"মানুষের এতো নপর-চপর কিন্তু যখন ঘুমোয়, তখন যদি কেউ দাঁড়িয়ে মুখে মুতে দেয়, তো টের পায় না, মুখ ভেসে যায়। তখন অহংকার, অভিমান, দর্প কোথায় যায়?"- রামকৃষ্ণ

নোয়াহ’র অন্য বয়ান

লেখক এবং পরিচালক আরোনোফস্কির নোয়াহ ফিল্মের বয়ান হুবহু বাইবেলের নোয়াহ’র কাহিনী ধরে নয়। এজন্য খ্রিস্টান ধর্মীয় মহল একে সাদরে গ্রহণ করেন নাই। আব্রাহামিক রিলিজিয়নে নোয়াহ এক গুরুত্বপূর্ন চরিত্র। এছাড়া প্রায় সব ধর্ম এবং মিথে একটি বড় বন্যার কথা আছে। যখন সমস্ত পৃথিবী প্লাবিত হইছিল। বিভিন্ন সময় এর স্বপক্ষে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বিভিন্ন কিছু বের করেন। যাইহোক, বাইবেল মতে নোয়াহ তার বিরাট নৌকায় প্রাণীকূল রক্ষা করেছিলেন। বন্যার পরে জগতে নয়া পৃথিবী শুরু হয়।

নোয়াহ

নোয়াহ ফিল্মে এই কাহিনী সূত্রমাত্র। ফিল্মের মূল দ্বন্দ্ব বা গল্পের ফোকাস এটা নয়। গল্পের মূল বিষয় নোয়াহ’র অন্তর্দ্বন্দ্ব। নোয়াহ’রুপী রাসেল ক্রো স্বপ্নে ঈশ্বরের নির্দেশ পাইয়া তা মানতে শুরু করেন। তার মনে সর্বদা কাজ করে ভয় যে হয়ত গডের কাজ তিনি ঠিকমতো পালন করতে পারতেছেন না।

ফ্লাডের সময় তারা যখন নৌকায় অর্থাৎ নোয়াহ এবং তার পরিবার, তখন বাইরে চিৎকার করে মানুষ মরতেছে। দয়ার্দ্র হৃদয়ের নোয়াহ, পশুপাখি বৃক্ষলতা সহ যাবতীয় প্রাণের প্রতি অপরিসীম দরদ তার। কিন্তু এই মরতে থাকা মানুষগুলারে তিনি তার বৃহৎ নৌকায় তুললেন না। কারণ তাতে অসন্তুষ্ট হইবেন তার আসমানে থাকা ঈশ্বর।

এর পরে দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হইল, যখন তিনি তার আগত ছেলের সন্তানরে মারার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। ঈশ্বরের দেয়া কাজ (ঈশ্বর সরাসরি দেন নাই, তিনি নিজেই কল্পনা করে নিছেন।) পুরোপুরি পালন করতে গিয়া নোয়াহ পরিবারের বিরুদ্ধে খাড়ান। ঈশ্বরের নির্দেশ এবং নাতনিদের প্রতি তার মমতা- এই দুই বিষয় পরষ্পর বিরোধী শক্তি লইয়া নোয়াহ’র ভিতরে খেলা করে। তখন নোয়াহই নায়ক, নোয়াহই ভিলেন হইয়া যান। পরচালক আরোনোফস্কি এই বিষয়টাই দেখাইতে চাইছেন।

এইরকম বিষয় নিয়া আগে একজন লোক চিন্তা করে গেছিলেন। তিনি একজন ডেনিশ ফিলোসফার। নাম তার সোরেন কীর্কেগার্ড, অনেকে লেখেন কীয়ের্কেগার্ড বানানে। ডেনিশ গোল্ডেন এইজে জন্মানো এই দার্শনিককে আধুনিক অস্তিত্ববাদের বাপ বলা হয়।

কীর্কেগার্ড দার্শনিক হেগেলের এথিক্যাল মতের বিরোধীতা করতে গিয়া ফিয়ার এন্ড ট্রেম্বলিং নামে একটা বই লেখেন। যার বাংলা করলে ভয় এবং কাঁপাকাঁপি করা যাবে না কারণ বইখানা দর্শনের দুনিয়ায় গুরুত্বপূর্ন বলে বিবেচিত। সেই বইয়ে কীর্কেগার্ড বাইবেলের আব্রাহাম এবং আইজাকের কাহিনী তুলে ধরে তার ব্যাখ্যা হাজির করেছিলেন। আব্রাহামকে ঈশ্বর নির্দেশ দিয়েছিলেন তার পুত্র আইজাককে উৎসর্গ করতে। কীর্কেগার্ড এই ঘটনার নিরিখে আব্রাহামের পুত্র প্রেম এবং ঈশ্বরের নির্দেশ পালনের ইচ্ছা এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব উপস্থাপন করেছেন। আরো দেখিয়েছেন আব্রাহাম কীভাবে সমস্ত দুনিয়াবী নৈতিকতার উর্ধ্বে উঠে ঈশ্বরের নির্দেশ পালনে উধ্বত হইয়াছিলেন। কীর্কেগার্ড এইখানে হেগেলের নৈতিকতাকে ব্যক্তির বিশ্বাসের বিপরীতে দাড় করাইয়া প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেষ্টা করেন। রাষ্ট্রীয় আইনের বিপরীতে একইভাবে কোন ক্ষেত্রে ব্যক্তির রিলিজিয়াস বিশ্বাস ভিত্তিক ন্যায়নীতি বড় হইয়া উঠতে পারে যা সফোক্লিসের আন্তিগোনিতে আছে।

অনেকে মনে করে শুধু হেগেল বিরোধীতাই কীর্কেগার্ডের এই রচনার উদ্দেশ্য ছিল না। কীর্কেগার্ড একটা মেয়েকে ভালোবাসতেন। তার নাম রেজিনা ওলসেন। রেজিনার সাথে তার বিয়ে ঠিক ছিল। কিন্তু কীর্কেগার্ড হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নেন তিনি বিয়ে করবেন না। রেজিনার সাথে সম্পর্ক ভেঙে দেন। কীর্কেগার্ডের জীবনে এটা একটা দারুণ গুরুত্বপূর্ন বিষয়। কারণ আজীবন তিনি দূর থেকে রেজিনাকে ভালোবাইসা গেছেন।

রেজিনাকে লেখা একটি চিঠিতে তার এপিক লাইন –

“Above all, forget the one who writes this; forgive someone who, whatever else, could not make a girl happy.”

এছাড়া এই সম্পর্কের বিস্তারিত জানতে আমার লেখতে থাকা কীর্কেগার্ড, একটি বৃহদাকার বিড়াল ও আমি ডকুফিকশনটায় চোখ বুলানো যাইতে পারে।

যাইহোক, কীকেগার্ডের রেজিনার সাথে প্রেম ও বিচ্ছেদের গল্প শোনানোর কারণ হল, অনেকে মনে করেন ফিয়ার এন্ড ট্রেম্বলিং এ আব্রাহাম আইজাকের কাহিনীর রূপকে কীর্কেগার্ড তার রেজিনাকে ছাইড়া দেয়ার কাহিনীই বয়ান করছেন। তিনি রেজিনাকে ছাইড়া দেয়াকে এই মহান উৎসর্গের লগে তুলনা কইরা স্বান্তনা পাইছেন বা তার অপরাধবোধের যাতনা থেকে মুক্তি পাইতে চেষ্টা করছেন হয়ত।

কির্কেগার্ডের কথাবার্তা ছিল বিশ্বাসের পক্ষে, বিশেষত তিনি হইলেন খিরিস্টান দার্শনিক। কিন্তু আস্তিক, নাস্তিক সহ নানা ধারার দার্শনিকেরা তার কাজ ও চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত।

নোয়াহ ফিল্মে নোয়াহ’র গল্প নির্মানে কীর্কেগার্ডের চিন্তার প্রভাব ছিল তা বুঝা যায়। তবে নোয়াহ শেষ পর্যন্ত দুনিয়াবি মায়া মমতার কাছে হার মানছেন। এই জন্য তিনি মনে করতেন ঈশ্বরের দেয়া টাস্ক ঠিকমত পালন করতে পারেন নাই। তারপর দেখা যায় পরিবার ছাইড়া গুহায় গিয়া বসেন নির্জনে আর চিরাচরিত প্রফেটিয় ধ্যান ছাড়া দ্রাক্ষারসে মাতাল হইয়া ঈশ্বরের নির্দেশ খুঁজেন। আরোফোনস্কি আধ্যাত্মিকতার লগে মাদকের এমন যে রিলেশন দেখাইলেন তা স্যাম হ্যারিসিও গাঞ্জাবাদী আধ্যাত্মিকতা দ্বারা প্রভাবিত কী না কে জানে।

নোয়াহ ফিল্ম হিসেবে ভালো লাগে নাই। না দেখলেও চলবে টাইপের ফিল্ম মনে হইছে। রাসেল ক্রো এবং জেনিফার কোন্নেলির কিছু জায়গায় অভিনয় ভালো লাগছে শুধু; যা এ বিউটিফুল মাইন্ডের কথা স্মরণ করাইছে। গেম থিওরীতে অবদানের জন্য খ্যাত গণিতবিদ  জন ন্যাশের জীবনের উপর ভিত্তি করে নির্মিত ওই ফিল্মেও তারা জামাই বউ ছিলেন।

Share
মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করে একে আগ্রহী পাঠকের সামনে যেতে সাহায্য করুন।

Related Posts

One Comment

  1. কীভাবে বই পড়তে হয়? | @ মুরাদুল ইসলামের ব্লগ
    February 16, 2016 at 1:22 pm

    […] ধরন নির্ধারিত হবে। ই এল জেমস পড়া আর কীর্কেগার্ড পড়া এক জিনিস নয়। বিনোদন বা তথ্যের […]

Leave A Comment