"মানুষের এতো নপর-চপর কিন্তু যখন ঘুমোয়, তখন যদি কেউ দাঁড়িয়ে মুখে মুতে দেয়, তো টের পায় না, মুখ ভেসে যায়। তখন অহংকার, অভিমান, দর্প কোথায় যায়?"- রামকৃষ্ণ

গাঁজার নৌকা পাহাড়তলী যায়

গাঁজার নৌকা পাহাড়তলী যায় একটা দারুণ গান। একটা বৈপ্লবিক গান বলা যায়। অনেকে মনে করতে পারেন এখানে বোধহয় মাদককে রোমান্টিসাইজ করা হইছে। কিন্তু এরকম ভাবলে হবে না।

এই গানটা আসলে একটা অসাধারণ রোমান্টিক গান। প্রেম এবং প্রেম ঘটিত ট্র্যাজেডি দুইয়ের সংমিশ্রণ আছে এতে। এই দুই বস্তুই এই গানের প্রাণ।

গানটা শুরু হয়েছে গাঁজার কথা দিয়ে। গাঁজা খাবো আটি আটি, মদ খাবো বাটি বাটি – এরকম অসাধারণ লাইন আছে যেখানে তথাকথিত শুদ্ধ ভাষার তোয়াক্কা না করে সহজভাবে নিজের আবেগ তুলে ধরতে পেরেছেন লেখক। এ পর্যায়ে মনে হতে পারে লেখকের প্রেম গাঁজার সাথে।

তারপর অন্যান্য মাদকের খারাপ দিকের বর্ননা আছে। আফিম খেলে মাথা ধরে, কোকেনে বুক ধড়ফড় করে ইত্যাদি। এই পর্যন্ত গানে রোমান্টিকতা আসে নাই। গাঁজার সাথে অন্যান্য মাদকের সাধারণ তুলনা এসেছে। এই তুলনায় এটাই বুঝানো হয়েছে যে গাঁজা অন্য মাদকদের চাইতে ভালো। এর পরেই লেখক গেছেন মীরাবাঈয়ের কথায়। তিনি বলেছেন মীরাবাঈকে পেলে গাঁজা খাবেন না। এই জায়গাটা তাই ধাক্কার মত। এবং এর রোমান্টিক আবেগীয় গাঢ়ত্ব অনেক। মহান ছোটগল্পের শিল্পীরা এমন চমক দেখাতে পারেন। এর জন্য অসাধারণ প্রতিভার দরকার।

মীরাবাঈয়ের প্রতি লেখকের প্রেম এতই প্রবল যে তিনি বলছেন, “খাবো না আর গাঁজা আমি, যদি পাশে থাকো তুমি/ তোমায় পেলে নেশা ভুলে যাই, ও মীরাবাঈ... ।”

এরকম রোমান্টিক গানের লাইন আমি খুব কম দেখেছি। বাংলা গানের ইতিহাসে এরকম বাস্তব রোমান্টিক লাইন খুব কম হয়েছে। সাধারনত আধুনিক প্রায় বাংলা রোমান্টিক গানগুলি ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে এমন অবাস্তবতা দিকে ধাবিত হয় যে, একে লুতুপুতু গান বলে চিহ্নিত করতে হয়।

যাইহোক, গানের পর্যন্ত এসে বুঝা যায় মীরাবাঈ লেখকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন।

কিন্তু এরপর আছে বিষন্নতা। আছে দুঃখবোধে আক্রান্ত এক প্রেমিকের হৃদয় উৎসারিত বেদনার শৈল্পিক রূপায়ন।

লেখক বলেন মীরাবাঈ আসবে না। "জানি আসবে না তুমি, আঁধারে এই কানাকানি। জানি আসবে না তুমি, বাতাসে এই কথা শুনি।"

এরপর লেখক বলেন যে তিনি মীরাবাঈকে ভুলেই (অথবা ভুলতেই?) গাঁজার নৌকা বাইতে থাকেন।
মীরাবাঈয়ের কী হয়েছে জানা যায় না। মীরাবাঈ কেন আসতে পারবে না তাও জানা যায় না। কিন্তু তার না আসার বেদনা শ্রোতা বুঝতে পারেন। লেখক এখানে একটা বড় গল্প বলেছেন। বিরাট গল্প তিনি ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছেন। মীরাবাঈকে কোনরূপ দোষ না দিয়ে বা তার ব্যাপারে বিস্তারিত কোন বর্ননায় না গিয়ে এই যে তার না আসার দুঃখবোধ ছড়িয়ে দেয়া, এর গুরুত্ব অপরিসীম। শুধুমাত্র এই কারণে মীরাবাঈ শুধুমাত্র লেখকের মীরাবাঈ না হয়ে সমস্ত মীরাবাঈদের প্রতিনিধিতে পরিনত হয়ে যায়, যে মীরাবাঈয়েরা আসে না। শ্রোতারা তখন আপন আপন স্মৃতি কিংবা অনুভূতি অনুসারে গল্পকে সাজিয়ে নেন।  শ্রেষ্ঠ গল্পকারেরা গল্প বলেন না শুধু, পাঠকের ভিতরে তার নিজস্ব গল্প তৈরী করিয়ে নেন। এখানে গানের লেখক একই কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন।

বাংলা আধুনিক গানের যারা চর্চা করেন, তারা এই গানকে আদর্শ ধরে এগুতে পারেন। গত একশো বছরে যত শ্রেষ্ট বাংলা গান হয়েছে এর মধ্যে এই গান অন্যতম সেরা। এর শৈল্পিক উৎকর্ষ, ভাষার সৌন্দর্য এবং পরিমীতিবোধ বিস্ময়কর।

Lyrics : Otunu Chowdhury/ Rezaie
Tune & Composition: Defy

Share
মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করে একে আগ্রহী পাঠকের সামনে যেতে সাহায্য করুন।

Related Posts

Leave A Comment