by

পাখির জন্য মমতা

রামায়ণের অরণ্যকান্ডে আছে পক্ষী জটায়ুর কথা। রাম, সীতা ও লক্ষণ তখন বনে বাস করছেন। সীতাকে হরণ করে নিতে আসে লঙ্কারাজ রাবণ। সে একটি চক্রান্ত করে। রাবণের হয়ে মারীচ সোনার হরিনের রূপ ধরে এলো সীতার সামনে। সীতা সোনার হরিন পেতে চাইলেন। রাম ছুটলেন হরিনকে ধরতে। তার পিছু পিছু ভাই লক্ষণ। আর এদিকে জনকরাজের মেয়ে ও রামের স্ত্রী সীতা একা ঘরে, দন্ডকারণ্যে।

এই সুযোগে বিকট রাবণ সীতাকে ধরে নিয়ে যেতে লাগল। সীতা চিৎকার করতে লাগলেন নিজেকে বাঁচানোর জন্য। এই চিৎকার শুনতে পান রাজা দশরথের বন্ধু পক্ষী জটায়ু। জটায়ু তখন বৃদ্ধ, বয়স ষাট হাজার বছর। তবুও পাখা ঝাপটে এগিয়ে এলেন তিনি। রাবণের সাথে হলো তার ভীষণ যুদ্ধ। সে যুদ্ধে জটায়ু মারা যান।

জটায়ু ও রাবণের যুদ্ধ; Source: Dollsofindia.com

তবে মারা যাবার আগে খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি কাজ করে যান তিনি। রাম যখন ফিরে এসে দেখলেন সীতা নেই তখন তিনি উদভ্রান্তের মত তাকে চারিদিকে খুঁজতে লাগলেন, জিজ্ঞেস করতে লাগলেন সবাইকে সীতা কোথায়। গোদাবরী নদীকেও তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন কোথায় জানকী দেবী। কিন্তু রাবণের ভয়ে সবার মুখে তালা, কেউ কিছু বলে না।

অবশেষে রাম দেখতে পেলেন রক্তাক্ত বিরাট পক্ষী জটায়ুকে। প্রথমে তার মনে হলো এই বৃহদাকার পাখিটিই সম্ভবত খেয়ে ফেলেছে সীতাকে। তিনি জটায়ুকে তীরবিদ্ধ করতে উদ্যত হলেন। তখন জটায়ু বলেন, “আমাকে মেরো না। আমি এমনিতেই মারা যাচ্ছি।” এরপর তিনি রামকে বললেন সীতাহরণের কাহিনী। বললেন যে বিশ্রবার পুত্র ও কুবেরের ভাই রাবণ ধরে নিয়ে গেছে সীতাকে।

সীতা উদ্ধারে জটায়ুর ভাই সম্পাতিও করেছিলেন আরেক মহাগুরুত্বপূর্ন কাজ। বানর সেনারা যখন বনে বাদাড়ে, পাহাড়ে পর্বতে সীতাকে খুঁজে খুঁজে অস্থির তখন সম্পাতিই খোঁজ দিয়েছিলেন সীতার। সম্পাতি ছিলেন জটায়ুর বড় ভাই, বয়স তার আরো বেশী। মহাশক্তিধর দুই ভাই মিলে পুরাকালে একবার বৃত্রাসুরকে খতম করে অভিযান চালিয়েছিলেন আকাশমার্গে, ইন্দ্রকে একহাত দেখে নেবার জন্য। ইন্দ্রকে জয় করে ফেরার পথে তারা সূর্যের দিকে ধাওয়া দেন। সূর্য তখন মধ্যগগণে দেদীপ্যমান। সূর্যের প্রখর তেজে মাটিতে পড়ে যেতে থাকেন জটায়ু। তাকে বাঁচাতে ডানা দিয়ে ডেকে রাখেন ভাই সম্পাতি। তখন সূর্যের তেজে সম্পাতির বিরাট ডানা পুড়ে যায়। আর তিনি স্থির হয়ে নিচে পড়ে যান, বিন্ধ্রপর্বতে। সেখানেই তিনি ছিলেন। নিশাকর ঋষি তাকে বলে গিয়েছিলেন কোনও একদিন রামের দূতেরা আসবে তার কাছে সীতার খবর জানার জন্য। সম্পাতি সেইজন্য বসে ছিলেন।

বানররাজ সূগ্রীবের সেনাদের তিনি তথ্য দিয়েছিলেন কোথায় সীতা আছেন। সমুদ্রের মাঝখানে, বিশ্বকর্মার তৈরী নগরী লঙ্কায়।

জটায়ু ও সম্পাতি অনেক দূর পর্যন্ত, আকাশের সপ্তম ভাগ পর্যন্ত দেখতে পেতেন। কারণ তারা ছিলেন বিনতাপুত্র গরুড় ও অরুণের বংশধর, যাদের গমন ছিল সপ্তম আকাশ পর্যন্ত।

ঋষি কশ্যপ ও বিনতার পুত্র অরুণ ও গরুড়। পুরাণের এক কাহিনী মতে, একবার ঋষি কশ্যপের আরেক স্ত্রী ও বিনতার ভগিনি কদ্রু কশ্যপের কাছে বর চান, তার যেন এক হাজার নাগ সন্তান হয়। বিনতা বর চান, তার যেন মাত্র দুটি সন্তান হয়, এবং এরা যেন শক্তিতে কদ্রুর এক হাজার সন্তানের চাইতে বেশী বলশালী হয়।

বিনতার প্রথম সন্তান, অসময়ে ডিম ভেঙ্গে বের হওয়া অরুণ, যার দেহ অসম্পূর্ন। আর দ্বিতীয় সন্তান সর্পভোজী ও পাখিদের রাজাধিরাজ গরুড়।

ঘটনাচক্রে একবার বিনতা কদ্রুর দাসী হয়ে পড়েন। দাসত্ব মোচনের উপায় ছিল তাদের জন্য অমৃত এনে দেয়া। অমৃত আনার জন্য অভিযানে বের হন মহাশক্তিধর গরুড়। তিনি সব বাধা বিপত্তি পেরিয়ে, দেবতাদের পরাজিত করে অমৃত এনেছিলেন। অমৃত হাতে পেয়েও তিনি তা পান করেন নি। এই লোভ সংবরণ দেখে বিষ্ণু তাকে বর দিতে চাইলেন। গরুড় তখন বর চেয়েছিলেন তিনি যেন অমৃত পান না করেও অমর হতে পারেন।

বিষ্ণু গরুড়কে বর দেন ও নিজের বাহন করে নেন।

অমৃত নিয়ে আসছেন বিনতানন্দন গরুড়; Source: dipanwita2000.blogspot.com

গরুড় যখন অমৃত নিয়ে ফিরছিলেন তখন ইন্দ্রের সাথে আবার গরুড়ের ভীষণ যুদ্ধ লাগল। ইন্দ্র দেখলেন যে গরুড় অপরাজেয়। তখন তিনি তার সাথে সন্ধি স্থাপন করতে চাইলেন, বন্ধুত্ব করতে চাইলেন।

গরুড় জানালেন তিনি অমৃত নিয়ে যাচ্ছেন এক বিশেষ উদ্দেশ্যে। তার মাকে দাসী করে রেখেছে সর্পরা। এই অমৃত তাদের নিয়ে দিলে তারা দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেবে তার মা বিনতাকে।

গরুড় বললেন, ইন্দ্র চাইলে অমৃত ওদের দেবার পর চুরি করে নিয়ে আসতে পারেন তিনি।

ইন্দ্র এতে সম্মত হন। ইন্দ্র গরুড়কে বর দিতে চাইলেন। গরুড় বর চাইলেন, সব মহাবল সর্পরা যেন তার ভক্ষ্য হয়। ইন্দ্র বর দিলেন।

গরুড় অমৃত নিয়ে দেন কদ্রুর সর্প পুত্রদের। তারা বিনতাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে। কিন্তু অমৃত তারা পান করতে পারে নি। এর আগেই ইন্দ্র চুরি করে নিয়ে যান।

পুরাণের কাহিনীমতে পাখিদের রাজা গরুড় অমর। বাস্তবেও আসলে তিনি অমর। পুরাণের গল্পগুলিতে তো জীবন্ত হয়ে আছেনই, এছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডের জাতীয় প্রতীকসহ আরো নানা ধরনের মূর্তিতে রয়েছে বিষ্ণুর এই বাহনের অস্তিত্ব।

থাইল্যান্ডের ফুকেট ক্যারন বীচে তাদের জাতীয় প্রতীক; Source: Encirclephotos.com

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাচীন গল্প গাথায়, পুরাণে পাখিদের রয়েছে এমন স্বচ্ছন্দ বিচরন। মানুষ যখন তার কল্পনার ডালপালা বিস্তার করে গল্প তৈরী করতে গেছে, তখন তার প্রিয় পাখিদের যুক্ত করতে সে ভুলে নি। প্রাচীন কালে, কৃষির উদ্ভবের পূর্বে, সেই শিকার-সংগ্রহ সমাজেও মানুষের মধ্যে প্রচলন ছিল গল্পের। মানুষ গল্প বলত বিভিন্ন সামাজিক রীতিনীতি শিক্ষা দেবার জন্য, যাতে সহযোগীতামূলক ভাবে তারা মিলেমিশে কাজ করতে পারে। তাই পুরাতণ গল্পগুলি হেলাফেলার জিনিস নয়, যতই বর্তমানের প্রেক্ষাপটে অদ্ভুত শোনাক, যুক্তির বিচারে। মানুষের কল্পনাকে কখনো যুক্তির শৃঙ্খলে বাঁধা যায় নি। যুক্তির উপরে উঠেই মানুষ বিশাল হয়ে উঠে গল্প গাঁথায়, রূপকথায়।

পাখিদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা খুবই প্রাচীন।

আধুনিক কালেও মানুষের সাহিত্যে; গল্পে, কবিতায়, উপন্যাসে পাখি এসেছে। বাংলা সাহিত্যে এমন কোন বড় কবি হয়ত পাওয়া যাবে না যার কবিতায় পাখি আসে নি। জীবনানন্দ দাসের কবিতায় নানাভাবে এসেছে পাখি, ‘পাখিদেরও আছে নাকী’ মন গ্রন্থের লেখক ইনাম আল হক জানাচ্ছেন জীবনানন্দের কাব্যে শনাক্ত করা যায় এমন চল্লিশ প্রজাতির পাখির কথা এসেছে। এছাড়া জীবনানন্দ শুক-সারি’র মত রূপকথার পাখিদেরও এনেছেন তার কাব্যে। কবিতায় এনেছেন ডোডো’র মত বিলুপ্ত পাখিকে।

রূপসী বাংলার অন্তর্গত আমার প্রিয় একটি কবিতা ‘খুঁজে তারে মরো মিছে’। এখানে অতীতের সুখস্মৃতি বা নস্টালজিয়ার ভাব বহন করে এসেছে কবির প্রিয় দাঁড়কাক।

খুজেঁ তারে মরো মিছে--পাড়াগাঁর পথে তারে পাবে নাকো আর;

রয়েছে অনেক কাক এ উঠানে-তবু সেই ক্লান্ত দাড়ঁকাক

নাই আর-অনেক বছর আগে আমে জামে হৃষ্ট এক ঝাঁক

দাঁড়কাক দেখা যেত দিন রাত-সে আমার ছেলেবেলাকার

কবেকার কথা সব;আসিবে না পৃথিবীতে সেদিন আবার;

পেঁচা এসেছে তার কবিতায়। এসেছে নানা ধরনের হাঁস। যেমন, বুনোহাঁস, বালিহাঁস, রাজহাঁস। তার প্রায় ত্রিশটি কবিতায় এসেছে হাঁসের কথা। এখানে কবি নজরুলের রোমান্টিক গানের কথা বলা যায়, যেখানে তিনি বলেছিলেন, মোরা আর জনমে হংস-মিথুন ছিলাম।

কবি আল মাহমুদ পাখিদের ভাষা শেখার আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছেন কবিতায়, বলেছেন যদি তাকে পাখিদের ভাষাটা শেখাতেন সুলেমান পয়গম্বর, তাহলে তিনি পাখিদের জিজ্ঞেস করতেন কীভাবে তারা খড় দিয়ে পাতার আড়ালে সুন্দর ঘর তৈরী করে। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় কার্ণিশে বসে থাকে কাক, সরোজিনী চুরি করে নিয়ে যায় রাজহাঁস। ব্রাত্য রাইসুর কবিতায় দোরা কাউয়া পেয়ারা গাছে বসে কা কা করতে থাকে। উৎপল কুমার বসুর কবিতায় মানুষজন পাখি দেখে মাঠের আড়ালে ওড়াউড়ি করে। শূন্য থেকে লাফ দেয়, গাছেও চড়ে, ফল-মূলে ঠোকরায়।

ইনাম আল হকের বই পাখিদেরও আছে নাকী মন

পোষা বিড়ালকে পাখির এক নাম্বার শত্রু ধরা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ইনাম আল হক তার ‘পাখিদেরও আছে নাকী মন’ বইতে জানাচ্ছেন প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে ২৪০ কোটি পাখি মারা যায় পোষা বিড়ালের আক্রমণে।

পাখি যে কী পরিমাণে কমছে তা কেউ একজন বয়স্ক লোকদের জিজ্ঞেস করলেই বুঝতে পারবেন। তারা যেরকম পাখি দেখেছেন এখানে ওখানে, আমরা তার সিকিভাগও পাচ্ছি না। ইনাম আল হক তার বইতে জানাচ্ছেন গত ত্রিশ বছরে প্রায় ত্রিশ প্রজাতির পাখি আমাদের দেশ থেকে বিলুপ্তই হয়ে গেছে। আর বিশ ত্রিশ বছরের মধ্যে যে তিনশ প্রজাতির পাখি আছে এদেশে তার মধ্যে শতাধিক প্রজাতি বিলুপ্ত হবার আশংকায় আছে।

বন্য প্রাণী প্রকৃতিতে নির্দিষ্ট একটি কাজ করে। কেউ নির্দিষ্ট পোকা খায়, কেউ ফুলের পরাগায়নে সাহায্য করে, ইত্যাদি। এদের কোন প্রজাতি বিলুপ্ত হলে প্রকৃতিতে ঐ কাজ করার কেউ থাকে না। প্রকৃতিতে এর প্রভাব পরে, এবং এভাবে একসময় প্রচুর প্রজাতি বিলুপ্ত হলে তার প্রভাব সরাসরি মানুষের উপর এসে পড়বে। জ্যারেড ডায়মন্ডের মত বড় চিন্তাশীল লোকেরা পারমানবিক যুদ্ধকে পৃথিবীর জন্য এক নাম্বার বিপদ হিসেবে রাখেন না। এক নাম্বারে রাখেন আমরা যে নিজেদের লাভ ও লোভে ও অজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে বিভিন্ন প্রজাতি বিলুপ্ত করে ফেলছি, প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট করছি, এটাকে। কারণ পারমানবিক যুদ্ধের ভয়াবহতার ব্যাপারে সবাই সচেতন। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি এর মাধ্যমে প্রভাবিত। কিন্তু পরিবেশ বিপর্যয় জনিত বিপদ নিয়ে পৃথিবীতে মতদ্বৈততা আছে। কিছু লোক মনে করেন হ্যা এটা সত্যিই বিপদজনক এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য, জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য আমাদের সচেতন হওয়ার দরকার। আর কিছু সংখ্যক লোক মনে করেন পরিবেশ বিপর্জয়, জলবায়ু পরিবর্তন এসব ভুয়া।

আমি মনে করি মানুষ হিসেবে আমাদের যে সবচাইতে ভালো গুণ বা ক্ষমতা আছে তা হলো মায়া। করুণা, দয়া ইত্যাদি আমি অপছন্দ করি, আমার মনে হয় এগুলি দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী কোন ভালো কাজ হয় না। বরং এদের মধ্যে নিজেকে বড় ও অন্যকে ছোট করে দেখার একটা বিষয় উহ্য থাকে। আমি তাই মায়া মমতায় বিশ্বাসী। কারো প্রতি যদি আপনার মায়া থাকে, তখনই কেবল আপনি তাকে সত্যিকার অর্থে গুরুত্ব দিতে থাকেন। তার দুঃখ কষ্ট অনুভব করা তখন সহজ হয়। তাকে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিতে, সেই পরিবেশ নির্মানে মমতার কারণেই একজন তৎপর হয়ে উঠবেন।

পাখিদের (এবং অন্যসব বন্য প্রাণীদের) প্রতি আমাদের মায়ার, মমতার জন্ম হোক, ও তা বাড়তে থাকুক। কিন্তু এই মমতার অর্থ এই নয় যে বন্যপ্রাণীদের নিজের আনন্দের জন্য ঘরে পোষা। ঘরে বিড়ালের মত প্রাণী পোষা জীববৈচিত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *