by

রেনেসার পূর্বে শিল্পী ও শিল্পের অবস্থা

রেনেসার (ইউরোপে ১৪ থেকে ১৭ শতকের উল্লেখযোগ্য সময় যখন শিল্প সাহিত্য ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। শেষ মধ্যযুগ থেকে এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের শুরু হয় ইতালিতে এবং আধুনিক যুগের প্রথমদিক পর্যন্ত এর স্থায়িত্ব ছিল।) পূর্বে শিল্পের দাম নির্ধারিত হইত ভিন্নভাবে। শিল্পীদের আলাদা কোন সম্মানের ব্যবস্থা ছিল না। তারা বিভিন্ন পয়সাওয়ালা লোকদের কাছ থেকে ছবি আঁকার অর্ডার পাইতেন। সেই পয়সাওয়ালাই ঠিক করে দিতেন কি ধরনের ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হবে, ছবিটা কিরকম হবে, কত সময় লাগবে ইত্যাদি। এইসব বিষয়ে তাদের মধ্যে চুক্তি হইত এবং এর মধ্যে শিল্পী কত টাকা পাইবেনও তাও অন্তর্ভূক্ত থাকত।

অর্থাৎ, শিল্পী তখন সাধারণ এক কারিগর ছিলেন মাত্র। লোকে অর্ডার দিয়া যার কাছ থেকে ছবি আঁকাইত। যারা শিল্পীদের পয়সার বিনিময়ে কাজ দিতেন এদের প্যাট্রন বা পৃষ্টপোষক বলা হইত। এদের উপরই নির্ভর করত শিল্পীদের আয় ইনকাম। তারা অনেক জিনিস আঁকাইতেন। নিজের ছবি, ল্যান্ডস্কেপ, চার্চের জন্য ছবি, ম্যুরাল ইত্যাদি আঁকাইতেন প্যাট্রনেরা। শিল্পীর স্বাধীনতা বলতে যা বুঝানো হয় বা বলা হয় এখন তার অস্তিত্ব তখন ছিল না।

portraitGeorgeL

উপরের ছবিতে আছেন ডিউক অব সেক্সোনি। উনি একজন শিল্পী দিয়ে তার এই ছবি আঁকিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একজন প্যাট্রন।

অনেক সময় যিনি ছবিটা অর্ডার দিয়া বানাইতেছেন তিনি ছবির মধ্যে অন্যদের সাথে থাকতে চাইতেন। তিনি বলতেন যে আমারে ছবির মধ্যে এক কোনায় জায়গা দিতে হবে। তো শিল্পীরা তাদের ছবিতে রাখতেন। সেইসময়ের অনেক ছবিতে তাই ক্রেতাকে দেখা যায় গম্ভীর হয়ে বসে আছেন।

উদাহরন হিসেবে নিচের ছবি দেয়া হইল। এর নাম ভার্জিন ম্যারি এন্ড চাইল্ড উইথ ক্যানন ভ্যান ডার পেইলে। এই ভ্যান ডার পেইলে ছিলেন বিত্তশালী এবং ছবির শিল্পী জ্যান ভ্যান ইক এর প্যাট্রন তথা পৃষ্টপোষক বা এই ছবির জন্য টাকা তিনি দিয়েছিলেন।

Mry

রেনেসা কালীন সময়ে শিল্পীদের অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। রেনেসার সেরা শিল্পীদের মধ্যে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলো বুওন্নারত্তি, উগো দ্য কার্পি। উগো মাস্টার আর্টিস্ট হলেও ভিঞ্চি বা মাইকেল এঞ্জেলোর মতো বিখ্যাত হন নাই তখন।

ওইসময়ে আর্টিস্টরা প্রধানত ছিলেন ব্যবসায়ী বা দোকানদারদের ছেলেমেয়ে। কিছু মেয়েও ছিল যদিও অধিকাংশই ছেলে। এরা বড় শিল্পীদের কাছে গিয়ে শিখতেন। যারা বড় শিল্পী বা মাস্টার আর্টিস্ট হিসেবে খ্যাতি পাইতেন এরা শেখানোর স্কুলের মত একটা জিনিস খুলতে পারতেন। ব্যবসায়ী বা দোকানদারেরা তাদের সন্তানদের এইখানে পাঠাইতেন। খুব ভাগ্যবান হইলে অনেকে মাস্টার আর্টিস্টদের সাথে কাজ করার সযোগ পাইতেন।

প্রাথমিক কাজ ছিল সাহায্য করা গুরুকে। গুরুর ঘর দোর পরিষ্কার করা থেকে আঁকার জিনিসপত্র বিষয়ক কাজ। এসব করতে করতে তারা বিনয়ী তরিকায় গুরুর কাছ থেকে ছবি আঁকার নানা জিনিস শিখতেন। যেমন ভারতীয় মনুসংহিতায় আছে গুরুদের বাড়িতে ছাত্রদের অবস্থান করে বিদ্যার্জনের কথা।

baccioL

 

উপরের চিত্রে দেখা যাচ্ছে একজন মাস্টার আর্টিস্টের সাথে কাজ করছেন তার শিষ্যরা। এই খোদাইচিত্রের নির্মাতা বাচ্চিও ব্যান্ডিনেল্লির স্টুডিওর ইনিয়া ভিকো।

এইভাবে শেখা অনেক দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। অনেকে শিখে ফেলতেন। তারপর তারা এক মাস্টারপিস তৈরী করতে মনোনিবেশ করতেন। সেই মাস্টারপিস যদি শিল্পীদের তৎকালীন সংঘটন দ্বারা অনুমোদিত হইত, বাহবা পাইত তবে তিনি স্বীকৃতি পাইয়া যাইতেন বড় শিল্পী হিসেবে। বড় শিল্পী হয়ে তিনি তখন নিজেই শেখানোর স্কুল খুলতে পারতেন।

ছাত্ররা গুরুর সাথে টুকিটাকি এঁকে, গুরুকে সাহায্য করতে করতে শিখতেন। এভাবে অতি অল্প সংখ্যক বলা যায়, হঠাৎ হঠাৎ কেউ কেউ গুরুর চাইতেও ভালো আঁকা শিখে ফেলতেন। এরকম একটা কাহিনী প্রচলিত আছে। যুবক লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি তার গুরু ভরোচ্চিওর চাইতে সুন্দর করে এঁকে ফেলেছিলেন এঞ্জেলের একটা ছবি। এটা দেখে গুরু ভরোচ্চিও তার নিজের তুলি ভেঙে ফেলেন এবং শিষ্যের সুপিরিয়রিটিকে স্বীকৃতি দিয়া নিজে সারাজীবনের জন্য ছবি আঁকা ছাইড়া দেন।

Annunciation

আগে শিল্পের দাম নির্ধারিত হইত তাতে থাকা সোনিদানা বা অন্যান্য দামী দ্রব্যাদির উপর নির্ভর করে। শিল্পের আলাদা যে দাম বা শিল্পীর খ্যাতির উপর নির্ভর করে এখন যেমন দাম হয় সেরকম দামের অস্তিত্ব তখনকালে ছিল না। উপরের চিত্রের নাম এনানসিয়েশন। এঁকেছেন ইতালিয়ান আর্টিস্ট সিমন মার্টিনি এবং লিপ্পো মেম্মি। রঙিন প্রলেপ এবং সোনা দিয়ে আঁকা। ছবিতে দেখা যাচ্ছে এঞ্জেল গেব্রিয়েল ভার্জিন ম্যারিকে জানাচ্ছেন যে তিনি জেসাসকে জন্ম দেবেন। এটা খ্রিস্টান ধর্মের একটা গুরুত্বপূর্ন বিষয়।

রেনেসার কালে এবং পরে বড় শিল্পীরা প্রভূত সম্মানের অধিকারী হইয়া উঠেন। শিল্পী এবং শিল্পের ধারণা এর পর মধ্যযুগের থেকে বদলে যায়। কারিগরের অবস্থান থেকে শিল্পী একজন বুদ্ধিজীবি, দার্শনিক বা তার চাইতেও মর্যাদাপূর্ন আসনের দাবীদার হয়ে বসেন।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *