by

প্রেম একটি নার্সিসিস্টিক বিষয়

গতবছর  (২০১৬ সালে) আমি নার্সিসাস এবং একো’র বিখ্যাত মিথিক্যাল গল্পটি নিয়ে লিখেছিলাম। সেখানে আমার অবস্থান ছিল এই যে, বাস্তব জীবনে এবং মিথের গল্পটিতেও নার্সিসাসের চাইতে বরং একো বেশী খারাপ অবস্থায় পড়বে। কারণ নার্সিসাসের প্রবণতা ছিল আত্মপ্রেম, সে কারো কাছে তার স্বীকৃতি চায় না। কিন্তু একো’র প্রবণতা বাইরের কাছে তার সৌন্দর্যের স্বীকৃতি। আমি এও উল্লেখ করেছিলাম যে সোশ্যাল মিডিয়ায় যেসব কাজকে মানুষ সাধারনত নার্সিসিস্টিক মনে করে (যেমন ছবি দেয়া বেশী।) এগুলি যতটা না নার্সিসিস্টিক তার চাইতে বেশী একোইস্টিক। কারণ ছবিগুলি অন্যের স্বীকৃতি চায়। পর্যাপ্ত লাইক না পেলে ঐ ব্যক্তি ছবি ঝুলিয়ে রাখবে না। আদর্শ নার্সিসিস্টিক লোকের তুলনা দিতে আমি বলেছিলাম সৃজিত মুখার্জির নির্বাক ফিল্মের অঞ্জন দত্ত অভিনীত চরিত্রটির কথা। লেখাটি আপনারা পড়ে দেখতে পারেন।

আধুনিক সমাজে একো এবং নার্সিসাস

এই লেখাটিও নার্সিসিজম নিয়ে, তবে একটু ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। আমরা ভালোবাসা বা প্রেম বিষয়টা নিয়ে জানি। এ নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা, অজস্র নাটক গান ফিল্ম ইত্যাদি হয়। কিন্তু এই প্রেমটা আসলে কী?

প্রেম হচ্ছে একটি নার্সিসিস্টিক বিষয়।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তির সাথে আরেকজন ব্যক্তির দেখা হলো। প্রথম ব্যক্তিটি ছেলে দ্বিতীয় ব্যক্তিটি মেয়ে। ছেলেটি মেয়েটিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল, এবং মেয়েটির ব্যবহারেও মুগ্ধ হয়ে গেল। এবং সে মেয়েটির প্রেমে পড়ে গেল। যেটাকে বলা হয় লাভ এট ফার্স্ট সাইট। এখন কথা হচ্ছে এই বিষয়টি নার্সিস্টিক কীভাবে?

প্রথম ছেলেটি মেয়েটিকে কেন পছন্দ করেছে? মেয়েটির নির্দিষ্ট কিছু কোয়ালিটি আছে এজন্য। ধরা যাক সেসব কোয়ালিটি সৌন্দর্য, সুন্দর হাসি, সুন্দর চোখ, সুন্দর চুল, বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি। এখন ছেলেটি আসলে মেয়েটিকে ভালোবাসে না মেয়েটির ঐসব কোয়ালিটিকে ভালোবাসে?

যদি বলা হয়, মেয়েটিকে ভালোবাসে তাহলে প্রশ্ন হবে ঐসব কোয়ালিটি সরিয়ে নেয়া হলেও কি ছেলেটি মেয়েটিকে ভালোবাসবে? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে আরেকটি প্রশ্ন হবে, তাহলে অন্য আরেকটি মেয়ের সাথে এই মেয়েটির পার্থক্য কোথায়? বা অন্য একটি মেয়ের সাথে এভাবে লাভ এট ফার্স্ট সাইট হলো না কেন ছেলেটির?

এই প্রশ্নগুলি দেখিয়ে দেয় মেয়েটি নয়, মেয়েটির কোয়ালিটিগুলিই ছেলেটি পছন্দ করে।

ছেলেটির মধ্যে তার পছন্দের একটা কাঠামো তৈরী হয়েছে। যেমন সুন্দর চুল, সুন্দর হাসি ইত্যাদি। বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞান বলবে ছয় বছরের মধ্যে শিশুমনে এইসব কাঠামো তৈরী হয়, ভবিষ্যতে সে কেমন পার্টনার পছন্দ করবে। এবং এই পছন্দের কাঠামো নির্মানে প্রভাব থাকে ঐসময়ে তার সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা নারীর। সে ঐ নারীর মতোই পার্টনার খুঁজে নেয় ভবিষ্যতে।

এছাড়াও, মানুষের পছন্দ নির্মান করে সমাজ ও মিডিয়া। অন্যের আকাঙ্খাকে অনুকরণ করার মধ্য দিয়েই মানুষের মধ্যে আকাঙ্খার তৈরী হয় বলে একটি মত আছে। এটিকে পুরোপুরি না মেনে নিয়েও বলা যায়, সমাজ মিডিয়া তথা অন্যদের আকাঙ্খা ব্যক্তির আকাঙ্খাকে আকৃতি দেয়।

সাধারণ বাংলাদেশী বলিউডি ফিল্ম দেখা তরুণের আকাঙ্কা হতে পারে বলিউডি নায়িকাদের মত বা ঐরকম জিনিস অনুকরন করা মেয়ে আবার সাধারণ হিন্দি সিরিয়াল দেখা বাংলাদেশী মেয়েদের পার্টনার হিসেবে পছন্দ হতে পারে হিন্দি সিরিয়ালের নায়কদের মত বা ঐরকম জিনিস অনুকরন করা ছেলে।

ম্যাক্সিম গোর্কি

মানুষ কোন জিনিসরে ইন্টারেস্টিং মনে করে, কাকে সেলিব্রেটি হিসেবে মানে, কী সে বিনোদনের জন্য ভোগ করে এসবই তার আকাঙ্খাকে আকৃতি দিতে প্রভাব ফেলে।

তো মূলত একটি ছেলে ও মেয়ের যে আকাঙ্খার কাঠামো, এটা অন্যের প্রভাবিত হলেও এটা তার নিজের। সে নিজে থেকেই কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সৌন্দর্য ইত্যাদি তৈরী করে রাখে। এরকম একজনকে সে কল্পনা করে। এই কল্পনার নারী বা পুরুষটি কোন বাস্তব নারী বা পুরুষ নয়, যিনি কল্পনা করছেন তারই একটি প্রতিরূপ। এই রূপেই মুগ্ধ থাকেন যিনি কল্পনা করেন তিনি।

এবং কখনো যদি তার কাল্পনিক কাঠামোর সাথে মিলে যায় এমন কারো দেখা পান তিনি, তাহলে তাদের ভাব-ভালোবাসা হয়। অথবা অনেকদিন চলতে চলতে একসাথে, হঠাৎ তিনি বুঝতে পারলেন ঐ ব্যক্তিটি তার কাল্পনিক কাঠামোর সাথে মিলে, তখন তাদের ভালোবাসা হয়। হোক।

কিন্তু প্রশ্ন এখানে, তিনি ভালোবাসেন কাকে? বাস্তবের লোকটিকে না তার কাল্পনিক কাঠামোটিকে?

উত্তর, তার কাল্পনিক কাঠামোটিকে। কারণ আমরা আগেই দেখেছি বাস্তবের ব্যক্তি নয়, ব্যক্তির কোয়ালিটির (সৌন্দর্য, সুন্দর হাসি ইত্যাদি) জন্যই তিনি তার প্রেমে পড়েন।

তাই, আসলে প্রেমকে বা এই ধরনের ভালোবাসাকে যত যাই বলা হোক না কেন, এগুলি আসলে মানুষের একটি নার্সিসিজম (আত্মপ্রেম) তাড়িত ব্যাপার।

নার্সিসিজম

উপসংহারঃ

আমি বিবর্তনবাদের দিক থেকে, সন্তান উৎপাদন করতে হবে তাই প্রেম; এভাবে দেখি নি এই লেখায়। দুই, আমি মস্তিষ্কে বিভিন্ন হরমোন ইত্যাদি নিঃসৃত হয় তাই ভালোবাসা ইত্যাদি অনুভব তৈরী হয়, এ ধরনের বিজ্ঞানভিত্তিক কথাবার্তায়ও যাচ্ছি না। অর্থাৎ, প্রেম বা ভালোবাসার নিসারতা বা অসারতা প্রমাণ আমার উদ্দেশ্য নয়, আমার উদ্দেশ্য ছিল জিনিসটা বুঝা।

প্লেটো যা বলেছিলেন, মানুষকে তৈরী করা হয়েছিল চার হাত পা দিয়ে। পরে তারা বেশী শক্তিশালী হয়ে যাবে ভেবে জিউস তাদের আলাদা করে দেন। তাই সারাজীবন একটা অংশ আরেকটা অংশকে খুঁজে। সেই দিক থেকে দেখলেও, তা নার্সিস্টিকই, কারণ নার্সিসিজমের যে আকর্ষন তা নিজের প্রতিই, তাকে দু’ভাগ করে দিলেও তা নার্সিসিজমই থাকবে।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *