by

তালেব ও তার ব্ল্যাক সোয়ান

ধরা যাক, একটি খামারে আছে একদল গরু। তাদেরকে নিয়মিত ভালো খাবার দাবার দেয়া হয়। কোন কাজ করতে হয় না তাদের। খামারের মালিক কেবল খাওয়ায় তাদের। গরুদের মনে বড় সুখ।

প্রায় এগারো মাস এর উপরে গেল এইভাবে, খাওয়া, আরাম আর ঘুম। গরুদের মধ্যে যারা নিজেদের বুদ্ধিমান ভাবে তারা সবাইকে নিয়ে তাদের ভবিষ্যত বিষয়ে ভাবতে বসল।

তারা অতীতের এগারো মাস সময় বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যত অনুমান করল এভাবেই দিন যাবে।

কিন্তু এসে গেল কুরবানির মাস। একদিন মালিক গরুদের বিক্রি করার জন্য বাজারে পাঠাল। ক্রেতারা কিনে নিয়ে গেল। এবং ঈদের দিন গরুদের জীবন যায়, আকস্মিকতার রেশ যায় না।

নাসিম তালেব টার্কি দিয়ে উদাহরণ দিয়েছিলেন তার বই ব্ল্যাক সোয়ানে। আমি সেটাকেই এখানে দিলাম গরু দিয়ে। পয়েন্ট একই গরু বা টার্কি ব্ল্যাক সোয়ানের মুখোমুখি হয়েছে।

ছবিঃ টার্কিদের এক হাজার এক দিনের গ্রাফ, নাসিম তালেবের ব্ল্যাক সোয়ান থেকে নেয়া।

ব্ল্যাক সোয়ান কী?

নাসিম তালেব এর মতে এই বড় বৈশিষ্ট্যগুলো হলোঃ

এক-  ঘটনাটি আগে থেকে অনুমান করা কঠিন।

 দুই-   ঘটনাটি সাধারণের বাইরে, যাকে বলে আউটলায়ার। সাধারণ ঘটনায় যেসব আশা জন্মে তার বাইরে ঘটনাটি অবস্থান করে। যেমন গরুরা সাধারণত স্বাভাবিক আরাম আয়েশে এগারো মাস কাটিয়েছে। তাদের সে অনুযায়ী আশা ছিল এভাবেই সামনের দিন যাবে বা খারাপ হলে অল্প খারাপ। কিন্তু হঠাৎ করে, এত দ্রুত মৃত্যুর ব্যাপারটা অনুমানের বাইরে। ঘটনাটি অবজার্ভারের কাছে হয় বিস্ময় জাগানিয়া।

তিন- ঘটনাটির প্রভাব হয় মারাত্মক।

চার- মানুষের ক্ষেত্রে ব্ল্যাক সোয়ান ঘটনাটি ঘটার পরে মানুষেরা বিভিন্ন বিশ্লেষণ করে দেখায় যে এটা আগে থেকে অনুমান করা যেত। এভাবে তারা ব্ল্যাক সোয়ানকে ব্যাখ্যাযোগ্য এবং অনুমানযোগ্য ভাবতে থাকে। তাদের এই ভুল ধারণা তৈরীর জন্য অর্থনীতি সহ আরো নানা ফিল্ড তারা ব্যবহার করে।

 

টুইন টাওয়ারে হামলা একটি ব্ল্যাক সোয়ান।

কোম্পানি হিসেবে গুগলের আবির্ভাব ব্ল্যাক সোয়ান।

হ্যারি পটারের সফলতা ব্ল্যাক সোয়ান।

 

ইত্যাদি ব্ল্যাক সোয়ান আরো অনেক আছে। তালেব মনে করেন সবচেয়ে বড় ব্ল্যাক সোয়ান ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। কারণ নেপোলিয়নিক যুদ্ধের পরে যখন শান্ত অবস্থা বিরাজিত তখন কেউ ভাবে নি আবার যুদ্ধ হবে। কিন্তু অপ্রত্যাশিত ভাবে যুদ্ধ হয় দুই খন্ডে।

 

আমার এত দিনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমি কখনো দূর্ঘটনার মুখোমুখি হই নি, কোন ধরনের দূর্ঘটনাই নয়। আমি কেবল একটি জাহাজকেই বিপদাপন্ন দেখেছিলাম, কোন জাহাজ দূর্ঘটনা দেখি নি, অথবা কখনো এমন কোন অবস্থায় পড়িনি যে জাহাজ দূর্ঘটনা হতে পারে।

ই জে স্মিথ, ১৯০৭, ক্যাপ্টেন

 

এই ক্যাপ্টেন স্মিথ ১৯১২ সালে একটি জাহাজ চালনা করে দূর্ঘটনায় পতিত হন, সেটি পৃথিবীর সবচাইতে বিধ্বংসী জাহাজ দূর্ঘটনায় পরিণত হয়। জাহাজটির নাম টাইটানিক।

আরেকটি ব্ল্যাক সোয়ান বাংলাদেশের অভ্যুদয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী পড়লেই একজন দেখতে পাবেন পাকিস্তানের প্রতি তাদের কেমন আশা আকাঙ্খা ছিল। পাকিস্তান আন্দোলনের সরাসরি নেতা ছিলেন তারা।

ঐতিহাসিক বা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের যে ব্ল্যাক সোয়ান তা আস্তে আস্তে সংঘটিত হয়।

পাকিস্তানের যখন জন্ম হয় তখন পূর্ব বাংলার মানুষ ভাবে নি বাংলাদেশের জন্ম হবে। মুসলিম লীগের নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব বাংলার মানুষের সমর্থন দেখেই পাকিস্তানের দাবীর প্রতি স্বোচ্চার হতে পেরেছিলেন।

পজেটিভ ব্ল্যাক সোয়ান তার প্রভাব ফেলে ধীরে ধীরে। পক্ষান্তরে নেগেটিভ ব্ল্যাক সোয়ান হয় খুবই দ্রুত, এবং প্রভাব পড়ে সাথে সাথেই।

এইসব ঐতিহাসিক ব্ল্যাক সোয়ান ঘটে যাবার পর, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সহ নানা প্রকার বিশ্লেষণ করে এমনভাবে দেখানো হয়, যেন ঐ ব্যক্তি জানতেন তা ঘটবে।

আসলে তা তিনি জানতেন না। এটা তার হিন্ডসাইট বায়াস।

হিন্ডসাইট বায়াস নিয়ে কায়নেম্যান ও টিভারস্কির রিসার্চ ভিত্তিক বই থিংকিং ফাস্ট এন্ড স্লো’তে বিস্তারিত আছে। কোন একটা ঘটনা ঘটার পর অনেক মানুষ বের হয় যারা বলে আমি জানতাম এটা ঘটবে।

কোন একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে একজন গেলেন। বর কনে দেখে তার মনে হলো এ বিয়ে টিকবে না। কিন্তু বিয়ে টিকে গেল। তখন তিনি ভুলেই যাবেন যে তার একবার মনে হয়েছিল এ বিয়ে টিকবে না।

কিন্তু যদি দেখা যায় ক’দিন পর বিয়েটি ভেঙ্গে যায় তাহলে তার মস্তিষ্ক তাকে জানান দিবে তিনি আগেই ভেবেছিলেন। তখন তিনি অন্যদের বলবেন, হু, আমি আগেই ভেবেছিলাম এমন হবে।

এটাই হিন্ডসাইট বায়াস।

ব্ল্যাক সোয়ান বিষয়ে ঘটনা ঘটার পর ব্যাখ্যা বিশ্লেষনে এই চিন্তাভ্রান্তি বা কগনিটিভ এররও কাজ করে।

অনিশ্চিত পৃথিবী নিয়ে নিশ্চিত ভাবে অনুমান করা ভুল।

যারা সংশয়বাদী আছেন, এবং মনে করেন সব জ্ঞানই পর্যবেক্ষণ জাত প্রমান নির্ভর তাদের ক্ষেত্রে লোকের ধারণা হয় এরা সম্ভবত প্যারানয়েড। কারণ মানব মন অনিশ্চিতকে মেনে নিতে পারে না, যেকোন উপায়েই হোক ব্যাখ্যা পেলে সে স্বস্তি পায়।

অনিশ্চয়তা থেকে নিরাপত্তার জন্য মানুষ যেমন অতি আত্মবিশ্বাসী অনুমানে যায়, ভাবে সে যৌক্তিকভাবে নানা জ্ঞানের ফিল্ড ব্যবহার করে ব্ল্যাক সোয়ান সহ সব ঘটনা বুঝতে পারছে; তেমনি আরেক দল লোক যায় ধর্মের আশ্রয়ে। যেমন গাজ্জালি বা আল গাজেল, এবং তৎপরবর্তী বিজ্ঞান বিরোধী মুসলিম সমাজ।

এই দুই দল দুইভাবে অনিশ্চয়তাবোধ দূর করতে চায়। কিন্তু দুনিয়া ম্যাটেরিয়ালিস্ট, ফলে সে তার নিজ চরিত্র বজায় রাখে এবং অনিশ্চিতই রয়ে যায়।

স্কেপটিসিজম এর পুরোধা দার্শনিক স্কটিশ ডেভিড হিউম। তাকে প্রশ্ন করা হতো, আপনি নিজের জীবন যাপনেও কি এরকম সংশয়বাদ লালন করেন?

হিউম উত্তর দিতেন, অবশ্যই না। কারণ এভাবে সব কিছু নিয়ে সংশয় প্র্যাক্টিস করলে জীবন যাপন অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

নাসিম তালেবের কথা হলো ব্যতিক্রম। তিনি বলেন সংশয়বাদ তিনি প্র্যাক্টিস করবেন, যাতে তিনি গর্দভ না হন। তিনি সত্যিকার (কগনিটিভ বায়াস ও ম্যাথমেটিক্যাল ভুলমুক্ত)  বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য উপাত্তে আগ্রহী। প্রাত্যহীক জীবনের ঘটনায়, বিশেষত গুরুত্বপূর্ন ঘটনায় ও তার বিশ্লেষনে, এর ব্যবহার করতে চান; যাতে তিনি গরু বা টার্কিদের মত ভুল বুঝা থেকে দূরে থাকতে পারেন।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *