ভারত মহাসাগর ঘিরে চীন ও ভারতের ভূ-রাজনীতি

চীন ও ভারতের সরাসরি যুদ্ধ না হলেও তাদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজমান থাকবে ভূ-রাজনৈতিক কারণেই। এই বিরোধের উৎস যদি ধরা হয়,  ভারতের অরুনাচল প্রদেশের তিব্বত সংলগ্ন সীমান্তে ২৪০০ মাইল জায়গা নিয়ে দ্বন্দ্ব বা হিমালয় সীমান্তে ১৯৬২ সালের চীন-ইন্ডিয়া যুদ্ধ; তাহলে তা ভুল হবে না। কিন্তু যেহেতু দুই দেশেরই অর্থনীতি বহুলাংশে নির্ভরশীল ভারত মহাসাগরের উপরে, তাই এই মহাসাগরীয় অঞ্চলে দুই দেশের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক তৎপরতা দিনে দিনে গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে তা আরো গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠবে।

ইন্ডিয়ান ওশেন বা ভারত মহাসাগর পৃথিবীর মোট সমুদ্রের প্রায় পাঁচ ভাগের একভাগ জায়গা জুড়ে এবং তা খুবই গুরুত্বপূর্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতির দুনিয়ায়। এর হরমুজ ও মালাক্কা প্রণালি দিয়ে সমুদ্রপথে তেল বানিজ্যের প্রায় পঞ্চাশ ভাগের বেশী তেল যায় আসে। প্রতিদিন এর পরিমান প্রায় ৩২.২ মিলিয়ন অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম। পৃথিবীর প্রায় ৪০ ভাগ অফশোর পেট্রোলিয়াম তৈরী হয় ইন্ডিয়ান ওশেনে। এবং এতে রয়েছে প্রচুর মজুত খনিজ, মাৎসসম্পদ।

ভারত মহাসাগর

ছবিঃ ভারত মহাসাগরে বাণিজ্য

চীন এবং ভারত দুই দেশের জন্যই এই ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এই ইন্ডিয়ান ওশেনের সমুদ্র পথেই তারা আমদানী রপ্তানী’র বড় কাজটি করে থাকে। ভারতের ব্যবহৃত প্রায় আশি ভাগ তেল-গ্যাস আসে এই পথ দিয়েই মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তার চীনের ব্যবহৃত প্রায় ৮৪ ভাগ তেল-গ্যাস আসে এই মহাসাগরের মালাক্কা প্রণালী দিয়ে। এই মালাক্কা প্রণালী চীনের অর্থনৈতিক উন্নতির প্রাণ ভোমরা, এবং চীনের আশঙ্কা কোন শক্তি এই প্রণালী’র উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে; এবং এতে তাদের সমূহ বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। বলা বাহুল্য চীনের আশঙ্কা যাকে নিয়ে সে হচ্ছে ভারত এবং ভারত মহাসাগরে ভারতের প্রবেশ অতি সহজ যে ভারতের মতে এই মহাসাগর তার “বাড়ির পেছনের উঠান।”

চীন ও ভারত উভয়েরই অর্থনৈতিক উন্নতি বজায় রাখার জন্য এই ভারত মহাসাগর নিরাপদ রাখা জরুরী, এর উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা জরুরী। আবার অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের দৃষ্টি সরিয়ে এনেছে এশিয়ায়, বিশেষত ইস্ট এশিয়ায়। ইস্ট এশিয়ায় চীনের কতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমস্যা এবং ভবিষ্যতে আরো সমস্যা তৈরী হতে পারে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ চীন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রও ভারত মহাসাগরের ব্যাপারে আগ্রহী। এছাড়া  এটি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন একটি বাণিজ্য পথ, তাই এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব থাকা দরকারী, তাদের নিজেদের ক্ষমতার প্রয়োজনেই।

এছাড়া ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের উৎপাতের বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ন, যা সবারই মাথাব্যথার কারণ। নিচের ছবিতে ভারত মহাসাগরের জলদস্যু প্রবন বিপদজনক জায়গাগুলি দেখা যাচ্ছে।

ভারত মহাসাগরে জলদস্যু

ছবিঃ ভারত মহাসাগরে জলদস্যু

ভারত মহাসাগর নিয়ন্ত্রণের জন্য যে একটি দ্বন্দ্বের সূত্রপাতমূলক অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তারই প্রতিক্রিয়া হিসেবে চীন ভারত মহাসাগর সংলগ্ন দেশগুলিতে নৌবন্দর নির্মান, রেলপথ নির্মান, রাস্তা নির্মান, পাইপলাইন নির্মান ইত্যাদি প্রজেক্টে এগিয়ে এসেছে। এই যোগাযোগ পথগুলি চীনের সাথে ইউরেশিয়া, আফ্রিকা এবং ভারত মহাসাগরকে আরো সংযুক্ত করবে। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে খুব দ্রুত। এর তাল ধরে রাখতে তার নিরবিচ্ছিন্ন তেল-গ্যাস আমদানী করতে হবে। তাই চীন চায় বাণিজ্য পথগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও তাদের উপর নিজেদের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। এর মাধ্যমে সে তার অর্থনৈতিক উন্নতি এবং সমৃদ্ধ হবার যাত্রা ধরে রাখতে পারবে।

চীনের এসব প্রজেক্টের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো ৪৬ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান ইকোনোমিক করিডোরের পরিকল্পনা। এই করিডোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা  চীনের সাথে আরব সাগর এবং পূর্ব পারস্য উপসাগরের সংযোগ ঘটাবে। করিডোরের একটি অংশ ভারত-পাকিস্তান বিরোধপূর্ন গিলগিত-বালতিস্থানের ভেতর দিয়ে যাবে বলে এতে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছে ভারত। এতে আপত্তি আছে জাপানেরও।

এই করিডোর চীনের জন্য হবে মালাক্কা প্রণালী’র একটি বিকল্প।

চীন পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর

ছবিঃ চীন পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর

শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, পাকিস্তান, এবং পূর্ব আফ্রিকান উপকূলে চীনের সহায়তায় সমুদ্র বন্দর নির্মিত হয়েছে এবং হচ্ছে। বাংলাদেশে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মানে চীন সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল, কয়েকবার কথা হলেও এখনো তা হয় নি। শেষপর্যন্ত দেখার বিষয় এই বন্দর চীনের সহায়তায় হয় কি না। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই গভীর সমুদ্র বন্দরের প্রয়োজনীয়তা অসীম।

সমুদ্র বন্দর নির্মানে সহায়তার বদৌলতে সুসম্পর্ক তৈরী এবং সম্ভাব্য নৌবহর নির্মান বা নিদেনপক্ষে মেরামত স্টেশন এর সুযোগ তৈরী হয়।

বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, সোমালিয়া, মালদ্বীপ, পূর্ব আফ্রিকা, কম্বোডিয়া ইত্যাদি জায়গার সমুদ্রের সাথে নিজের সংযুক্তি বাড়িয়ে ভারতে কৌশলগত ভাবে ঘিরে ফেলছে চীন, এমনই আশঙ্কা ভারতের। কিন্তু চীনের উপরমহল থেকে বলা হয় তাদের এই প্রচেষ্টা তাদের ব্যবসার জন্যই কেবল। ২০০৫ সালে আমেরিকান একটি ফার্ম স্ট্রিং অব পার্লস হাইপোথিসিস দাঁড় করায়, তারা দেখায় কীভাবে চীন চায় ভারত মহাসাগরে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। চীনের পক্ষ থেকে স্ট্রিং অব পার্লস স্বীকার করে কোন বিবৃতি আসে নি, কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া এবং এনালিস্টের তা ব্যবহার করে আসছেন।

 

স্ট্রিং অব পার্ল

ছবিঃ স্ট্রিং অব পার্লস

 

ভারত মহাসাগরে চীন ও ভারত সহায়তায় নির্মিত সমুদ্র বন্দরগুলি দেখা যাবে নিচের গ্রাফিক্যাল ছবিটিতে। দেখা যাবে চীনের সহায়তায় নির্মিত বন্দরই অধিক।

 

ভারত মহাসাগর

দেখা যাচ্ছে ভারত মহাসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দু’টি নৌবহর আছে। পৃথিবীর সব গুরুত্বপূর্ন সমুদ্র পথে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহরই তাদের পৃথিবীর উপর কতৃত্বের প্রধান উৎস, এবং ভারত মহাসাগরেও তাদের এই অবস্থান বর্তমান আছে। চীনের বর্তমান তৎপরতার জন্য ধারণা করা যায় আগামীতে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরো শক্ত হবে।

ইন্ডিয়া বা চীন কারোরই সুপারপাওয়ার হবার ক্ষমতা নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি তাদের সংঘর্ষের সম্ভাবনা নেই। দু’টি দেশেরই অর্ধেকেরও বেশী মানুষ গরীব,  তাদের উদ্দেশ্য বড়জোর আঞ্চলিক প্রাধান্য বিস্তার এবং নিজেদের বড় হতে থাকা অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

এই প্রাধান্যের জন্য সমুদ্র বন্দর নির্মান ছাড়াও ভারত মহাসাগর সংলগ্ন দেশগুলিতে সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে চীন (এবং ভারতও করছে পালটা প্রতিক্রিয়া হিসেবে)। ২০১৬ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে চীনের প্রায় ৩৮.৫ বিলিয়ন ডলারের ইনভেস্টমেন্ট চুক্তিকে এরই অংশ হিসেবে দেখা যাতে পারে। এছাড়াও চীন বাংলাদেশের কাছে দুটি সাবমেরিন বিক্রি করে, যার প্রথমটি বাংলাদেশ গ্রহণ করে ২০১৬ সালের নভেম্বরে। এর আগে চীন ২০১৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের কাছে বিক্রি করে পাঁচটি সাবমেরিন। এছাড়া, চীনের নিউক্লিয়ার সাবমেরিন ও যুদ্ধ জাহাজকে শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানের বন্দরে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে, এবং এ নিয়ে ভারত তার উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছে।

১৪ই নভেম্বর বাংলাদেশ সাবমেরিন গ্রহণ করে আর এরপরই তড়িঘড়ি করে তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। ভারতের সেনাপ্রধান আসেন বাংলাদেশে (২৯ মার্চ,২০১৭)। বাংলাদেশের সাথে সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে ভারত, এমন আভাস মিলেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ ভারত ভ্রমণে (৭ এপ্রিল,২০১৭)।

ভারত এবং চীন উভয় দেশই তাদের নৌবাহিনী শক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত অষ্ট্রেলিয়ার সাথে দ্বিপাক্ষিক এবং অষ্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানের সাথে বহুপাক্ষির সামরিক মহরায় অংশ নিয়েছে ভারত মহাসাগরের বঙ্গোপসাগরে। নৌবাহিনী, এন্টি সাবমেরিন ক্ষমতা অর্জনের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে ভারতের মোদি সরকার।  জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এখানে একসাথেই চীনের তৎপরতার বিরুদ্ধে সচেতন। 'কোন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য  পথকে কোন একটি দেশের কতৃত্বে যেতে দেয়া হবে না' যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি ভারত মহাসাগরেও বলবৎ থাকবে ধরাই যায়।

এবং, শেষকথা হলো, আগামী দিনগুলিতে ভারত মহাসাগরে ভূ-রাজনৈতিক খেলা আরো হবে; এতে প্রধান দুই খেলোয়ার চীন ও ভারত।

Share
আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। লিংক শেয়ার করুন, তাতে অন্যরা পড়ার সুযোগ পাবেন।

Related Posts

Leave A Comment