"মানুষের এতো নপর-চপর কিন্তু যখন ঘুমোয়, তখন যদি কেউ দাঁড়িয়ে মুখে মুতে দেয়, তো টের পায় না, মুখ ভেসে যায়। তখন অহংকার, অভিমান, দর্প কোথায় যায়?"- রামকৃষ্ণ

হুমায়ূন আহমেদের গল্প “বুড়ি” – ক্রিটিক্যাল পাঠ

গল্পটি উত্তম পুরুষে লেখা। কথক আমেরিকায় পড়তে গিয়েছেন এবং পায়রার খোপের মত জায়গায় বাস করছেন। তার পাশের অন্যান্য খোপে আরো কিছু ছাত্র ছাত্রী এবং একজন বুড়ির বাস। সেই বুড়ি একা, নিঃসঙ্গ। রাত বিরেতে ব্যাগ পাইপ বাজিয়ে সে খোপবাসীদের বিরক্ত করে যাতে তারা কেউ তাকে গিয়ে বন্ধ করতে বলে, তখন কিছু কথা বলা যাবে, এমনই নিঃসঙ্গ সে।

পড়তে পড়তে গল্পের এন্ডিং দুঃখের হবে এমন মনে হয়। কিন্তু হাসিখুশি সমাপ্তিই হয়েছে। লেখক তার কোমলপ্রাণ পাঠকদের মনে চাপ দিতে চান নি। শেষটাতে বুড়ি অসুস্থ হয়, হাসপাতালে যায়। খোপবাসী গল্প কথক বুঝতে পারেন বুড়ি কতটা নিঃসঙ্গ। এবং পরবর্তীতে সে হাসপাতাল থেকে ফিরলে খোপবাসীরা একটা পার্টি দেন, একটা ব্যাগ পাইপও গিফট করেন বুড়িকে।

আশা করা যায়, এর পর থেকে বুড়িকে তারা অত অবজ্ঞা করে চলবেন না। সময় দিবেন এবং গল্পসল্প করবেন।

প্রাথমিকভাবে মনে হয় হুমায়ুন আহমেদ এই গল্পের মাধ্যমে আসলে একটা সমালোচনাই করেছেন আমেরিকান সমাজের যেখানে বুড়াবুড়িদের নিঃসঙ্গ করে রাখে। গল্পে এর উল্লেখও আছ যে ঐ সমাজে বুড়াবুড়ির কোন স্থান নেই।

বুড়াবুড়ি মানে শক্তি বা কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া একজন মানুষ। পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ হচ্ছে প্রফিট উৎপন্ন করার যন্ত্র। বুড়াবুড়ির যেহেতু প্রফিট তৈরীর ক্ষমতা কমে যায় ফলে তাদেরও সবাই ছেড়ে যায়। যে ফ্যামিলি বা ধর্মীয় ভ্যালুর কারণে বুড়াবুড়ির প্রতি লোকে দায়িত্ব পালন করে, তার বিপরীতে দাঁড়ায় বুর্জোয়া পুঁজিবাদ।

ছবি- হুমায়ুন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২। শিল্পী+ছবি ক্রেডিটঃ কল্লোল

ছবি- হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২। শিল্পী+ছবি ক্রেডিটঃ কল্লোল

হুমায়ূন আহমেদ সামান্য কিছু ঘটনা দিয়ে, অল্প কথায় এবং হালকা কিছু চরিত্রের মাধ্যমে এই বিষয়টাকে তুলে এনেছেন। চরিত্রের নির্মান, গভীরতা বলে যেসব জিনিসের কথা বলা হয়, এই গল্পে তা নেই। না থাকার ফলে গল্পের বয়ান বুঝতে বা চরিত্র বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না। চরিত্র নির্মান এবং তার বর্ননার দরকার হত যদি মনস্তাত্বিক কোন দ্বন্দ্বের উপস্থাপন থাকতো। কিন্তু তেমন কিছু এখানে নাই, সোজাসাপ্টা বয়ান আছে একটা সমাজের। সমাজের কিছু সমস্যা এবং মানুষের উপর তার প্রভাবের উপস্থাপনই প্রাধান্য পেয়েছে গল্পে।

গল্পের কথোপকথনেও একটা বিশেষত্ব আছে। যেমন, ভারতীয় ছাত্র বুড়িকে বলছে, “তুমি অতি নিম্নশ্রেণীর একটি প্রাণী।” এইরকমভাবে বাংলায় কেউ গালি দেয় না। ইংরেজির বাংলা অনুবাদেও গালির পরিবর্তে আরেক বাংলা গালি ব্যবহারের রীতি আছে। কিন্তু হুমায়ুন আহমেদ এখানে অদ্ভুতভাবে “আন-রিয়েলিস্টিক” ভাষা ব্যবহার করেছেন। এটা ভিন্ন স্বাদ দেয় এবং গালিটা ইংরেজিতে দেয়া হয়েছিল, তা আক্ষরিকই অনুবাদিত হয়েছে এমন একটা বোধের তৈরী করে। গল্পে যে সব সময় বাস্তবের প্রতিফলন হতে হবে এমন কোন নিয়ম নেই। চিত্রকলার ক্ষেত্রে বাস্তবের চাইতে ভিন্ন নানা ধরনের প্রচেষ্টা হয়েছে। সেসব শিল্পকলার বিকাশে অনেক গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখে এসেছে।

হুমায়ূন আহমেদের এই গল্পটি আসলে আধুনিক সমাজের সাধারন সমালোচনামূলক এ্কটি গল্প। লেখক অল্প কিছু রহস্য তৈরী করে রেখেছেন গল্পে যা আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন মনে হতে পারে। যেমন, ফিলিপাইনের একটা মেয়ে তোহা, যে প্রায়ই গভীর রাতে ফুঁপিয়ে কাঁদে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। কেন কাঁদে এর কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না গল্পে। এমন কি তার চরিত্রের সরাসরি উপস্থাপনও নেই।

আরেকটি চরিত্র কোরিয়ান ছাত্র হান। যে ইংরেজি একেবারেই জানে না। ইংরেজি না জেনে সে আমেরিকায় পড়তে গেল কীভাবে, পড়ছে কীভাবে সেটা এক রহস্য।

ভারতীয় ছাত্র অনন্ত নাগ, যে লেখকের সাথে তেমন কোন কথাবার্তা বলে না। শুধু দেখা হলে “আবে ইয়ার” বলে একটা চিৎকার দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ে। ছেলেটার কথাবার্তা নেই এমন কারো সাথে এরকম “আবে ইয়ার” বলা অস্বাভাবিক।

এইসব রহস্য লেখক কেন তৈরী করলেন?

এখানে লেখক রূপকার্থে আধুনিকতার সমস্যা (ক্রাইসিস অব মডার্নিটি) তুলে ধরেছেন।

আবে ইয়ার বলে অনন্ত নাগ নিজ রুমে প্রবেশ করে। আর কোন কথাবার্তা তার হয় না লেখকের সাথে। লেখকের সাথে ছেলেটির “আবে ইয়ার” সম্পর্কটা একটা ফেইক সম্পর্ক। আধুনিক সমাজে এরকম হয় অহরহ। কোরিয়ান চরিত্র হানের ইংরেজি না জানার রূপকে লেখক বুঝিয়েছেন আধুনিক সমাজে মানুষে মানুষে যোগাযোগের সমস্যা। কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ করতে না পারা, নিজের ভেতর যে চিন্তা আছে তা প্রকাশ করতে না পারাই প্রকৃত একাকীত্ব বা লোনলিনেস। আধুনিক সমাজে যা খুব প্রকট।

তোহা মেয়েটা রূপবতী এবং তার প্রায় গভীর রাতের কান্না মানষের একাকীত্ব, অবসাদের বেদনা। যা আধুনিক সমাজের মানুষেরা বুঝতে পারে কিন্তু এ নিয়ে কিছু করতে পারে না। কারণ পাশাপাশি থাকলেও তাদের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব।

আধুনিক সমাজে ফেইক সম্পর্ক, যোগাযোগের সমস্যা এইসব দূরত্বের তৈরী করে।

গল্পে বাড়িওয়ালা চরিত্রের সরাসরি উপস্থাপন নেই। তবে লেখক প্রথম দিকেই বাড়িওয়ালার কর্তৃত্বের কথা বলেছেন। বাড়িতে কমন বাথরুম ব্যবহার করতে হয়, রান্নাঘর নেই। এসব সমস্যার বা সীমাবদ্ধতার সাথে মানিয়ে চলতে হয় ভাড়াটিয়াদের। কিন্তু বাড়িওয়ালা সিগারেট খেতে নিষেধ দেন, উচ্চ ভল্যিউমে স্টেরিও শুনতে নিষেধ দেন। এই যে বাড়িওয়ালার নিয়ন্ত্রণ এটা আধুনিক সমাজে টোটালিটারিয়ান রাষ্ট্রের সাধারন মানুষের জীবন যাপন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের রূপক। বিভিন্ন অজুহাতে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো তাদের নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে যায় অবিরত।

সামগ্রিকভাবে গল্পটি আধুনিক সমাজের একাকীত্বের গল্প। অতিরিক্ত ইন্ডিভিউজুয়ালিজমের প্রভাবে আধুনিক পুঁজিবাদী হেডোনিস্টিক সমাজের মানুষ যে একা হয়ে পড়ে, অবসাদ ও বিষন্নতায় ভুগে তারই উপস্থাপন। গল্পে বুড়ি শুধু একা না, খেয়াল করলে দেখা যাবে গল্পের কথকসহ সবাই একা।

 

--

আগ্রহীদের জন্য আরেকটি গল্প আলোচনাঃ শহীদুল জহিরের গল্প "তোরাব সেখ" এর সাইকোএনালিসিস

Share
মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করে একে আগ্রহী পাঠকের সামনে যেতে সাহায্য করুন।

Related Posts

One Comment

  1. হুমায়ু&#247...
    September 3, 2016 at 6:40 pm

    […] হুমায়ুন আহমেদের গল্প।  […]

Leave A Comment