ডানাযুক্ত গল্প

ডানাযুক্ত গল্প

 

 

তখন ঘুমের সময়। রাত দুইটা। কিন্তু আমি জাইগা ছিলাম। জাইগা জাইগা ভাবতেছিলাম যে আমার কেন ডানা নাই। যেন ডানা না থাকাটা এক বিরাট অসম্ভব এক ব্যাপার – এইরকমই আমার মনে হইতেছিল তখন।  দুঃখ হইতেছিল কিছুটা। সেই সময়ে ঠিকঠিকিও ডাইকা উঠল। সত্য কথা কেউ বললে বা কারো মনে হইলে ঠিকঠিকি ডাক দেয় ঠিক ঠিক। সত্যমিথ্যা জানিনা, ঠিকঠিকির এই ব্যাপারটা শুনে আসতেছি। সেই ছোটকাল থেকে। তাই আমার মনে হইল আমি যেন ঠিক একটা ব্যাপার ভাবতেছি। অত্যন্ত ন্যায্য একটা ব্যাপার ভাবতেছি যে আমার কেন ডানা নাই।

সেইসময় আবার মনে হইল ঠিকঠিকিরও তো ডানা নাই। তারো কি আমার মত রাত দুইটার সময় এইরকম চিন্তা মাথায় আসে? হয়ত আসে। নাইলে এই রাতে সে ঘুমায় নাই কেন? আমার কথার সাথে ঠিক ঠিক করেই বা কেন?

আমার জীবনে দুইখান ডানা থাকলে কী হত আমি ভাবি। আসমানে কি চলে যাইতে পারতাম? অথবা এইখানে সেইখানে। অথবা যেইখানে শময়িতাদের বাড়ি। শময়িতা মেয়েটা কে আমি জানি না। তাহার প্রতি আমার কোন আকর্ষনও নাই। তবে তাদের বাড়ির প্রতি আছে। আমি কবি সৌমিত্র দেবের কবিতার বইয়ে পড়ছি। কবিতার বইয়ে বাড়ি থাকে না। এইখানে ইট কাঠ সিমেন্ট রাখার জায়গা নাই। ডিজাইন, মাপজোক করারও কিছু নাই। সেপ, অটোক্যাড ইত্যাদি দিয়া আঁকিবুকিরও কিছু নাই। কিছুই নাই, বাড়ি বানানোর জায়গাই নাই। অথবা হয়ত আছে। আছে সবকিছু, পাহাড় নদী গাছ ফড়িং। ঝুলন্ত পাহাড় আর সেই পাহাড়ে উঠে যাওয়া একটা মেয়ে যে জীবনে প্রথমবার একটা পাহাড়ে উইঠা দেখে পাহাড় থেকে নামার কোন উপায় নাই। কারণ পাহাড়টাই ঝুলন্ত পাহাড়।

এইসব থাকতেও পারে। আমি হয়ত দেখতে পাই না। আমি অনেক কিছুই দেখতে পাই না, বুঝতে পাই না। এইটা শুধু আমার ক্ষেত্রে না। সব মানুষের ক্ষেত্রেই। সব মানুষই অনেক কিছু পারে না। অনেক কিছু পায় না। যেমন আমি ডানা পাই নাই। এইটার কী ব্যাখ্যা হতে পারে? বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যায় যেইসব প্রজাপতি বের হয়ে আসেন, তারা আমার মগজে ঢুইকা থাকেন। আমারে মন্ত্রণা দেন তারা। কিন্তু তাদের মত ভাবলে আমার হয় না। কিছু না, এই ভাল লাগে না আর কি। আমি ভাবি হয়ত অন্য কিছু আছে। অন্য কিছু যার কারণে কিছু লোক কবিতার বইয়ে ঘাস ফুল লতাপাতা নীল জেব্রা এবং তুমুল গন্ধময় ফুলের পাপড়ির ভেতরে বইসা থাকা রাজহংসীর দল দেখতে পায়। অথবা তারা গন্ধ শুকে একেকটা কবিতার বইয়ের, মাতাল হয়ে পড়ে থাকে। এরা কম থাকে। সংখ্যায় কম থাকে। কিন্তু এরা থাকে। বেঁচে থাকে। এদের এই যে ক্ষমতা এইগুলা তারা যেখান থেকে পায় আমার ধারণা হয়, সেখান থেকে আমারে এইসব কিছু দেয়া হয় নাই। আমারে ধরা হইছে অন্য কিছু হিশাবে। কোন একজন লোক যে রাত দুইটায় ঘুমাবে না। না ঘুমাইয়া ডানা লাগাইয়া ঘুরার চিন্তা করবে। তার চিন্তার সাথে থাকবে একটা ঠিকঠিকি। সেই ঠিকঠিকিও নিশ্চয়ই আমারই মত। ঐসব ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত। ঠিকঠিকিদের সমাজেও এইরূপ কিছু থাকার সম্ভাবনা আছে। অন্তত আমার এইটাই ভাবতে হবে কারণ আমি তো জানি না তাদের সমাজ কীরকমভাবে চলে।

আমি ঘুমাইলাম আরো পরে। মনে হয় তখন বাজে চাইরটা। ঘুম থেকে উঠলাম দিন বারোটায়। উইঠা বাথরুমে গেলাম। মুখ টুক ধুইয়া ব্রাশ ট্রাশ কইরা বাথরুম থেকে বাইর হইলাম, প্যান্ট শার্ট পইরা বের হইলাম রাস্তায়। আজ দেরী হইয়া গেছে। রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানে গিয়া বসতেই  হাফিজুদ্দি বলল, “ইশ! স্যার দেরী কইরা ফালাইছেন!”

আমি কললাম, “হ। যেইভাবে দেরী করতাছি কোনদিন দেখবা চাকরি নাই।”

হাফিজুদ্দি চায়ের কাপের চা চামচ দিয়া নাড়তে নাড়তে বলল, “ না স্যার। অফিসের কথা না। একটু আগে যদি আইতেন দেখতে পাইতেন। বিরাট মিস করছেন।”

সে আমারে চায়ের কাপ আগায়া দিল। আমি হাতে নিলাম।

তারে জিজ্ঞেস করলাম, “কী বিষয়?”

হাফিজুদ্দি বলল, “স্যার, একটু আগে তিনটা পাখি একজনরে কিইনা দিলাম। বেঁচতে লইয়া আইছে এক লোক। একশো টাকায় দিয়া দিল।”

“তুমি নিজে রাখলা না কেন?”

“আমার বউ স্যার, পাখি খায় না। তাই নিজের জন্য নিতে পারি নাই। আপনি অফিসে যান নাই জানলে আপনার জন্য রাইখা দিতাম। জেতা পাখি।”

“জেতা পাখি? ক্যামনে ধরছে?”

“ধরছে ক্যাম্নে কইতে পারি না। তবে লোক পাখি শিকারী না। ওইগুলারে আমি চিনি। ওরা হইলে একটা তিনশ কইরা নিত। পাখিগুলার ডানা কাটা ছিল।”

 

আমি হাফিজুদ্দির দোকানে চা খাইলাম । টাকা দিলাম। দিয়া একটা রিকশা নিলাম। রিকশা নিয়া অফিসে যাইতে লাগলাম। রইদ উঠছে। কঠিন রইদ। এমন রইদে কাকেরা কা কা ডাকে। আমি উচা উচা বিল্ডিংগুলায় তাকাইয়া দেখলাম কোন কাক দেখা যায় কি না। চারদিক তাকাইয়াও কোন কাক দেখা গেল না। কিন্তু নিচে তাকাইয়া  ডাস্টবিনের ধারে কিছু কাক দেখলাম। এরা মাঝে মাঝে লাফ দিতেছে। এবং তারা কীসব খাওয়ায় ব্যস্ত।

এদের দেইখা কেন জানি হঠাৎ করে মনে হইল হাফিজুদ্দি বলছিল পাখিগুলার ডানা ভাঙা ছিল। পাখির ডানা ভাঙল কে? কেন ভাঙল? একজনের ডানা আরেকজন কেন ভাঙবে? পৃথিবীতে কত কি আছে যাদের ডানা নাই। ডানা কি সহজ জিনিস নাকী! আমার খারাপ লাগতে শুরু করল।

আমার মাথা গরম হইয়া উঠতেছিল ডানা ভাঙ্গা পাখিদের কথা চিন্তা করতে করতে। উপরে আবার সূর্য তার গরম ছাড়তেছে। ভালোভাবে বললে হয়, সূর্য তার প্রবল উত্তাপ বিকীর্ণ করতেছিলেন। আমার আরো খারাপ লাগতেছিল। মনে হইতেছিল পাখিগুলার ডানা কেউ ভাঙে নাই। আমার ডানা ভাঙছে। কী করব কিছু বুঝতে না পাইরা রিকশাওয়ালারে জিজ্ঞেস করলাম, “রিকশাওয়ালা ভাই, কারো ডানা ভাঙা কি ঠিক?”

রিকশাওয়ালা ঘাড় ঘুরাইয়া একবার আমার দিকে তাকাইল। তারপর আবার তার রিকশা চালাইতে মনযোগ দিল।

আমার চোখ ঝাপসা হইয়া আসল। আমি রাস্তার দিকে তাকাইলাম। ঝাপসা দেখা যাইতেছে সবকিছু। অস্পষ্ট। আমি চোখ মুছলাম। চোখ মুইছা তাকাইয়াও দেখি ঝাপসা লাগে! তখন আমি ডানদিক বামদিক সবদিক তাকাইয়া দেখি আমি রাস্তা থেকে অনেক উপরে উইঠা গেছি। আমার রিকশার দুই পাশে বড় দুইটা ধবধবে সাদা ডানা। রিকশা পাখা ঝাপটাইতে ঝাপটাইতে বিশাল এক পাখির মত উইড়া যাইতেছে।

আর প্রচন্ড বাতাসে উড়তেছে রিকশাওয়ালা লম্বা কোঁকড়া চুল।

Share
আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। লিংক শেয়ার করুন, তাতে অন্যরা পড়ার সুযোগ পাবেন।

Leave A Comment