by

কীভাবে বিরাট কিছু কইরা ফেলবেন

আমরা সবাই, বা প্রায় সবাই বিরাট কিছু করতে চাই। অন্তত আমার এইরকম মনে হয়। আমি মনে করি না কেউ মাঝারি বা নিম্ন মাঝারি হইয়া থাকতে চান লাইফে। যিনি লেখক, তিনি বড় লেখক হইতে চান। যিনি শিল্পী, তিনি হইতে চান বড় শিল্পী। বিশেষত শিল্প সাহিত্যের ফিল্ডে বড় না হইয়া উপায়ও বিশেষ নাই, মাঝারি ও নিম্নমাঝারিরা এইখানে নাই হইয়া যান বেশিরভাগ সময়ে। [এই বিষয়ে আপনার কী আসবে সেইদিন, লেখাটি পড়া যাইতে পারে; যা নাসিম তালেবের চিন্তার উপর ভর কইরা লেখা।]

তো, বেশীরভাগ লোকে এইটা স্বীকার করেন না যে তারা বিরাট কিছু করতে চান। অথবা তা প্রকাশ করতে ভয় পান। তাদের মনে হয় তারা যদি ব্যর্থ হন তাইলে অন্যেরা হাসবে। কিন্তু মনের গহীনে, চেতনে বা অবচেতনে তারাও আশা রাখেন একদিন কইরা ফেলবেন বিরাট কিছু।

কিন্তু কীভাবে বিরাট কিছু কইরা ফেলা যায়? এ ব্যাপারে রিচার্ড হ্যামিং কী বলেন?

হ্যামিং তখন বেল ল্যাবে কাজ করেন। তিনি খাইতেন ম্যাথমেটিশিয়ানদের লগে। তারপর তিনি লক্ষ করলেন এদের সাথে খাইয়া তার কোন লাভ হইতেছে না। তিনি নয়া কিছু জানতে পারতেছেন না। স্মার্ট হইবার নিয়মই হইল নিজের চাইতে বেশী স্মার্ট লোকদের সাথে মেশা। হ্যামিং তা জানতেন। তিনি গেলেন পদার্থবিজ্ঞানের টেবিলের। সেইখানে পদার্থবিজ্ঞানীরা খাইতেন। তাদের সাথে খাইতে বইয়া হ্যামিং নয়া অনেক কিছু জানতে পারতেন, নিজেও অনেক কিছু শেয়ার করতেন। একসময় নোবেল পুরস্কার পাইলেন এই টেবিলের অনেকে। তারা পুরস্কার পাইয়া, প্রমোশন পাইয়া চলে গেলেন। হ্যামিং তখন গেলেন পদার্থবিজ্ঞানের পাশের আরেক টেবিলে। সেইটা রসায়নের বিজ্ঞানীদের টেবিল।

রসায়নের টেবিলের বিজ্ঞানী ডেভ ম্যাককলের সাথে তিনি পূর্বে কাজ করছিলেন। তিনি তারে গিয়া বললেন, তোমাদের সাথে আমি খাইতে আসলে কোন সমস্যা কি?

ডেভ না করতে পারেন নাই। ফলে রসায়নের টেবিলে হ্যামিং এর খাওয়া শুরু হইল।

তিনি তাদের জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, আপনাদের ফিল্ডের গুরুত্বপূর্ন সমস্যা কী কী? এর এক সপ্তাহ পর জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কোন কোন গুরুত্বপূর্ন সমস্যা নিয়া কাজ করতেছেন? এর কিছুদিন পরে একদিন তিনি বইলা ফেললেন, আপনারা যেইসব বিষয় নিয়া কাজ করতেছেন তা যদি গুরুত্বপূর্নই হইল না, বা তা যদি গুরুত্বপূর্ন সমস্যাগুলির দিকে গেল না, তাইলে আপনারা বেল ল্যাবে করতেছেন টা কী!

এরপরে স্বভাবতই তিনি আর ঐ টেবিলে অভ্যর্থিত হন নাই। ফলে তার অন্য টেবিল দেখতে হয়। এইটা ঘটছিল বসন্তে।

পরের শরতে, ডেভ ম্যাককলের সাথে হ্যামিং এর দেখা একদিন হলে। ডেভ বললেন, হ্যামিং আমি তোমার কথাটা আমারে ভালোভাবে হিট করছে। আমি পুরা সামার ভাবছি আমার ফিল্ডের গুরুত্বপূর্ন সমস্যা কী। আমার গবেষণা বদলাই নাই। আমার মনে হয় এইটা গুরুত্বপূর্ন সমস্যা নিয়াই।

হ্যামিং বলতেছেন,

আমি বললাম, ডেভ, তোমারে ধন্যবাদ। এরপর চইলা আসলাম। এর কয়েকমাস পরে আমি লক্ষ করলাম সে ডিপার্টমেন্টের হেড হইছে। এরপরে একদিন দেখলাম ন্যাশনাল একাডেমী অব ইঞ্জিনিয়ারিং এর সদস্য হইছে সে। আমি দেখলাম সে সফল হইল। অন্য যারা ছিল ঐ টেবিলে তাদের কথা বিজ্ঞান বা কোন বৈজ্ঞানিক সমাজে আমি আর শুনি নাই। তারা নিজেরে জিজ্ঞেস করতে পারে নাই, আমার ফিল্ডের গুরুত্বপূর্ন সমস্যা কী কী?

আপনে যদি গুরুত্বপূর্ন সমস্যা নিয়া কাজ না করেন তাইলে আপনে গুরুত্বপূর্ন কাজ করতে পারবেন না। এইটাই স্বাভাবিক। মহান বিজ্ঞানীরা সতর্কভাবে তাদের ফিল্ডের কিছু গুরুত্বপূর্ন সমস্যা নিয়া ভাবছেন এবং তক্কে তক্কে ছিলেন ক্যামনে এইগুলারে এটাক করা যায়। গুরুত্বপূর্ন সমস্যা বিষয়টারে একটু খোলাসা কইরা বলি। পদার্থবিজ্ঞানের তিনটা বড় সমস্যা নিয়া আমরা বেল ল্যাবে কখনো কাজ করি নাই। গুরুত্বপূর্ন বলতে আমি বুঝাইতেছি যেগুলায় নোবেল প্রাইজ গ্যারান্টি দিয়া পাইবেন, এবং পাইবেন যত টাকা আপনি চান। আমরা (১) টাইম ট্রাভেল (২) টেলিপোর্টেশন (৩) এন্টিগ্র্যাভিটি নিয়া কাজ করি নাই। তারা গুরুত্বপূর্ন সমস্যা ছিল না কারন তাদের এটাক করার অস্ত্র আমাদের ছিল না। পরিপার্শ্ব কোন সমস্যারে গুরুত্বপূর্ন কইরা তুলে না, গুরুত্বপূর্ন হবে যখন আপনার কাছে তারে এটাক করার যৌক্তিক অস্ত্র থাকবে। এইটাই কোন সমস্যারে গুরুত্বপূর্ন সমস্যা কইরা তুলে।

যখন আমি বলি অধিকাংশ বিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ন সমস্যা নিয়া কাজ করে না, তখন এই অর্থেই বলি। গড় বিজ্ঞানীরা এমন সমস্যা নিয়া কাজ করে যেগুলা তারা বিশ্বাস করে গুরুত্বপূর্ন না, এবং এইটাও বিশ্বাস করে না এগুলো কোন গুরুত্বপূর্ন সমস্যার দিকে যাবে।  

আমি আগে বলছি বীজ রোপন করার কথা যাতে বৃক্ষ জন্মায়। আপনে সব সময় এইটা ঠিক ঠিক জানবেন না কোথায় থাকতে হবে, কিন্তু সেই জায়গায় আপনে সক্রিয় থাকতে পারেন যেইখানে কিছু একটা ঘটতে পারে। এবং যদিও বা আপনে বিশ্বাস করে বড় বৈজ্ঞানিক কাজ ভাগ্যগুণে হয় তবুও দাঁড়াইতে পারেন পর্বতের চূড়ায় যেইখানে বর্জ্রপাত আঘাত করে, উপত্যকার মাঝে নিরাপদ জায়গায় লুকাইতে হবে না। গড় বিজ্ঞানীরা গড়পরতা নিরাপদ কাজকর্ম কইরাই কাটাইয়া দেয় সময়। তাই সে বেশী কিছু করতেও পারে না। এইটা সহজ হিশাব। যদি বিরাট কাজ করতে চান, তাইলে স্পষ্টভাবে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ন সমস্যা নিয়া কাজ করতে হবে এবং আপনার একটা আইডিয়া থাকতে হবে।

হ্যামিং এর এই গুরুত্বপূর্ন সমস্যা তত্ত্বের মূলকথা কী? মূলকথাটা হচ্ছে, মাঝারি বা নিম্ন মাঝারি গড়পরতা জিনিস নিয়া থাকলে আপনি সেইরকমই থাকবেন। বিরাট কিছু আপনার আর করা হবে না। বিরাট কিছু করতে হলে বিরাট সমস্যা নিয়া কাজ করতে হবে, গুরুত্বপূর্ন যেগুলা। তবে এখানেও আপনারে যৌক্তিক থাকার কথা বলেন হ্যামিং। যেসব সমস্যা নিয়া কাজ করার আইডিয়া আপনার নাই, যৌক্তিক কারনও নাই, সেইগুলা খুব বেশী বড় সমস্যা। এগুলা গুরুত্বপূর্ন নয়।

বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে বলা হইলেও অন্য নানা ক্ষেত্রে হ্যামিং এর কথা প্রযোজ্য। একজন লেখক যদি মনে করেন তিনি গড়পরতা সাহিত্যিক হইবেন, তার পূর্বসুরীদের মত লেইখাই মনের আশ মিটাবেন তাইলে খুব সম্ভবত তিনি মাঝারি হইয়া থাকবেন। কোন লেখকরে ভাবতে হবে তার ফিল্ডের গুরুত্বপূর্ন সমস্যা কী? এবং সেই সমস্যারে আক্রমণ করার যুক্তি তার আছে কি না? থাকলে তিনি তা নিয়া কাজ করতে পারেন। তিনি যদি দেখতে পান তার ভাষায় অসাম্য আছে বা তার ভাষার পূর্ন ব্যাপ্তী হইতেছে না বর্তমান কাঠামোতে তখন তিনি এই নিয়া কাজ করতে পারেন।

বাংলা সাহিত্যের অনেকে বড় কাজ করেছেন। যেমন মধুসূধন দত্ত বা প্রমথ চৌধুরী। প্রথম চৌধুরী ভাষার চলিত রীতির প্রবর্তকের সম্মান পাইয়া থাকেন।

একজন চিন্তক বা বুদ্ধিজীবি ভাববেন তার সমাজের গুরুত্বপূর্ন সমস্যাবলী নিয়া। কিন্তু দেখা যায়, মূল গুরুত্বপূর্ন সমস্যাগুলি নিয়া মাঝারিরা চিন্তা করতে নারাজ থাকেন। কারণ হয়ত এতে তাড়াতাড়ি ফল পাওয়া যায় না, এবং জনপ্রিয়তাও আসে না।

বড় বুদ্ধিজীবি ও লেখকের অভাব একটা দেশের দূর্ভাগ্যের প্রধান একটা কারণ।

পলিটিকাল কারেক্ট ভাষায় উন্নয়নশীল আর ভালো ভাষায় গরীব একটা দেশে নানা গুরুত্বপূর্ন সমস্যা বিরাজমান থাকে। যদিও ক্ষুদ্রঋণের নানাবিদ বদনাম আছে তথাপি এটা বলা যায় তা দারিদ্র বিমোচনের এক প্রচেষ্টা হিসেবেই নিয়েছিলেন ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস। দেশের দারিদ্র একটি গুরুত্বপূর্ন সমস্যা, তিনি এইটা নিয়া কাজ করছেন। তা একসময় বিরাট কাজ হইছে এবং তিনি নোবেল পুরস্কার পাইছেন। প্রথম বাংলাদেশী হিসাবে। তার সম্পর্কে বিতর্ক যাই থাক, এইটা অস্বীকার করা যাবে না।

সব কথার শেষকথা, রিচার্ড হ্যামিং এর কাছ থেকে জানা গেল বিরাট কিছু করতে হলেঃ

১। ফিল্ডের গুরুত্বপূর্ন সমস্যা কী তা নিয়া ভাবতে হবে।

২। এদের একটি বা কয়েকটি নিয়া কাজ করতে হবে।

 

 

হ্যামিংচর্চাঃ

একঃ কীভাবে জ্ঞান ও প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানি যায়

দুইঃ কীভাবে সৃষ্টিশীলতা বাড়ানি যায়

Share

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.