লেখক লেখক রম্য

লেখকদের নিয়ে মজার ঘটনা পড়তে ভালো লাগে। গত বছর বিভিন্ন সময়ে এরকম কিছু জিনিস জানার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেগুলো নিয়েই এই লেখা। রোয়াল্ড দাল, হার্পার লী, দান্তে রসেট্টি, এডগার এলান পো , এফ স্কট ফিটজেরাল্ড এবং রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ব্যাপারে কিছু লেখা আছে এই পোস্টে।

ছবিঃ রোয়াল্ড দাল এবং আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, লন্ডন, ১৯৪৪

ছবিঃ রোয়াল্ড দাল এবং আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, লন্ডন, ১৯৪৪

# প্রিয় লেখক রোয়াল্ড দাল ব্রিটিশ স্পাই ছিলেন। তথ্য সংগ্রহের জন্য তাকে আমেরিকান অনেক ক্ষমতাবান মহিলাদের পটাতে হত। এবং এই কারণে তাকে অসংখ্যা হাই সোসাইটি মহিলাদের সাথে রাত্রী যাপন করতে হয়েছে।

# হার্পার লী তখন স্ট্রাগলিং রাইটার। স্ট্রাগলিং রাইটারদের টাকা পয়সার সমস্যা থাকা স্বাভাবিক। সেই অবস্থায় লী এর এক বন্ধু তাকে এক বছরের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা পাঠিয়ে দিল। সাথে নোটঃ “তোমাকে এক বছরের বেতন দেয়া হল। এখন যা ইচ্ছা লেখো এই বছর। ম্যারী ক্রিসমাস।”

সেই বছর হার্পার লী টু কিল এ মকিংবার্ড লিখেন।

# ইংলিশ কবি দান্তে রসেট্টির বউ মারা গেল আত্মহত্যায়। বাঙালী কোন এক দুখী লোক বউয়ের প্যাদানী খেয়ে একটা প্রবাদ বানিয়েছিল, তাই বলা হয় কথায় আছে, ভাগ্যবানের বউ মরে আর দূর্ভাগার মরে গরু। সেই হিসেবে দান্তে ভাগ্যবান ছিলেন বলা যায়। কিন্তু সে ভাগ্য তার সহ্য হল না। শোকে কাতর হয়ে এবং আবেগের বশবর্তী হয়ে (কবিদের নাকী আবেগ বেশী থাকে) বউকে কবর দেয়ার সময় তিনি তার সব অপ্রকাশিত কবিতার পান্ডুলিপি কফিনে দিয়ে দিলেন।

তারপর লেখা ছেড়ে দিয়ে ভালো মানুষের মত জীবন যাপন শুরু করলেন।

কয়েকবছর পর তার কিছু সমস্যা দেখা দিল। চোখের দৃষ্টি কমে যাচ্ছে। রাতে ঘুম টুম হয় না, ইনসোমনিয়া ইত্যাদি। তিনি আবার লেখার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুই মনে পড়ল না। কিছুই মাথা থেকে বের হচ্ছে না। উপরন্তু তার কেবলই মনে হতে লাগল কফিনে দেয়া কবিতাগুলোর কথা।

এরপর তিনি নিয়ে ফেললেন দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত। তখন তার আবেগের জোশ কমে এসেছে। তাই বউ মরার ছয় বছর পরে হাইগেট সিমেটারী থেকে বের করে আনলেন পচতে থাকা কবিতার পান্ডুলিপি। রসেট্টি কবিতাগুলো কপি করে নিলেন।

তারপর প্রকাশিত হয় তার কবিতাগ্রন্থ।

Poe

# এডগার এলান পো গল্প লিখে জনপ্রিয়তা না পেয়ে ঠিক করলেন বড় কিছু লিখবেন। ৭২ হাজার শব্দের একটা উপন্যাস লেখলেন। তার একমাত্র উপন্যাস। সেখানে একটি বিধ্বস্ত জাহাজে তিনজন সারভাইভর কেবিন বয় রিচার্ড পার্কারকে খেয়ে ফেলে। ১৮৩৮ সালের উপন্যাস।

এর ৪৬ বছর পর ১৮৮৪ সালে ইংল্যান্ড থেকে অষ্ট্রেলিয়া যেতে পথমধ্যে বিপদে পড়ে একটি জাহাজ। সেখানেও তিনজন সারভাইভর। তারা কেবিন বয়কে মেরে খেয়ে ফেলে। এখানেও কেবিন বয়ের নাম ছিল রিচার্ড পার্কার।

এজন্যই বলা হয়, মহান লেখকদের ক্ষেপাইতে নাই। কী একটা লেখে যাবেন, পরে তা আর খন্ডানো যাবে না।

পো তার উপন্যাসকে বলতেন সিলি বুক। কিন্তু এটা জুলভার্ন, হারমান মেলভিলের কাজে অনুপ্রেরণা ছিল।

# এফ স্কট ফিটজেরাল্ডের বিখ্যাত বই “দ্য গ্রেট গেটসবি”। বইটি খুব কম বিক্রি হয়েছিল। লেখক এই ভেবে মরেছিলেন যে এটা তার একটা ব্যর্থ কাজ। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে গেটসবি বিক্রি হতে শুরু করে এবং ক্লাসিকের মর্যাদা পায়। এর অনেক স্টেজ এবং ফিল্ম এডাপ্টেশন হয়েছে এবং সর্বশেষ গ্যাটসবি চরিত্রে আমরা দেখলাম জনাব লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওকে।

# রবার্ট লুই স্টিভেনসন তার অতিখ্যাত বই “ডক্টর জেকিল এন্ড মিস্টার হাইড” এর ফার্স্ট ড্রাফট বউকে দেখালেন। তার বউ ফ্যানি স্টিভেনসন পড়ে গেলেন রেগে। তিনি এক বন্ধুর কাছে “ছাইপাশ উদ্ভট লেখা” বলে তা পুড়িয়ে ফেলেন।

লুই স্টিভেনসনের তখন মাথা নষ্ট অবস্থা। যক্ষাক্রান্ত এবং মেডিক্যাল কোকেনে বিপর্যস্ত অবস্থায় আবার লেখেন ৩২০০০ হাজার শব্দ তিনদিনে।

তারপর বই প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পরেই বিখ্যাত হয়ে যায়। স্টিভেনসন দম্পতির দূর হয় অর্থাভাব।

লেখকের বউ ফ্যানির আরেকটা চিঠি থেকে পাওয়া যায় তিনি লিখেছেনঃ

"লুই একটা গল্প নিয়ে ভাবছে এবং হয়ত এটা নিয়ে কাজ করা শুরু করবে। তাকে এসব কাজে বাঁধা দিলে বিরক্ত হয় তাই আমি করতে দিচ্ছি। কিন্তু আশংকা করছি এগুলো আবর্জনাই হবে। যেমন হয়েছে তার বাকি কাজগুলো।"

লুই স্টিভেনসনের বউ ফ্যানি স্টিভেনসনের মত বেশি বুঝদার বউ লেখকদের না হওয়াই মঙ্গল।

রবার্ট লুই স্টিভেনসন

রবার্ট লুই স্টিভেনসন

 

#

মাইকেল ক্রিকটন, জুরাসিক পার্কের লেখক। তরুণ বয়স থেকেই তার ছিল সাহিত্যিক হওয়ার ইচ্ছা ছিল। লিটারেচারে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট করতে ভর্তি হলেন হার্ভার্ড কলেজে। সেখানেও আমাদের দেশের বদ প্রফেসরদের মত এক বদ প্রফেসর ছিল। এই বদ প্রফেসর ক্রিকটনকে দেখতে পারত না। কম নাম্বার দিত।

ছাত্র ক্রিকটন আরেক ভালো প্রফেসরকে বললেন, ওই ভদ্রলোক আমারে ইচ্ছা করে কম নাম্বার দেন।

ভালো প্রফেসর বললেন, বিশ্বাস করলাম না। এইসব আজেবাজে কথা বাদ দিয়া পড়ালেখায় মন দাও। ভালো নাম্বার পাইবা।

ভালো প্রফেসররের এই কথায় ক্রিকটনের রাগ হল। তিনি বললেন, ঠিক আছে। আপনারে প্রমাণ দিতেছি।

একটা প্রবন্ধ সাবমিট করার কথা ছিল সেই বদ প্রফেসরের কাছে। মাইকেল ক্রিকটন জর্জ অরওয়েলের একটা প্রবন্ধ সাবমিট করলেন নিজের নামে।

দুনিয়ার নিয়ম হল বদ প্রফেসররা প্রথম শ্রেনীর মূর্খ হয়। এই বদ প্রফেসরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তাই অরওয়েলের প্রবন্ধতেও বদ প্রফেসর দিলেন বি মাইনাস।

ক্রিকটন তা নিয়ে লাফাইতে লাফাইতে গেলেন সবার কাছে। সবার সামনে এক্সপোজ কইরা দিলেন সেই বদ প্রফেসরের বদমায়েশী। এই নিয়া ঝামেলা হইছিল। পরে ক্রিকটনকে ডিপার্টমেন্ট পরিবর্তন করে এনথ্রোপোলজি থেকে আন্ডারগ্রাজুয়েট করতে হয়।

ক্রিকটন পরে পৃথিবীর বিখ্যাত লেখক-ডিরেক্টর হন এবং পাঁচটা বিয়ে করেন।

Share
আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। লিংক শেয়ার করুন, তাতে অন্যরা পড়ার সুযোগ পাবেন।

Related Posts

One Comment

  1. কীভাবে বই পড়তে হয়? | @ মুরাদুল ইসলামের ব্লগ
    February 16, 2016 at 1:36 pm

    […] এডগার এলান পো বইয়ে দাগানো নিয়ে বলেছেন দাগানোর মাধ্যমে লেখককে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন হয়। তার কথায়, “বইয়ে দাগানো হলো লেখকের সাথে একমত বা মত পার্থক্যের প্রতীক। এইভাবেই একজন লেখককে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়।” […]

Leave A Comment