ ও ক্রূর হাসি হেসে
মিলিয়ে যায় নিমিষে
উড়িয়ে বাতাসে সঞ্জীবনী মদ
আমি জিজ্ঞেস করি তাকে
হে মাছ, তুমি কি মান্নান সৈয়দ ?

(কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ স্মরণে)

 

 

ব্যাঙবন্দনা

কতদিন পর ব্যাঙ
ভাঙ্গা স্যুটকেস ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছো
মুখে নিয়ে বিনম্র ফুটপাত
রাঙ্গা চার দেয়ালে লাগানো যত ভাঙ্গা কাচ
সব সম্মিলিতভাবে ধরে রেখেছে তোমাকে
তুমি অদ্ভুত ব্যাঙ
তুমি বিস্ময়!
অন্ধকারে যখন নামে বৃষ্টির মত ভয়
তখনো তুমি রয়ে যাও
আদি ও অকৃত্রিম
নিশাচর ও দিবাচর
ব্যাঙ।

 

 

নড ও নৌকা বিষয়ক

আমি নড নগরীতে অভিশপ্ত নাবিক এক
যার সহায় সম্বল ছিলো একটিমাত্র খেয়া নৌকা
তা ডুবিয়া গিয়াছে গাঢ় চৈত্রের রোদে
আর আমি তোমার হস্ত স্পর্শ করিবার অন্তীম ইচ্ছায়
বর্ণ চিহ্ন মুছে যাওয়া কী বোর্ডের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যাই
নির্বিকার
খটখট শব্দ তুলে ঝড়
জিউসের বর্জ্রদণ্ডের আঘাতে মুহুর্মুহু কেঁপে উঠে আসমান
আর ফজরের আজানের কালে
দুঃস্বপ্নের ইঞ্জিনিয়ারিং শেষে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়
যেন ঘুম হয় বিদীর্ণ খানখান।

তোমার বর্তমান অবস্থাকে মাথায় রেখে

আমাকে ছেড়ে যাবার পর
তুমি চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে এতই বেড়ে গেছো যে
এখন তোমার মুখের দিকে তাকাতে হলে আমার মাথা উচু করতে হয়
আর আমি ভুলে যাই স্কুলজীবনে শেখা ক্যালকুলাসের যাবতীয় সব সূত্র
শুনেছি ভূ-বিদ্যা কিংবা বায়োলজির কোনো এক অপঠিত অধ্যায়ে
রয়েছে তোমার চক্রবৃদ্ধির জন্মকাহিনী
ছাড়াছাড়াভাবে এবং খুব অস্পষ্ট।

আমার মাছি

আমার একটি পোষা মাছি
নিয়ত হতাশ থাকে
মুখ করে বেজার
আর
মাঝে মাঝে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে
বৃত্ত তৈরি করে
তারপর আরেকটি বৃত্ত
এভাবে করে যায় যতোক্ষণ না দিনান্তে
সূর্য জানায় শেষ বিদায়
আমার পোষা মাছি
আমার বিষণ্ন মাছি
সন্ধ্যাবেলা যখন রাত্রির হাতছানি
সে তখন উড়ে এসে জুড়ে বসে থাকে আমার হাতখানি
তারপর এঁকে যায় বৃত্তের পর বৃত্ত
মাঝে মাঝে কিছুক্ষণ থমকে বসে থাকে
মিছেমিছি জুঁই ফুলের গন্ধে আনমনা বৃক্ষের মতো
তখন আমি হাত নেড়ে জানিয়ে দেই, আছি
আমার পোষা বিবর্ণ মাছি

এরপর রাত্রি আসে
হয় গভীর থেকে আরো গভীর
আমি তখন অন্ধকারে লীন
মাছি তখন জোনাকের মতো
সবুজ আলো ছড়িয়ে উড্ডীন
রচনা করে চলে বৃত্ত এবং বৃত্ত
চক্রাকার সব গোলকধাঁধা
রঙ তাদের ধূষর, হরিৎ কিংবা সাদা

আমি যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার ভিতরে ঢুকে পড়ি
স্বভাবতই পাই না কোনো ঠাই
এবং আমি তলিয়ে যাই।

(শিল্প ও সাহিত্য, বাংলানিউজ২৪)

Share
মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করে একে আগ্রহী পাঠকের সামনে যেতে সাহায্য করুন।

Related Posts

Leave A Comment