"মানুষের এতো নপর-চপর কিন্তু যখন ঘুমোয়, তখন যদি কেউ দাঁড়িয়ে মুখে মুতে দেয়, তো টের পায় না, মুখ ভেসে যায়। তখন অহংকার, অভিমান, দর্প কোথায় যায়?"- রামকৃষ্ণ

সান জু’র সমরবিদ্যা থেকে উদ্যোক্তারা যা শিখতে পারেন

 

প্রারম্ভিক

সান জু তার আর্ট অব ওয়ার লিখেছিলেন খ্রিস্টের জন্মের প্রায় পাঁচশ বছর আগে, এমন ধারণা আছে। সান জু ছিলেন চৈনিক সমরবিদ এবং দার্শনিক। তার এই আর্ট অব ওয়ার যুদ্ধবিদ্যার একটি অন্যতম ক্লাসিক হিসেবে পরিগণিত হয়। পৃথিবীর বড় বড় দেশের জাঁদরেল সব জেনারেলরা, সমরবিদেরা এই বই গুরুত্ব দিয়ে পড়ে থাকেন। এই বই নিয়ে হয়েছে নানা ধরনের গবেষণা এবং এখনো হচ্ছে। সান জু’র বইটি আকৃতিতে ছোট। তিনি সরাসরি কথা বলেছেন, বর্ননা করেছেন যুদ্ধ সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ। আর্ট অব ওয়ার যে কেবলমাত্র যুদ্ধবিদ্যার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এমন নয়, বড় বড় কোম্পানির সিইওরাও এই বই পড়ে থাকেন।

সান জু বা সান জি’র বইটি টিকে আছে হাজার বছর ধরে। জ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। সুতরাং, বই পড়ার সময় ফিল্টারের হিসাব মতে এটি অবশ্যই একটি পড়ার মত বই।

সান জু’র এই বইটি যারা উদ্যোক্তা আছেন বা হতে চান তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য। এখানে কয়েকটি বিষয় আমি তুলে ধরছি, যা খুবই গুরুত্বপূর্ন। কিন্তু কখনোই মনে করবেন না এই লেখাটা বইয়ের সারাংশ অথবা এটি পড়লেই হবে আর বই পড়তে হবে না। বই পড়তে হবে, পুনঃপাঠও আবশ্যক।

 

যা করতে যাচ্ছেন তা ভালোমত জানুন এবং জানতে থাকুন

সান জু কেন এই বই লিখেছিলেন? সেনাপতিদের যুদ্ধ সম্পর্কে জ্ঞান দেবার জন্য। তিনি এ ব্যাপারে বেশ কঠোরভাবেই বলেছেন, যারা তার এই বই পড়বেন না এমন সেনাপতিদের অবসরে পাঠানো উচিত কারণ তারা যুদ্ধের আগেই হেরে বসে আছেন। সান জু’র বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে আছে যুদ্ধ, যুদ্ধের পরিকল্পণা, আক্রমণ, আত্মরক্ষা, নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় রাখা ইত্যাদি সম্পর্কে তার উপদেশ।

প্রথমে আপনাকে জানতে হবে আপনি কী করতে যাচ্ছেন। ভালোভাবেই জানতে হবে।

দ্বিতীয়ত আপনাকে জানা বন্ধ করলে চলবে না। নিয়ম করে এই জানা চালিয়ে যেতে হবে। সান জু শুরুতেই এই কথা বলেন। তিনি সেনাপতিদের নির্দেশ দেন তার বইয়ের বাইরেও আরো জ্ঞান আহরণ করতে যাতে বিচিত্র পরিস্থিতিতে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন।

সান জু প্রথম উপদেশ, যা করতে যাচ্ছেন তা জানুন, এবং সব সময় জানা অব্যাহত রাখুন। আর জানার এক উৎকৃষ্ট এবং সেরা উপায় যে বই পড়া তা কে না জানে!

 

ব্যবসার নৈতিক কারণ কী?

যুদ্ধের জন্য “একটি নৈতিক কারণ” এর কথা বলেছেন প্রথমেই সান জু। আপনার ব্যবসার জন্যও এমন একটি কারণ থাকতে হবে। আলীবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা বলেন, “আমি ভাগ্যবান যে অনেক বিখ্যাত মানুষের সাথে মেশার সুযোগ পেয়েছি যেমন বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট,জ্যাক ওয়েলশ,ল্যারী পেইজ, মার্ক জাকারবার্গ ইত্যাদি। আমি তাদের সবাইকে চিনি।  সাধারণ অন্য লোকদের সাথে এইসব লোকদের একটা বড় পার্থক্য আছে। এরা সব সময় ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী। তারা কখনো অভিযোগ করেন না।  আর এরা অন্য লোকের সমস্যার সমাধান করেন। এবং সুযোগ কোথায় আছে? সুযোগ সেইখানে থাকে যেখানে লোকে অভিযোগ করে। কিছু লোক বসে বসে খালি অভিযোগ করে। ওটাই আপনার কাজের ক্ষেত্র, আপনাকে ভাবতে হবে ওই সমস্যা কি আমি সমাধান করতে পারি। এটাই আমি করেছি।”

মানুষের অভিযোগের সমাধান করা ব্যবসার একটি উদ্দেশ্য। এই সমস্যার সমাধান করাটাকে হলো সান জু’র “নৈতিক কারণ”-এ ফেলা যায়। এই কারণ যত শক্ত হবে ততই আপনি এবং আপনার সাথের লোকেরা কাজের জন্য বেশী অনুপ্রেরণা পাবেন। আপনি আপনার স্টার্টাপ বা ব্যবসা কেবল লাভের জন্যই শুরু করেন নি, এটি অন্যের উপকারও করছে এমন ধারণা ব্যবসার জন্য ভালো।

যারা খুব বেশী মাত্রায় টাকাপন্থী তারা হয়ত বলবেন নৈতিক কারণের দরকার নেই, আমার টাকা হলেই হলো। কিন্তু এ ধরনের চিন্তা খুব কার্যকরী নয়। মানব ইতিহাসে প্রেস্টিজ বা সম্মানের গুরুত্ব মারাত্মক রকম বেশী। এই প্রেস্টিজের জন্যই মানব সভ্যতা গতি পেয়েছে। আগেকার দিনে যে লোকটি শিকার করে এনে সবার সাথে ভাগ করে খেত, সে একটা সম্মান পেত। দলের যুবকেরা তাকে অনুসরণ করত। বই দি সিক্রেট অব আওয়ার সাকসেস এ লেখক জোসেফ হেনরিক জানাচ্ছেন, মানব সভ্যতা এগিয়েছে প্রেস্টিজিয়াস মানুষকে অনুকরণের মাধ্যমে।

স্টার্টাপের মাধ্যমে যারা সমাজের কোন সমস্যার সমাধান করেন, এরা মানুষের সম্মানও পান, ব্যবসায়িক সফলতার সাথে সাথে। তাদের অনুকরন করে অন্যেরা। ফলে একটি উদ্যোক্তা সংস্কৃতি গড়ে উঠে।

 

পরিকল্পনা করুন

সান জু যুদ্ধের আগে পরিকল্পণাকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। পরিকল্পনা ছাড়া কেউ যুদ্ধে জিততে পারবে না। তেমনি কোন ব্যবসা শুরু করার আগে আপনার পরিকল্পনা করতে হবে ঠিকমত।

পরিকল্পণার জন্য সান জু, যুদ্ধের ক্ষেত্রে আবহাওয়া, টেরেইন অর্থাৎ যুদ্ধ হবে যে দেশে তার ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিবেচনায় নিতে বলেছেন বার বার। আপনার ব্যবসার ক্ষেত্রেও এগুলি গুরুত্বপূর্ন।

যে জিনিস অন্য এক দেশে কাজ করেছে তা আপনার ব্যবসা করার স্থলে নাও কাজ করতে পারে। আপনার ব্যবসা স্থলের মানুষের মনস্তত্ব, এখানকার পরিবেশ, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আপনার ধারণা থাকতে হবে, ব্যবসা শুরু করার আগেই।

সান জু সেনাপতিদের নির্দেশ দেন যুদ্ধ জয় করতে হলে সব দিক ভেবে যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য। তারা যেন নানা বিকল্প পন্থা ভেবে রাখেন। যাতে একটা কাজ না করলে অন্যটায় যেতে পারেন অথবা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে পারেন।

স্টার্ট আপের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা দেয়া হয়। কোর্সেরায় অন্ট্রিপ্রেনিউরশিপ নিয়ে ইজরাইলের টেকনিয়ন ইন্সটিটিউটের থেকে একটা কোর্স আছে, ক্র্যাকিং দ্য ক্রিয়েটিভিটি কোড। এর লেকচারে এমিরেটাস অধ্যাপক শ্লোমো মাইতাল জানিয়েছিলেন, আপনার স্টার্ট আপ শুরু করার আগেই আপনাকে ভাবতে হবে আপনি সর্বোচ্চ কত দূর যেতে চান। এরপর সেখান থেকে ধাপে ধাপে ভাবতে ভাবতে পেছনে আসুন। এরকম ভাবলে আপনি বুঝতে পারবেন কোথায় থামতে হবে, আপনার স্পষ্ট ধারণা থাকবে আপনার লক্ষ্য সম্পর্কে।

উদ্যোক্তা

ক্র্যাকিং দ্য ক্রিয়েটিভিটি কোড কোর্সের স্লাইড থেকে নেয়া ছবি।

ক্র্যাকিং দ্য ক্রিয়েটিভিটি কোড নামে বই আছে অধ্যাপক শ্লোমো মাইতাল এবং  এরি রুটেনবার্গ এর লেখা।

কত দূরে আপনি যেতে চান তা আগে থেকেই ভেবে নেয়ার এই চিন্তাটা জেন বুদ্ধিজমেও আছে, আছে প্রাচীন গ্রীসের স্টোয়িক দর্শনে।

অন ট্রাংকুয়েলিটি অব মাইন্ডে সেনেকা বলেন, ‘সব শক্তি একটি কাজের দিকে নির্দেশ করুন এবং শেষটা মাথায় রাখুন। কার্যকলাপ মানুষকে বিব্রত করে না, কোন জিনিস সম্পর্কে ভুল ধারনাই তার অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’

রবার্ট গ্রীনের ৪৮ পাওয়ার অব ল এর ২৯ নাম্বার ল হচ্ছে আগে শেষ পর্যন্ত ভেবে রাখুন। স্টিফেন কভি’র সেভেন হ্যাবিটস অফ হাইলি ইফেক্টিভ পিপল বইয়ের দ্বিতীয় হ্যাবিটই হচ্ছে কোন কাজের শেষপর্যন্ত ভেবে রাখা। ৪৮ পাওয়ার অব ল খুবই ভালো বই। ক্ষমতা অর্জনের ৪৮ টি নিয়ম এখানে উল্লেখ করেছেন লেখক এবং তার স্বপক্ষে ইতিহাস থেকে নানা উদাহরণ দিয়েছেন। ৭ হ্যাবিটস অডিও বুক আকারে বেশ অর্ধেক শুনেছিলাম, একটু বেশী ডেল কার্নেগী ঘরানার মনে হয়েছে।

জেন বুদ্ধিজমে আগে ভেবে রাখার চিন্তাটা একটু অন্যরকম ভাবে আছে। তাদের মত একটি ওক এর বীজ থেকে বড় ওক গাছ হওয়ার প্রক্রিয়ায় দুটি শক্তি কাজ করে। এক বীজের ভিতরের শক্তি। যা থেকে গাছ হয়, আস্তে আস্তে বড় হয়। এই শক্তি সবাই দেখতে পায়। কিন্তু আরেকটি শক্তি আছে, তা হলো ভবিষ্যতের বড় গাছ। ওক এর বীজটি যখন গাছ হয় নি, যখন সে কেবল একটি সতেজ বীজ তখনো ভবিষ্যতের বড় গাছটি অদৃশ্যভাবে অবস্থান করে। সেই গাছটি অদৃশ্যে থেকে বীজটিকে টানে, এবং এই শক্তির ফলেই বীজ থেকে চারা বের হয়, বড় হয়; এবং একসময় সেই বড় গাছে পরিণত হয়।

একজন উদ্যোক্তা এভাবেও ভাবতে পারেন। তিনি একজন ভবিষ্যতের বিলিনিয়ার, তার সেই অদৃশ্য স্বত্তা তাকে টানছে সেইদিকে। যেমন আমি ভাবি নোবেল পুরস্কার টানিছে আমারে...!

 

ম্যানেজমেন্ট

সান জু মনে করেন আপনি অল্প সংখ্যক মানুষ অর্থাৎ পাঁচ দশজনকে চালাতে পারলে বেশী সংখ্যক মানুষকেও চালাতে পারবেন। ম্যানেজমেন্টের জন্য গুরুত্বপূর্ন একটি জিনিস হচ্ছে পুরস্কার ও শাস্তির বিধান। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার প্রদান এবং খারাপ কাজের জন্য শাস্তিকে গুরুত্ব দেন সান জু। তিনি বলেন সেনাপতির সৈন্যদল যদি ১০ টা চ্যারিয়ট আটক করতে পারে তাহলে যেসব সৈন্য প্রথম চ্যারিয়ট আটক করেছে এটা তাদের পুরস্কার দিয়ে দিন।

শাস্তির ক্ষেত্রেও সান জু কঠোর নীতি অবলম্বণ করতে বলেন। তার সম্পর্কে একটি কথিত গল্প এমন, তার বই পড়ে ওউ এর রাজা হো লু তাকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গেলেন। তাকে বললেন, একটি মহড়া দেখাতে। তবে সেখানে সৈন্য হিসেবে থাকবে রাজার নর্তকীরা।

সান জু এতে রাজী হলেন। তিনি রাজার হেরেমের একশো আশি জন নর্তকীকে দু’ভাগ করে কীভাবে কী করতে হবে তা বুঝিয়ে দিলেন। কিন্তু নর্তকীরা হাসে। সান জু তাদের কমান্ড দিলেন। তারা হাসে। সান জু আবার তাদের বুঝালেন। এভাবে পাঁচবার বুঝানো হলো। কিন্তু নর্তকীরা কমান্ড শুনে হেসে গড়াগড়ি খায়।

তখন সান জু নির্দেশ দিলেন, দুই নর্তকী দলের নেত্রীর শিরোচ্ছেদের। পাঁচ বার বুঝানোর পরও যখন কমান্ড মানা হচ্ছে না তখন দোষ দুই দলের দলনেত্রীর।

রাজা তো তখন প্রিয় দুই নর্তকীর মাথা যাবে দেখে বাঁধা দিতে এলেন। কিন্তু সান জু কি আর শুনেন তার কথা! সান জু সাফ জানিয়ে দিলেন, সেনাপতি সেনাবাহিনী চালাতে গিয়ে রাজার সব আদেশ মানতে বাধ্য নন।

সত্যি সত্যিই দুই নর্তকী নেত্রীর মাথা গেল। এরপরে দেখা গেল সবাই ঠিক। সান জু’র আদেশ দিতে দেরী হয়, নর্তকীদের আদেশ পালনে দেরী হয় না। পানিশম্যান্ট বা শাস্তি যে এভাবে কাজ করে তা নতুন কথা নয়। সান জু’র এই গল্পটি কথিত বলে আছে, এরকম সত্যি নাও হয়ে থাকতে পারে। তবে ইতিহাসে নানা সময়ে মারাত্মক অনেক শাস্তির বিবরণ পাওয়া যায়, যেগুলি দেওয়া হত অপরাধীকে কেবল কষ্ট দিতেই নয়, অন্যদের একই ধরনের অপরাধ থেকে বিরত রাখতে। প্রসঙ্গত এখানে স্মরণ করা যায় জর্জ ওয়াশিংটন সৈন্যদল থেকে পালিয়ে যাওয়া একটি খামার বালককে চল্লিশ ফিট উঁচুতে তুলে ফাঁসি দিয়েছিলেন। এই চল্লিশ ফিট উঁচুতে তোলার কারণ হল অন্যেরা যাতে ভয়ে এই কাজ আর না করে।

এখানে শাস্তির আরেকটা ঘটনা মনে পড়ল। যা আছে সৈয়দ মুজতবা আলীর পঞ্চতন্ত্রে। আঠারো শতকে একবার গুজরাতে দূর্ভিক্ষ দেখা দিল। পর পর কয়েকমাস বৃষ্টি না হওয়ায় এই অবস্থা। লোকেরা খাদ্যের আশায় আহমেদাবাদ যাচ্ছে, পিতামাতারা সন্তানদের বিক্রি করে দিচ্ছে এমন অবস্থা। গুজরাতের সুবাদার তখন আহমেদাবাদের সবচেয়ে ধনী শ্রেষ্ঠীকে ডাকিয়ে আনলেন পরামর্শের জন্য। শ্রেষ্ঠীরা জৈন ধর্মের লোক এবং ব্যবসা বাণিজ্য করে অনেক ধনী। ধনী শ্রেষ্ঠী এলে সুবাদার তার কাছে পরামর্শ চাইলেন। শ্রেষ্ঠী বললেন মালওয়া অঞ্চলে প্রচুর ফসল হয়েছে। অনেক গম পাওয়া যাবে। আমি তা আনতে পারব। কিন্তু দুইটা শর্ত মানতে হবে।

সুবাদার বললেন কী শর্ত।

শ্রেষ্ঠী জানালেন যেহেতু দুই প্রদেশে দূর্ভিক্ষ চলছে তাই মাল লুঠ হবার সম্ভাবনা আছে অতএব সাথে ফৌজ পাঠাতে হবে।

দ্বিতীয় শর্ত, গম আনার পর তিনি যে দামে বলবেন মুদিরা যেন সে দামে বিক্রি করে। কেউ বেশী দাম নিলে তাকে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

সুবাদার সানন্দে রাজী হলেন।

শ্রেষ্ঠী তার সঞ্চিত অর্থ নিয়ে গেলেন গম আনতে। তার সাথে গেল ফৌজ। তিনি গম আনলেন নিরাপদেই। এবং এনে কেনা দামেই তিনি ছেড়ে দিলেন মুনাফা ছাড়াই। অনেক লাভ করেছেন জীবনে, এই দুর্ভিক্ষের কালে তার লাভ করার ইচ্ছা ছিল না। নির্দিষ্ট দাম বেঁধে দিলেন এবং যাতে কেউ মজুত করে রাখতে না পারে এজন্য হিসাব করে মুদিদের দিলেন গম। কিন্তু এত সতর্কতা স্বত্ত্বেও দু’জন মুদি বেশী দাম নিচ্ছিল। শ্রেষ্ঠী খবর পেয়ে চটে গেলেন। তিনি তাদের এই হীন কর্মের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেলেন সুবাদারের বাড়ি। গিয়ে বললেন, এদের বিহিত করুন।

সুবাদার আদেশ দিলেন মুদি দু’জনের পেট কেটে দেয়ার জন্য। পেট কাটা হল। তাদের নাড়ি ভুড়ি বের হয়ে গেল। এই অবস্থায় সুবাদার নির্দেশ দিলেন শহরের সবচেয়ে উঁচু দুই উটের পিঠে লাশ দুটি বেঁধে সারা শহর প্রদর্শনের জন্য। সমস্ত রাত ধরে এই কাজ করা হয়েছিল।

এটা করা হয়েছিল যাতে এই ধরনের কাজ আর কেউ করতে সাহস পায়। মুজতবা আলী তার লেখায় জানাচ্ছেন, ঐ ইতিহাসিক যিনি এই ঘটনা লিখেছিলেন তিনি জানিয়েছেন এরপর থেকে অধিক মুনাফার জন্য আর কেউ বেশী দাম নেয়ার সাহস পায় নি।

 

উদ্ভাবনী ক্ষমতা বা ইনোভেটিভনেস

সান জু এমন গ্যারান্টি দেন না যে তার উপদেশগুলি মেনে সব ধরনের যুদ্ধাবস্থা মোকাবেলা করতে পারবেন কোন জেনারেল। বরং, সান জু গুরুত্ব দেন জেনারেল এর নিজস্ব বিচক্ষণতা এবং তার উদ্ভাবনী শক্তির উপরে। তিনি যেন আরো প্রচুর জানতে থাকেন এবং যে পরিস্থিতিই তৈরী হোক না কেন তা মোকাবেলার জন্য নিত্য নতুন উপায় উদ্ভাবন করে যান।

উদ্যোক্তারাও সান জু’র এই উপদেশ আমলে নিতে পারেন। উদ্যোক্তাদের জন্য উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকল্প নেই। তাকে ক্রিয়েটিভ উপায়ে চিন্তা করতে হবে।

 

পরিকল্পণা গোপন রাখুন

আপনি ব্যবসায়ী হলে আপনার পন্য বা সেবা কীভাবে তৈরী করবেন বা কীভাবে তা লোকের কাছে পৌছে দেবেন এই পরিকল্পণাটি আপনি যেন পুরোপুরি প্রকাশ করে না দেন। আপনি কীভাবে কাজ করছেন তা লোকে বাইরে থেকে দেখতে পারবে। কিন্তু ভিতরের পরিকল্পনা যেন সবাই না জানে।

 

শেষকথা

সান জু’র আর্ট অব ওয়ার এ আরো এমন জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আছে। এর অনেকগুলিই মানুষের ব্যক্তিজীবনে, ব্যবসায়িক জীবনে কাজে লাগার মত। সান জু একজন বাস্তব বুদ্ধি সম্পন্ন চিন্তক ছিলেন। তার একটি মূল কথা হলো, সেনাপতি যদি যুদ্ধ করা ছাড়াই কৌশলে শত্রুকে পরাস্থ করতে পারেন অর্থাৎ তার দাবী মানতে বাধ্য করতে পারেন তাহলে সেটাই বড় বিজয়। কারণ যুদ্ধে জয়ী দল এবং পরাজিত দল উভয়েরই ক্ষতি হয়। পিটার থিয়েলের বই জিরো টু ওয়ানের একটি প্রধান কথাই হচ্ছে প্রতিযোগীতা ভালো নয়। প্রতিযোগীতামূলক বাজার লাভ হ্রাস করে। পিটার থিয়েলের কথা হচ্ছে, একটি আনট্যাপড মার্কেট খুঁজে বের করতে হবে এবং তাতে মনোপলি ব্যবসা করতে হবে। তার বই থেকে উক্তি, “তলস্তয় আনা ক্যারেনিনা শুরু করেছিলেন এই বলে যে, “সব সুখী পরিবার একইরকম, কিন্তু সব দুখী পরিবার ভিন্ন ভিন্ন ভাবে অসুখী।” ব্যবসা হলো এর বিপরীত। সব সুখী কোম্পানি ভিন্ন, তারা একেকটি ইউনিক সমস্যা সমাধান করে তাদের মনোপলি অর্জন করে। আর সব ব্যর্থ কোম্পানিগুলি একইরকম, তারা প্রতিযোগীতা থেকে বাঁচতে পারে নি।”

কোম্পানিগুলির মধ্যেকার প্রতিযোগীতাকে যুদ্ধের মত ধরা হলে সান জু’র নীতি এখানে গুরুত্বপূর্ন হিসেবে নেয়া যায়। প্রতিপক্ষের সাথে সরাসরি যুদ্ধে না নেমে চেষ্টা করুণ কৌশলে যুদ্ধ শুরুর আগেই তাকে ধরাশায়ী করার। জেতাটাই মূখ্য, যুদ্ধের আগে জিতলে তা উৎকৃষ্ট। আর যুদ্ধ তথা প্রতিযোগীতা এড়িয়ে যদি ব্যবসা করা যায় তা আরো উত্তম।

 

আর্ট অব ওয়ার বাংলায়

সান জু

সান জু'র আর্ট অব ওয়ার

সান জু’র আর্ট অব ওয়ারের ইংরাজি অনুবাদ সহজলভ্য ইন্টারনেটে। বাংলাতে এর একটি অনুবাদ করেছেন মেজর মোঃ দেলোয়ার হোসেন, পিএসসি। তার অনুবাদটি কেবল সরাসরি সান জু’র অনুবাদ নয়। এতে আধুনিক সমরবিদ্যার নানা দিক থেকে সান জু’র উপদেশাবলী দেখা হয়েছে। এর লেখক সেনাবাহীনির একজন মেজর, ফলে তার বই হয়েছে অসাধারণ। যুদ্ধবিদ্যার নানা বিষয় তিনি সান জু’র উপদেশের আলোকে, এবং ইতিহাসের বিভিন্ন যুদ্ধের উদাহরণ দিয়ে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন। আধুনিক দৃষ্টিকোণে সানজু’র দ্য আর্ট অব ওয়ার নামে বইটি প্রকাশ করেছে বাতিঘর প্রকাশনী।

Share
মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করে একে আগ্রহী পাঠকের সামনে যেতে সাহায্য করুন।

Related Posts

Comments are closed.