by

গ্লোবালাইজেশন এবং আমাদের প্রি-রোমান্টিক স্টেজে আটকে থাকার সম্ভাবনা

পশ্চিমা কালচার প্রি-রোমান্টিক পিরিয়ডের পরে রোমান্টিক স্টেজে গিয়েছে। প্রি-রোমান্টিক স্টেজে তাদের বিয়ে ইত্যাদি এরকম হত যে বাপ-মা-ফ্যামিলি বিয়ে ঠিক করত। এবং তারা বিয়ে করত।

তারপর রোমান্টিক স্টেজে লাভ এট ফার্স্ট সাইট ইত্যাদি এবং নিজস্ব প্রেম-ভালোবাসা ইত্যাদিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হল। তখন হল প্রেমের বিয়ে।

এখন আবার টেকনোলজিক্যাল ডেভলাপমেন্টের ফলে পশ্চিমা কালচার প্রি-রোমান্টিক স্টেজে চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন ডেটিং সাইট নির্ভর যেসব রিলেশন তৈরী হচ্ছে সেখানে ডেটিং সাইটগুলো পালন করছে সেই ফ্যামিলির মত ভূমিকা। গত কিছু বছরে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের অনলাইন ডেটিং ইন্ড্রাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। ডেটিং সাইটের এই বিস্ফোরনের এগুলোর উপর মানুষের নির্ভরতাকেই ইঙ্গিত করে।

ডেটিং সাইট যদিও ইউজারের চাহিদা বা পছন্দ অনুযায়ী ব্যক্তি প্রদর্শন করে কিন্তু তবুও এখানে তাদের কিছু ভূমিকা থাকে। তারা একই এলাকা, তাদের নিজস্ব রিসার্চের ফলাফল অনুযায়ী এক ইউজারের সামনে অন্য ইউজারকে তুলে ধরে। দেখা গেছে প্রথমে এসব সাইট একজন ইউজার ব্যক্তিগত তথ্যে দেয়া যেরকম লাইফ পার্টনার খুঁজছে সেরকম লোককে সার্চ রেজাল্টে বা ইউ মে নো ইত্যাদি ফিচারে দেখাত। কিন্তু কিছুদিন পর ডেটিং সাইটগুলো আবিষ্কার করল আসলে এভাবে হচ্ছে না। সম্পর্ক হচ্ছে না। মানুষ ব্যক্তিগত তথ্যে হয়ত লিখছে সে “রোমান্টিক, ইন্টেলেকচুয়াল, ধার্মিক, গোবেচারা টাইপ” পার্টনার খুঁজছে কিন্তু তাদের ব্রাউসিং প্যাটার্ন দেখে বুঝা যায় তাদের সত্যিকার আগ্রহ অন্য ধরনের লোকের দিকে।

লেঞ্চলে্ট এবং গুইনেভেরে বাই হার্বার্ট জেমস ড্র্যাপার
লেঞ্চলে্ট এবং গুইনেভেরে বাই হার্বার্ট জেমস ড্র্যাপার

 

ব্রিটেনের লিজেন্ডারী রাজা কিং আর্থারের বউ গুইনেভেরেকে দেখা যাচ্ছে ছবিতে। তার দিকে তাকিয়ে আছে আর্থারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং সাহসী নাইট লেঞ্চলেট। গুইনেভেরে লেঞ্চলেটের প্রেমে পড়েন। এই প্রেম কিছু বড় যুদ্ধের জন্ম দেয়।

 

আমরা জানি না আমরা কী চাই। লাকানের ফ্যান্টাসী তত্ত্বের আলোকে শহীদুল জহিরের গল্পের আলোচনা দেখা যেতে পারে। স্লোভানিয়ান দার্শনিক স্ল্যাভো জিজেক বলেছিলেন, ধরা যাক, একজনের বউ আছে। এবং একজন প্রেমিকাও আছে। বউয়ের সাথে লোকটির সম্পর্ক ভালো নেই। লোকটা প্রতিদিন ভাবে যে যদি তার বউ নাই হয়ে যেত তাহলে দারুণ হত। সে তখন তার মিস্ট্রেসকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে পারবে, সুখে থাকবে ইত্যাদি ভাবে। এখন যদি তার বউ সত্যি সত্যি নাই হয়ে যায় তখন সাইকোএনালিসিস মতে লোকটা তার মিস্ট্রেসকেও হারাবে। এরকম বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়। সে তখন ওই ভদ্রমহিলার কাছে যাবে এবং বুঝতে পারবে ব্যাপারটা জটিল। সে তাকে দূরে থেকেই আকাঙ্খার বস্তু হিসেবে রাখতেই চাইত আসলে।}

সাইকোলজিক্যাল এই কারণেই হয়ত ডেটিং সাইটে মানুষের যেরকম পার্টনার চায় এর তথ্যের সাথে তার নিজের সত্যিকার চাওয়াটা মিলে না। আমি এইসব একে বারে ফাও বলছি না। এরকম কথা বলার ক্ষেত্রে কিছু একটা রেফারেন্স লাগে। ডেটিং সাইটের তথ্যগুলোর রেফারেন্স আজিজ আনসারীর টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি লেখা যা তার বই মর্ডার্ন রোমান্স থেকে গৃহীত হয়েছিল।

যাইহোক, আমার কথা বা এইসব ডেটিং সাইটের ফিরিস্তি দেয়ার অর্থ হল এটা বুঝানো যে ডেটিং সাইটের ইউজারদের পার্টনার পছন্দের ক্ষেত্রে ডেটিং সাইট কীভাবে ফ্যামিলির মত ভূমিকা পালন করে।

এবার ফিরে আসি মূল কথায়। ডেটিং সাইটদের বদৌলতে পশ্চিমা বিশ্ব চলে যাচ্ছে প্রি-রোমান্টিক স্টেজে। তারা একসময় প্রি-রোমান্টিক ছিল। এরপর গেল রোমান্টিক স্টেজে। এখন আবার ফিরে যাচ্ছে প্রি-রোমান্টিক অবস্থায়।

কিন্তু আমাদের অবস্থা কী?

dating site bd

আমরা প্রি-রোমান্টিক স্টেজে ছিলাম এবং আছি। আমাদের অধিকাংশ বিয়ে হয় ফ্যামিলি-মা-বাবার ঠিক করা লোকের সাথে। আমরা রোমান্টিক স্টেজে যেতে পারি নি। তার আগেই গ্লোবালাইজেশনের কারণে ইন্টারনেটের বিস্তার হয়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেটের বিস্তারের সাথে সাথে ডেটিং সাইটেরও বিস্তার হবে স্বাভাবিকভাবে। আধুনিক মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়ছে দিন দিন। যদি ঠিকমত ইন্টারনেট-টেকনোলজির বিস্তার হয় তাহলে পশ্চিমা বিশ্বের মত এখনকার পরবর্তী জেনারেশনের মধ্যে ডেটিং সাইটের জনপ্রিয়তা বাড়বে।

জনপ্রিয়তা বাড়ার ফলে তারা যদি সেসব সাইটের মাধ্যমে পার্টনার খুঁজে বা পায় তবে সেটা হবে আরেকটা ফ্যামিলি-বাবা-মা দ্বারা পার্টনার পাওয়ার মতই বিষয়। অর্থাৎ আমাদের যাত্রা হবে প্রি-রোমান্টিক থেকে আধুনিক প্রি-রোমান্টিক এ। আমরা আর রোমান্টিক স্টেজে যেতে পারবো না।  😀

 

আপডেটঃ  জুলাই ৭/২০১৬

এই একভাবে দেখার বাইরে গিয়ে আরেকভাবে দেখা যেতে পারে।

এই লেখায় (লিংক) আমেরিকান ম্যারেজ নিয়া কথা বলেছেন সাইকোলজিস্ট এলি ফিঙ্কল। আমেরিকা তিন ধরনের ম্যারেজ মডেল এক্সপেরিয়েন্স করছে। এর মধ্যে প্রথমটা হইল, এগ্রিকালচারাল কারণে বিয়া, ১৮৫০ পর্যন্ত । এর নাম প্রাতিষ্ঠানিক বিয়া। খাদ্য উৎপাদন নিরাপত্তা ইত্যাদি এই স্তরে ছিল প্রধান বিষয়।
 
এরপরে ১৮৫০ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত কম্প্যানিওনেট ম্যারেজের উৎপত্তি, তখন লাভ, সেক্স ইত্যাদি প্রধান বিষয় হইল বিয়ার। কারণ ততদিনে মানুষের সম্পদ বাড়ছে, রুরাল থেকে আরবান লাইফে মুভ করছে। খাদ্য নিরাপত্তা ইত্যাদি বিয়ার আগেই নিশ্চিত হইছে। ফলে লাভ এবং সেক্স প্রধান হইল বিয়ার ক্ষেত্রে।
 
অতঃপর ১৯৬৫ থেকে আধুনিককালের যে ম্যারেজ এর নাম দেয়া হইছে সেলফ এক্সপ্রেসিভ ম্যারেজ। এখন সেলফ ইস্টিম, সেলফ ডিসকোভারি, পার্সোনাল গ্রোঔথ ইত্যাদি হইছে প্রধান বিষয়। মানুষ এখন বিয়া করে এইগুলার জন্য।
বাংলাদেশে বা এই অঞ্চলে বিবাহ এবং তার প্রকৃতি নিয়া গবেষণা হওয়া দরকার।
Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *