শাদাবাজিঃ আসুন, বসুন, শাদা হোন

থাইল্যান্ডে একটি প্রসাধনী কোম্পানি তাদের রঙ ফর্সাকারী তথা সোজা বাংলায় চামড়ার রঙ শাদা করার প্রসাধনী বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করেছে। বিজ্ঞাপনটি প্রচারের পর তুমুল সমালোচনা হয়। কারণ ভিডিওটিতে দেখা গেছে একজন সফল অভিনেত্রীকে। যিনি তার সফলতার পেছনে গায়ের শাদা রঙকেই কৃতিত্ব দিচ্ছেন। তার কথা বিবিসি বাংলার অনুবাদে, “আমি যদি শরীরকে ফর্সা রাখার পেছনে বিনিয়োগ না করি, আমার যা কিছু আছে তার সবই শেষ হয়ে যাবে।”

এরকম রঙ শাদা করার ক্রিমের বিজ্ঞাপন আমরা দেখে থাকি। ইন্ডিয়াতেও শাহরুখ খান এবং জনপ্রিয় ক্রিকেটাররা ক্রিম মেখে শাদা হয়ে যান আমরা দেখতে পাই। এই শাদা শাদা আরো শাদা বিজ্ঞাপনগুলো অনেক ক্ষেত্রে বর্ণবাদী।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে রঙ শাদা করার জিনিসপত্রের ৪৩ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা বিশ্বজুড়ে। এর বেশিরভাগই মনে হয় এশিয়া-আফ্রিকায়।

বিবর্তনীয় জেনেটিক চামড়া রঙ আর্কিটেকচারের এই ছবিটা দেখা যেতে পারে।

গায়ের রঙ

এখানে বিবর্তনগত দিক থেকে দেখে তিন অঞ্চলের মানুষের কালারের ভ্যারিয়েশন দেখানোর একটা চেষ্টা করা হয়েছে।

ছবিটা দেখে প্রশ্নে যাওয়া যাক। আমাদের মানুষের মধ্যে গায়ের রঙ শাদা করার প্রবণতা কেন? কেন লোকে শাদাকে সুন্দর বলে এবং শাদা হতে চায়?

এর দুইটা উত্তর হতে পারে।

১। উপনিবেশবাদের প্রভাব। ইংরেজরা আমাদের কলোনি করে রেখেছিল দুইশ বছর। আমরা তাদের দ্বারা শাসিত হয়েছি। আমরা দেখেছি শাসকেরা শাদা চামড়ার হয়ে থাকেন। তারা দুর্দন্ড প্রতাপধারী। শক্তিতে, তেজে এবং অত্যাচারে তাদের তুলনা নেই। তাদের বউরাও শাদা শাদা। তাদের বাচ্চারাও শাদা। পুরা এক শাদাময় অবস্থা। তাই এ অঞ্চলের মানুষের মনে শাদার প্রতি ভয়, সম্মানবোধ এবং নিরঙ্কুশ ভক্তি চলে এসেছে। সেটা আর দূর হচ্ছে না।

২। শাদা রঙ আভিজাত্যের প্রতীক বলে বিবেচিত হত। সম্ভবত ইংরেজরা এদেশে আসার আগেও ছিল এই ধারণা। যারা ধনী তারা আরাম আয়েশে থাকত। ঘর থেকে তেমন বের হত না। ফলে সূর্যরশ্নির উষ্ণ স্পর্শ না পেয়ে তাদের চামড়া শাদা শাদা হয়ে যেত।

আগেকার জমিদার, রাজাদেরও গায়ের চামড়া ছিল সম্ভবত শাদা। যারা বাইরে থেকে এসেছে অর্থাৎ তুর্কী-মূঘল এরাও শাদা ছিল। এছাড়া দেশী রাজা-জমিদাররা আরাম আয়েশে থাকতে থাকতে শাদা হয়ে যেতেন সম্ভবত। তাদের পুত্র কন্যারাও হতেন শাদা শাদা। শাদা রাজকুমার - শাদা রাজকুমারী। এদের বিয়ে হলেও তারা পয়দা করতেন শাদা শাদা বাচ্চা।

আর গরীব প্রজা এবং সাধারণ জনসাধারণেরা তপ্ত সূর্যের নিচে দিনমান কাজ করত। সূর্যের নিচে থাকতে থাকতে তাদের চামড়া তামাটে বা কালো হয়ে যেত।

এই কারণে শাদা রঙ তখন হয়ে উঠে আভিজাত্যের প্রতীক।

এই দুই উত্তরের মধ্যে হয়ত প্রথমটাই বেশী গ্রহণযোগ্য। সৈয়দ মুজতবা আলীর এক লেখায় দ্বিতীয় উত্তরের বিপক্ষে তথ্য পাওয়া যায়। তার সেই প্রবন্ধে উল্লেখ ছিল ইউরোপীয়রা আগমনের পূর্বে এতদঞ্চলের লোকেরা শাদাকে সৌন্দর্যের প্রতীক বলে মনে করত না। ইউরোপীয় পর্যটকেরা লিখে গেছেন, তারা যখন প্রথম এদেশে এলেন তখন “এখানকার লোকেরা বেদনাভরা কন্ঠে তাদের জিজ্ঞেস করত, তোমাদের সবার ধবলকুষ্ঠ কেন?”
এই অঞ্চল থেকে উদ্ভুত দুই ধর্মীয় মহাপুরুষের একজনেরও গায়ের রঙ শাদা বলা হয় নাই। তবে বর্তমানে যদি এরকম কোন মহাপুরুষ সৃষ্টির সুযোগ থাকত তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় তার গায়ের রঙ দেয়া হত শাদা।

এশিয়ার দেশ জাপানেও রঙ শাদা করার জিনিসপাতি বেশ জনপ্রিয়। তবে সেখানে মহিলাদের জন্য এই চামড়া শাদা করার বিষয়টা বেশ প্রাচীন। তাদের একটি প্রবাদ আছে-

色の白いは七難隠す

জাপানিতে লেখা আছে ‘ইরো নো শিরোই ওয়া শিচিনান কাকাসু’। তবে এর অর্থ হচ্ছে- “শাদা চামড়া সাত খুন ঢাকে”

আমাদেরও প্রবাদ আছে, ‘পয়লা দর্শনদারি, তারপর গুণবিচারী’। মানুষের বিয়ের কথাবার্তা শুরু হলে এই প্রবাদ শোনা যায়। তবে এখানে সরাসরি গায়ের রঙের দিকে ইঙিত না করলেও পরোক্ষভাবে তাই বুঝানো হয়।

গুণের চেয়ে ছিবা-সুরত তথা চেহারাকে গুরুত্ব দেয়া বর্ণবাদ (কালারিজম)। এই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অবশ্য বাঙালীর ভান্ডারে আরেকটি প্রবাদ আছে। তবে সেটি অন্য ধরনের বর্ণবাদী । যেমন – ‘নদীর জল ঘোলাও ভালো, জাতের মেয়ে কালো ভালো’

যাইহোক, বর্তমান সময়ে, এই বিস্তৃত পুঁজিবাদের কালে মিডিয়া ব্যবহার করে রঙ শাদা করার জিনিসপত্রের ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করে যাচ্ছে। সমাজের শাদা রঙের প্রতি দূর্বলতা ব্যবহার করছে তারা। ক্রিমে ভিটামিন এ বি সি ডি সহ মাল্টিভিটামিন ইত্যাদি কত বালছাল থাকে শুনতে পাই বিজ্ঞাপনে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না অপুষ্টি আমাদের দেশের এক বড় সমস্যা। দেশের বেশিরভাগ মানুষ পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খেতেই পারছে না। দেশের ৩৬ ভাগ শিশু খর্বকায় হচ্ছে পুষ্টির অভাবে, কোন কোন বিভাগে এই খর্বকায় শিশুর হার ৫০ ভাগ। এই অবস্থায় রঙ শাদাকারী ক্রিমে ভিটামিনের বহর বইতে দেখে অনেকেরই বিরক্তির উদ্রেগ হতে পারে।

আগে শুধু ছিল ফেয়ার এন্ড লাভলী। অর্থাৎ মেয়ে তথা মহিলাদের জন্য। এখন যোগ হয়েছে ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসাম। এটা মাখলে বিজ্ঞাপনের বয়ান অনুসারে কী লাভ হয় তা দেখতে নিচের বিজ্ঞাপনের ছবি দেখা যাক-

রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপনে দেখাচ্ছে মাত্র দশ পার্সেন্ট শাদা হয়ে গেলেই শাদা শাদা মেয়েরা আপনাকে ঘিরে ধরবে। হি হি। কী মর্মান্তিক শাদাবাজি। আরেকটা বাজি আছে যাকে শুদ্ধ বাংলায় বলে রমনীবাজি। তো বিজ্ঞাপনের কথা হল, “দশ পার্সেন্ট বেশী শাদা হয়ে আপনি করতে পারবেন ইচ্ছামত রমনীবাজি।”

মানুষের শাদা হবার বাসনা, শাদা হতে না পারার দুঃখ চারপাশে তাকালে অনেকই দেখা যায়। কিন্তু গায়ের চামড়ার রঙ শাদা করার দিকে লোকের যত মনযোগ মন শাদা করার জন্য এর দশমাংশও নাই।

কিন্তু খালি বাহিরে শাদা হলেই কী চলবে? বাহিরের শাদা রঙের ঝলকানি শেষ হলে কী পড়বে না ধরা ভিতরের কালো অন্ধকার?

 

পোস্ট সংযুক্তিঃ আধুনিক সমাজে একো এবং নার্সিসাস

Share
আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। লিংক শেয়ার করুন কারণ তাতে অন্যরা পড়ার সুযোগ পাবে

One Comment

  1. আধুনিক সমাজে একো এবং নার্সিসাস | @ মুরাদুল ইসলামের ব্লগ
    January 24, 2016 at 3:58 pm

    […] একোদের স্বীকৃতি পাবার চেষ্টা, সৌন্দর্য বর্ধনের চেষ্টার উপর যেহেতু ক্যাপিটালিস্ট সমাজের […]

Leave A Comment