by

বইয়ের দাম কেন আমরা দিতে চাই না বা বৃদ্ধাশ্রম কেন আমাদের খারাপ লাগে

বইয়ের দাম কেন আমরা দিতে চাই না বা বৃদ্ধাশ্রম কেন আমাদের খারাপ লাগে

 

মানুষ কিছু জিনিসের অর্থনৈতিক মূল্য দিতে চায় না। দিতে চায় না এই কারণে না যে তার টাকা কমে যাবে, বরং সে ঐসব জিনিসকে এমনভাবে সম্মান করে যে, ভাবে অর্থনৈতিক মূল্য এর সম্মান হানি ঘটায়। টাকা বাঁচানো দ্বিতীয় কারণ হতে পারে, কিন্তু প্রথম কারণ ঐ বস্তুদের সম্মান বিষয়ে সমাজের মনস্তাত্ত্বিক ধারনা।

আবার সমাজে এটাকে ট্যাবুর মত রাখা হয়। এ নিয়ে কথা বলাও নিষেধ পর্যায়ের। কেউ বললে তাকে খারাপ ভাবে দেখে লোকে।

যেমন, কনসালটেশনের ফী, শিল্প সাহিত্যের বস্তুর দাম, স্নেহ ভালোবাসা ইত্যাদি। এগুলিকে মানুষ অমূল্য বা মূল্যের উর্ধ্বে ধরে থাকে মনস্তাত্ত্বিক ভাবে। ফলে এর বিণিময়ে টাকা খরচ করতে তার কষ্ট হয় বেশী।

একটা কোক কিনতে পয়সা দিলে কারো খারাপ লাগে না, তার কাছে স্বাভাবিকই লাগে। কিন্তু ডাক্তারের কনসালটেশন ফী বা বইয়ের মূল্য দিতে তার কষ্ট বেশী হয়। যেহেতু সমাজে ডাক্তারের কাছে রোগীদের বেশী যেতে হয়, তাই ইন্টারেকশন বেশী হয়, এবং এর ফলে ডাক্তারেরা কসাই নাম পেয়েছেন সমাজের কাছ থেকে। ডাক্তারীকে সমাজ কীরূপে দেখতে চায় তা এইম ইন লাইফ বা জীবনের লক্ষ্য রচনাগুলাতে দেখা যায়। সবাই মানবসেবা করতে চায়, এজন্যই ডাক্তার হতে চায় এমন বলে। কিন্তু এটা তো প্রথমত একটা পেশা। পেশার পেশাগত এথিক্সে মানবসেবা ইত্যাদি থাকতে পারে কিন্তু পেশার মূল তাড়না এবং উদ্দেশ্য হিসেবে সমাজ মানবসেবা দেখতে চাইলে তা যদিও অতি সম্মানের তথাপি ভয়ংকর। কারণ বাস্তবে সমাজ এমন দেখবে না। কিন্তু যেহেতু তার আশা বেশী ছিল তাই তার বেশী খারাপ লাগবে। ৫০০ টাকা আশা করে গিয়ে ২০০ টাকা পেলে খারাপ লাগে, কিন্তু বাস্তবতা মাথায় রেখে আশা কমিয়ে আগেই যদি দুইশ করা যেত, তাহলে দুইশ পেলেই তা খুশির ব্যাপার হয়ে উঠত। তখন ইন্টার্ন ডাক্তারদের পরিশ্রম এবং সেবার দিকটাও মানুষের নজরে পড়ত।

ডাক্তারী পেশা হিসেবে শক্তভাবেই আছে কারণ রোগের তো অভাব নাই এবং রোগীকে আসতেই হবে। তবুও, ডাক্তার ও সমাজের যে তিক্ত দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্ক রয়েছে এর পেছনে সমাজের মানসপটে ডাক্তারী পেশার অতি সম্মানজনক অবস্থানের ভূমিকা আছে। এই পেশার বিরুদ্ধে যে বিদ্বেষ দেখা যায় তাও এই অতি সম্মানের ঘিতে জ্বলে উঠা অগ্নুৎপাত।

কনসালটেশন বেইজ প্রায় সব পেশাতেই এমন পাওয়া যাবে যে ফী দিতে চায় না লোকে। এর মানে এটা কখনোই নয় যে ঐ পেশার সব লোকই ভালো। আমার পয়েন্ট হচ্ছে এইসব কনসালটেশন ফী দিতে মানুষের সাইকোলজিক্যালী যে বেশী কষ্ট হয়, এবং এক্ষেত্রে টাকা খরচের জন্য মানুষের যে হিপোক্রিসি আছে, তা এইসব পেশার খারাপ রেপুটেশনের জন্য দায়ী অনেকাংশে।

সিগমুন্ড ফ্রয়েড যখন তার সাইকোএনালিসিস শুরু করেছিলেন তখন তার কাছে যারা কনসালটেশন সেবা নিতে আসতেন এরা সবাই ছিলেন উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেনীর পেশাজীবি। ফ্রয়েড দেখলেন এরা ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেন থেরাপিতে। কিন্তু টাকা দেবার প্রসঙ্গটা আসলেই নানা ঠালবাহানা শুরু করেন।

সিগমুন্ড ফ্রয়েড তার কনসাল্টিং রুমে, ভিয়েনা, ১৯৩৭

সেই ক্লায়েন্টেরা তো জানতো না তারা  এমন একজনের এর সামনে এসব ভড়ং করছে, মানিব্যাগ ফেলে এসেছি ইত্যাদি বলছে যিনি মনের রাজ্যে হানা দিতে জানেন। ফ্রয়েড লেগে গেলেন এ নিয়ে চিন্তায়, কেন মানুষ এরকম করে। তিনি পেলেন সমাজের এক বড় সমস্যা। ছোটবেলা থেকে আমরা বড় হতে হতে খাদ্য, পরামর্শ এবং নিঁখাদ ভালোবাসা পাই ফ্রীতে। ফলে এগুলি সম্পর্কে আমাদের এত উচ্চ সম্মান তৈরী হয় যে আমরা এদের টাকায় মূল্য দিতে চাই না।

কনসালটেশনের ফী আমাদের কাছে কেউ চাইলে আমাদের খারাপ লাগে। দোকানদার আলুর দাম চাইলে খারাপ লাগে না। বইয়ের দাম রাখা হয় পৃষ্ঠা সংখ্যা অনুযায়ী, ২০০ পৃষ্ঠা হলে দাম প্রায় ২০০ টাকা। অর্থাৎ কাগজের দামেই বই, লেখক যে গল্প লিখলেন বা কবিতা তার দাম কোথায়? বইয়ের দাম বেশী হলে, প্রকাশক-লেখক যদি বলেন ২০০ পৃষ্ঠার কাগজের দাম ২০০ আর কন্টেন্টের দাম ২০০, অর্থাৎ চারশো তখন এটা কেউ মেনে নিতে চাইবেন না।

কন্টেন্ট এমনিতেই দিতে হবে, এটা আবদার। অনেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন তাহলে প্রকাশনা শিল্প কীভাবে টিকে আছে? শিল্প বলতে আসলে ঐ বস্তু এখনো প্রতিষ্ঠিতই হয় নি, পত্রিকা-সংস্কৃতিওয়ালারা আদর করে ডাকেন প্রকাশনা শিল্প, আসলে এটি কুটির শিল্প এখনো এখানে। প্রকাশকেরা বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী প্রোগ্রামে, লাইব্রেরীতে বই গছিয়ে দেয়, আর আছে ফেব্রুয়ারী মাস ভিত্তিক মৌসুমী প্রকাশনা ব্যবসা। সারা বছর বই প্রকাশ করে এমন প্রকাশনী হাতে গোনা।

চা দোকানদারকে চায়ের দাম দেয়া যায়, কিন্তু ইন্টেলেকচুয়াল প্রোডাক্ট যারা তৈরী করেন তাদের পণ্যের দাম দেয়া যাবে না, এমন অবস্থান আধুনিক সমাজের অর্থনৈতিক হিপোক্রিসি। বাছবিচার বইকে প্রোডাক্ট বলে, আমি ওখানে কয়েকটা শর্ট রিভিউ লিখেছিলাম। তো কয়েকজন জিজ্ঞেস করেছিলেন বইকে প্রোডাক্ট বলা হচ্ছে কেন? তাদের মতে এতে বইয়ের অপমান হয়। এ মত বেশীরভাগ মানুষেরই। এমন অবস্থান উক্ত বস্তু সম্পর্কে উচ্চ সম্মানের কারণেই, কিন্তু এই সম্মানই আবার বস্তুটির বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দেয়। লেখক বা আর্টিস্ট ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টির দাম না পেলে সে তা তৈরী করবে কীভাবে, বা জীবনধারনই করবে কীভাবে? সমাজে দীন দুখী, গরীব, না খেতে পাওয়া গ্রেট আর্টিস্টদের কথা সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয়। এই উচ্চ সম্মান ভবিষ্যত শিল্প সাহিত্য ধ্বংসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।

মা মাতৃস্নেহ নিয়ে সমাজে অতি উচ্চ সম্মান ধারনা প্রচলিত আছে। অবশ্যই এটি সম্মানের, কিন্তু অতি উচ্চ সম্মান আমাদের বাস্তবতা দেখতে দেয় না। ফলে আমরা মনে করি মাতৃস্নেহ আমাদের প্রাপ্যই, এবং তা অমূল্য। বলা হয় আবেগী কথা, মায়ের ঋণ কখনো শোধ করা যাবে না। এসব বলেই সন্তান তৃপ্ত। ঋণ যখন শোধই করা যাবে না তাহলে মা অতি সম্মানের আসনেই থাক, তার প্রতি নিজের কর্তব্য পালন একটু শিথিল করাই যায়-এমন ভাবনা যেন!

কিন্তু আসলে ঘটনা তো এমন নয়। মা’কেও তার স্নেহ মমতা প্রীতির বিণিময়ে তা ফেরত দেয়া উচিত। অর্থনৈতিক ভাবে বা নিজের অর্থনৈতিক ভাবে মহামূল্যবান সময় দিয়ে – তখনই তা যথার্থ সম্মান হয়।

মা ব্যক্তিটিও মানুষ আর তারও বিভিন্ন ধরনের চাহিদা ও আকাঙ্খা রয়েছে। আমাদের সমাজে মা’কে অতি সম্মানের একটি বায়বীয় স্থানে বসিয়ে রেখে তার মানুষ স্বত্তাকে হত্যা করা হয়। তিনি যেন দুঃখী, সন্তানের জন্য প্রাণপাত করা জননী, সর্বংসহা মমতাময়ী।

সমাজে বৃদ্ধাশ্রমকে খারাপ ভাবে দেখা হয়। অনেক ফ্যামিলিতে ছেলে, ছেলের বউয়ের সাথে অবিরত দ্বন্দ্বে মা বাবা কষ্টভোগ করতে করতে নিঃশেষ হতে থাকেন। কার দোষ কার গুণ এটা আমার বিষয় নয় এখানে, দুই জেনারেশনের নানা সমস্যা এমনিতেই থাকে দৃষ্টিভঙ্গী এবং আচরনে। এসব ক্ষেত্রে, বনিবনা একেবারেই না হলে সহজ সমাধান হতে পারত বৃদ্ধাশ্রম। তাতে মা বাবা শান্তিতে থাকতে পারেন। তাদের অর্থনৈতিক দিকটা দেখবে সন্তান। বিভিন্ন উৎসব পার্বণে নাতি নাতনিদের সাথে দেখা করতে পারলেন। মানে সম্মানজনক ভাবে তারা বাস করতে পারতেন শান্তিতে, শেষ বয়েসের দিনগুলি।

অবশ্যই আমাদের কাম্য যে মা বাবা নিয়ে সন্তানেরা তাদের ফ্যামিলিতে থাকবে, যেমন আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কিন্তু আমাদের চারপাশের সমাজ তো রূপকথার গল্পের মত সুন্দর নয় সব সময়। ফলে কখনো “উচ্চ সম্মানের” ধারনা বাদ দিয়ে আমাদের সমাধান ও ভোক্তভোগীর শান্তিটাকেই প্রাধান্য দিতে হবে।

ফ্রয়েড বলছিলেন আধুনিক মানুষেরা যৌনতাকে যেভাবে হিপোক্রিসির ভেতর দিয়ে নেয় তেমনি ভাবে টাকার ব্যাপারটিকেও নেয়। তিনি চেয়েছিলেন তার সাইকোএনালিসিস ভিত্তিক কনসালটেশনের পেশাকে এর বাইরে নিয়ে আসতে। তিনি সরাসরি টাকা চাইতেন, না দিলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতেও পিছপা হতেন না। তার কথা ছিল, আমার এক ঘন্টা সময়ের মূল্য এটা। কিন্তু তাও এখনো সাইকোএনালিসিস ব্যবসায়িক ভাবে বড় পেশা হিসেবে দাঁড়াতে পারে নি, এখনো বিশ্বে তা কুটির শিল্পের মতোই রয়েছে। আমেরিকায় নেইল বারের ব্যবসার লাভ এর চাইতে অনেক বেশী।

“অতি সম্মান” এভাবেই বুমেরাং হয়েই অতি সম্মানের বস্তুগুলিকে নাশ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *