"মানুষের এতো নপর-চপর কিন্তু যখন ঘুমোয়, তখন যদি কেউ দাঁড়িয়ে মুখে মুতে দেয়, তো টের পায় না, মুখ ভেসে যায়। তখন অহংকার, অভিমান, দর্প কোথায় যায়?"- রামকৃষ্ণ

ক্রাইম ফিকশন হওয়া উচিত যে সংস্কৃতি সে তুলে ধরছে তার এক মনস্তাত্ত্বিক নিরীক্ষা – হেনিং ম্যাংকেল

 

হেনিং ম্যাংকেলের সাক্ষাৎকার

 

হেনিং ম্যাংকেল সুইডেনে জন্ম নেয়া একজন লেখক। তিনি স্টকহোমে জন্ম নিয়েছিলেন ১৯৪৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারী। লিখেছেন নাটক, শিশুদের জন্য এবং ক্রাইম ফিকশন বা অপরাধ উপন্যাস। তিনি বিখ্যাত ডিটেক্টিভ সিরিজ কুর্ট ওয়ালান্ডারের জন্য। তিনি একজন সক্রিয় বাম সোশ্যাল ক্রিটিক ছিলেন। আফ্রিকার মোজাম্বিকে একটি থিয়েটার পরিচালনা করতেন। তার মৃত্যু হয় ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লিখেছেন ৪০ টি বই, তার বই বিক্রি হয়েছে ৪০ মিলিয়ন কপিরও বেশী। তিনি ১৯৯৮ সালে বিয়ে করেছিলেন ইভা বার্গম্যানকে, যিনি মাস্টার চলচ্চিত্র পরিচালক ইংগমার বার্গম্যানের কন্যা। ম্যাংকেল চরিত্রের আরেক বৈশিষ্ট্য তার দানশীলতা। প্রচুর টাকা তিনি দান করে গেছেন চ্যারিটিতে, যারা বিশেষত আফ্রিকার উন্নয়নে কাজ করছে।

হ্যানিং ম্যাংকেলের এই সাক্ষাৎকারটি হ্যানিংম্যাংকেল ডট কম থেকে নেয়া। এখানে তিনি তার লেখালেখি, বিখ্যাত চরিত্র কুর্ট ওয়ালান্ডার ও কাজের ধরণ ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন।

হেনিং ম্যাংকেল

ছবিঃ হেনিং ম্যাংকেল

কী আপনাকে লেখালেখিতে নিয়ে আসল?

আবার বাবা সব সময় পড়তে উৎসাহীত করতেন, তাই আমি অনেক পড়ি। আমি ছিলাম অনেক কল্পনাপ্রবণ এবং তাড়াতাড়ি এটা বুঝে নিয়েছিলাম কল্পনা হচ্ছে বেঁচে থাকা এবং সৃষ্টিশীলতার জন্য এক দারুণ জিনিস। আমি মনে করি সেই সময়টাই আমার জন্য সবচেয়ে সেরা সময় যখন আমার কল্পনার শক্তি বাস্তবের সমান হয়ে উঠে। আমার যখন ছয় বছর বয়স তখন আমার দাদী আমাকে লিখতে শেখান, আমি এখনো মনে করতে পারি সেই অদ্ভুত ভালো লাগার অনুভূতি যখন আমি একটি শব্দ লিখছি, একটি বাক্য তৈরী করছি, গল্প বলছি। প্রথম যে জিনিস আমি লিখেছিলাম তা হচ্ছে রবিনসন ক্রুসোর এক পৃষ্ঠা লম্বা একটি সারমর্ম। দূর্ভাগ্যের বিষয় সেটি এখন আর আমার কাছে নেই, কিন্তু ঐ সময়েই আমি লেখক হয়ে যাই।

 

আপনার এত পাঠক হল কীভাবে?

আমার মনে এটা এই জন্য যে আমি সেসব মানুষদের কথা লেখি যারা পরিবর্তিত হয় এবং আমি এমন একটা পরিবেশ নিয়ে লেখি যা মানুষেরা চিনতে পারে। আমরা যেই পৃথিবীতে বাস করি তাকে বুঝতেই আমি লেখি। যা আমাকে আগ্রহী করে তা হচ্ছে গভীর অস্তিত্ববাদী প্রশ্নগুলি। মানুষ হওয়ার অর্থ কী, আমরা যেই পৃথিবীতে বাস করি তার চরিত্র কী। আমি যাই লেখি, তা কোন না কোনভাবে এইসব বিষয় নিয়েই।

 

কোথা থেকে এবং কীভাবে আপনি অনুপ্রেরণা পান? আপনি কীভাবে কাজ করেন?

আমি সবখান থেকেই অনুপ্রেরণা পাই। এবং আমি প্রচুর পড়ি। আমি আমার কাজের ব্যাপারে খুবই নিবেদিতপ্রাণ এবং লেখার সময় খুবই সুশৃঙ্খল। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে আমি নিজেকে সব সময় খালি করে রাখতে থাকি আর তখন বাকী থাকে কেবল গভীর অনুভূতিগুলি সংগ্রহ করা। এটা এমন যে একটা খালি নৌকা আমি পানি দিয়ে ভরছি আরো খালি করার পরিবর্তে এবং যখন নৌকা ডুবতে শুরু করে তখন আবার খালি করতে থাকি।

 

কুর্ট ওয়ালান্ডার এত জনপ্রিয় কেন?

ওয়ালান্ডার এমন একটা চরিত্র, আমি মনে করি যাকে একেবারে মানুষের মত মনে হয়। সে একজন প্রতিভাবান ডিটেক্টিভ কিন্তু তার নিজের সমস্যাও রয়েছে। যেমন তার প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা ডায়বেটিসের সাথে যুদ্ধ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলি পরিচর্যা করতে পারার অযোগ্যতা। সে তার কাজের ব্যাপারে শতভাগ নিবেদিত প্রাণ কিন্তু তাও সে সন্দেহের মধ্যে থাকে, দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকে সে ঠিক কাজ করছে কি না এ নিয়ে। মাঝে মাঝে তার ইচ্ছা হয় সব কিছু ছেড়ে ছুঁড়ে, যন্ত্রণাকে ফেলে দূরে কোথাও চলে যাবার। ঠিক যেমন আমরা সবাই মাঝে মধ্যে ভেবে থাকি।

 

কীভাবে আপনি ওয়ালান্ডার সিরিজ লিখতে শুরু করলেন? কুর্ট ওয়ালান্ডার কীভাবে জন্ম নিল?

ওয়ালান্ডার লেখার আইডিয়ার জন্ম হয় ১৯৮০’র দশকে সুইডেনে বাড়তে থাকা বর্ণবাদ নিয়ে লেখার তাড়না থেকে। বর্ণবাদ আমার কাছে একটি অপরাধ তাই অপরাধ থ্রিলার লেখাটা আমার স্বাভাবিক মনে হয়েছিল।  এরপরে পুলিশের লোকের আইডিয়াটি আসে। টেলিফোন ডিরেক্টরী থেকে আমি কুর্ট ওয়ালান্ডার নামটা নেই। এবং তারপর এটি চলতে থাকল। আমি যখন লেখি তখন চেষ্টা করি যে বাস্তবতায় আমরা বাস করি সেই বাস্তবতাটাকে তুলে ধরতে। এমন একটি বাস্তবতা যা দিন দিন বন্ধুর এবং হিংস্র হয়ে উঠছে। এই হিংস্রতা এবং চারপাশের মানুষের উপরে এর প্রভাবটাই আমি কুর্ট ওয়ালান্ডারে তুলে ধরতে চেষ্টা করি। কিন্তু বাস্তবতা সব সময়েই কল্পনাকে ছাড়িয়ে যায়।

 

আপনার এবং কুর্ট ওয়ালান্ডারের মাঝে কি অনেক মিল?

আমাদের দুজনেরই সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা আছে এবং কাজের প্রতি দুজনরেই ক্যালভিনিস্ট মনোভাব বিদ্যমান। কিন্তু, মানুষ হিসেবে আমি ওয়ালান্ডারের খুব ভক্ত নই আমি। কিন্তু এতে কিছুই আসে যায় না। যেহেতু সে কাল্পনিক এবং আমার মাথাতেই তার বাস।

 

আপনার কি কোন সাহিত্যিক পথিকৃৎ আছেন, থাকলে তিনি কে?

অগাস্ট স্টিনবার্গ, জন লী ক্যারে, প্রাচীন গ্রীক নাটকগুলি এবং আরো অনেক অনেক। উদাহরনস্বরূপ ম্যাকবেথ, এ পর্যন্ত যা লেখা হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে সেরা অপরাধ গল্প।

 

আফ্রিকা এবং সুইডেন দুই জায়গাতে বসবাস করতে কেমন লাগে? একটি কী অন্যটির চাইতে বেশী আপন মনে হয়?

আফ্রিকা এবং ইউরোপ, দুই জায়গায় ভাগ করে আমার কাটানো সময়গুলি আমাকে দৃষ্টিভঙ্গী ও দূরত্ব দিয়েছে, এবং আমি মনে করি আমাকে একজন অপেক্ষাকৃত ভালো ইউরোপিয়ান বানিয়েছে।  হারজেদালেনের বরফঢাকা দৃশ্যপট এবং মোজাম্বিকের অনুর্বর ভূদৃশ্য, অনেক সময় একটি আরেকটির কথা মনে করিয়ে দিত আমায়। একইভাবে আফ্রিকার অধিক গরম মনে করিয়ে দিত সুইডেনের শীতের ঠান্ডার কথা। দুই জায়গাই আমার বাড়ি। কিন্তু সব সময়ই আমি একজন ইউরোপিয়ান রয়ে যাব।

 

একটি উপন্যাসের জন্য এবং অপরাধ উপন্যাসের জন্য কী গুরুত্বপূর্ন?

যখন আমি পড়ি তখন আমি কিছু শিখতে চাই। আমি সেইসব বই পছন্দ করি যারা আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমার ক্রিটিক্যাল চিন্তাশক্তি ব্যবহার করার কথা। একটি ভালো অপরাধ গল্প শুধু মাত্র অপরাধ ও তার সমাধান নিয়ে নয়। এটা হওয়া উচিত যে সংস্কৃতি সে তুলে ধরছে তার এক মনস্তাত্ত্বিক নিরীক্ষা।

 

আফ্রিকায় থাকা এবং কাজ করাটা কেমন, যেহেতু ওখানে দারিদ্র চরম এবং এইচআইভি ও এইডসের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায়?

আমি দারিদ্র ও যন্ত্রণা দেখি প্রতিদিন। কিন্তু আমি আনন্দ আর হাসিও দেখি। মাপুতোর রাস্তায় লোকে বেশী হাসে স্টকহোমের রাস্তার চাইতে। মনে হয়, পেমেন্ট এবং ক্রেডিটের মাঝখানে কোন একটা জায়গায় পশ্চিমা সমাজ তাদের হাসিটা হারিয়ে ফেলেছে। সে হাসি আফ্রিকানরা ধরে রেখেছে। তেয়াত্রো এভেনিদার সাথে আমার কাজটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দেশে থিয়েটার চালানো সহজ কথা না। কিন্তু এটা আমাকে বুঝতে শিখিয়েছে যেখানে সম্পদ আছে সেখানেই কল্পনাশক্তি আছে।  গরীব হওয়াটাই একমাত্র খারাপ জিনিস না, কারণ তখন আপনাকে কল্পনাশক্তির ব্যবহারও করতে হবে। কিন্তু আফ্রিকার দারিদ্রতার সমস্যা, অশিক্ষা ও এইচআইভি ইত্যাদি সমাধানের বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্বের উদাসীনতা হতাশাজনক। আমি সবাইকে সাহায্য করতে পারবো না, এটি কোন অজুহাত হতে পারে না অল্পকে সাহায্য না করার জন্য।

 

Share
মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করে একে আগ্রহী পাঠকের সামনে যেতে সাহায্য করুন।

Related Posts

One Comment

  1. সোহেল নূর
    July 12, 2017 at 11:56 pm

    ভালো লাগল সাক্ষাতকার পড়ে।

Leave A Comment