by

চার্লি মাঙ্গারের উপদেশ

চার্লি মাঙ্গার সেই মহান জ্ঞানী ব্যক্তি যারা নিজেদের জ্ঞান দিয়া অন্যদের সাহায্য করতে চান। তার উপদেশাবলী তার দেয়া বিভিন্ন লেকচার এবং তারে নিয়া লেখা বইগুলাতে বর্তমান। আমি সেইসব থেকে একনিষ্ঠভাবে শিখি আর মাঙ্গারের প্রতি শ্রদ্ধা আমার বাড়তে থাকে। চার্লি মাঙ্গার নিয়া এইসব লেখা তার প্রতি আমার শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশএবং তারই উপদেশ মানা। তিনি বলছিলেন জ্ঞান অর্জন হইল নিজে জানা এবং অন্যরে তা জানানি। আরো বলছিলেন, একজন মানুষরে করা আরেকজন মানুষের সর্বোচ্চ সাহায্য হইল তারে জানার সুযোগ কইরা দেয়া।

 

এই লেখায় মাঙ্গারের প্রধান কিছু আইডিয়া আছে।

 

 

কীভাবে আপনি যা চান তা পাইতে পারেন

 

চার্লি মাঙ্গারের মতে এর সবচেয়ে ভালো ও নিরাপদ উপায় হলো আপনি যা চান তার যোগ্য করে নিজেকে গড়ে তোলা। আপনে কোন জিনিস বেঁচতে চান, তাইলে সেই জিনিসই বেঁচেন আপনি ক্রেতা হইলে যা কিনতেন। এমন কোন জিনিস যদি হয় আপনি একই অবস্থায় ক্রেতা থাকলে তা কিনতেন না, তাইলে সে জিনিস বিক্রয় করবেন না।

মাঙ্গার এটারেই বলেন গোল্ডেন রুল। যেকোন পেশার ক্ষেত্রে তা সত্য। এতে খালি মানি লাভ হয় না। লাভ হয় সম্মানও। আপনি লোকের কাছে বিশ্বস্ত হইলেন। যেই বিশ্বস্ততা আপনি প্রত্যাশা করেন। লাইফে এই জিনিস অর্জন করা বিরাট বড় কিছু।

টাকা তো অনেকেই করতে পারে। মাদকের ব্যবসায়ীরা টাকা বানায়, যাদের বিক্রি করা মাদকদ্রব্য কতো লোকের ফ্যামিলিতে অশান্তি ডাইকা আনে। ভূমিখেকোরা, যারা দূর্বলের জমি দখল কইরা পথে নামায়। টাকা তো করতে পারে বেশ্যার দালালেরা, লেখকের টাকা মাইরা দেয়া প্রকাশকেরা বা করাপ্ট পলিটিশিয়ান।

মাঙ্গার বলেন, “এইরকম খচ্চর লোক মাঝে মাঝে পাইবেন যারা অনেক পরিচিত। অনেক ধনী। এদের প্রকৃতি সম্পর্কে আসলে তার চারপাশের সমাজের লোকেরা ভালোই জানে। এরা মারা যাইবার পরে লোকেরা ক্যাথেড্রালে লোকেরা আসে আসলে তার মরারে উদযাপন করার জন্য। এইটা আমারে একটা ঘটনা মনে করাইয়া দিল। এইরকম একটা লোক মারা গেছিল। মন্ত্রী বললেন, “কেউ আগাইয়া আসেন, উনার সম্পর্কে দুইটা ভালো কথা কন।”

ক্যাথেড্রাল নিরব। কেউ আর আসে না। আসে না তো আসে না-ই। পরে একজন লোক আগাইয়া আইলেন। আইসা তিনি বললেন, “যাইহোক, ওর ভাই তার চাইতেও বেশী খারাপ ছিল।”

মাঙ্গার মনে করেন এডমায়রেশন বেইজড লাভের চাইতে বড়ো কোন লাভ নাই। মুগ্ধতা থেকে যেই সম্মানসূচক লাভের তৈরী হয়।  মানুষ এইভাবে অন্য একজন মানুষরে মন থেকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়। মাঙ্গার স্মরণ করাইয়া দেন, এই লাভে যেন সেইসব জ্ঞানীরা থাকেন যারা আর পৃথিবীতে নাই। মারা গেছেন দীর্ঘকাল আগে। রেখে গেছেন তাদের জ্ঞান। সেইসব পইড়া আমরা জ্ঞান অর্জন করতে পারি। চারপাশের জীবন ও জগতরে ভালোভাবে বুঝতে পারি।

লাইফলং লার্নিং অর্থাৎ, নিয়মিতভাবে নয়া জিনিস শিখে যাওয়া, জ্ঞান অর্জনের পক্ষে চার্লি মাঙ্গার। তিনি মনে এছাড়া আর কোন উপায় নাই এই নিয়ত পরিবর্তনশীল এবং অদ্ভুত জগতের বিষয়াদি বুঝার।

 

 

বড় ফিল্ডের বড় তত্ত্বেরা

 

মাঙ্গার মনে করে পৃথিবীতে কোন ঘটনার বিভিন্ন দিক থাকে। অর্থনৈতিক, সামজিক, রাজনৈতিক, বায়োলজিক্যাল ইত্যাদি। তাই কোন একদিক থেকে জিনিসটাকে দেখতে গেলে পুরা চিত্র পাওয়া যাবে না। তাই তিনি সব বড় ফিল্ডের বড় বড় সব তত্ব শিখে নেবার ব্যাপারে মত দেন। তিনি মনে করেন এই বড় সব তত্ত্বেরা ওই ফিল্ডের মোটাদাগে বেশীরভাগই বহন করে।

বড় ফিল্ডের বড় তত্ত্ব শিখে নিলেই খালি চলবে না। এগুলা চর্চা করতে হবে। বিভিন্ন জিনিশ বুঝতে এগুলা প্রয়োগ করতে হবে। যা চর্চা করা হয় না তা হারিয়ে যায়। মাঙ্গার বড় ফিল্ডের বড় সব তত্ত্ব নিয়া মানসিক নকশা বানাইছিলেন তার জন্য। এবং তা প্রয়োগ করেছেন তার নিজের জীবনে, বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে। তার ইনভেস্টমেন্ট ফিলোসফিতে এসব প্রয়োগ করেছেন।

তিনি বলেন, এগুলা আমার লাইফরে করেছে মজার। আমারে করেছে অন্যের কাছে বেশী হেল্পফুল। আমারে করেছে বিরাট বিরাট ধনী। আর কী করেছে- আপনে নাম দেন ওইসবের। এটা দারুণ কাজের।

 

 

জ্ঞাণের বিপদ ও মাঙ্গারের পথ

 

জ্ঞানের বিপদ আছে। আপনি যদি জানতে থাকেন, জানার পিছনে মেধা ও শ্রম দিতে থাকেন তাইলে অনেক কিছু বুঝতে পারবেন। যা আপনারে বিপদে ফেলতেও পারে।

মাঙ্গার একটা ঘটনার কথা বলেন। তার এক কলিগ খুব ভালো ছাত্র ছিল। ল স্কুলে প্রথম। সে অনেক জানত। একজন ইয়াং লইয়ার হিশাবে সে তার জানারে প্রকাশ কইরা বেড়াইত।

একদিন তার সিনিয়র তারে ডাইকা নিলেন। নিয়া বললেন, শোন, তোমারে আমি কিছু কথা কইতে চাই। যেকোন পরিস্থিতিতে তোমার কাম হইল ক্লায়েন্টরে বুঝানি সে দুনিয়ার সবচাইতে স্মার্ট লোক।  এইটা করার পরে কোন এনার্জি অবশিষ্ট রইলে তা দিয়া তোমার সিনিয়ররে বুঝাইবা সে দুনিয়ার সবচেয়ে স্মার্ট লোক। এই দুই কাজ করার পর তোমার জ্ঞান নিয়া যা ইচ্ছা তাই করো।

মাঙ্গার বলেন, হইতে পারে এইটা কোন বিরাট ফার্মে উন্নতি করার পন্থা। কিন্তু এইটা আমি মানি না। আমি আমার প্রকৃতি অনুযায়ী চলি। এইটা যদি কেউ লাইক না করে, না করল; সবার কাছে পছন্দের ব্যক্তি হওয়ার দরকার আমার ছিল না।

এইটা কিন্তু বিপদজনক এক পথ। নিজের প্রতি যদি প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস না থাকে তাইলে এমন পথ নেয়া যায় না।

 

 

ইতিহাস, সিসেরো ও দিন শেষের সফলতা

 

মাঙ্গার সিসেরো’র উক্তির উদাহরণ দেন। সিসেরো ছিলেন রোমান দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, বক্তা। জন্মেছিলেন ১০৬ বিসিতে।

সিসেরো বলেন, “যে লোক জীবনে তার জন্মের আগে ঘইটা যাওয়া দিনগুলির ইতিহাস জানলো না, সে যেন এক বাচ্চার মত জীবন যাপন করলো।”

মাঙ্গার ইতিহাস, দর্শন, বায়োলজি সব ফিল্ডের বড় সব তত্ত্ব আর ঘটনার জানার জন্য উৎসাহ দেন। তিনি বলেন, এইটা এমন জানা না যে খালি তা দিয়া পরীক্ষায় এ পাইতে হবে। এইগুলারে মানসিক নকশাকারে রাখতে হবে মাথায়। এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহার কইরা যাইতে হবে। যদি তা করেন, আমি কথা দিতেছি; একদিন আপনি রাস্তা দিয়া হাটবেন আর পিছনে তাকাইয়া যখন নিজের গত জীবনরে দেখবেন তখন বইলা উঠবেন, “আমার স্বর্গীয় দিনেরা! পুরা জীবনে আমি একজন উপযুক্ত, যোগ্য লোকই ছিলাম, পৃথিবীর অল্প সব লোকদের একজন!” আর এইটা যদি না করেন, তাই অনেক মেধাবীর মাঝারি বা নিম্নমাঝারি হইয়াই থাকবেন পুরা জীবন।

দিন শেষের সফলতা এই যে আপনি যদি পিছনে তাকাইয়া বলতে পারেন, আমার অসাধারন জীবন। আমি পৃথিবীর সব মহৎ জ্ঞানীদের মতই বাইচা ছিলাম এই পৃথিবীতে।

 

ইনভারশন

মাঙ্গারের একটা বিখ্যাত কথা হইল, আমি কোথায় গেলে মারা যামু তা জানতে চাই। তাইলে আমি আর ওইখানে যামু না।

মাঙ্গার আমাদের ইনভার্স করতে বলেন। তিনি বলেন আপনারা বীজগণীতে দেখেন, যেইসব সমস্যা এমনিতে সলভ করা যায় না এগুলা ইনভার্স কইরা করা যায়। লাইফেও এমন হয়।

সফল হইবেন ক্যাম্নে তা না ভাইবা ভাবেন কী করলে আপনি ব্যর্থ হইবেন। এবং তা কইরেন না। তাইলেই তো আপনে সফল।

মাঙ্গার বলেন, ইনভারশন আপনারে সেসব সমস্যা সমাধান করতে সাহায্য করবে যা এমনিতে আপনি করতে পারেন না। যদি না আপনে আইনস্টাইনের চাইতে বেশী স্মার্ট হন।

জীবনে কী আপনারে ব্যর্থতার দিকে নিয়া যাবে? আলস্য আর অবিশ্বস্ততা। আপনি বিশ্বস্ত না হইলে, আপনার আর যা গুণ থাক, গর্তে পড়বেন দ্রুতই। আপনে এড়াইতে চান আলস্য আর অবিশ্বস্ততা।

 

 

আদর্শবাদ লইয়া মাঙ্গারের মত

 

মাঙ্গার এক্সট্রিম আদর্শবাদের বিরুদ্ধে মত দেন। একটা আদর্শ একজনের চোখের চশমা হইয়া যায়। সে সেই চশমার ভিতর দিয়াই তখন সব কিছু দেখে। ফলে এক অদ্ভুত এবং মিথ্যা জগতের ভিতরে সে বান্ধা পইড়া যায়। ইয়াংদের জন্য এইটা এক ভয়াবহ ফাঁদ।

মাঙ্গার ওষুধ দিছেন আদর্শবাদের ভ্রান্তিতে না পড়ার। তিনি বলেন, “কোন মতের পক্ষে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করার আগে, এর বিপক্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী মত যেন আপনি ঐ মতের সমর্থকদের চাইতেও ভালোভাবে বর্ননা করতে পারেন।”

আমরা হুট কইরা আবেগের বশে একটা আদর্শবাদে চইলা যাই। এর বিরুদ্ধ মত দেখার প্রয়োজনও বোধ করি না অনেক ক্ষেত্রে।  এইটা মারাত্মক এবং তার ফল আপনি যেকোন আদর্শবাদীদের আচরণ দেখলেই বুঝবেন।

মাঙ্গার বলেন, কোন এক্সট্রিম আদর্শবাদের নিজেরে ডুবাইয়া না দেয়া জীবনে, খুব খুব এবং খুবই গুরুত্বপূর্ন জিনিশ। যদি আপনে সঠিক জ্ঞাণ অর্জন করতে চান, অন্যদের চাইতে জ্ঞানী হইতে চান; তাইলে আদর্শবাদ ক্ষতিকর।

যেকোন অবস্থানের দুই পক্ষ সম্পর্কে জানতে হবে। আবেগ মিশাইয়া যুক্ত হবার কিছু নাই। নিজের বিবেক বুদ্ধি দিয়া, দুই পক্ষের মত দেইখা পইড়াই আপনি জ্ঞানী হইতে পারেন।

মিশন তো ঠিক করতে হবে। প্রজ্ঞাবান হবেন না কোন মত ও আদর্শের লাঠিয়াল হইবেন।

 

মাঙ্গারিজম-১ঃ জীবনে অব্যর্থ উপায়ে দুর্দশা আনার উপায়

Share

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.