by

মোহাম্মদ বিন সালমানঃ সৌদি’র জন্য কী অপেক্ষা করছে?

সৌদি আরবের বর্তমান বাদশার বয়েস হয়েছে অনেক। তিন অসুস্থ এবং তার স্মৃতিভ্রমের অসুখ রয়েছে বলে শোনা যায়, যদিও এ নিয়ে অফিসিয়াল কোন মন্তব্য সৌদি আরবের কাছ থেকে জানা যায় নি।

বর্তমান বাদশা সালমান বিন আব্দুল আজিজ ২০১৫ সালে রাজা হন, এবং হয়েই তিনি তার তৃতীয় স্ত্রীর ঘরে জন্ম নেয়া পুত্রধন মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। তখন থেকেই আলোচনায় আসতে শুরু করে মোহাম্মদ বিন সালমানের নাম। তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠতে থাকেন প্রবল ক্ষমতাশালী। ২০১৫ সালেই সৌদি আরব ইয়ামনে হুথি বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

বাদশা সালমান আরেকটি বড় পরিবর্তন আনেন ক্ষমতা কাঠামোতে। তার ছেলে ৩১ বছর বয়সী মোহাম্মদ বিন সালমানকে ক্রাউন প্রিন্স বা যুবরাজ বানান, ভাতিজা ৫৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে। সৌদির এই প্রথম কোন রাজা নিজ পুত্রকে যুবরাজ বানালেন। যুবরাজই হন দেশটির সর্বোচ্চ পদটির উত্তরাধিকারী, সেক্ষেত্রে এমবিএসই হচ্ছেন পরবর্তী সৌদিরাজ। এমবিএস, নামের এই সংক্ষিপ্ত রূপেই ভদ্রলোক পরিচিত হচ্ছেন মিডিয়ায়।

মোহাম্মদ বিন সালমান
ছবিঃ মোহাম্মদ বিন সালমান

আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদ। তার পুত্র ছিল প্রায় ৪৫ জন, এর মধ্যে ত্রিশজনেরও বেশী পুত্ররা আরো পুত্র জন্ম দিয়েছেন। ফলে সৌদি রাজবংশ অনেক বড় এবং বিভিন্ন পারিবারিক ক্ল্যানে বিভক্ত।

সৌদি রাজবংশের শাসন তিনটা জিনিসের উপর প্রতিষ্ঠিত। এক- তাদের পারিবারিক ক্ল্যানগুলির মধ্যে সমঝোতা, নেতৃত্ব মানা। দুই- ইসলামিক কট্টর পন্থা তথা ওহাবী আদর্শ গ্রহণ করেন সৌদি রাজবংশ, তাদের সমর্থনের জন্য। তিন- সৌদির তেলবিক্রির টাকা রাজবংশের পারিবারিক ক্ল্যানদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা।

সৌদি এবং তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলির ধন সম্পদ ও বিলাশবহুল জীবন দেখে মনে হতে পারে তাদের অর্থনীতি খুবই শক্ত। কিন্তু, সৌদি প্রায় পুরোটাই তেলনির্ভর। এদিকে ইউএসএ ফ্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে বেশী তেল তুলতে পারছে, যার ফলে সেখানে হচ্ছে তেল উৎপাদনের শেল বিপ্লব। এর জন্য তেলের দাম বাজারে কমতেই আছে। আজ ব্যারেল প্রতি তেলের যা দাম তা ২০১৪ এর দামের প্রায় অর্ধেক।

সৌরশক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অগ্রগতিও আরেক চ্যালেঞ্জের মুখে টেলে দিয়েছে তেল উৎপাদনকারীদের। আধুনিক ইলেক্ট্রিক গাড়ি প্রযুক্তি এ সংকেত দিচ্ছে যে অদূর ভবিষ্যতে তেল নির্ভরতা আরো কমবে। নরওয়ে ২০২৫ সালের মধ্যে ফসিল ফুয়েল ( তেল গ্যাস ইত্যাদি) দ্বারা চালিত গাড়ি নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে, যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে তা ২০৪০ সাল।

ইতিমধ্যেই সৌদি আরবের ফরেন রিজার্ভ ২০১৪ সালের থেকে তিন ভাগ কমে গিয়েছে। ৭৩৭ বিলিয়ন ডলার থেকে এসে দাড়িয়েছে ৪৩৪ বিলিয়ন ডলারে!

মোহাম্মদ বিন সালমান বা এমবিএস এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে যাচ্ছেন। তেলনির্ভর অর্থনীতি দিয়ে সৌদি আরব আর বেশীদিন চলতে পারবে না, এখনই নানা অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়েছে দেশটি। তাই এমবিএস চাচ্ছেন এই তেল নির্ভরতা থেকে বের হতে ও দেশটিকে আধুনিক শিল্প নির্ভর একটি দেশে পরিণত করতে। তিনি হাতে নিয়েছেন ভিশন ২০৩০ প্রকল্প।

শিল্প নির্ভর দেশ করার জন্য তিনি কিছু সামাজিক পরিবর্তনেও আগ্রহী। যেমন, মহিলাদের অধিকার দেয়া ও তাদের কাজে অংশগ্রহনের সুযোগ দেয়া।

সৌদির তিন ভাগের দুই ভাগ জনগন তরুণ। তারা পরিবর্তন চায়। ফলে এই দলের সমর্থন রয়েছে এমবিএসের প্রতি।

এই সমর্থন কাজে লাগিয়েই এমবিএস অত্যাধুনিক শহর নিওমের পরিকল্পণা হাজির করেছেন। দেশকে শিল্প নির্ভর করতে বিনিয়োগের প্রয়োজন। এই বিনিয়োগের টাকা জোগাতে সৌদি আরামকো নামের বৃহৎ কোম্পানিটির এক অংশ (৫%) তিনি বিক্রি করে দিচ্ছেন। কিন্তু, এই আরামকো হচ্ছে সৌদি রাজবংশের সব সদস্যদের জন্য টাকা জমানো মাটির ব্যাংকের মত, যেখান থেকে তারা লাভ পেয়ে থাকেন। এর একটি অংশ বিক্রি করা মানে তাদের লাভ কমে যাওয়া, ফলে তারা কখনোই এতে খুশি নন।

কিন্তু এমবিএস কারো খুশির দিকে তাকানোর ব্যক্তি নন, অন্তত এখন পর্যন্ত তার কার্যকলাপে এমনই প্রতিয়মান হয়। নভেম্বরের ৪ তারিখে তিনি একটি দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করেন। এর কয়েক ঘন্টা পরেই এক দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে দেশটির বড় অনেক কর্মকর্তা, ধনকুবের প্রিন্সদের গ্রেফতার করা হয়। প্রায় দুইশতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, বন্দি করে রাখা হয়েছে একটি বিলাসবহুল হোটেলে, এবং জব্দ করা হয়েছে প্রায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। সৌদি দুর্নীতি দমন কমিশনের মতে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার দুর্নীতির কারণে লস হয়েছে, এগুলি উদ্ধার করা হবে।

যেহেতু সৌদি সৌদ রাজবংশের পারিবারিক ক্ল্যানদের বাগ বাটোয়ারা ভিত্তিক সমঝোতায় চলে, তাই দুর্নীতি এখানে বিস্তৃত। ফলে এমবিএসের এই হঠাৎ অভিযানের অন্য অর্থও খোঁজা হচ্ছে। ক্ষমতাধর প্রিন্সদের গ্রেফতারের মাধ্যমে এমবিএস নিজের ক্ষমতায় যাবার পথ কাঁটামুক্ত করছেন বলেই মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

তবে এমবিএস এর মতে তিনি দুর্নীতি মুক্ত করে বিদেশী ইনভেস্টরদের আকৃষ্ট করছেন। কারণ তার ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নে বিদেশী ইনভেস্টরদের ইনভেস্টমেন্ট দরকারী। এমবিএসের এই দুর্নীতি দমন অভিযানের সূত্রে জি জিনপিং এর দুর্নীতি দমন অভিযানের কথাটিও আসছে, সেখানেও মিডিয়া ও বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়েছিল ক্ষমতা আরো বেশী কুক্ষীগত করার প্রকল্প, কিন্তু এর ফলে চীনে দুর্নীতি অনেকটা কমেছে।

এমবিএস ভিশনারী, তিনি ভবিষ্যতের জন্য দেশের শক্ত অর্থনীতি নির্মান করতে চান, সামাজিক পরিবর্তন চান কিন্তু তার এসব করার প্রক্রিয়াটি একনায়কসূলভ তৎপরতা। এবং তিনি জনগণের কিছু ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে সমর্থন আদায় করে যাচ্ছেন তার কার্যকলাপের, যেমনটা অনেক একনায়কই করেছেন ইতিহাসে। কিন্তু এমন লোকরঞ্জনবাদী কার্যকলাপের মাধ্যমে ক্ষমতায় গেলে, তিনি কি জনগনের বাড়তে থাকা চাহিদাগুলি পূরণ করে যেতে পারবেন? না পারলে জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে, যখন তাদের আশার সাথে এমবিএসের কাজ মিলবে না। সেই অবস্থায় জনসমর্থন তিনি হারাবেন, কারণ আদৌ তিনি কোন নির্বাচিত নেতা নন।

এদিকে ইয়ামনে হুথি বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধে সৌদি ব্যর্থ হয়েছে। মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ উঠেছে। হুথিদের সাথে ইরানের সম্পর্ক ভালো। সম্প্রতি নভেম্বরের পাঁচ তারিখে ইয়ামন থেকে হুথি বিদ্রোহীরা একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুঁড়ে রিয়াদের উদ্দেশ্যে। হতাহতের খবর পাওয়া যায় নি।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি কয়েকদিন আগে সৌদিতে গিয়ে অদ্ভুতভাবে পদত্যাগ করেছেন। অনেকে বলছেন সৌদি তাকে এ কাজে বাধ্য করেছে, লেবাননে হেজবুল্লাহকে বিপদে ফেলতে। লেবাননে শিয়া ধর্মীয় গ্রুপ হেজবুল্লাহ খুবই শক্ত অবস্থানে, ক্ষমতাসীন দলের সাথে জোটে আছে এবং ইরানের সমর্থনপুষ্ট। লেবাননে হেজবুল্লাহকে মোকাবেলা করার মত একমাত্র শক্তি ইজরাইল। ফলে, এমবিএস নিয়ন্ত্রিত সৌদির সাথে ইজরাইলের সম্পর্ক এখন গাঢ়।

মধ্যপ্রাচ্যে ভালো অবস্থানে এখন ইরান। আভ্যন্তরীন এবং বাইরের নানা ঝামেলা জড়িয়ে পড়ছে এমবিএসের সৌদি আরব। বাইরের শক্তির মোকাবেলা ও ভিতরের বিরোধী শক্তির মোকাবেলা, অর্থনৈতিক ধ্বস সামলে শক্তিশালী অবস্থানে যাওয়া ইত্যাদি একসাথে করা খুবই দুরূহ কাজ। এদিকে তরুণদের সামাজিক পরিবর্তনের দাবীর প্রতি এমবিএসের সমর্থন ইসলামী কট্টর পন্থীদেরও নাখোশ করছে। ফলে, খুবই জটিল এক পরিস্থিতির দিকে দেশকে নিয়ে যাচ্ছেন মোহাম্মদ বিন সালমান, সৌদি আরবের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। এই অবস্থায় তার পিতা, বৃদ্ধ বাদশার মৃত্যু হলে অবস্থা আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে। ভিতরের ও বাইরের ঝামেলা সামলে, দেশকে উন্নতি ও সুষম অর্থনৈতিক ভিত্তির দিকে নিয়ে যেতে পারবেন কি মোহাম্মদ বিন সালমান, নাকী সৌদি আরবের জন্য অপেক্ষা করছে এক নৈরাজ্যজনক ও ভীতিপূর্ন ভবিষ্যত? দেখা যাক।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *