by

গল্প বলা প্রাণীটি

গল্প

 

একটা বুড়ো লোক, বয়স ষাটের মত, সাদা পাঞ্জাবী পরে একটি বেতের চেয়ারে বসেছিলেন।

প্রশস্ত রাস্তা, তার পাশে সারি সারি দোকান, গাড়ি থেকে নেমে সুশ্রী একটি মেয়ে দোকানগুলির একটিতে প্রবেশ করল।

আকাশে উড়ে গেল একটি চিল, হাতে রক্তাক্ত ছুরি নিয়ে কালো হ্যাটপরা লোকটি চলে যেতে লাগল, যেন এইমাত্র তার আরাধ্য কাজটি সে সমাধা করতে পেরেছে।

 

............

 

............

 

উপরোক্ত লাইনগুলিতে যে বর্ননা আছে তা পড়ে আপনার কী মনে হয়? নিশ্চয়ই আপনি দৃশ্যগুলি কল্পনা করতে পেরেছেন। কিন্তু একটি সমস্যায় এখানে পড়েছেন পাঠক। সমস্যাটি হলো, বুড়ো লোকটি কে? খুব সম্ভবত সুশ্রী মেয়েটিকে খুন করেছে হ্যাটপরা লোকটি। কিন্তু তাদের সংযোগটা কী?

খুব দ্রুতই মস্তিষ্কে এসব প্রশ্নের উদয় হয়। এবং মস্তিষ্ক এসব প্রশ্ন উত্তরহীন থাকবে তা পছন্দ করে না। তাই সে খুব দ্রুত সংযোগ তৈরী করে নেয়। সে কল্পনা করে নেয় তার মত করে। একটা গল্প তৈরী করে নেয়।

আসলে সত্যিকার অর্থে লাইনগুলিতে একক কোন গল্প বলা হয় নি। তিনটি ঘটনাই বিচ্ছিন্ন। এই তিন বিচ্ছিন্ন ঘটনার সাথে একের পর এক সম্মুখীন হয়ে খুব কম মস্তিষ্কই তাদের নিয়ে গল্প না বানিয়ে থাকতে পারবে।

গল্প হচ্ছে সেই বিস্ময়কর জিনিস। যা মানব সভ্যতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষ গল্প তৈরী করে। সেই গল্প তীব্রভাবে বিশ্বাস করে। এমনকী বাস্তবতা তার সামনে উপস্থিত থাকলেও সে গল্পে আশ্রয় নেয়।

সে ঘুমন্ত অবস্থায় গল্প দেখে। জেগে গল্পে আশ্রয় নেয়।

গল্প তাকে তৈরী করে। শুনতে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু তা সত্য। গল্প প্রভাব ফেলে এবং পরিবর্তন করে মানুষের রুচি, আচরন এমনকী তার নৈতিকতা। আপনি কী গল্প পড়েন তা গুরুত্বপূর্ন।

 

গল্প তৈরী মানব মস্তিষ্কের সহজাত প্রবৃত্তি

 

কোন ঘটনা অব্যাখ্যাত থাকবে তা মানব মস্তিষ্কের পছন্দ নয়। সে খুব দ্রুত একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। ড্যান আরিয়ালির অনেস্ট ট্রুথ এবাউট ডিজওনেস্টিতে এই নিয়ে কিছু পরীক্ষা ছিল। নাসিব তালেবের ব্ল্যাক সোয়ান অন্তর্ভূক্ত ন্যারেটিভ ফ্যালাসিও মানুষের গল্প তৈরী করা ফল।

মানুষের সাথে শিম্পাঞ্জীর ডিএনএ স্ট্র্যাকচারের পার্থক্য ১ পয়েন্ট ৬ ভাগ। এই পার্থক্যের কারণেই মানুষের এত উন্নতি, অপর দুই প্রজাতির শিম্পাঞ্জি থেকে। অসাধারন বিজ্ঞানী ও লেখক জ্যারেড ডায়মন্ড ধারণা করেছিলেন এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে কারন এই অল্প পার্থক্যের মধ্যে এমন কিছু ছিল যার জন্য মানুষ ভাষা আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। মানুষের ভোকাল কর্ড পরিণত হয়েছে। মানুষের উন্নতির পিছনে দাঁড়িয়ে আছে ভাষা। কমিউনিকেশন বা ভাষার মাধ্যমে গল্প তৈরী এবং তাতে বিশ্বাস করা প্রজাতি হিসেবে মানুষের উন্নতির কারণ, এমন মনে করে প্রফেসর ইয়্যুবাল নোয়াহ হারারি লিখেছেন তার বই সেপিয়েন্স। তিনি জ্যারেড ডায়মন্ড দ্বারা প্রভাবিত।

 

কন্সপিরেসী থিওরী

 

অনলাইনে প্রায় সব কিছু নিয়ে কন্সপিরেসী থিওরী আছে। ইলুমিনাতি, এলিয়েন, ফ্রী মেসন ইত্যাদি অসংখ্য কিছু। এইসব কন্সপিরেসী থিওরী প্রতিদিন লাখ লাখ শেয়ার হয়। সাধারণ শিক্ষিত মানুষেরা এগুলি বিশ্বাস করছে। এবং তারা যেসব জিনিস বুঝতে পারে না কেন ঘটছে, সেসবের জিনিসের ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছে এসব কন্সপিরেসী থিওরীর মধ্যে। আমাদের দেশে যেমন বর্জ্রপাতে যখন অনেক মানুষ মারা গেল, মানুষ গল্প তৈরী করল ইন্ডিয়া সীমান্ত পিলার তুলে নিয়ে গেছে এজন্য দেশে বর্জ্রপাত হচ্ছে। বর্জ্রপাত কেন হচ্ছে এত বেশী, এই জটিল প্রশ্নের ব্যাখ্যা তাদের দরকার ছিল। পিলার তত্ত্বের গল্প তাদের ব্যাখ্যা দিয়েছে। এই ব্যাখ্যাই তদের স্বস্তি।

 

ফিকশন ভার্সেস নন ফিকশন

আমেরিকান লিটারারী স্কলার জোনাথান গটস্ক্যালের বই স্টোরি টেলিং এনিম্যাল। বইটি খুবই আগ্রহ উদ্দীপক। গল্প এবং মানব সভ্যতা ও মানুষের উপরে তার প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে এতে।

এই প্রযুক্তির যুগে, যখন বই ব্যবসা অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে তখনো তৃতীয় শ্রেনীর স্বস্তা এডাল্ট ফিকশন যত বিক্রি হয়, সমস্ত নন-ফিকশন মিলিয়েও এত বিক্রি হয়। ১৯৬০ সালের দিকে নতুন ধরনের জার্নালিজমের উত্থান হয়, যাতে সত্য কাহিনী গল্পাকারে বলার চল পড়ে। অনেক নন ফিকশনও ফিকশন আকারে হতে থাকে। আমাদের বায়োগ্রামি ভালো লাগে এই কারণে যে তা উপন্যাসের মত। একজন প্রধান চরিত্র, তার স্ট্রাগল, সফলতা এসব আমাদের স্পর্শ করে।

গড়ে একজন আমেরিকান প্রতিদিন পড়েন বিশ মিনিটের উপরে। তা নিউজপেপার, বই সব মিলিয়ে। আর টিভি দেখেন কয়েক ঘন্টার উপরে। এখন তারা স্ক্রীনের সামনে বসে থেকে গল্প গিলেন। আমেরিকান শিশুরা বড় হতে হতে সবচেয়ে বেশী সময় ব্যয় করে টিভি দেখায়, এমনকী স্কুলের চাইতেও তা বেশী।

ডিভিডি আর মুভি থিয়েটার হিসাবে নিলে তা হয় বছরে ১৯০০ ঘন্টা আমেরিকানরা টিভি দেখেন। তা দাঁড়ায় দিনে গড়ে প্রায় পাঁচ ঘন্টার মত।

এই এত সময় যদি কিছু মানুষ গল্প গিলতে থাকেন, তাদের আশা, আকাঙ্খা, স্বপ্ন, নৈতিকতা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে টিভি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গল্পের আকারে তাদের দিতে হবে তা, যেরকম তাদের বানানো অথরিটির অভিলাষ। আমেরিকার প্রায় ৯০ ভাগ টিভি চ্যানেল ও পাবলিশিং কোম্পানি এখন মাত্র ছয়টি কোম্পানীর অধীনে। ১৯৮৩ সালে যেখানে ছিল ৫০ টি কোম্পানি ৯০ ভাগ মিডিয়ার মালিক।

 

 

গল্প কী মানুষের উপর প্রভাব ফেলে?  হাছা নি ইতা?

 

স্টোরি টেলিং এনিম্যাল বইয়ে লেখক লিখেছেনঃ

সাম্প্রতিক কয়েক দশকে টিভি চ্যানেলের বিস্তারের সাথে সাথে মানুষের চিন্তার উপরে গল্পের প্রভাব কী, তা নিয়ে সাইকোলজিস্টেরা সিরিয়াসলি কাজ করতে শুরু করেন। তাদের গবেষনায় নিয়মিতভাবে এবং শক্তভাবে আসছে মানুষের উপরে গল্পের প্রভাবের কথা। গল্প মানুষের আবেগ, অনুভূতি, ভয়, নৈতিক অবস্থান ইত্যাদি দারুণভাবে প্রভাবিত করে, গল্প তার চিন্তাকে আকৃতি দেয়। সেইসব গল্প বইয়ে, টিভিতে বা ভিডিও গেইম যে মাধ্যমেই হোক না কেন। এগুলি মানুষের নৈতিক যুক্তি প্রভাবিত করে; ভয়, আশা এবং উত্তেজনা দিয়ে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে তার আচরন, এমনকী ব্যক্তিত্বও বদলে যায়। গল্প এই যে নিয়ত মানুষকে পরিবর্তন করে চলে তা মানুষ বুঝতে পারে না।

কিন্তু বেশীরভাগ মানুষের মত হল গল্প এবং বাস্তব তারা আলাদা করতে পারেন। তাই তাদের উপরে গল্পের কোন প্রভাব নেই। এই সম্পর্কে গটস্ক্যালঃ

আমাদের বেশিরভাগই মনে করি আমরা ফ্যান্টাসী এবং বাস্তবতাকে আলাদা করতে পারি। কিন্তু গবেষনা দেখাচ্ছে সব ক্ষেত্রে এমন হয় না। আমাদের মানসিক যে পাত্রে ফিকশন এবং নন-ফিকশন মিলেমিশে যায়। ল্যাবরেটরী পরীক্ষায় দেখা গেছে গল্প দিয়ে উদ্ভট জিনিসেও মানুষকে বিশ্বাস করানো সম্ভব হয়। 

তলস্তয় মনে করতেন একজন শিল্পীর কাজ তার আইডিয়া এবং অনুভূতি দিয়ে দর্শকদের আক্রান্ত করা। এই “আক্রান্ত” যত শক্তিশালী হবে, আর্ট তত ভালো। তলস্তয় ঠিক ছিলেন। গল্পের আইডিয়া এবং অনুভূতি দারুণ সক্রামক। এবং মানুষেরা ভ্রান্তভাবে মনে করে এর প্রতিরোধ শক্তি তার আছে খুব বেশী পরিমানে।

যখন আমরা নন-ফিকশন পড়ি তখন আমাদের সব প্রতিরক্ষা বর্ম নিয়ে বসি। আমরা একে সন্দেহপূর্নভাবে দেখি। কিন্তু যখন আমরা ফিকশন বা গল্প পড়ি, তখন বর্মগুলো তুলে রাখি। বুদ্ধিবৃত্তিক বর্মের পরিবর্তে আমরা খুলে দেই আবেগের দরজা। আমরা তখন গল্পের আবেগ দ্বারা তাড়িত হই। এবং এই অবস্থায় আমরা হয়ে পড়ি প্রতিরক্ষাহীন।

 

 

 

হিটলার এবং তার উপর গল্পের প্রভাব

 

স্টোরি টেলিং এনিম্যালে হিটলার সম্পর্কে অল্প কিছু আলোচনা আছে। কীভাবে ওয়াগনারের গীতিনাট্য তার উপর প্রভাব ফেলেছিল। স্লোভানিয়ান ফিলোসফার স্ল্যাভো জিজেক বলেন, নো এথনিক ক্লিনজিং উইদাউট পয়েট। অর্থাৎ, কবি ছাড়া কোন জাতিগত নিধন হয় নি। কবিরা একটা স্বপ্ন দেখান, নিজের জাতির শুদ্ধতা, দেশপ্রেম, গর্ব ইত্যাদি তুলে ধরেন যা মানুষকে জাতিগত নিধনে সাহায্য করে। সম্ভবত এই কারণে প্লেটো তার রিপাবলিকে কবিদের রাখতে চান নি। কবি বা যারা ফিকশন লেখকেরা ব্যক্তির উপরে দারুণ প্রভাব ফেলেন, ব্যক্তির অবচেতনে। হিমলার কীভাবে সৈন্যদের উৎসাহীত করতেন নির্যাতনে প্রাচীন ভারতীয় গল্পের সাহায্যে তা ফ্রেইলটি ফিল্মের আলোচনায় এসেছিল। হিটলারের উপর গল্পের প্রভাব স্টোরি টেলিং এনিম্যাল থেকে ভাষান্তরেঃ

কীভাবে গল্প ইতিহাস ও ব্যক্তিকে বদলে দিতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহর এডলফ হিটলার। রিচার্ড ওয়াগনারের গীতিনাট্যই তাঁকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল তার কাজে। হিটলার নিজেকে ওয়াগনারের নাট্যের নায়ক ভাবতেন, ওয়াগনারকে ভাবতেন গুরু। তার শিল্পের প্রতি ভালোবাসা, তার এইসব গল্প শোনা ও দেখা; তাঁকে ভালো মানুষে পরিণত করে নি। উপরন্তু তিনি যুদ্ধ ডেকে এনেছিলেন যাতে প্রাণ যায় ষাট মিলিয়ন লোকের। এর কারণ পুরোটা গল্পের প্রভাব নয়, কিন্তু গল্পের প্রভাব একেবারে সামান্যও নয়।

হিটলার শিল্পের জন্য, শিল্পের মাধ্যমে শাসন করেছেন। ফ্রেড্রিক স্পটস তার বই হিটলার এন্ড দ্য পাওয়ার অফ এস্থেটিকসে লিখেছেন, হিটলারের মূল লক্ষ্য সামরিক বা রাজনৈতিক ছিল না, ছিল শৈল্পিক। যারা হিটলারে শিল্পের প্রতি টান অগভীর বলে মত দেন তাদের সমালোচনা করে স্পটস বলেন, শিল্পের প্রতি হিটলারের টান তার রেসিজমের মত তীব্র ছিল। একটিকে অস্বীকার করা, অন্যটিকে অস্বীকার করার মত মারাত্মক ভুল।

হিটলারের কাছে শিল্পের মর্যাদা ছিল। তিনি জানতেন গল্পের ক্ষমতা সম্পর্কে। যুবক বয়সে ওয়াগনারের নাট্য তার লক্ষ্য নির্ধারন করে দেয়। তাই তিনি বিরোধী মতের বই গুলি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। ইহুদি, বলশেভিক, সমাজতান্ত্রিক, আধুনিকতাবাদী এবং আন-জার্মান স্পিরিটযুক্ত লেখকদের বই। বিদেশী লেখক হেমিংওয়ে, থমাস মান, জ্যাক লন্ডন সহ আরো অনেক লেখকের বইও পুড়তে থাকে। জার্মান লেখক হেইনরিখ হাইনের বইও ছিল, নাটক আল মানসুর। সেই নাটকের এক লাইন –

যেখানে তারা বই পুড়ায়, সেখানে তারা মানুষও পুড়াবে।

 

মানুষের বাচ্চাদের খেলা

 

দেখা যায়, ছোট মেয়ে বাচ্চাদের খেলা আর ছেলে বাচ্চাদের খেলার পার্থক্য আছে। ছেলেরা যুদ্ধ, এডভেঞ্চার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে খেলে। আর মেয়েরা খেলে তাদের বাচ্চা এবং তার লালন পালন নিয়ে। এই ধরনের খেলার বিশেষত্ব আছে। এগুলি মানুষের বিবর্তনগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। নৃতাত্বিকেরা এমন কোন সমাজ পান নি যেখানে মহিলারা শিকার ও যুদ্ধের সিংহভাগ কাজ করত।

বায়োলজিক্যাল বিবর্তন কালচারাল বিবর্তনের চাইতে ধীর। কালচারালি এখন নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে এমন নয় যে নারীকে ঘরে বসে বাচ্চা পালন করতেই হবে আর পুরুষ বাইরে কাজ করবে। এখন নারীরাও বাইরে কাজ করতে পারেন, অন্তত উন্নত বিশ্বে তারা সম অধিকার পান।

কিন্তু মানুষ বায়োলজিক্যালী এইভাবে এখনো বিবর্তীত হয় নি। ফলে ছেলে ও মেয়ে বাচ্চাদের খেলার যে পার্থক্য তা তাদের ভবিষ্যত জীবনের প্রস্তুতি।

 

মানুষের গল্পে দুর্যোগ

মানুষের গল্পে থাকে ভায়োলেন্স। ভয়ংকর এক অবস্থা তারা গল্পে কল্পনা করে নেয়। রূপকথার গল্প, যেগুলি বাচ্চাদের জন্য তাতেও ভয়াবহতার কমতি থাকে না। গ্রীম ভাইদের রূপকথার বইয়ের প্রথম এডিশনে এই গল্পটি ছিলঃ

এক লোক শুওর জবাই করছিল। তার দু’টি ছেলে তা দেখল। লোকটি চলে যাবার পর এক ছেলে ছুরি হাতে নিয়ে অন্য ছেলেটিকে বলল তুই শুওর হ, আমরা খেলি। ছেলেটি তার ভাইকে জবাই করে ফেলল।  লোকটির স্ত্রী ঘরে তাদের বাচ্চা ছেলেটাকে গোসল করাচ্ছিল। শব্দ শুনে সে বেরিয়ে এল সেখানে। সে সে দেখতে পেল বড় ছেলেটি দ্বিতীয়টিকে জবাই করে ফেলেছে। সে এতই উত্তজিত হল যে ছুরি হাতে নিয়ে অন্য ছেলেটিকেও মেরে ফেলল। তারপর ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখল বাচ্চা ছেলেটি পানিতে ডুবে মারা গেছে। মহিলাটি সহ্য করতে পারল না। সে আত্মহত্যা করল। লোকটি বাসায় ফিরে এসে সব দেখল। এবং সে দুঃখে মারা গেল।

এই যে অদ্ভুত গল্প, মানুষের গল্পগুলি মূলত এইরকম। শিশুদের জন্য রূপকথার গল্প ভয়ংকর ছিল, সেগুলো অনেক এডিট করা হয়েছে। কিন্তু এখনো যে রূপে আছে রাক্ষস খোক্ষস, ড্রাগন, এক মেয়ের মা মারা যায় সৎ মা ও বোনদের অত্যাচার ইত্যাদিই প্রধান।

যেসব বেস্ট সেলার বই, টিভি সিরিয়াল, মিভি ইত্যাদি টপ চার্টে থাকে এরা প্রচুর ভায়োলেন্সে পূর্ন এবং দূর্যোগে পূর্ন। সবকিছু ঠিক ঠাক, কোন ঝামেলা নেই এমন কাহিনী গল্প হিসেবে চলে না। আবার একেবারে সাদামাটা মানুষের জীবন বা হাইপাররিয়ালিজমের গল্পও জনপ্রিয় হয়। গল্পকে সাধারনত বলা হয় এসকেপিস্ট মাধ্যম। মানুষ তার বাস্তব জীবন থেকে পালাতে এর আশ্রয় নেয়। কিন্তু এই গল্পগুলিতে সে পায় আরো কিছু দূর্যোগ, এবং এগুলোর মাধ্যমেই সে তার জীবনের দূর্যোগ থেকে পালায়। পৃথিবীর যে জায়গাতেই হোক, তার ইতিহাসে, লোকগল্পের যত গভীরে যাওয়া যাক না কেন; দেখা যাবে সবার গল্পের মধ্যে মিল আছে। একজন হিরো, তার জীবনে নানা দূর্যোগ আসে এবং সেসবের সাথে যুদ্ধ করে সে জিতে যায়।

 

মানুষের গল্প গেলার প্রবণতা কীভাবে উদ্যোক্তারা ব্যবহার করবেন

একজন উদ্যোক্তা মানুষের কাছে তার সেবা বা পন্য বিক্রি করে থাকেন। ফলে মানুষের প্রকৃতি বুঝা তার জন্য দরকার। মানুষের গল্প শোনার প্রবণতার জন্য উদ্যোক্তা যদি তার কোম্পানি সম্পর্কে গল্পাকারে বলতে পারেন তাহলে মানুষের তা বেশী গ্রহণ করার কথা। শন ক্যালাহানের এনেকডট নামে একটা স্টোরি টেলিং প্রজেক্ট আছে। সেখানে স্টোরি বলা, তার বিভিন্ন ব্যবসায়িক টেকনিক নিয়ে কাজ করা হয়।

কোন উদ্যোক্তা যদি চান তার স্টার্ট আপ টিমে বা কোম্পানিতে যারা কাজ করেন তারা সবাই যেন কোম্পানিকে নিজের মনে করে, তাহলে তিনি গল্প বলার টেকনিকটি চালু করতে পারেন। ধরা যাক, একটি ডেলিভারী সার্ভিস। এপের মাধ্যমে ডেলিভারি অর্ডার নেয়া হয় এবং কোম্পানির ডেলিভারী ম্যানেরা তা বাসায় পৌছে দিয়ে আসে। এই ডেলিভারী ম্যানেরা যদি কোম্পানিকে নিজের মনে করে তাহলে সে তার সেরা সেবা দিবে। অন্য সব পজিশনের ক্ষেত্রেও তা সত্য। একজন ভালো ম্যানেজার কর্মচারীদের কাজ জনে জনে পরীক্ষা করতে পারবেন না। কারণ এটা করতে গেলে ডিজাস্টার হবে। সব বিষয়ে তার জ্ঞান থাকবে না। তার মূল কাজ হবে, কর্মচারীদের মনে এই ধারণা তৈরী করা যে কোম্পানিটি তারও। একজন মানুষ যদি মনে করে কোন জিনিস তার, তাহলে এর ভালোর জন্য সে তার সর্বোচ্চটা দিবে।

ডেলিভারী ম্যানদের সাথে আমাদের উদাহরনকৃত কোম্পানির উদ্যোক্তারা যদি গল্প বলা চালু করতে পারেন, তাহলে ডেলিভারী ম্যানেরা কোম্পানিকে আরো বেশী নিজের মনে করবে। এটা হতে পারে এমন একটা আয়োজন, প্রতিদিন এক গল্প বলা সেশন। আজ কাজ করতে গিয়ে কী কী হয়েছে তা একসাথে বসে সব কর্মচারীরা বলবেন। এইভাবে যেকোন কোম্পানি তার কর্মচারীদের সাথে গল্প পদ্বতি প্রয়োগ করতে পারেন।

ট্র্যাডিশনাল কর্পোরেট পরিবেশের সাথে অবশ্য তা যায় না। কিন্তু স্টার্ট আপের জন্য দরকারী। অন্তঃত স্টার্ট আপের একটি বাইবেল, পিটার থিয়েলের জিরো টু ওয়ানে একটা চ্যাপ্টারই আছে এমন কাজের ভালো পরিবেশ তৈরীর জন্য। তিনি এখানে গুরুত্ব দিতে ছাড় দেন নি।

 

গল্প সম্পর্কে আর কী? 

গল্পে মানুষ মানুষকে খুন করে। ভিলেন মানুষ খুন করে এবং তার বিপরীতে নায়ক ভিলেনকে খুন করে। গল্প হিসেবে বাংলা ফিল্মের কথা ভাবা যাক। শেষ ফাইটের দৃশ্যে কত মানুষ মারা যায়। যারা ভিলেন সাঙ্গ পাঙ্গ। নায়ক বা নায়কেরা এদের খুন করেন। তিনি ওদের জন্য আমাদের কোন মমতার উদয় হয় না। আমাদের সব মায়া মমতা নায়ক  ও তার পরিবারের জন্য। আমাদের ঘৃনা থাকে ভিলেনের জন্য। কিন্তু শেষ দিকের ফাইট দৃশ্যে ভিলেনের সাথের লোকেরা ওদের মৃত্যু আমরা হিসাবেই ধরি না। এর কারণ হল তার বা তাদের গল্প আমাদের জানা নেই। তার গল্প আমাদের কাছে নেই, অর্থাৎ সে আমাদের কাছে মূল্যহীন।

বিভিন্ন দিকের গল্প আছে, তাই এক গল্প থেকে সাবধান। এক গল্প আংশিক চিত্র উপস্থাপন করে।

গল্প সহজ জিনিস নয়। কন্সপিরেসী তত্ত্ব এবং এই ধরনের গল্পের উর্বর ভূমি তৈরী হয়েছে ইন্টারনেটে। তাই গুজব তত্ত্ব  মাথায় রাখতে হবে।

      আমাদের এই পৃথিবী কি কোন গল্প বা সিমুলেশন?

🙂

    আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্নঃ একজিস্টেঞ্জ

      ট্রুমান শোঃ সত্য বাস্তবতা, মিথ্যা বাস্তবতা

Share

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.