"মানুষের এতো নপর-চপর কিন্তু যখন ঘুমোয়, তখন যদি কেউ দাঁড়িয়ে মুখে মুতে দেয়, তো টের পায় না, মুখ ভেসে যায়। তখন অহংকার, অভিমান, দর্প কোথায় যায়?"- রামকৃষ্ণ

চড়ুই পাখি

 

 চড়ুই পাখি

খুব ছোটবেলায় আমি এবং আমার ভাই যখন ক্লাস থ্রি ফোরে পড়ি তখন আমাদের বাসার ভেন্টিলেটরের ফাঁকে একজোড়া চড়ুই পাখি বাসা বাঁধে। ভেন্টিলেটরের এক ভাঙা অংশ দিয়ে ভিতরে ঢুকে শুকনো খড় পাতা দিয়ে তৈরী করে তাদের বাসস্থান।

দাদী বললেন চড়ুই পাখির বাসা সৌভাগ্যের লক্ষণ।

সৌভাগ্য জিনিসটা কি তখন ভালমত না বুঝলেও বুঝতাম চড়ুই পাখির আসাটা খারাপ কিছু না। ভাল কিছু।

বাবা তখন ছোট ব্যবসা করতেন। তিনিও খুশি হলেন। আমরা যখন স্কুল থেকে ফিরে এসে পাখিগুলো ঘরে ফিরেছে কি না দেখতাম, খেয়েছে কি না আলাপ আলোচনা করতাম তখন তিনিও আমাদের সাথে যোগ দিতেন।

পাখিগুলো যখন বাচ্চা দিল তখন শুরু হল আরো কিচির মিচির শব্দ। আমাদের আনন্দ হল প্রচুর। ধান ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিদিন বিকেলে আমরা মা পাখির বাচ্চাদের জন্য খাবার সংগ্রহে সাহায্য করতাম।

মা তখন বকতেন। তিনি কেন জানি পাখিগুলোকে সহ্য করতে পারতেন না প্রথম থেকেই। আমাদের অতি উৎসাহ দেখে বিরক্ত হয়ে  বকতেন। একদিন ছোট ভাই দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে বাচ্চা দেখতে চাইলে তাকে মেরেছিলেন খুব। মা র মেজাজ তখন এমনিতেই ভাল থাকত না। প্রতি রাতে পাখিগুলোর কিচির মিচির শব্দ শোনার জন্য দুই ভাই যখন জেগে থাকতাম তখন পাখিদের শব্দের সাথে অস্পষ্ট কিছু কথা কাটাকাটির শব্দ ও আমার কানে আসত বাবা মার ঘর থেকে। তবে ছোট ভাইটার কানে এসব যেত না। সে উৎসাহে চোখ বড় বড় করে বলত, ভাই, বাচ্চাগুলো কি ঘুমাইছে?

একদিন বিকেলে স্কুল থেকে এসে শুনতে পেলাম বাবা জানি কোথায় চলে গেছেন। ফিরে আসবেন শীঘ্রই। আমার জন্য নতুন জ্যামিতি বক্স এবং ছোট ভাইটার জন্য ফুটবল রেখে গেছেন আমাদের রুমে।

নতুন জিনিস পেয়ে আমাদের কয়েকদিন আনন্দেই কাটল। পাখিদের খোঁজখবর নেয়ায় কিছুটা ভাঁটা পড়ল। তবে প্রতিদিনের স্বাভাবিক নিয়মে কয়েকবার তাদের সাথে দেখা হচ্ছিল।

কিন্তু কয়েকদিন পর একদিন স্কুল থেকে এসে দেখলাম বাচ্চাদের ডাক শোনা যাচ্ছে না।মা পাখিগুলোকে ও দেখা যাচ্ছে না কোথাও। মায়ের ভয়ে উপরে উঠে দেখতে না পারলেও আমরা বের হলাম পাখি খোঁজতে। পিছনে রাস্তার পাশে যেখানে পাখিগুলোকে প্রায়ই দেখা যেত সেখানে গিয়েও দেখি নাই। ছোট ভাই পাথরের ছোট টুকরা কুড়িয়ে ছুঁড়ে মারল ডাস্টবিনের কুকুরটার দিকে। কুঁই কুঁই করে কুকুরটা সরে যাবার পর হঠাৎ খোলা ডাস্টবিন টার দিকে চোখ যেতেই দেখি খড়কুটো সহ পুরো বাসাটা কেউ এখানে ফেলে রেখেছে। খড়ের বাসার মাঝে মৃত পাখির ছানা দুটির গায়ে কিলবিল করছে অসংখ্য পিঁপড়ে।

সেই থেকে মা-বাবা পাখিদুটি আর কখনো আমাদের বাড়িতে আসে নি। বাবাও আসেন নি।

 

chorui pakhi

 

ও পাখি! ও কবি!

Share
মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করে একে আগ্রহী পাঠকের সামনে যেতে সাহায্য করুন।

Leave A Comment