আই হার্ট হাকাবিজঃ জীবনের অর্থ উদঘাটন

আই হার্ট হাকাবিজ ডেভিড ও রাসেল পরিচালিত একটি দার্শনিক কমেডি ফিল্ম। একইসাথে মজার এবং জীবন সম্পর্কিত অনেক গভীর দার্শনিক ধারণাযুক্ত।

ফিল্ম এর এক প্রধান চরিত্র আলবার্ট মারকোভস্কির জীবনের অর্থহীনতা অনুভব করতে থাকে। সে একটি পরিবেশবাদী গ্রুপের প্রধান যারা এক জলাভূমি বাঁচাতে চেষ্টা করছে হাকাবি কর্পোরেশনের কাছ থেকে। আলবার্টের প্রতিদ্বন্ধী চরিত্র ব্র্যাড হাকাবি কর্পোরেশনের শ্যালো পাওয়ার একজিকিউটিভ। আলবার্ট মারকোভস্কি জীবনের অর্থহীনতা, তার কাজের অর্থহীনতা নিয়ে হতাশ তো ছিলোই, এর মাঝে তার সাথে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে যায়। সে এক লম্বা আফ্রিকান লোককে তিনবার দেখে ফেলে কাকতালীয়ভাবে। এর কারণ কী, এর সাথে কি জীবনের অর্থের কোন সংস্লিষ্টতা আছে তা জানতে সে একজিজটেনশিয়াল গোয়েন্দা বার্নার্ড এবং ভিভিয়ান জেফির শরণাপন্ন হয়।

i-heart-huckabees-i-love-huckabees

একজিজটেনশিয়াল ডিটেকটিভ বার্নার্ড এবং ভিভিয়ান স্বামী স্ত্রী। তারা জীবনের অর্থহীনতায় ভুগতে থাকা মানুষকে সাহায্য করে থাকে। কেউ তাদের কাছে আসলে কন্ট্রাক্ট সাইনের পর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজ চালাতে থাকে। বার্নার্ডের (ডাস্টিন হফম্যান) জীবন সম্পর্কে ভিউ হচ্ছে অনটোলোজিক্যাল। অনটোলোজি স্বত্তার প্রকৃতি বা অস্তিত্বের প্রকৃতি নিয়ে চিন্তার একটি শাখা। বার্নার্ড মনে করে যে সবকিছু অস্তিত্বগত অন্য সব কিছুর সাথে যুক্ত। বাস্তব জীবনে আমরা কেবল তা বুঝতে পারি না। সে তার ব্ল্যাংকেট থিওরীর মাধ্যমে আলবার্ট মালকোভিচকে ট্রিটমেন্টের চেষ্টা করে। তার মতে এই আত্ম উপলব্ধিই সব সমস্যার সমাধান করতে পারে।

blanket

ভিভিয়ান অন্য দিকে এপিস্টিমোলজিক্যাল। এপিস্টিমোলজি হচ্ছে জ্ঞাণতত্ব। জ্ঞান, এর পদ্বতি, সত্যতা এসবের উপর নির্ভর করে। এজন্য ভিভিয়ান গোয়েন্দার মতো ক্লায়েন্টদের সাথে লেগে থাকে এবং তারা সারাদিকে কি কি কাজ করে তা সব নোট করে রাখে।

একজিজটেনশিয়াল তথা অস্তিত্ববাদী গোয়েন্দা দম্পতি অনটোলজিক্যাল এবং এপিস্টিমোলজিক্যাল – এই দুই ভিন্ন পদ্বতিতে তাদের ক্লায়েন্টের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। ফিল্মের এক পর্যায়ে টমি নামে একজন অগ্নি নির্বাপক কর্মীর আগমন ঘটে। সেও ফিল্মের এক প্রধান চরিত্র। অস্তিত্ববাদী গোয়েন্দা দম্পতির ক্লায়েন্ট ছিল সে। ক্যাথরিন ভুবান নামক এক নিহিলিস্টিক লেখিকার বই “ইফ নট নাও” পড়ে সে জীবনের অর্থহীনতা, থার্ড ওয়াল্ডের শ্রমিক শোষন, পেট্রোলিয়াম রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে অতিরিক্ত হতাশ হয়ে পড়ে। তার তৎপরতা এত বৃদ্ধি পায় যে তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যায়।

huckabee nihilism

টমি জীবন দর্শনের বিজ্ঞান ভিত্তিক বা তথ্য ভিত্তিক অংশটাই গ্রহণ করে, বাকী কিছু গ্রহণ করে না। ফলে তার পক্ষে স্বাভাবিক জীবন যাপন অস্বস্থিকর হয়ে পড়ে। যেমন সে তীব্র পেট্রোলিয়াম বিদ্বেষী যে গাড়ি চড়ে না। তার এই অনুভব সৎ কিন্তু ভালো না তার জন্য। চা শ্রমিকদের মারাত্মকভাবে শোষণ করা হয়, এই জন্য চা খাওয়া ত্যাগ এবং যারা চা খায় তাদের প্রতি আক্রমণাত্মক হলে তা কোন সমাধান হয় না, বরং এতে হতাশাই বাড়ে।

self and other

ফিল্মে টমিকে আলবার্ট মারকোভস্কির আদার বলা হয়। ফেনোমেনোলজিতে আদার বলা হয় সেলফের অপর অংশকে। প্রত্যেক সেলফের অস্তিত্বের জন্য একটা আদার থাকতে হয়। ফিল্মে আলবার্ট সেলফ এবং টমি তার আদার। তারা দুইজন বন্ধু হয়ে যায়।

ফিল্মে তথাকথিত আমেরিকান বা কর্পোরেট মানবিকতার প্রকৃত রূপের উপস্থাপন আছে।

টমি এবং আলবার্ট একসময় আমেরিকান এক পরিবারের সাথে দেখা করে। যারা আফ্রিকান একটি লোককে দত্তক নিয়েছে, যে লোকটিকে কাকতালীয়ভাবে তিনবার দেখার মাধ্যমে জীবন নিয়ে আলবার্টের চিন্তা ঘনীভূত হয়েছিল। এই পরিবারের সাথে কথোপকথনে  তাদের দৃষ্টিভঙ্গী ফুটে উঠেছে। এই সাধারণ আমেরিকানরা মনে করে তারা একজন আফ্রিকানকে দত্তক নিয়ে অনেক বড় ভালো কাজ করে ফেলেছে। আমেরিকা খনিজ সম্পদ, পেট্রোলিয়ামের জন্য আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে রেখেছে, একনায়ক বসিয়ে রেখেছে; এসব তারা সমর্থন করে।

তারা মনে করে এসব তাদের সন্তানদের জানা উচিত নয়। তাদের ছেলেমেয়েরা দত্তক নেয়া আফ্রিকান লোকটার হাইট নিয়ে মজা করে। ( কংগোতে সাম্রাজ্যবাদী, কলোনিয়াল আগ্রাসন নিয়ে ফিল্ম - লিওপল্ডের ভূত।) এতে পুঁজিবাদী মানসিকতায় বাস করা  মানবিকতার নগ্ন রূপ ফুটে উঠেছে। আমেরিকা আফ্রিকা থেকে সম্পদ ডাকাতি করে নিয়ে গিয়ে তাদের দুই পয়সা দান করে। এসব কর্পোরেট ধোঁকাবাজি করা হয় মানবিকতার নাম দিয়ে।

আফ্রিকা থেকে এভাবেই ডাকাতি করে ইউরোপ-আমেরিকা। তারপর তারাই আফ্রিকায় ছোট ছোট দান কার্য, সেবামূলক কর্ম চালায়। এইসব দান কা... Posted by Muradul Islam on Monday, 18 January 2016

brad

অস্তিত্ববাদী দম্পত্তির কাছে ক্লায়েন্ট হিসেবে আলবার্টের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যাডও আসে। তার উদ্দেশ্য জীবনের অর্থ খোঁজা ছিল না। সে ওসব দার্শনিক বিষয় নিয়ে ভাবিত নয়। সে একজন কর্পোরেট আমেরিকান লোক যে প্রতিদিনের সাধারণ জীবন যাপন করে যায়। নিজেকে ইন্টারেস্টিং ভাবে উপস্থাপনের জন্য একই কৌতুক বিভিন্ন সময় বলে। অগভীর কর্পোরেট জনতার প্রতীক চরিত্র।

huckabeees

টমি একসময় অস্তিত্ববাদী গোয়েন্দাদের কর্মকান্ডে বিরক্ত হয়ে তার বন্ধু আলবার্টকে নিয়ে যায় তার প্রিয় লেখিকা ক্যাথরিন ভুবানের কাছে। এই ক্যাথরিন ভুবান একসময় অস্তিত্ববাদী গোয়েন্দা দম্পতির স্টুডেন্ট ছিল। কিন্তু সে এখন তাদের চেয়ে ভিন্ন পন্থায় কাজ করে। ক্যাথরিন ভুবানের দর্শন নিহিলিজম। নিহিলিজম হচ্ছে জীবনের অর্থহীনতা অনুভব করে সব ধর্মীয়, সামাজিক, নৈতিক রীতিনীতি অস্বীকার করা। পশ্চিমে খ্রিস্টানিটিতে দুই পৃথিবীর তত্ত্ব  ছিল। সেটা মতে - বর্তমান পৃথিবী, পৃথিবীর কষ্টভোগ ইত্যাদি এর এক অর্থ আছে এবং এই অর্থ হলো মৃত্যুর পরে হ্যাভেন। এই ধারণা জীবনের এক অর্থ প্রদান করত। নিহিলিজমের ধারনার উদ্ভবের সাথে সাথে খ্রিস্টানিটির দুই পৃথিবীর ধারণা দূর্বল হয়ে পড়ে।

নিহিলিজমের ধারণা ৫০০ বিসির গ্রীক কবি থিয়োগনিস অব মেগারার কবিতায় যেমন ছিল, তেমন টুর্গেনেভের উপন্যাসে এবং পরবর্তীতে নীচার মাধ্যমে শক্তিশালী অবস্থান নির্মান করে। এছাড়া বিজ্ঞানের উত্থান এর পক্ষে অশেষ শক্তি জোগায়। জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞাণ মহাবিশ্বের বিশালতার সাপেক্ষে পৃথিবী এবং মানুষের তুচ্ছতাকে নির্দেশ করে ঠেলে দেয়  কসমিক নিহিলিজমের দিকে।

নিহিলিজমকে নীচা পরিবর্তনের একটা স্তর বলেছেন। তিনি একসময় এর মধ্যে ছিলেন। এবং তার থেকে বেরিয়ে আসার কিছু উপায়ও তিনি বাতলে গেছেন। আই হার্ট হাকাবিজ এর ক্যাথরিন ভুবান তার নিহিলিস্টিক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গীতে প্রভাবিত করে টমি এবং আলবার্টকে। ফিল্মেও আলবার্টও নিহিলিজমের মধ্য দিয়ে যায়।

আলবার্টের প্রতিদ্বন্ধী ব্র্যাড এর গার্লফ্রেন্ড ডন ক্যাম্পবেল, যে হাকাবি কর্পোরেশনের মডেল এবং ভয়েজ অব হাকাবি নামে পরিচিত। ডন একসময় বার্নার্ড জ্যাফির দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সব ছেড়ে দেয়। সে ভাবতে থাকে তার “সেলফ” নিয়ে। তার মডেলিং, পোশাক, মেক আপ ইত্যাদির বাইরে গিয়ে সে নিজেকে অনুভবের চেষ্টা করে। জীবন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গী বদলে যায়। ফলে হাকাবি তাকে বাদ দিয়ে দেয়। ক্যাথরিন ভুবানের নিহিলিস্টিক ফিলোসফি দ্বারা প্রভাবিত হতাশ অগ্নিনির্বাপক কর্মী টমির সাথে তার দেখা হয়। এবং তারা দুজন একে অন্যের প্রেমে পড়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত আলবার্ট তার জীবনের অর্থ খোঁজে পায় বা তার আত্ম উপলব্ধি আসে। নিজে থেকেই আলবার্ট তার শত্রু ব্র্যাডের খারাপ অবস্থা দেখে বুঝতে পারে সেও তার সাথে যুক্ত। সমস্ত মানবজাতির সাথে এভাবেই একজন মানুষ যুক্ত মানুষের কষ্টভোগের মধ্য দিয়ে। এটাই জীবনের অর্থ। পুরো ফিল্ম আলবার্ট মারকোভিচের দার্শনিক ভ্রমণ তথা ফিলোসোফিক্যাল জার্নি। অস্তিত্ববাদী গোয়েন্দা দম্পতি এবং ক্যাথরিন ভুবান এই কেস বন্ধ করে দেন। অর্থাৎ, সমধান হয়ে গেছে তাদের সমস্যা।

সংযুক্তিঃ
এই ফিল্মের শ্যুটিং এ ভিভিয়ান জেফি চরিত্রে অভিনয়কারী লিলি টমলিনের সাথে পরিচালক ডেভিড ও রাসেরলের ঝগড়া হয়। এর লিকড ভিডিও দেখা যেতে পারে।

Share
আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। লিংক শেয়ার করুন, তাতে অন্যরা পড়ার সুযোগ পাবেন।

Related Posts

One Comment

  1. আই হার্&#24...
    September 7, 2016 at 2:47 pm

    […] HOW I AM NOT MYSELF?  […]

Leave A Comment