by

যাত্রা

pic
কিশোরগঞ্জের স্কুল শিক্ষক শাহীনুর পাশা ধুম করেই মরে গেলেন।সামান্য বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।দুইদিনের মধ্যেই সব শেষ।তার গ্রামের বাড়িতে ফোন গেল।
শাহীনুর পাশার বড় ভাই মৌলানা মহীনুর পাশা হাসপাতালে সদলবলে এসে উপস্থিত হলেন।দলবল আর কেউ না।আত্নীয় স্বজন।
মহিনুর পাশা হাসপাতালেপৌছে দেখলেন ঢোকার মেইন গেট বন্ধ।সরকারী হাসপাতাল।এখানে নিয়ম বড়ই জটিল। এক লোক জানাল,হাসপাতাল কমপ্লেক্সের গেট বন্ধ থাকে সবসময়।খুলতে হলে গেটের আশপাশে থাকা লোককে টাকা দিতে হয়।তবেই সেই বিরক্তমুখে গেট খুলে দেয়।মহিনুর পাশা তাই করলেন।
তারপর শুরু হল আরেক ঝামেলা।রোগীর মৃত্যুর খবর পেয়ে দালাল জুটে গেছে।এরা নিজেরাই লাশ পৌছে দিতে চায়।মাঝবয়সী এক লোক বলল, চাচাজী নো চিন্তা।আমরা ঠিক বাড়িতে পৌছে দেব।টাকাও বেশী লাগব না।নেয্য টাকা দিবেন।আমাদের কোন চাওয়া নাই।ঈমানদার লোক।লাশ নিতে দামাদামি করি না।
মহিনুর পাশা ভ্রু কুচঁকে বললেন, ন্যায্য ভাড়া কত?
মুখের সাদা পাকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে লোকটি বলল, বেশী না চাচা।কিশোরগঞ্জের রাস্তা ও তেমন ভাল না।দশ হাজার দিবেন।
মহিনুর পাশা চমকে উঠলেন।দশ হাজার! কি বল মিয়া?তোমার কি মাথা খারাপ? পাঁচ হাজার দিমু।
চাচা লাশ নিয়া যাইতে আমরা দামাদামি করি না।দশ হাজার ই নেয্য।
দশ হাজার দিয়া আমি তোমাদের নেব না।মাইক্রোবাস ভাড়া করে আনব।
লোকটি বিষন্ন মুখে বলল, আমাদের বাস ছাড়া লাশ নড়ব না।এইটাই নিয়ম।
মহিনুর পাশা অনেক তর্কাতর্কি করলেন।ডাক্তারদের ও বললেন।কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না।বাইরের কোন বাসে লাশ উঠানো যাবে না।মহিনুর পাশা দেখলেন এদের মানুষ অনেক।ডাক্তার ও তাদের কথায় সায় দিচ্ছে।তেলতেলে হাসি দিয়ে বলছে, এদের বাস নিয়ে ই চলে যান।মাত্র কয়েকটা টাকার ব্যাপার।তেলতেলে ভঙ্গিতে বলা কথাটা শোনে মহিনুর পাশার মনে হল এই ডাক্তারকে সয়াবিন তেলের ড্রামে চুবানো দরকার।ঘড়ি ধরে তিন ঘন্টা।
রাত ২ টা।শাহীনুর পাশার লাশ নিয়ে চলেছে জামাত আলী।তার সাথে মছদ্দর।জামাত আলী ই মহিনুর পাশার সাথে তর্কা তর্কি করেছিল।ভাল একটা দান মারা গেছে।গাড়িতে তারা দু জন ছাড়া আর কেউ নেই।পিছনে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় আছেন মৃত শাহীনুর পাশা।ভাল করে চা পাতা দিয়ে প্যাকেট করেছে জামাত আলী।এসব কাজে সে অত্যন্ত সিরিয়াস।
মছদ্দর বলল, ওস্তাদ একটা গান ছাড়েন।
জামাত আলী এমন আবদারে সচরাচর ধমক দেয়।আজ তার মন ভাল।ফুরফুরে মেজাজ।গান ছাড়ল বেশ জোরেই।জোর ভল্যিয়ুমে গান চলছে।গাড়ির স্পিকার টা ভাল।সুন্দর বিট দিচ্ছে।
মুন্নি বদনাম হুই, ডার্লিং তেরে লিয়ে......গানের সুরে রাস্তা প্রায় কাঁপিয়ে চলছিল মৃত শাহীনুর পাশাকে নিয়ে চলা মাইক্রোবাস।
জামাত আলী গানের সুরে সুরে মাথা দোলাচ্ছে।তবে খেয়াল ও রাখতে হচ্ছে রাস্তার দিকে।রাতে এদিকে বিশাল বিশাল ট্রাক চলে।ট্রাকের ড্রাইভার গুলি থাকে পাড় মাতাল।কখন না গাড়ি উপর দিয়ে তুলে নেয়।
জামাত আলীর ইন্দ্রিয় তাই সজাগ ছিল।হঠাৎ সে শুনতে পেল কি যেন শব্দ হচ্ছে।পলিথিনে ঘষাঘষির শব্দ।
জামাত আলী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।আবছা আলোতে কিছুতে দেখা যাচ্ছে না।তবে খসখস শব্দ বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট।জামাত আলী ভল্যিয়ুমটা কমিয়ে ভেতরের লাইটটা জ্বালিয়ে পিছনে তাকাল আবার।তাকে অনুসরন করল মছদ্দর।
লাইটের আলোতে দেখা গেল শোয়া থেকে উঠে বসে আছেন শাহীনুর পাশা।তার চোখদুটি লাল।যেন রাগে জ্বলছে।জামাত আলী এবং মছদ্দর তাকাতেই তিনি খসখসে গলায় গর্জে উঠলেন, বুরবাকের দল! গান শুনবি এত সাউন্ড দিয়া? মনে রঙ লাগছে রঙ?
পরদিন খবরের কাগজে আসে লাশ নিয়ে কিশোরগঞ্জ যাওয়ার পথে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে চালকসহ দুইজন নিহত।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *