"মানুষের এতো নপর-চপর কিন্তু যখন ঘুমোয়, তখন যদি কেউ দাঁড়িয়ে মুখে মুতে দেয়, তো টের পায় না, মুখ ভেসে যায়। তখন অহংকার, অভিমান, দর্প কোথায় যায়?"- রামকৃষ্ণ

প্রতিযোগিতা ও সহযোগীতা বিষয়ক মানসিক নকশা

প্রতিযোগিতা ও শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি

একটু ডেস্টিনির কথা বলে শুরু করি। এক সময় আমাদের দেশে এই এমএলএম কোম্পানির হুজুগ চলছিল, এবং  তরুণেরাসহ প্রচুর মানুষ এতে বিনিয়োগ করেন। আমার দুয়েকজন বন্ধু আমাকে তাদের অফিসে নিয়ে যায় এবং বুঝায়। এমএলএম কোম্পানি নিয়ে ইন্টারনেটের বদৌলতে আমার কিছু জানাশোনা ছিল। তাই আমি ডেস্টিনিতে ইনভেস্ট করি নি। আমার যেসব বন্ধুরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিল তারা বেশ টাকা উপার্জন করছিল ডেস্টিনি থেকে, তবুও আমি তাতে যোগ দেই নি। আমার যুক্তি ছিল, এই যে চেইন চেইন সিস্টেম তাতে উপরে থাকা কিছু লোকের লাভ হবে কিন্তু বেশীরভাগ লোকেরই ক্ষতি হবে। তারা তাদের টাকা ফেরত পাবে না। ফলে এটি একটি অন্যায় ব্যবসা।

ডেস্টিনির সমালোচনা এখানে উদ্দেশ্য নয়, এমএলএম এর নিয়মই এমন। আজ এই প্রসঙ্গ এখানে উত্থাপনের কারণটা হলো একই যুক্তি আমার কাছে আবার এসেছে, এবং এখন তার লক্ষ্যবস্তু শিক্ষা ব্যবস্থা।

শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা শুরু থেকেই দেখি ক্লাসে কিছু ভালো ছাত্রছাত্রী বেশী সুবিধা পেয়ে যায়। শিক্ষা ব্যবস্থায় যে মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া হয় হয়ত এটা তাদের ভালো লাগে বা তারা তা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। অন্যরা হয়ত একই শিক্ষা অন্যভাবে দিলে গ্রহণ করতে পারত। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় তা করার উপায় নেই। ফলে একই পদ্বতিতে সবাইকে শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করা হয়, এবং এতে কিছু ছাত্রছাত্রী ভালো করে। তারা ট্যালেন্টেড হিসেবে পরিচিত হয়। ক্লাসে, শিক্ষকদের কাছ থেকে, প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এবং সমাজে তারা এর জন্য বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে।

একটা প্রতিযোগিতা বর্তমান থাকে শিক্ষা ব্যবস্থায়। এখানে আরেকজনের চাইতে বেশি মার্ক পেলেই একজন আগে যেতে পারবে। এবং এই সিস্টেমে এক নাম্বারে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভালো।

এইভাবে স্কুল অতিক্রম করার পর কলেজ। অতঃপর কলেজ অতিক্রম করার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা। এর নাম অনেক সময় ভর্তিযুদ্ধ হিসেবে বলে থাকে পত্রিকাগুলি বা কোচিং সেন্টার।

সেই যুদ্ধ করে, ঐ স্কুলের, কলেজের বাছা ট্যালেন্টেড ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা বিষয়ে ভর্তি হয়।

তারা তাদের সময় ব্যয় করে, অর্থও।

কিন্তু শেষ পর্যায়ে এখান থেকেও এগিয়ে থাকা অল্প কয়েকজন যে চাকরির/লক্ষ্যের জন্য পড়ছিল তা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

বাকীরা ঐ স্থান অর্জন করতে পারে না। বেশীরভাগেই পারে না। বেশীরভাগে ভালো করলেও পারবে না কারণ ঐ স্থানের সীমাবদ্ধতা আছে। ফলে ভালোর মধ্যেও র‍্যাংকিং করে বেটারকে নেয়া হবে।

ফলে স্কুল থেকে পুরো প্রক্রিয়াটিকে যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখতে পাবো তা ডেস্টিনির মতই এক ব্যবস্থা। যেখানে বিরাট সংখ্যক লোকেরা কাঙ্খিত জায়গায় যেতে পারে না, একই প্রোগ্রামের ভিতর দিয়ে গিয়েও।

অল্প কয়েকজন লাভবান হয় ও বাকীদের ক্ষতি হয়।

এটা কেবল বাংলাদেশেই নয়, পিটার থিয়েল তার জিরো টু ওয়ান বইয়ে উল্লেখ করেছেন আমেরিকায় প্রতি বছর দশ হাজার ল স্টুডেন্ট বের হয়, কিন্তু মাত্র কয়েক ডজন সুপ্রিম কোর্টের কেরানি হতে পারে।

পিটার থিয়েল নিজেও এর জন্য এপ্লাই করেছিলেন এবং ব্যর্থ হন। তখন তিনি হতাশ ছিলেন এজন্য।

কিন্তু পরবর্তীতে তিনি পেপাল প্রতিষ্ঠা ও বিক্রি করেন।

এটা অবশ্যই এক্সেপশনাল। সব ঝরে পড়া ও একাডেমিক শিক্ষা শুরুর কালের কাঙ্খিত জায়গায় পরবর্তীতে না যেতে পারারা যে এক্সেপশনাল অর্জন করে বসেন তা অবশ্যই নয়। তাই সারভাইভরশীপ বায়াসের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কিছু নেই।

এখানে শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে আমাদের দেখতে হবে। এটা কী লাভজনক ইনভেস্টমেন্ট? এর আউটকাম কী?

যে ধারণার উপর এই ব্যবস্থাটা দাঁড়িয়ে আছে তা হলোঃ প্রতিযোগিতা।

মানুষের লিখিত ইতিহাস, অর্থাৎ মানুষ লেখা শুরু করেছে বিভিন্ন চিহ্ন টিহ্ন দিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। এই পাঁচ হাজার বছর ধরেই মানুষের ইতিহাস বিবেচনা করে বলা হয় প্রতিযোগিতার কারণেই মানুষ টিকে আছে।

কিন্তু মানুষের ইতিহাস কি মাত্র ঐ পাঁচ হাজার বছরের নাকী?

অবশ্যই না।

নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায় এই পাঁচ হাজার বছরের অনেক আগেও মানুষ ছিল। আধুনিক মানুষের উৎপত্তি প্রায় ১০,০০০ বছর পূর্বে, আর আমাদের প্রজাতির উৎপত্তি ১০০,০০০ বছর পূর্বে। প্রায় চার বা পাঁচ মিলিয়ন বছর আগে আফ্রিকায় কোন এক প্রকারের শিম্পাঞ্জি হতে মানুষের দূর পূর্বপুরুষের উৎপত্তি, এমনই গবেষকেরা বলে থাকেন। ক্রিস হারমান একাডেমিক স্টাইলে তথ্য রেফারেন্স দিয়ে পিপলস হিস্টরী অব দ্য ওয়ার্ল্ড বইটি লিখেছেন, সেখান থেকেই এই তথ্যগুলি নিলাম।

এই যে বিরাট সময়, তখন এই মানুষেরা বা মানুষের পূর্বপুরুষেরা কি প্রতিযোগিতা করে থাকত?

নৃতাত্ত্বিকেরা যেসব প্রমাণ পেয়েছেন তাতে প্রতিযোগিতার প্রমাণ পাওয়া যায় নি। পাওয়া গেছে সহযোগীতার প্রমাণ। স্বাভাবিক বুদ্ধি নিয়ে ভাবলেও বুঝা যায়, তখনকার প্রতিকূল অবস্থায় সহযোগীতা ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল না।

প্রতিযোগিতার উদ্ভব অনেক পরে। কৃষিভিত্তিক সমাজের আবির্ভাবের পর। ফলে প্রতিযোগিতা ব্যাপারটা নতুন।

একটি ফুটবল টিমের কথা ভাবা যায়। সেখানে প্লেয়ারদের মধ্যে দুইটা জিনিস কাজ করে।

এক- ব্যক্তিগত সাফল্য আকাঙ্খা

দুই- দলীয় সাফল্য আকাঙ্খা

প্রতিটি প্লেয়ার যদি নিজ স্বার্থ দেখে এবং ব্যক্তিগত সাফল্যে মনযোগী হয় তাহলে দলগত ভাবে তারা ভালো করতে পারবে না। দলগত ভাবে ভালো করতে হলে তাদের অবশ্যই সহযোগী হতে হবে। এটাই প্রধান এবং এই সহযোগী হয়েই তারা ব্যক্তিগত সাফল্য দেখাতে পারে, সময়ে ও সুযোগে।

 

প্রতিযোগিতার দর্শন বা মনস্তত্ত্ব

 

পাঁচ হাজার বছরে মানুষের ভেতরে প্রতিযোগিতা এসেছে, সহযোগীতার সাথে। কিন্তু এর কারণ কী? ফ্রেন্স দার্শনিক, লিটারারি ক্রিটিক ও তাত্ত্বিক রেনে জিরার্দ বলেন এর কারণ হল মিমেটিক ডেজায়ার। মানুষ অনুকরণ প্রিয় প্রাণী। মানব সভ্যতা এগিয়ে গেছে মানুষের এই অনুকরণ ক্ষমতার গুণে বহুলাংশে। নিউরোসাইন্সের গবেষনাও জানাচ্ছে আমাদের মস্তিষ্ক যে অনুকরণ করতে পারে এর মাধ্যমেই আমরা শিখতে পারি।

রেনে জিরার্দ

ছবিঃ দার্শনিক রেনে জিরার্দ

তো সবকিছু অনুকরণ করার সাথে সাথে মানুষ অন্যদের ডেজায়ার বা আকাঙ্খাও অনুকরণ করে। জিরার্দ এই ডেজায়ার অনুকরণের নাম দিয়েছেন মিমেটিক ডেজায়ার।

অনুকরণকে তিনি দুইভাগে ভাগ করেছেন, এক হচ্ছে ইমিটেশন। যা ভালো অনুকরণ।

এবং দুই মিমেসিস। এই ধরনের অনুকরণ যার আচরণ বা কাজ অনুকরণ করা হচ্ছে তার সাথে শত্রুতা বা প্রতিযোগিতার তৈরী করে।

মানুষের ডেজায়ার বা আকাঙ্খা যে অন্যের আকাঙ্খা অনুকরণের মাধ্যমে তৈরী হয় তা আমরা বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখতে পারি। ছোট বাচ্চা অন্য বাচ্চার হাতে নতুন খেলনা দেখে ঐ খেলনার জন্য কাঁদে, ওটা তার চাই। বাজারে নতুন ফ্যাশনের কাপড় এলে, অন্যেরা তা পরলে বাকীরাও তার পরার তাড়ণা বোধ করে।

বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়, কোন সেলিব্রেটি একটি প্রোডাক্ট ব্যবহার করছেন। এখানে সেলিব্রেটির ব্যবহার করাটা দেখানো হয় যাতে অন্যেরা তাকে অনুকরণ করে ঐ বস্তুটি ব্যবহার করে। প্রোডাক্ট কী কোয়ালিটির, তাতে কী বস্তু আছে তার বিত্তান্ত প্রোডাক্টের গায়ে ছোট ছোট করে লেখা থাকে। ওগুলো নিয়ে বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের বিশেষ মাথাব্যথা থাকে না। আর কয়জন ভোক্তা এগুলো পড়ে দেখেন?

জিরার্দ অনুকরন করা ডেজায়ারকে আবার দু’ভাগে ভাগ করে দেখেছেন।

এক হলো, যখন যার অনুকরণ করা হচ্ছে তার সাথে প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা থাকে না। দুইজন দুই সমতলে অবস্থান করছেন। ধরা যাক, সাকিব আল হাসান নুডলস বা হরলিক্সের বিজ্ঞাপন করছেন। বিজ্ঞাপনে তিনি নুডলস বা হরলিক্স খাচ্ছেন। এটা দেখে প্রচুর লোক তাকে অনুকরণ করে ঐ পন্য ব্যবহার করবেন। কিন্তু তাতে সাকিবের সাথে ব্যবহারকারীর সংঘাতের কোন সম্ভাবনা নেই।

আবার এক ছোট বাচ্চা, তার বাবা সিভিল এঞ্জিনিয়ার। সে বড় হয়ে সিভিল এঞ্জিনিয়ার হতে চায়। এই অনুকরণ ভিত্তিক ডেজায়ারে বাবার সাথে তার সংঘাতের কোন সম্ভাবনা নেই। জিরার্দ এ ধরনের ডেজায়ারকে বলেছেন একস্টার্নাল মেডিয়েশন। অর্থাৎ, যাকে অনুকরণ করা হচ্ছে সে বাইরে বা ভিন্ন সমতলে।

কিন্তু যাকে অনুকরণ করা হচ্ছে সেই ব্যক্তি বাইরে না হয়ে একই সমতলে হলে, অনুকরিত ব্যক্তি ও অনুকরণকারী একই জিনিস আকাঙ্খা করে, আর তখন তাদের মধ্যে সংঘাত অপরিহার্য। এখানেই আসে প্রতিযোগিতা। জিরার্দ এর নাম দিয়েছেন ইন্টার্নাল মেডিয়েশন, এবং এটা ভয়ংকর অবস্থার দিকে নিয়ে যায়। এ ধরনের ডেজায়ারের উদাহরণ হিসেবে ভাবুন এক বাচ্চা অন্য বাচ্চার হাতে খেলনা দেখে তা পেতে চাইছে। তখন সে ওটা ছিনিয়ে নিতে চাইবে। ফলশ্রুতিতে সংঘাত আবশ্যক।

প্রথমে বাচ্চাটি দ্বিতীয় বাচ্চাটির হাতে খেলনাটি দেখে, তার অনুকরণভিত্তিক ডেজায়ার তৈরী হয় এবং পরবর্তীতে সে যাকে অনুকরণ করছে তার বিরুদ্ধেই যুদ্ধে নামতে বাধ্য হয়, কারণ তার আকাঙ্খার তৃপ্তির জন্য যে বস্তুটি দরকার তা পেতে হলে এটাই তাকে করতে হবে।

 

দুই ম্যাজিশিয়ানে এক্সটার্নাল মেডিয়েশন ও ইনটার্নাল মেডিয়েশন

 

দুই ম্যাজিশিয়ান সত্যজিৎ রায়ের একটি গল্প। গল্পটিতে একজন উচ্চাকাঙ্খী ম্যাজিশিয়ান সুরপতি ট্রেইনে করে যাচ্ছে লখনৌ যাদু দেখাতে। এই প্রথম তার বাংলার বাইরে যাদু দেখাতে যাওয়া এবং কিছুদিন আগেই সে কলকাতায় দারুণ শো করেছে।

ট্রেইনে বসে সুরপতি ভাবছিল তার যাদু শেখায় আসার কথা। তখন দেখা যায় গ্রামে একজন বুড়ির যাদু “ভানুমতির খেল” দেখেই যাদু শেখার প্রতি আকৃষ্ট হয় সুরপতি। এখানে সুরপতি মিমেটিক ডেজায়ার তৈরী হয়েছে বুড়ির যাদু দেখে।

এরপর এক বিয়েতে সুরপতি দেখে খাটি যাদুকর ত্রিপুরা চরণ মল্লিকের যাদু। ত্রিপুরা চরণ হাত সাফাই নয়, আদি ও অকৃত্রিম যাদুই দেখাতেন। তার যাদুর ডাকে আংটি পড়ে থাকা আধুলি মাথায় নিয়ে হেঁটে চলে আসত।

সত্যজিৎ রায়

ছবিঃ সত্যজিৎ রায়

এটা দেখে সুরপতির মাথা ঘুরে যায়। সে ত্রিপুরা বাবুর শিষ্য হয়ে যাদু শিখতে থাকে। এখানে সুরপতি ত্রিপুরা বাবুর যাদু দেখে পুনরায় তার মিমেটিক ডেজায়ারের বশবর্তী হয়েছে।

ত্রিপুরা বাবু গরীব ছিলেন। টাকা করার যাদুটা তিনি জানতেন না। তার যাদুতে হাত সাফাই ও তথাকথিত গ্ল্যামার ছিল না। একদিন সুরপতি কলকাতায় আসা ইতালিয়ান যাদুশিল্পী শেফাল্লোর যাদু দেখে। সাথে মাদাম পেলার্মোর যাদু। এই যাদু ও চাকচিক্য দেখে সুরপতির মন মজে যায়।

তখন সে ত্রিপুরা বাবুর পথ ছেড়ে এদের মতই হতে চায়। অর্থাৎ, এখানে আবার তার মিমেটিক ডেজায়ার কাজ করেছে।

কিন্তু তিন ক্ষেত্রেই যাদের সে অনুকরণ করছে তারা ছিলেন ভিন্ন সমতলে। ফলে সংঘাত বা প্রতিযোগিতার কিছু ছিল না।

গল্পে এর পরে একটি ঘটনা দেখা যায়, যা আমাদের সংঘাতমূলক অনুকরণের চরিত্রটাও দেখিয়ে দিতে সক্ষম হয়। যেমন, হঠাৎ সুরপতি দেখে একজন লোক তার কামরায় দ্রুত এসে বসলেন। রিজার্ভ কামরা, বাঁধা দিতে গিয়েও সুরপতি থেমে যায়। কারণ বৃদ্ধ লোকটি আর কেউ নন। স্বয়ং ত্রিপুরা চরণ মল্লিক। সুরপতি অবাক হয় কারণ সে জানত তিনি গাড়ি চাপা পড়ে কবেই মারা গেছেন।

ত্রিপুরা বাবুর সাথে সুরপতির কথোপকথন হয়। ত্রিপুরা বাবু কথাবার্তায় জানিয়ে দেন আসল যাদু ছেড়ে চাকচিক্যের লোক ভুলানো যাদুতে সুরপতি চলে যাওয়ায় তিনি মনক্ষুন্ন হয়েছেন।

এরপর ত্রিপুরা বাবু এক দাবী করে বসেন বা অদ্ভুত এক জিনিস চেয়ে বসেন। তিনি সুরপতিকে বলেন, সুরপতির পরিবর্তে লখনৌতে যাদু দেখাতে তিনি নিজে যেতে চান। সুরপতি রাজী হয় না, প্রথমে প্রত্যাখান করে। ত্রিপুরা বাবু তখন সম্মোহনী যাদু শক্তির সাহায্যে সুরপতির হাত অবশ করে দিয়ে দেখিয়ে দেন তিনি চাইলে সে যাদুই দেখাতে পারবে না, মঞ্চে অপদস্ত হবে। ভয়ে সুরপতি রাজী হয়।

সুরপতির সাথে ত্রিপুরা বাবুর এই সংঘাত দেখিয়ে দেয়, যখন আকাঙ্খা একই তলে থাকে তখন অনুকরনকারী ও যাকে অনুকরণ করা হচ্ছে তাদের মধ্যে সংঘাত হতে পারে।

একই জিনিস হতে পারে কোন পিএইচডি সুপারভাইজর এবং ক্যান্ডিডেট এর মধ্যে। ক্যান্ডিডেট ছাত্রটি সুপারভাইজরকে অনুকরণ করতে থাকল ধরা যাক, তার কাজ ইত্যাদি। পরবর্তীতে তারা যদি উভয়ই একই বিষয়ে একাডেমিক স্বীকৃতির প্রত্যাশা করেন, তখন তাদের মধ্যে শত্রুতা সংঘাত দেখা যেতে পারে।

 

মেটাফিজিক্যাল ডেজায়ার ও প্রেস্টিজ

 

এই ডেজায়ার আরো তীব্র হতে পারে। তখন অনুকরণকারী যাকে অনুকরণ করছে সে হতে চায়, এবং এর জন্য নিজেকেই বিনাশ করতে চায়।

ক্রিস্টোফার নোলানের প্রেস্টিজ ফিল্মটি যারা দেখেছেন, তারা এই মেটাফিজিক্যাল ডেজায়ার দেখতে পাবেন ম্যাজিশিয়ান রবার্ট এঞ্জিয়ারের মধ্যে। সে আরেক ম্যাজিশিয়ান আলফ্রেড বরডেন এর যাদু 'ট্রান্সপোর্টেড ম্যান' দেখে, এবং এতে তার মিমেটিক ডেজায়ার এত তীব্র হয়ে ওঠে যে সে একই যাদু দেখাতে চায়।

বরডেন যে যাদুটি দেখাচ্ছিল তা সিম্পল ট্রিক। একইরকম দুইজন মানুষ দুইদিকে। একজন বল ছুড়ে দরজার আড়ালে লুকায়। অন্যজন অন্য দরজা দিয়ে বের হয়ে বল ধরে। দুইজন লোকই একইরকম দেখতে। তাই লোকে ভাবে একই লোক শুন্যের মধ্য দিয়ে গিয়ে বলটি ধরেছে।

প্রেস্টিজ

ছবিঃ পোস্টারে বামে হিউজ জ্যাকম্যান অর্থাৎ এঞ্জিয়ার। মাঝখানে নায়িকার ছবি দ্বারা বুঝানো হয়েছে ডেজায়ার। আর ডানে ক্রিস্টিয়ান বেল বা বরডেন। তাদের শত্রুতার মূলে যে এঞ্জিনিয়ারের মেটাফিজিক্যাল ডেজায়ার, তার এক উপস্থাপন পোস্টারটি।

এঞ্জিয়ার এই ম্যাজিকটির ট্রিক জানতে চায়, তখন এঞ্জিনিয়ারের যাদু প্রকৌশলী জেমস কাটার জানায় এটা সিম্পল ট্রিক। দুই দিকে একইরকম দুজন লোক। কিন্তু এঞ্জিনিয়ার তা বিশ্বাস করতে চায় না।

এই বিশ্বাস করতে না চাওয়ার কারণ তার মিমেটিক ডেজায়ারের তীব্রতা, ডেজায়ার তখন মেটাফিজিক্যাল স্তরে পৌছে গেছে। এর কারণেই সে মনে করতে থাকে হয়ত বরডেন এমন কোন যাদুকরী ট্রিক আবিষ্কার করেছে যাতে সত্যিই অদৃশ্য হয়ে অন্য দরজা দিয়ে বের হওয়া সম্ভব।

এই ম্যাজিক ট্রিক জানার জন্যই এঞ্জিয়ার মরিয়া হয়ে উঠে। এই যে অবসেশন তার তৈরী হয়, মেটাফিজিক্যাল ডেজায়ার স্টেইজে এসে এমন অবসেশন তৈরী হয় অনুকরণকারীর। সে বাস্তবতার বাইরে চলে যায় তার ডেজায়ারের তাড়নায়। ফিল্মে দেখা যায় এঞ্জিয়ার টেসলার কাছে যায়। ট্রান্সপোর্টেড ম্যান যাদু দেখানোর জন্য যন্ত্র তৈরী করে। তার গার্লফ্রেন্ড হারায়, এবং এক ভয়ানক, মর্মান্তিক বাস্তবতায় পতিত হয়।

প্রেস্টিজ ফিল্মটি মিমেটিক ডেজায়ার, এবং এ জনিত সংঘাত, প্রতিযোগিতা ও শত্রুতার ফল কতো মারাত্মক হতে পারে তার এক দারুণ চিত্রায়ন।

 

প্রতিযোগিতার যুদ্ধটা কেমন?

পিটার থিয়েল তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন কার্ল মার্ক্স মনে করতেন মানুষ যুদ্ধ করে ভিন্নতার জন্য। প্রলেতারিয়েত শ্রেণী বুর্জোয়াজি শ্রেণীর চাইতে ভিন্ন, তাদের চিন্তা ভিন্ন, আদর্শ ভিন্ন। এই ভিন্নতাই তাদের যুদ্ধের মূলে, ভিন্নতা যত বেশী যুদ্ধ তত তীব্র।

কিন্তু শেক্সপিয়র রোমিও এন্ড জুলিয়েটে দেখিয়েছেন মানুষ যুদ্ধ করে কারণ তারা একইরকম। রোমিও এন্ড জুলিয়েট শুরুই হয় মন্টেগু এবং ক্যাপুলেট পরিবারের একইরকমতার কথা বলে। তাও তারা যুদ্ধ করে, এবং সংঘাতের এক পর্যায়ে ভুলে যায় কেন যুদ্ধ করছিল।

রোমিও এন্ড জুলিয়েট

থিয়েল বলেন বাস্তব ব্যবসার পৃথিবীতে শেক্সপিয়রের মডেলই কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে মাইক্রোসফট এবং গুগলের সংঘাতের কথা ধরা যায়। তারা একইরকম দুই পরিবার। তাদের সংঘাতের কোন বিষয়ই ছিল না। একজন বানিয়েছে অপারেটিং সিস্টেম আরেকজন লিখেছে সার্চ ইঞ্জিন, এখানে সংঘাতের কী? কিন্তু সংঘাত হয়েছে। তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় নেমেছে, একে অন্যকে নিয়ে অবসেসড হয়েছে। ফলে এসেছে উইন্ডজ এর বিপরীতে ক্রোম ওএস, গুগল সার্চ এর বিপরীতে বিং, এক্সপ্লোরারের বিপরীতে ক্রোম, অফিসের বিপরীতে ডক্স, সারফেইস এর বিপরীতে নেক্সাস।

এই যুদ্ধে লাভ কারো হয় নি। মন্টেগু ও ক্যাপুলেট পরিবার সংঘাতে তাদের সন্তান হারিয়েছিল। গুগল এবং মাইক্রোসফট পরিবার হারায় আধিপত্য। মাঝ খান দিয়ে এপল আসে এবং ২০১৩ সালে এপলের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন দাঁড়ায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার, আর গুগল এবং মাইক্রোসফট মিলে ৪৬৭ বিলিয়ন ডলার। যদিও মাত্র তিন বছর আগে গুগল এবং মাইক্রোসফট দুই কোম্পানিই ভিন্নভাবে একাই এপলের চাইতে দামী ছিল।

 

সহযোগীতা

 

প্রতিযোগিতা একটি বিধ্বংসী শক্তি। যদিও তা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়, এবং প্রায় সর্বক্ষেত্রেই প্রচার করা হয়। এটি একটি আইডোলজি বা মতাদর্শ। আইডোলজি হচ্ছে মানুষের চোখের কালো চশমার মত, যা বাস্তবতা দেখতে তাকে বাঁধা দেয়। প্রতিযোগিতার মতাদর্শ আমাদের সমাজে এতই প্রকট যে, তা এর লাভ ক্ষতি আমাদের দেখতে দেয় না। একধরনের মেটাফিজিক্যাল স্তরে নিয়ে যায়, যেখানে অন্ধভাবে আমরা তাকে অনুকরণ করতে থাকি।

প্রতিযোগিতার বিপরীতে আছে সহযোগীতা। এই প্রতিযোগিতার মতাদর্শিক সমাজে সহযোগীতার মনোভাব নিয়ে চলা সহজ কথা নয়। তাই সব সময় সহযোগী হলে আপনার যে লাভ হবে তা বলা যায় না। কখন সহযোগীতা, এবং কখন নয় তা বুঝাটা তাই দরকারী।

 

সহযোগীতা অথবা অসহযোগীতা

ধরা যাক, সৌদি আরব এবং ইরান দুই দেশই ক্রুড ওয়েল বিক্রি করে, এবং তারা চুক্তিতে সম্মত হলো বাজারে দাম ঠিক রাখার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল তারা উৎপন্ন করবে। যাতে দাম ঠিক থাকে ও লাভ সমান থাকে।

সৌদি এবং ইরান লো প্রোডাকশন করলে উভয়েরই লাভ হয় ৫০ বিলিয়ন ডলার।

কিন্তু সৌদির নেতা ভাবল, আমরা যদি বেশী তেল উৎপন্ন করি, আর চুক্তিতে থেকে ইরান কম তেল উৎপন্ন করে তাহলে আমাদের লাভ বেশী হবে। আমি তখন পাবো ৬০ বিলিয়ন। সুতরাং বেশী উৎপন্ন করাই লাভ। আবার ইরানকে তো বিশ্বাস নেই। তারা যদি চুক্তি ভঙ্গ করে হাই প্রোডাকশন করে তখন আমি লো প্রডাকশন করলে আমি পাবো ৩০ বিলিয়ন ডলার। আবার ইরান যদি হাই প্রোডাকশন করে, আর আমিও হাই প্রোডাকশন করি, দুজনেই চুক্তি ভঙ্গ, তাহলে আমি পাবো ৪০ বিলিয়ন ডলার। তাই আমার জন্য হাই প্রোডাকশনে যাওয়াই বেটার।

একই ভাবে ভাববে ইরান। ফলে উভয়েই চুক্তি ভঙ্গ করে হাই প্রোডাকশন করল। উভয়ের লাভ হলো ৪০ বিলিয়ন। যেখানে তারা যদি নিজেদের বিশ্বাস করতে পারত ও চুক্তি মেনে লো প্রোডাকশন করত তাহলে উভয়েরই ৫০ বিলিয়ন করে লাভ হতো।

এই ২০ বিলিয়ন দুই দেশেরই লস হলো।

অলিগোপলিতে (যেখানে একাধিক প্লেয়ার) একসাথে মিলে বসে দাম ঠিক করে মনোপলির মত ব্যবসা করা সম্ভব, কিন্তু তাতে সমস্যাটা হলো যেহেতু লাভ আছে তাই কোন সদস্য চালাকি করে চুক্তি ভাঙতে পারে। এটাই মূলত হয়ে থাকে।

বিখ্যাত কয়েদি বিভ্রাট এই কথাই বলে। দুজন লোক এক অপরাধের জন্য সন্দেহভাজন হিসেবে ধৃত হয়েছে। তাদের অপরাধ প্রমাণের উপায় নেই যদিও পুলিশের ধারনা তারা দুজন মিলে খুন করেছে একটা। প্রমাণ ছাড়া মাত্র দুই বছরের জেল হবে অবৈধ অস্ত্র রাখার জন্য।

তখন চতুর তদন্তকারী দুজনকে আলাদা নিলেন। বললেন, “আপনি যদি স্বীকার করে নেন ঐ খুনটা করার কথা, এবং এর জন্য আপনার বন্ধুরে দায়ী করেন, তাহলে আপনার বন্ধুর হবে বিশ বছরের জেল আর আপনাকে আমরা ছেড়ে দিব। আপনারা দুইজনই যদি স্বীকার করে নেন অপরাধের কথা, তাহলে দুজনেরই সোজা ১৪ বছরের জেল হবে।”

এখন দুই অপরাধী করবে কী? তারা যদি স্বীকার না করে তাহলে অপরাধ প্রমানের উপায় নাই। কিন্তু তারা জানে না অন্যজন কী সিদ্ধান্ত নিবে। তাই দুজনই স্বীকার করে নেবে, মুক্ত হয়ে চলে যাবার জন্য এবং উভয়ই ১৪ বছরের জন্য জেলে যাবে সোজা।

 

ওপেক এবং ক্রুড ওয়েলের মূল্যহ্রাস

 

ওপেক বা অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় একসাথে মিলে তেলের দাম ও সাপ্লাই ঠিক রেখে ব্যবসার নিমিত্তে। তেলের দাম কোন কারণে পড়ে গেলে ওপেকের সদস্যরা একমত হয়ে তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে দাম আবার আগের জায়গায় আনতে পারে। এটা ওপেকের অন্যতম একটি মূল কাজ।

কিন্তু ওপেকের সদস্যদের মধ্যে বিশ্বাসহীনতা ও শত্রুতা (সৌদি এবং ইরান বিশেষত) থাকার জন্য তারা একমত হয়ে উৎপাদন কমাতে পারছে না।

নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে তেল উৎপাদনের কারণে তেলের দাম কমছে। প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার থেকে ৩৫ ডলার পর্যন্ত নেমেছিল।

সৌদি বা ইরান এ অবস্থা নিরসনে ওপেকের মাধ্যমে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসছে না, এর কারণ তাদের শত্রুতা। নিজের ক্ষতি করে হলেও অন্যের ক্ষতি করার পথই তারা বেছে নিয়েছে।

এই ধরনের পরিস্থিতি বুঝার জন্য প্রথমে কয়েদি বিভ্রাট দিয়ে বুঝার চেষ্টা করা যায়। যেহেতু সৌদি মনে করছে ইরান বা ওপেকের অন্য দেশগুলো চুক্তি মানবে না, তাই তারা নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে উৎপাদন করছে। অন্যরাও একই কাজ করে যাচ্ছে। ফলে সবারই লস হচ্ছে।

আবার সৌদি এবং ইরান এই দুই প্লেয়ারকে গেইম থিওরীতে রেখে চিকেন গেইম দিয়েও তা বুঝার চেষ্টা করা যায়। চিকেন গেইমে কল্পনা করা হয় দুইজন গাড়ি চালক উদভ্রান্ত বেগে পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের যদি সংঘর্ষ হয় তাহলে দুজনই মারা যাবে। আবার কেউ একজন যদি পাশে সরে যায় তাহলে সে ভীরু বা চিকেন বলে অভিহিত হবে। এই অবস্থায় চালকদ্বয় কী করবে?

তারা একই স্পিডে সামনে এগুতে পারে ও তথাকথিত বীরত্বের সাথে মারা যেতে পারে।

অথবা অন্যজনের সিদ্ধান্ত কী হয় তা দেখে সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অন্যজন সরলে সে সরবে না। তখন তার লাভ বেশী। সে তথাকথিত বীর হলো মানে জিতল, আর অন্যজন চিকেন হলো। আবার অন্যজন না সরলে তাকে অবশ্যই অবশ্যই সরতে হবে। কারণ তা না হলে অন্যজনের সাথে তার ধ্বংসও নিশ্চিত হবে।

অথবা আরো একটি অপশন থাকে,  দুইজন দু’দিকে সরে যেতে পারে। তাতে একজনের আর চিকেন বা কাপুরুষ হতে হবে না।

বিরাজমান তেলের মূল্যহ্রাসের চিত্রটি সৌদি ও ইরানকে নিজেদের দিকে দ্রুতবেগে এগিয়ে আসতে থাকা চালকের আসনে রেখে দেখা যায়।

 

  উপসংহার

এই লেখায় প্রথমত প্রতিযোগিতাকে দেখা হয়েছে, দেখা হয়েছে মানুষ কেন প্রতিযোগিতায় আকৃষ্ট হয়, এবং এর ফলে তার কী মারাত্মক ফল হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাস্তব দুনিয়ায় সহযোগীতার কিছু সমস্যা বা জটিলতার দিকে আলোকপাত করা হয়েছে। রিসোর্স পেইজে একটি গেইম এর লিংক আছে স্ট্র্যাটেজি হেডিং এর নিচে। সহযোগীতা, এবং গেইম থিওরীতে কারো আগ্রহ থাকলে এই গেইম খেলতে পারেন। মানসিক নকশা পেইজটাও দেখতে পারেন অন্য সব নকশাগুলির জন্য।

Share
মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করে একে আগ্রহী পাঠকের সামনে যেতে সাহায্য করুন।

Related Posts

Leave A Comment