by

সুন্দর মুহুর্তের ছবি তোলা বিষয়ে ইতালো কালভিনো

কোন বাস্তবতা আমাদের কাছে সুন্দর মনে হয় তাই এর ছবি তোলা হয়েছে এবং বাস্তবতার ছবি তোলা হয়েছে বলেই আমাদের কাছে সুন্দর মনে হচ্ছে – এই দুইয়ের মধ্যেকার পার্থক্য বড় অল্প। “আহ, কী সুন্দর দৃশ্য! এটি আমাদের ছবি তুলে রাখা উচিত।” এইরকম কথা যখনই আপনি বলা শুরু করবেন তখনই আপনি সেই মানুষটার চিন্তার কাছাকাছি চলে যাবেন যে মনে করে যা কিছুর ছবি তোলা হয় না সেসব হারিয়ে যায়, যেন এগুলোর ছবি তোলা না হলে এর অস্তিত্ব নেই, যেন সত্যিকারভাবে বাঁচতে হলে যত বেশি সম্ভব আপনাকে ছবি তুলতে হবে, এবং এর জন্য এমনভাবে জীবন কাটাতে হবে যেন প্রতি মুহুর্তই হয় ছবি তোলার মত অথবা সব মুহুর্তকে মনে করতে হবে ছবি তোলার উপযুক্ত হিসেবে। এর প্রথমটা নিয়ে যাবে নির্বুদ্ধিতার দিকে আর দ্বিতীয়টা নিয়ে যাবে উন্মাদ দশায়।

- ইতালো কালভিনো, ইতালিয়ান লেখক। জন্ম ১৫ অক্টোবর ১৯২৩। মৃত্যু ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫।

১৯৭০ সালে ইতালিয়ান লেখক ইতালো কালভিনো তার ডিফিকাল্ট লাভস গল্পগ্রন্থের এন্তোনিও ক্যারেক্টারের মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন এই কথা।

calvino510x333
                           ছবি- ইতালো কালভিনো

এই উক্তি সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে দারুণ প্রাসঙ্গিক।

প্রাকৃতিক এবং বাস্তব যে সৌন্দর্য, ছবি তুললেই তা হয়ে যায় অতীতের এক বস্তু যা চলে গেছে। ছবি তোলে সৌন্দর্যকে ফ্রেমবন্দি করে রাখার ইচ্ছা এক ধরণের স্মৃতি রাখার ইচ্ছা যা বর্তমানকে উপভোগের পথে অন্তরায়। সৌন্দর্যকে ক্যামেরায় ধরে রাখা এবং তা পোস্ট দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক পাওয়ার ইচ্ছা বা অন্যকে দেখানোর ইচ্ছার দরুণ, ঐ সময়ের বর্তমানে বা বাস্তব সময়ে থাকতে পারছে না আধুনিক মানুষেরা।

তাদের কোন সুন্দর মুহুর্তে থাকা, সেটা উপভোগের আনন্দ শিফট হয়ে গেছে ফেইসবুকে দেখানো এবং লাইক পাওয়ার মধ্যে। সেই ক্ষেত্রে ঐ সুন্দর মুহুর্তে সে হয়ত হাসি হাসি মুখে আনন্দ উপভোগের অভিনয় করে, এবং পরে তা ফেইসবুকে দেখিয়ে প্রকৃত আনন্দ পায়।

এটা এমন যে, খাওয়ার সময় সে এমনভাবে খাইল যাতে পরবর্তীতে সেই খাওয়ার কথা মনে করে, খাওয়ার ছবি অন্যদের দেখিয়ে বিমলানন্দ পেতে পারে। অদ্ভুত বিষয়!

সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা লাইক পাচ্ছে এবং পোস্ট কৃত নিজের তোলা সেসব ছবি দেখে নস্টালজিক হয়ে পড়ছে। তখন অতীতের সুখকর সেইসব মুহুর্তের কথা তাদের মনে হচ্ছে। আরো সুশোভিতভাবে মনে হচ্ছে অথবা সে সেই মুহুর্ত আরো বেশী সুখের ছিল এমন কল্পনা করে নিচ্ছে। অথবা এমনও হতে পারে সে নিশ্চিত জানে ঐ মুহুর্তে সে সুখী ছিল না, কিন্তু সুখের অভিনয় করে দেখিয়েছে, তা ফেইসবুকে সবাই দেখছে, লাইক দিচ্ছে। সুখের মুহুর্তে অসুখী থাকার মানে হলো হয়ত সে দুখী, কিন্তু যেহেতু সবাই ভাবছে সে দারুণ সুখী, অসাধারণ লাইফ কাটাচ্ছে, এই সবার ভুল ধারনার কারণে সে কি সুখী অনুভব করবে? আমাদের দুঃখ অন্যে না জানলে সে দুঃখ কি দুঃখ নয়? এটা ভাবার বিষয়।

কালভিনো ছবির বিষয়ে কথাটি একটা চরিত্রের মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি আসার অনেক আগে। ছবি তোলা আধুনিক প্রযুক্তির এক ভালো আবিষ্কার। স্মৃতি রাখার জন্য তা অল্প তোলা যেতেই পারে। কালভিনো নিজেও তুলেছেন। কিন্তু তা যেন বাস্তব লাইফ থেকে আমাদের বিতারিত করে না ফেলে, কালভিনোর কথার মূল কথা এই।

Share

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.