"মানুষের এতো নপর-চপর কিন্তু যখন ঘুমোয়, তখন যদি কেউ দাঁড়িয়ে মুখে মুতে দেয়, তো টের পায় না, মুখ ভেসে যায়। তখন অহংকার, অভিমান, দর্প কোথায় যায়?"- রামকৃষ্ণ

দার্শনিক ডেবিড বেনাটারের সাক্ষাৎকারঃ “জীবন খারাপ, এবং মৃত্যুও খারাপ”

ডেভিড বেনাটার একজন সাউথ আফ্রিকান দার্শনিক, ইউনিভার্সিটি অব কেপটাউনের অধ্যাপক এবং দর্শন বিভাগের প্রধান। তাকে অন্যতম একজন বিতর্কিত দার্শনিক হিসেবে ধরা হয়, এবং তার মত ফিলোসফির “বিপদজন আইডিয়া” এর মধ্যে পড়ে। এন্টি নাটালিজম মানে সন্তান জন্ম না দেয়া পন্থী মত। বেনাটার তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ট্রাডিশনাল এন্টি-নাটালিস্টেরা শিশুদের অপছন্দ করেন বা নিজেদের জীবন উপভোগের জন্য সন্তান জন্ম দানের বিরুদ্ধে। কিন্তু তিনি এই কারণকে নৈতিক ভাবে যুক্তিযুক্ত মনে করেন না। এমনকী যারা মনে করেন এই পৃথিবী বর্তমানে নানা অব্যবস্থায় ভর্তি তাই সন্তান জন্ম দেয়ার দরকার নেই, তিনি তাদের সাথেও দ্বিমত করেন। কারণ তাদের কথা মতে পৃথিবীতে সু-ব্যবস্থা থাকলে সন্তান জন্ম দেয়া যাবে।

চিত্রশিল্প

ছবিঃ দ্য ভয়েইজ অফ লাইফ- থমাস কোল,১৮৪২

 

বেনাটারের কথা হচ্ছে, মানব জীবন পাওয়াটাই মানুষের সবচেয়ে বড় দূর্ভাগ্য। এই দূর্ভাগ্যজনক বাস্তবতায় আরেকজন মানুষকে আনার নৈতিক অধিকার কোন মানুষের নেই। পৃথিবীতে যার জীবন সবচেয়ে সুখী, তাকেও নানাভাবে ভুগতে হয় যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। বেনাটার তাই বেবি-মেকিং বা নতুন মানব তৈরীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। মানুষ সন্তান জন্ম দেয় নিজের উপকার বা আনন্দের জন্য। সন্তানের বা নতুন ঐ মানুষটির ভালোর জন্য নয়। আমরা যখন আমাদের জীবন এবং এই দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতায় বসে ভাবি, তখন যে মানুষ এখনো অস্তিত্বশীল নয় তাকে এই দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতায় নিয়ে আসাটা অনৈতিক।

ডেবিড বেনাটারের নতুন বই দ্য হিউম্যান প্রেডিকামেন্ট। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস ইউএসএর সম্পাদক পিটার অলিন এই বই নিয়ে তার সাথে কথা বলেছেন। ওইউপি ব্লগে তা প্রকাশিত হয়েছে ইংরাজিতে, এবং সেখান থেকেই বাংলায় অনুবাদ করে এখানে দেয়া হলো।

বেনাটারের দার্শনিক অবস্থান পেসিমিস্ট দার্শনিকদের সাথে। বর্তমানে আমাদের যে যুগ, সেখানে সব জায়গায় অপটিমিজম বা আশাবাদ শেখানো হয়। কিন্তু এই আশাবাদ বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তৈরী করে দুঃখ ও দুর্দশার তীব্রতা। রোমানিয়ান হতাশাবাদী দার্শনিক এমিল চিওরান বলেছিলেন যে হতাশাবাদী কখনো আত্মহত্যা করে না। কারণ জীবন থেকে কিছু পাওয়ার বড় কোন আশাই তার ছিল না।  আত্মহত্যা করে আশাবাদীরা। যারা অনেক কিছু চেয়েছিল, পায় নি, আশাভঙ্গের দুঃখে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

পিটার অলিনঃ আপনার নতুন বইয়ের নাম দ্য হিউম্যান প্রেডিকামেন্ট। এই প্রেডিকামেন্ট বা দূর্ভাগ্যজনক অপ্রিতকর অবস্থাকে আপনি কীভাবে বর্ননা করবেন সংক্ষেপে?

ডেভিড বেনাটারঃ জীবন কঠিন। আমাদের স্ট্রাগল করতে হয় অপ্রিতকর অবস্থাকে দূরে সরিয়ে রাখতে এবং প্রায়ই এই স্ট্রাগল হয় ব্যর্থ স্ট্রাগল। জীবনের যদি কোন অর্থ থাকত তাহলে হয়ত বুঝা সহজ হত। কিন্তু যদিও আমরা কিছু অর্থ তৈরী করতে পারি, শেষতক জীবনের আলটিমেট কোন অর্থ নেই। মৃত্যু আমাদের এই ভোগান্তির অবসান ঘটাতে পারে কিন্তু অর্থহীনতার যে সমস্যা তার সমাধান দিতে পারে না। এবং মৃত্যু যেহেতু বিনাশপ্রাপ্ত হওয়া, তাই এটা আমাদের দূর্ভাগ্যেরই অংশ (অবশ্য সব কিছু হিসাবে নিলে জন্মের চাইতে কম খারাপ)। অন্যভাবে বলতে গেলে, আমাদের জীবনের দূর্ভাগ্যজনক অবস্থাটা হলো জীবন খারাপ, এবং মৃত্যুও খারাপ।

পিটারঃ আপনি কীভাবে এই বিষয়ে আগ্রহী হলেন, এবং আপনার আগের বই বেটার নেভার টু হ্যাভ বিন এর সাথে কীভাবে এটি সম্পর্কযুক্ত?

ডেবিড বেনাটারঃ আমাদের এই দূর্ভাগ্যজনক অপ্রিতকর অবস্থা বুঝতে এর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতে হয়। নিজেদের দুর্দশা-ভোগান্তি এবং এসবের অর্থহীনতা, আর যে গ্রটেস্ক শেষাবস্থা তা কৌতুহল উদ্দীপক হয়ে উঠেই, অন্তত আমার কাছে। একবার এই দূর্ভাগ্যজনক অবস্থায় চলে আসলে তা থেকে পালানোর উপায় নেই, কিন্তু যদি প্রথমেই বাস্তবতায় না আসা যেত তাহলে এই দূর্ভাগ্যজনক অবস্থা থেকে বাঁচা সম্ভব হতো। অবশ্যই, আমরা যারা এখানে আছি, আমাদের জন্য অনেক দেরী হয়ে গেছে, কারণ আমরা এসে গেছি। কিন্তু নতুন মানুষ তৈরী না করে, একইরকম ভাবে এই দুর্ভাগ্যজনক অপ্রিতকর অবস্থায় তাদের পড়তে আমরা না দিতে পারি। অর্থাৎ আগেরটা না হলে পরের দূরাবস্থা হবে না। এইজন্য, জন্ম না নেয়াই ভালো ছিল।

পিটারঃ যেভাবে অস্তিত্ববাদী এবং কিছু অ-পশ্চিমা সংস্কৃতিতে “জীবনের অর্থ” বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু এনালিটিক ফিলোসফিতে তা একরকম এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে প্রধানত। মানব জীবনের এই “বড় প্রশ্ন” সম্পর্কে এনালিটিক দর্শন কী যোগ করতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

ডেবিড বেনাটারঃ এটা জানা আসলে শক্ত ব্যাপার কেন এনালিটিক ফিলোসফাররা এড়িয়ে গেলেন, কিন্তু এক কারণ হতে পারে এনালিটিক ফিলোসফারেরা জীবনের অর্থ কী প্রশ্নটাকেই বিভ্রান্ত (কনফিউজড) মনে করেন। এই কারণেই এনালিটিক ফিলোসফারেরা এই বিষয়ে যা লিখেছেন সেগুলো হলো, প্রশ্নটা আসলে কী বুঝায় তা স্পষ্ট করা। অবশ্যই কিছু এনালিটিক ফিলোসফার আরো গভীরে গিয়েছেন।

এই “বড় প্রশ্নে” এনালিটিক পদ্বতি যা দেয় তা হলো, স্পষ্টতার আকাঙ্খা, এবং যুক্তির জন্য শক্তি। কিন্তু এখানে একটি বিপদের আশংকা আছে, যখন সরলীকরণ করে দেখা হয় তখন এই পদ্বতি চিত্তাকর্ষক সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে বিরক্তিকর ভাবে। আমি সতর্কভাবে যুক্তি দিয়ে এবং আকর্ষক লেখার পদ্বতির মাধ্যমে এই চোরাবালি অতিক্রম করার চেষ্টা করেছি।

পিটারঃ আপনি মানব জীবনের অর্থ থাকতে পারে এর বিরোধীতা করেন, কিন্তু অনেকে অর্থ কিংবা তৃপ্তি পেতে পারে ধর্ম, পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা কেরিয়ার ইত্যাদিতে। মানুষ এই যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তৃপ্তি পেতে পারে, এটা কি আপনার জীবনের অর্থ বিষয়ক চিন্তায় প্রভাব ফেলে?

ডেবিড বেনাটারঃ আসলে আমি মনে করি না যে জীবনে কোন ধরনের অর্থ একেবারেই থাকতে পারে না। আমাদের জীবনের অর্থ হতে পারে অন্যের সাথে আচরনের প্রেক্ষিতে, কম্যুনিটির সাথে, এবং বিরল ক্ষেত্রে পুরো মানবজাতির ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি “পৃথীবিজ” (টেরেস্টিয়াল) একটি অর্থ আছে। আমি যা অস্বীকার করি তা হলো কোন আলটিমেট অর্থ নেই। যাকে বলতে পারেন কসমিক অর্থ।

এমন কোন বৃহৎ কর্মের জন্য আমরা নই। তাই মানুষ যখন জীবনের কাজে অর্থ খুজে পায় তা আমার মতের বিরুদ্ধে যায় না বরং আমার মতকেই সমর্থন করে। পৃথিবীজ বা টেরেস্টিয়াল অর্থ খুজে পাওয়া জীবনকে অপেক্ষাকৃত কম খারাপ করে তোলে। তার মানে এই নয় মানুষ যেসব জিনিস অর্থপূর্ন মনে করে তার সব কিছুর আসলেই অর্থ আছে।  উদাহরণস্বরূপ, কেউ কোন দেবতাকে পুজা দেয়ায় অর্থ খুজে পেতে পারে, কিন্তু দেবতা নিজেই যেহেতু নেই, তাই আর পুজার আসলে কোন অর্থ থাকে না।

পিটারঃ আত্মহত্যা নিয়ে আপনার মত কী, এবং তা কীভাবে সমাজ যেভাবে দেখে বিষয়টাকে অনৈতিক হিসেবে, তার চাইতে ভিন্ন?

ডেবিড বেনাটারঃ আত্মহত্যা আমার কাছে, যে দূর্ভাগ্যজনক অপ্রিতকর অবস্থায় আমরা আছি তার কিছু বিষয়ের এক যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া, যদিও অন্য অনেক বিষয়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তা অযৌক্তিক। মৃত্যু কোন সমাধান নয় কারণ মৃত্যু জীবনের কোন কসমিক অর্থ দিতে পারে না, বরং এটি অন্য যেসব অর্থ জীবন অর্জন করতে পারে(সবসময় নয়) তাও ধ্বংস করে দেয়। তাই জীবনের অর্থহীনতা সমস্যার সমাধান আত্মহত্যা নয়। অন্যদিকে, আত্মহত্যা ভোগান্তির অবসান করতে পারে। যখন জীবন কারো জন্য খুবই দুর্দশাগ্রস্থ কঠিন হয়ে যায় যে সে সব আগ্রহ হারায়, তখন তার কাছে আর কোন অপেক্ষাকৃত ভালো বিবেচনা থাকে না। আমি আত্মহত্যাকে অনৈতিক বা অসংযত কাজ হিসেবে দেখি না, বরং দেখি একজনের পারিপার্শ্বিকের সাপেক্ষে যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে। এই পারিপার্শ্বিক অবস্থা কেবল দুরারোগ্য ব্যধীর শেষকালীন অবস্থা নয়। কারো কাছে তা ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু আত্মহত্যার জন্য মূল্য দিতে হয় যে লোকটি তা করল এবং তার পরিবার ও বন্ধুদের। তাই যৌক্তিক হলেও, তা মর্মান্তিক রয়ে যায়।

পিটারঃ অনেক পাঠক বলতে পারেন আপনার মত  ডার্ক হতাশাবাদী বা পেসিমিস্টিক। আপনি তাদের কী বলবেন, এবং মানব জীবন কি যে দূর্ভাগ্যজনক অপ্রিতকর অবস্থায় সে পতিত তা কোনভাবে কমাতে পারে?

ডেবিড বেনাটারঃ আমি একমত যে আমার মত নির্মম, কিন্তু তার কারণ হলো, আমার যুক্তিটা হচ্ছে, এসব বিষয় সম্পর্কে সত্যটা হলো গভীরভাবে অস্বস্থিকর। আমি মনে করি আমার পেসিমিজম নিশ্চিত বা ন্যায্য। এর মানে এই নয় যে আমাদের এই অবস্থায় কোন ভালো জিনিসই নেই।  অন্ততপক্ষে আমরা আমাদের জীবনের কিছু অর্থ অর্জন করতে পারি, এবং সব সময়ই জীবন আরো খারাপ হতে পারত। আমাদের দূর্ভাগ্যজনক বাস্তবতার জন্য আমরা যে সব সময় বিষাদগ্রস্থ থাকব এমন নয়। জীবন থেকে আমাদের খুঁজতে হবে, আনন্দ, তৃপ্তি, অর্থ (নৈতিকতার শৃঙ্খলের ভিতরে।) এবং আমাদের হাসতে হবে, আনন্দের এবং দুঃখ বেদনার উপশমের জন্য। শেষকথা হলো, বইয়ের ফুটনোটে আমি কিছু হাস্যরসও যোগ করেছি।

Share
মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করে একে আগ্রহী পাঠকের সামনে যেতে সাহায্য করুন।

Related Posts

Leave A Comment