"মানুষের এতো নপর-চপর কিন্তু যখন ঘুমোয়, তখন যদি কেউ দাঁড়িয়ে মুখে মুতে দেয়, তো টের পায় না, মুখ ভেসে যায়। তখন অহংকার, অভিমান, দর্প কোথায় যায়?"- রামকৃষ্ণ

ফিল্টার বাবলঃ ইন্টারনেট যা দেখায় না আপনাকে

যে একাডেমিক শিক্ষা পায় নি সে মূর্খ, (এমন ধরা হয়ে থাকে যদিও একাডেমিক শিক্ষা ছাড়াও জ্ঞানীরা আছেন এবং একাডেমি শিক্ষাপ্রাপ্তদেরই শিক্ষিত* বলা যায় না এ যুগে।) আর যে একাডেমিক শিক্ষা পেল কিন্তু চিন্তা করা শিখল না সে মহামূর্খ।

একইরূপে গুগল/ইন্টারনেট ব্যবহারকে দেখা যায়। কেউ গুগল ব্যবহার করে তথ্য বের করতে পারে না, ফলে সে কম জানে। কিন্তু গুগল ব্যবহার করে তথ্য বের করতে জানে যারা, তারা যদি এর ক্রিয়াপদ্বতি সম্পর্কে না জানে, ঠিকভাবে ব্যবহার না জানে, তাহলে তারা ভূল জানবে ও রামছাগলে পরিণত হয়ে উঠবে।

ধরা যাক, একটা বিতর্ক করছে দুইজন লোক। গরু ভালো কি ভালো না। গরুর পক্ষের জন গুগলে লিখে সার্চ দিবে, হোয়াই কাও গুড। গরুর বিপক্ষের জন্য লিখে সার্চ দিবে হোয়াই কাও ব্যাড!

ফলে তারা তাদের মতের পক্ষেই লেখা পাবে। গুগল সার্চ এঞ্জিন। মাস্টর না। গুগল আপনার সার্চ চাহিদা ও সার্চ হিস্টরী দেখে তাদের ইন্ডেক্স করা ওয়েবপেইজগুলা থেকে কিছু ওয়েবপেইজ সামনে আনে।

সুতরাং, মোটামোটি প্রকৃত তথ্যের জন্য লিখে দিতে হবে, "কাও গুড অর ব্যাড"। বা এরকম কিছু। তাহলে মোটামোটি নিরপেক্ষ, উভয় দিকের ভিউ যুক্ত লেখাই পাওয়া যাবে। গরু দিয়ে কেবল  উদাহরণ দিলাম। অন্য যেকোন আইডলজি বা বিতর্কের বিষয়ের জন্য একই কথা প্রযোজ্য।

মানুষ তার মত বা পূর্বধারনা পক্ষের লেখা বা মতামতই খুজে। মানুষের মস্তিষ্কে এই প্রোগ্রাম সেট করা, এবং এর নাম দেয়া হয়েছে কানফার্মেশন বায়াস। গুগল, মাইক্রোসফট, ইয়াহু ইত্যাদি কোম্পানিগুলো মানুষের এই বায়াসকে কাজে লাগিয়ে তাদের ব্যবসা করে নেয়। মানুষকে সেই তথ্যই তারা দিতে চেষ্টা করে যে তথ্য ঐ মানুষের মত বা পূর্বধারনার পক্ষে যায়।

এই পদ্বতিতে তারা বেশী সময় ইউজারকে ধরে রাখে। বেশী ক্লিক ও ভিউ পায়। সুতরাং বেশী রেভিনিউ।

তারা একজনের সার্চ হিস্টরী এবং ইন্টারনেট ব্যবহার দেখে ঠিক করে নেয় তারা কীসব কন্টেন্ট দেখতে চায়, এবং ঐসব কন্টেন্টই হাজির করতে থাকে সামনে। মানে ইন্টারনেট হয়ে যায় অথরিটি যে জানে আপনার জন্য কোনটা ভালো।

এটা নিছকই ব্যবসার জন্য হলে, এর অন্য কোন প্রভাব না থাকলে হয়ত একে কম খারাপ বলা যেত। কিন্তু যেহেতু এটি একজন মানুষের চিন্তা পদ্বতি নিয়ন্ত্রণ করছে, তাই একজন রেসিস্ট আরো রেসিস্টে, একজন প্রতিক্রিয়াশীলকে আরো বেশী প্রতিক্রিয়াশীলে পরিণত করছে ইন্টারনেট।

সে ঐ ব্যক্তিদের আইডোলজিক্যাল বেইজকে শক্ত করে দিচ্ছে, যার ফলে ঐ আইডোলজি ধ্বংসাত্মক রূপে হয়ত দেখা যাচ্ছে রাজপথে, কর্মক্ষেত্রে, রেসিস্ট ইমিগ্রেশন পলিসির সমর্থনে, দাঙ্গায়।

গণতান্ত্রিক একটা পরিবেশের জন্য মানুষকে মুক্তভাবে সব মত ও পথকে দেখার সুযোগ তৈরী করে দিতে হবে। কিন্তু ইন্টারনেট সেই জিনিসটাই বন্ধ করে দিচ্ছে।

জাকারবার্গ একবার বলেছিল, আপনার দরজার সামনে যে কাঠবিড়ালী মারা গেল তা হয়ত আপনার সাথে আগ্রহের বেশী সম্পর্কযুক্ত,  আফ্রিকায় মারা যেতে থাকা শিশুদের চাইতে।

এই ‘সম্পর্কযুক্ত’ দিয়েই বিষয়গুরুত্ব বিচার করে ফেইসবুক।

বই দ্য ফিল্টার বাবলের লেখক এলি প্যারিজার বলেন, “নিজের ব্যক্তিগত আগ্রহের সাথে সবচাইতে সম্পর্কযুক্ত জিনিসের দিকেই লক্ষ রাখা- মানে এই কাঠবিড়ালী পদ্বতি ব্যবসার স্ট্র্যাটেজি হিসেবে ভালো। কিন্তু এটা আমাদের চোখকে নিজেদের দরজার সামনেই রেখে দেয়, মানুষের দুর্দশা, গণহত্যা, দূর্ভিক্ষ-ক্ষুধা ইত্যাদি পড়তে না দিয়ে।”

ইন্টারনেট হতে পারত পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার মানুষের যোগাযোগের এক বৈপ্লবিক মাধ্যম, এবং পৃথিবীর সমস্যাবলী সমাধানে লোকেরা কাজ করতে পারত মায়া মমতা ও সহমর্মীতার তাড়নায়। কিন্তু যখন ইন্টারনেট ফিল্টার বাবলের মাধ্যমে বিষয়গুলি ফিল্টার করে নিচ্ছে, এবং দেখাচ্ছে কেবল ব্যক্তিগত আগ্রহের সাথে সম্পর্কযুক্ত বিষয়; তখন অবস্থা হচ্ছে ভিন্ন। বাংলাদেশের দরিদ্র গার্মেন্টস কর্মীর কারখানায় পুড়ে মরার খবর তার তৈরী কাপড়ের ইউরোপিয়ান সাধারণ ভোক্তার কাছে যাচ্ছেই না। ইন্টারনেট ফিল্টার করে তাকে হয়ত দেখাচ্ছে তার আগ্রহের বিষয়, ধরা যাক ক্রিকেট। তখন বাংলাদেশ নিয়ে সার্চ দিলেও তার সামনে আসবে ক্রিকেট।

তো, শেষকথা, ফিল্টার বাবলের বাইরে বেরুতে হবে। এবং এটা মনে রাখতে হবে গুগল বা সোশ্যাল মিডিয়া আপনার আগ্রহের সাথে সম্পর্কযুক্ত লোকদের স্ট্যাটাস কমেন্ট লিংক বা আদর্শের বা মতের পক্ষের কথাবার্তাই দেখাচ্ছে। ফলে নিজ থেকে আপনাকে এগুলির বাইরে গিয়েও দেখতে হবে, এবং সচেতন ভাবে তথ্যমূলক/শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট ব্যবহার করে তথ্য নিতে হবে।

 

ফুটনোটঃ

এ যুগে শিক্ষিত কারা?

এটাই হচ্ছে কথা। এই সময়ে যারা লেখতে পড়তে জানে না এরাই অশিক্ষিত না। কারন প্রায় সবাই লেখতে পড়তে পারবে। হয়ত সবাই-ই শীঘ্র হয়ে উঠবে ডিগ্রীধারী। যারা শিখতে, এবং শেখা জিনিস বদলাতে এবং পুনরায় শিখতে পারবে না; এরাই হবে প্রকৃত অশিক্ষিত। কোন শেখা জিনিস নিয়েই স্থির হয়ে বসার সুযোগ নেই। নতুন নতুন জ্ঞান তৈরী হচ্ছে। তাই কন্টিনিউয়াস লার্নিং আর নিজের শেখকে চ্যালেঞ্জ করে যাওয়াই শিক্ষিত হওয়া।

 

আরো পড়তেঃ

গুজব তত্ত্ব

চীনের অনলাইন নিয়ন্ত্রন থেকে কী শেখা যায়

Share
মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করে একে আগ্রহী পাঠকের সামনে যেতে সাহায্য করুন।

Related Posts

Leave A Comment