সক্রেটিসের বউ এবং তার তথাকথিত কলহপ্রিয়তার প্রতি দৃষ্টিপাত

প্রাচীন গ্রীসের দার্শনিক সক্রেটিস সম্পর্কে জানেন না এমন শিক্ষিত লোক পাওয়া মুশকিল। সবাই দেখা যায় সক্রেটিস সম্পর্কে জানেন। এবং অধিকাংশের জানার সাথে তার নিজস্ব কল্পণা, রূপকথা ইত্যাদির মিশ্রণ থাকে। সেই হিসেবে ভদ্রলোক আর প্রাচীন গ্রীসের আর দার্শনিক থাকেন না। হয়ে যান ঐতিহাসিক উপন্যাসের একটা ক্যারেক্টার।

A bust of Socrates in the Louvre

A bust of Socrates in the Louvre

ঐতিহাসিক উপন্যাসে দেখা যায় ইতিহাসের বিভিন্ন চরিত্রের মুখে লেখক নিজস্ব কথোপকথন বসিয়ে দিতে পারেন। বিভিন্ন ঘটনা তাদের দ্বারা করাতে পারেন। ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে বা ঘটনা নিয়ে ভাবার সময় অথবা কথা বলার সময় মানুষ এই কাজটা করে থাকে। বিভিন্ন ওয়াজেও একই ব্যাপার দেখা যায়। ওয়াজ যখন করা হয় তখন বিভিন্ন ক্যারেক্টারের মুখে দেশীয় ভাষা অনুসারে ডায়লগ জুড়ে দেয়া হয়। অবশ্যই তা উপস্থিত দর্শকদের কাছে ঘটনাকে উপভোগ্য করে তুলতে।

যাইহোক, জনমানসের সক্রেটিস ভাবনায় আরেকজন ব্যক্তি অবধারিতভাবে এসে উপস্থিত হন। তিনি সক্রেটিসের স্ত্রী। তার চরিত্র ভয়ংকর এবং এমনভাবে তাকে তুলে ধরা হয় যেন তিনি নিয়মিত সক্রেটিসকে ঝাড়ুপেটা করতেন। মানুষ এই ব্যাপারটা আবার উপভোগ করে। কারো বউ আগ্রাসী এবং বিধ্বংসী এটা ভাবার এক ধরনের আনন্দ আছে বোধহয়।

সক্রেটিসের প্রচলিত বানীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রচারিত একটা মহান বানী এরকম –

বিয়ে করবে। তোমার বউ ভালো হলে সুখী হবে আর খারাপ হলে হবে দার্শনিক।

এই মহান বানী সক্রেটিস বলে থাকলেও তা ভুল। সত্যি হলে অন্তত কিছু দার্শনিকের দেখা মিলত চারপাশে। অথবা সুখী মানুষের। সুখী মানুষের যে গল্পটা আছে তাতে দেখা যায় একমাত্র সুখী মানুষটির গায়ে দেয়ার জামা পর্যন্ত ছিল না, বউ তো দূরের কথা।

আরো কিছু ঘটনা শোনা যায় সক্রেটিসের বউকে নিয়ে। যেমন একবার নাকী তিনি সক্রেটিসের মাথায় পানি ঢেলে দিয়েছিলেন উত্তেজিত হয়ে। সক্রেটিস তখন বলেন, গর্জনের পরেই নামে বারিধারা।

কোন কোন গল্পে দেখা যায় সক্রেটিসকে তার বউ ঝাড়ুপেটা করছেন আর সক্রেটিস শান্তভাবে বই পড়ে যাচ্ছেন। যেন আশপাশে কিছুই হচ্ছে না।

এই গল্পগুলো নির্ভরযোগ্য কোন উৎস তেমন নাই। এগুলো “কথিত আছে” টাইপের গল্প।

The chamberpot episode: Socrates, his Wives and Alcibiades, by Reyer van Blommendael

The chamberpot episode: Socrates, his Wives and Alcibiades, by Reyer van Blommendael

 

(এই কাল্পনিক চিত্রকর্মটিতে দেখা যাচ্ছে সক্রেটিসের দুই স্ত্রী এবং তার প্রিয় সুদর্শন শিষ্য এলসিবিয়েডসকে। )

সক্রেটিস তো আর অল্পকাল আগের লোক না। আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছর আগের লোক। তার ঘরের খবর জানা কী সোজা কথা?

সক্রেটিসের বউয়ের নাম জ্যানথিপি বা জানথিপি। জানথিপি অর্থ হলুদ ঘোড়া। ইংরেজি অভিধানে জানথিপি শব্দের অর্থই আছে

“a scolding or ill-tempered wife; a shrewish woman.”

 

জানথিপি

জানথিপি

সক্রেটিস সম্পর্কে জানার উৎস মূলত তিনটি। তার শিষ্য প্লেটো ও জেনোফ্যানের লেখা। এবং বিরোধী এরিস্টোফ্যানিসের লেখা ব্যঙ্গাত্বক নাটক ক্লাউডস। বাংলায় এর অনুবাদ করা যাক মেঘমালা।

প্লেটো ছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলে এবং সক্রেটিসের যোগ্য শিষ্য। তিনি কাব্যিক ভঙ্গিমায় কথোপকথন আকারে সক্রেটিসের বক্তব্য লিখে গেছেন। এগুলোর সবই সক্রেটিসের বক্তব্য নাও হতে পারে। সক্রেটিস নিজে কিছু লিখে যান নি। সক্রেটিসের পদ্বতি জ্ঞাণ বিলানো টাইপ ছিল না। তিনি শুধু প্রশ্ন করে যেতেন। যেটাকে জার্মান চিত্র পরিচালক মিখায়েল হানেকে বলেন একজন আর্টিস্টের মূল কাজ। প্রশ্ন করে যাওয়া, উত্তর দেয়া নয়।

সক্রেটিসের আরেক ভক্ত জেনোফ্যান পুস্তক লিখেছেন সক্রেটিস নিয়ে। তবে প্লেটোর পুস্তকগুলোতে সক্রেটিসের দার্শনিক রূপ পাওয়া গেলেও জেনোফ্যানের বইয়ের তার চিত্র একজন ধর্মীয় গুরুর মত। জেনোফ্যান নিজে একজন সৈনিক ছিলেন। সক্রেটিসকে দেখার ভঙ্গি তার ছিল একজন ধর্মীয় গুরুকে ভক্তের দেখার ভঙ্গির মত।

সক্রেটিসের বউ জানথিপির কথা আছে প্লেটোর বইয়ে। সেখানে তিনি জানথিপিকে বলেছেন স্বামীর অনুগত স্ত্রী এবং সন্তানদের একজন ভালো মা হিসেবে।

জেনোফ্যানের বই সিম্ফোজিয়ামের এক জায়গায় সক্রেটিস বললেন, নারীরা পুরুষের চাইতে ইনফিরিয়র না। এবং পুরুষদের বললেন যে তারা তাদের স্ত্রীদের বিভিন্ন জিনিস শেখাতে পারে ইত্যাদি।

এই সময় এন্টিস্থিনিস নামে এক ত্যদড় লোক সক্রেটিসকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার কলহপ্রিয়, বদমেজাজী বউ জানথিপিরে তাহলে শিক্ষিত করলে না কেন?

এখানেই জানা যায় জানিথিপি ছিলেন বদমেজাজি এবং কলহপ্রিয়।

সক্রেটিস জবাব দিয়েছিলেন যে জানথিপির তর্ক করার স্পিরিটের জন্য তাকে পছন্দ করেছেন। এবং বলেন, I know full well, if I can tolerate her spirit, I can with ease attach myself to every human being else.(সিম্ফোজিয়াম ১৩-১৯)

এইলিয়ান নামের একজন রোমান (গ্রীক না, সক্রেটিসের সময়কালের না) লেখক জানথিপিকে হিংসুটে মহিলা হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন। তিনি একটা ঘটনার উল্লেখ করেছেন, এলসিবিয়েডস (নামের উচ্চারণ হল কী না বুঝতে পারছি না) একবার দারুণ একটা কেক পাঠালেন সক্রেটিসের কাছে। সক্রেটিসের তিনি ছাত্র ছিলেন। সুদর্শন হিসেবে তার খ্যাতি ছিল এথেন্সে।

এইলিয়ান লিখেছেন –

They say that the most amiable and beautiful amongst the Greeks was Alcibiades ; amongst the Romans, Scipio. (Chap. XIV. Claudius Aelianus His Various History. Book XII)

এলসিবিয়েডস এর ক্লোজ সম্পর্ক ছিল সক্রেটিসের সাথে। যুদ্ধে এলসিবিয়েডসের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন সক্রেটিস। সুতরাং, জানথিপি সক্রেটিসের সাথে এলসিবিয়েডসের সম্পর্ককে অন্য কিছু সন্দেহ করতেন। নিশ্চয়ই সে সময়ে কিছু কানাঘুষা হয়েছিল। কারণ এলসিবিয়েডসের সক্রেটিস ভক্তি ছিল অতুলনীয়। তাই সেই পাঠানো কেককে ঈর্ষাকাতর হয়ে তিনি জানথিপি নষ্ট করে ফেলেন। এই সন্দেহের জন্য এবং কেক নষ্ট করার জন্য আমার মনে হয় তাকে অতিরিক্ত দোষ দেয়া যায় না।

Socrates and Alcibiades, by Christoffer Wilhelm Eckersberg

Socrates and Alcibiades, by Christoffer Wilhelm Eckersberg

 

(ছবিটি সক্রেটিস এবং এলসিবিয়েডস এর কাল্পণিক চিত্র।)

জানথিপি নিয়ে আরো দুয়েকটি সক্রেটিসের কথাবার্তা দেখা যায় এই এলসিবিয়েডসের সাথেই।

প্লেটোর পুস্তক মোতাবেক সক্রেটিস এবং জানথিপি মধ্যে বয়সের ব্যবধান অনেক ছিল। প্রায় চল্লিশ বছর বা এরকম। সক্রেটিসের সত্তর বছর বয়সের কালে তার পুত্রদের বয়স ছিল অতি অল্প। এইসব বিবেচনায় এই বয়স ব্যবধানের ধারণা। ভুলও হতে পারে।

তবে এত না হলেও বয়স ব্যবধান ছিল। আর জানথিপির বংশ মর্যাদা ছিল সক্রেটিসের বংশ মর্যাদার চাইতে ভালো। তাই তাদের প্রথম ছেলের নাম রাখা হয়েছে জানথিপির বাবার নামে। সক্রেটিসের বাবা জানথিপির বাবার চাইতে মর্যাদাবান হলে বড় ছেলের নাম সফ্রোনিসকাস হত। এটাই ছিল তখনকার এথেন্সের নিয়ম।

জানথিপি দেখতে অসুন্দর ছিলেন এমন বলা যায় না। কিন্তু সক্রেটিস দেখতে ছিলেন অসুন্দর। তার উপর তিনি সোফিস্টদের মত শিক্ষা দিয়ে টাকা নিতেন না। তিন পুত্র এবং আরেক বউও ছিল তার। আরেক বউয়ের কথা জানা যায় এরিস্টটলের মাধ্যমে।

সুতরাং, জানথিপির স্বামীর প্রতি রাগ দেখানোর যথেষ্ট কারণ ছিল বলা যায়। তার ঝাঁঝ হয়ত বেশি ছিল। কিন্তু যেভাবে প্রায় ডাইনিরূপী স্বামী নির্যাতনকারী হিসেবে তাকে তুলে ধরা হয়, হয়ত তিনি তেমন ছিলেন না।

সক্রেটিসের মৃত্যুর পর জানথিপি গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন। সক্রেটিসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শিষ্যে প্লেটোর মত অনুযায়ী তিনি খারাপ ছিলেন না। তার প্রতি যেসব অভিযোগ সেগুলো যতটা না সত্য, তার চেয়ে বেশি ফুলে ফেঁপে উঠেছে পুরুষতন্ত্রের বাতাসে।

সক্রেটিস বউয়ের ভয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলতেন না বা তর্ক করতেন না এমনও নয়। সক্রেটিস এমনিতেই তর্ক এড়িয়ে চলতেন। যেমন এপিকটেটাস লিখে গেছেন –

socrates

“ভালো এবং মহান মানুষেরা কারো সাথে তর্ক করেন না। তার সর্ব উৎকৃষ্ট ক্ষমতা অন্যের সাথে বিতর্কে ব্যবহৃত হয় না। আমাদের সামনের এর চমৎকার উদাহরণ আছেঃ সক্রেটিসের জীবন।

তিনি শুধু বিতর্ক এড়িয়ে চলেন নি, অন্যের বিতর্ক দূর করার চেষ্টা করেছেন। জেনোফ্যানের সিম্পোজিয়ামে দেখা যায় বার বার তিনি বিতর্ক দূর করেছেন, থ্র্যাসিম্যাকাস, পোলাস, ক্যালিক্লেস এর সাথে কীভাবে তিনি ধৈর্যশীল ছিলেন। দেখা যাবে তার স্ত্রী এবং পুত্রের সাথে তিনি কত শান্ত ছিলেন।

তার পুত্র যখন তাকে বিভ্রান্তিকর যুক্তি দেন এমন অভিযোগে অভিযুক্ত করল, তখনো তিনি শান্ত ছিলেন।”

- এপিকটেটাস, বুক চার, চ্যাপ্টার পাঁচ

 

ছবিঋণঃ ছবিগুলো উইকি থেকে নেয়া।

Share
আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। লিংক শেয়ার করুন, তাতে অন্যরা পড়ার সুযোগ পাবেন।

Related Posts

2 Comments

  1. রাফায়েলের স্কুল অব এথেন্স এবং মহান ডায়োজিনিস | মুরাদুল ইসলামের ব্লগ
    August 16, 2015 at 6:51 pm

    […] এবং সক্রেটিসের সম্পর্ক নিয়ে সক্রেটিসের স্ত্রী জানথিপি সন্দেহ […]

  2. দ্য ট্রুমান শো – সত্য বাস্তবতা, মিথ্যা বাস্তবতা | @ মুরাদুল ইসলামের ব্লগ
    January 21, 2016 at 9:39 am

    […] এর উত্তরে প্রাচীন গ্রীসের দার্শনিক সক্রেটিসকে স্মরণ করতে হবে। তার মত ছিল আইডিয়া […]

Leave A Comment