হিচককের রোপ এবং নীচার উবারম্যানশ

রোপ (১৯৪৮) ফিল্ম শুরু হয় একটি খুনের মাধ্যমে। ব্র্যান্ডন শ এবং ফিলিপ মর্গান নামের দুই যুবক তাদের সাবেক এক সহপাঠীকে গলায় দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে। তাদের এই খুনের কারণ একটাই। তারা মনে করে তারা আলাদা। পৃথিবীর সব নৈতিকতার বাইরে। এবং তারা এই খুনকে মনে করে পারফেক্ট মার্ডার এবং তাদের খুনের উদ্দেশ্য পারফেক্ট মার্ডার সম্পন্ন করে পার পেয়ে যাওয়া। ব্র্যান্ডনের মতে মার্ডার একটা আর্ট তাদের জন্য, তারা অন্যদের চাইতে সুপিরিয়র এবং ইনফিরিয়রদের তারা এভাবে খুন করতেই পারে।

rope

তাদের মধ্যে এই ধারণার উৎপত্তি হয়েছে তাদেরই এক শিক্ষকের মাধ্যমে। এই শিক্ষকের আগ্রহের বিষয় ছিল দর্শন। তিনি এখন আর শিক্ষকতায় নেই, দর্শনের বিভিন্ন বই প্রকাশ করেন।

এই শিক্ষক নীচার (নীৎসের/নীটশে) উবারম্যানশ (Übermensch ) তথা অভারম্যান বা সুপারম্যানের কনসেপ্ট তার এই ছাত্রদের বুঝিয়েছিলেন। যদিও নীচার সুপারম্যানের কনসেপ্টের বিভিন্ন দিক আছে কিন্তু ব্র্যান্ডন এবং ফিলিপ অনুপ্রাণিত হয়েছিল তারা অন্য সবার চাইতে সুপিরিয়র এবং সমস্ত নৈতিকতার বাইরে এই ধারণা দ্বারা।

তাদের সেই শিক্ষক চরিত্রে অভিনয় করেছেন অন্যতম শক্তিমান অভিনেতা জেমস স্টিওয়ার্ট।

ব্র্যান্ডন এবং ফিলিপ তাদের সহপাঠীকে শ্বাসরোধ করে খুন করল। মৃতদেহ রুমে থাকা একটি কাঠের সিন্দুকে রাখল। তারপর আয়োজন করা হল একটা পার্টির। সেখানে খুন হয়ে যাওয়া ছেলেটির বাবা মা, গার্লফ্রেন্ড, বন্ধু এবং সেই শিক্ষককে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল।

সাসপেন্স নির্ভর এই ছবিতে কথোপকথনের মাধ্যমে কাহিনী চলতে থাকে। হিটলার এবং নাৎসী জার্মানী দার্শনিক নীচার উবারম্যানশ তথা সুপারম্যানের ধারনায় প্রভাবিত ছিল। তারা নিজেদের আর্য মনে করত, অন্য সবার চাইতে সুপিরিয়র। তাদের দার্শনিক ভিত্তি ছিল নীচার উবারম্যানশ। তারা নিজেদের সেরা জাত বলে ইনফিরিয়র জাতের ধারণা তৈয়ার করে। তবে তাদের এই ধারনা নীচার উবারম্যানশ সারমর্ম নয় কারণ নীচার ধারনা জটিল এবং এর বিভিন্ন দিক আছে। নীচা নিজেই এন্টি-সেমিটিজম এবং জার্মান জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করেছেন।

ছবিঃ শ্যুটিং এ হিচকক এবং জেমস স্টিওয়ার্ট ফিল্মের অন্য দুই প্রধান চরিত্রের সাথে

ছবিঃ শ্যুটিং এ হিচকক এবং জেমস স্টিওয়ার্ট ফিল্মের অন্য দুই প্রধান চরিত্রের সাথে

রোপ ফিল্মে নীচার কথা এসেছে বার বার। নীচা প্রভাবিত ফ্রয়েডের নামও শোনা যায়। যে মূল ঘটনার উপর ভিত্তি করে ফিল্মটি নির্মিত তা হল ১৯২৪ সালের লিওপল্ড-লোয়েব কেস। তারা ১৪ বছরের একটি ছেলেকে খুন করেছিল নিজেদের বুদ্ধিভিত্তিক সুপিরিয়রিটি প্রমাণের জন্য। এদের মধ্যে লিওপল্ড নিজেকে নীচার উবারম্যাশ মনে করত। তার ধারণা ছিল সে দুনিয়াবি সমস্ত নীতি নৈতিকতার উর্ধ্বে উঠা একজন উবারম্যানশ।

ফিল্মের শিক্ষক জেমস স্টিওয়ার্ট শেষ পর্যায়ে তার ধারনার ভয়াবহ এ্ক দিক দেখতে পারেন তার ছাত্রদের কৃত কর্মের মধ্য দিয়ে। তার নিজের চিন্তা এরকম ছিল না। তার ছাত্ররা একে এক ভিন অর্থে নিয়েছে যা তার সামনে নিজের ধারণার এক নতুন অর্থ হাজির করে।

তখন তার মুখে শোনা যায়-

Each person has “the right to live, to work, and to think as an individual, but with obligations to the society we live in. By what right did you dare say there’s a superior few to which you belong? . . . Did you think you were God?”

এই ফিল্ম একটি দার্শনিক গুরুত্ব বহন করে। সাসপেন্সের মাধ্যমে র‍্যাডিক্যালী নিজেকে সুপিরিয়র ভাবা, অন্যদের চাইতে আলাদা কিছু ভাবার বিষয়টা যে ভয়াবহ হতে পারে তা দেখানো হয়েছে।

এখানে খুনটা শেষ পর্যন্ত আত্মধ্বংশী হয়েছে খুনীদের জন্যও। কারো কোন উপকারে লাগে নি। কারো বিদ্ধিভিত্তিক বিজয় অর্জিত হয় নি বা চিন্তার অসাধারণ ক্ষমতা প্রকাশিত হয় নি। নিজেদের সুপিরিয়র ভাবা দুই মূল চিন্তক ব্র্যান্ডন এবং ফিলিপ নিজেরাই নিজেদের ধ্বংশের দিকে নিয়ে গেছে। তাদের শিক্ষক নিজেই তার চিন্তার ভয়ংকর দিকের সাথে পরিচিত হয়ে বিস্মিত ও বিমূঢ় হয়েছেন।

এটাকে এভাবে বলা যেতে পারে, চিন্তকরা যদি সাধারণ মানুষকে নিজেদের চাইতে ইনফিরিয়র মনে করেন, মনে করেন এদের বাঁচা আর মরাতেই বা কী আসে যায়, এরা গুরুত্বহীন প্রাণী; তাহলে তাদের চিন্তা সাধারণের জন্য এবং তাদের নিজের জন্যও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

নীচাকে বুঝতে না পেরে হিটলার এবং নাৎসীরা তাকে ধ্বংসাত্মক কাজের অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়েছিল। তেমনি রোপের শিক্ষকের চিন্তাকে ভুলভাবে নিয়ে তার ছাত্ররা ভয়ংকর কাজ সম্পন্ন করে। ফিল্মে শিক্ষক যেমন তার ধারণার ভয়াবহ প্রয়োগ দেখে যুগপৎ বিস্মিত এবং হতাশ হয়েছেন, নীৎসে হিটলারের কর্মকান্ডে তার উবারম্যানশের ভয়ানক প্রয়োগ দেখে সেইরূপ হতাশ হতেন ধারণা করা যায়।

rear window

রোপ কথোপকথন নির্ভর ফিল্ম, টুয়েলভ এংরি ম্যান (১৯৫৭), উইটনেস ফর দ্য প্রসেকিউশন (১৯৫৭) বা জাজমেন্ট এট নুর‍্যেমবাগ (১৯৬১) ট্রায়ালের মত। এর ছয় বছর পর জেমস স্টিওয়ার্টকে নিয়ে হিচকক বানান রিয়ার উইনডো (১৯৪৮)। সেখানে ভাঙা পা নিয়ে ঘরে বসে থাকা একজন ফটোগ্রাফার জানালা দিয়ে আশপাশের এপার্টমেন্টে বসবাসরত মানুষদের জীবন যাপন দেখে। একসময় সে সন্দেহ করতে থাকে একটি এপার্টমেন্টের একজন লোক তার স্ত্রীকে খুন করেছে। তার এই সন্দেহ থেকেই ফিল্মের মূল সাসপেন্স শুরু হয়।

Share
আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। লিংক শেয়ার করুন, তাতে অন্যরা পড়ার সুযোগ পাবেন।

Related Posts

2 Comments

  1. অবচেতনের নিয়ন্ত্রণ- এনিমি | @ মুরাদুল ইসলামের ব্লগ
    February 12, 2016 at 5:48 am

    […] মূলত ফিল্মের কাহিনী। আলফ্রেড হিচকক প্রেজেন্টস-সিজন ওয়ান এর দশ নাম্বার […]

  2. আলফ্রেড হিচকক এবং এন্ডি ওয়ারহলের কথোপকথন | @ মুরাদুল ইসলামের ব্লগ
    February 13, 2016 at 2:09 pm

    […] সময়। সেখানে তিনি হাটু গেড়ে ছিলেন আলফ্রেড হিচককের সামনে এবং নিজেই স্বীকার করেছিলেন […]

Leave A Comment