by

শহরের সাম্প্রতিক অবস্থা

খুন হয়ে পড়ে আছে একটি মেয়ে
শান্ত নিঃস্তব্দ চেহারা তার
চুলেতে রক্তের দাগ, বয়স আনুমানিক পঁচিশ ছাব্বিশ
রাস্তার ধারে তার এই পড়ে থাকা
অতি অবশ্যই অনাকাঙ্খিত এবং বিষাদ বিষাদ
আমরা জানি না কে বা কারা
অথবা কেন তাকে খুন করে
শহরের এই নিরব রাস্তার পাশে
এই রাতের নির্জনে ফেলে রেখে গেল
আমরা মেয়েটির নামও জানি না
মুখ তার মায়াবি যদিও, তথাপি চেনা যায় না

ডিটেক্টিভ খোরশেদ আলম আসে
গাঢ় চশমার ফাঁক দিয়ে সে সব দেখে
তার এক হাতে ধরা নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যতবানী
অন্য হাতে বোদলেয়ার
মুখে সিগারেট
কখনো কখনো এক বই বগলে রেখে হাত দিয়ে মুখ থেকে সিগারেট বের করে
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে
পরক্ষণেই বই হাতে নেয়, চারপাশে তাকায়
পর্যবেক্ষণী দৃষ্টি তার, অন্তর্ভেদী
রক্তের দাগ দেখে সে, দেখে এক পাশে পড়ে রয়েছে পিস্তল
এস আই জি প্রো সেমি অটোমেটিক
খোরশেদ আলম মাথা চুলকায়
তার বা কাঁধে বসে থাকা পোষা কাক এলান পো
কা কা করে ডেকে ওঠে হঠাৎ

আমাদের শহর ছোট
এখানে যে খুন জখম হয় না তা নয়
কিন্তু এমন মায়াবী চেহারার কোন মেয়ে
এমন নিষ্ঠুরভাবে শেষ কবে খুন হয়েছিল স্মৃতিতে আসে না

শহরের বড় গ্যাংস্টার এজিদ মিস্ত্রাল
প্রায়ই তার দু’নলা শটগান নিয়ে বের হয় কাকশিকারে
শোনা যায় এখন সে আর মানুষ মারে না
কয়েকটি শেয়াল পুষে
এবং রোজ রাতে তাদের ডাকাডাকিতে শহরে চোরেরা আসে না
কুকুরেরা শহরে সংখ্যালঘু হয়ে গেছে অনেক আগেই

খোরশেদ আলম পর্যবেক্ষন শেষে উঠে পড়ে
লাশ পোস্টমর্টেমে পাঠানো হয়
এবং লাশের গায়ে সেঁটে দেয়া হয় জীবনানন্দের কবিতা

খোরশেদ আলম নস্ত্রাদামুসের পাতা উলটে গুম হয়ে বসে থাকে আর মদ খায়
এরই মধ্যে আরেকটি খবর আসে
শহরের দক্ষিণ পাশে নির্জন রাস্তায়
আরেকটি খুন হয়েছে
আরেকটি লাশ পাওয়া গেছে
এবারো একটি মায়াবী মেয়ে
খুন হয়ে পড়ে আছে, বিভৎস
তার বুকের উপর রাখা এঞ্জিনিয়ারিং হাইড্রোলজি বই
খোরশেদ আলমের বিশ্রাম নেই
শহরের প্রধান ডিটেক্টিভ সে
চৌকশ, বুদ্ধিমান
ঘুমিয়ে পড়া পোষা কাক এলান পো’কে টেবিলে রেখেই সে ঘটনাস্থলে চলে যায়

ঘটনাস্থলে মানুষজন নেই
খালি পুলিশের লোক
শহরবাসীরা শান্তিতে ঘুমে
খোরশেদ আলম পর্যবেক্ষণী দৃষ্টিতে তাকায়
এবার সে কোন অস্ত্র পায় না
তবে মেয়েটিকে গুলি করা হয়েছে তা নিশ্চিত
কপালে দেখা যাচ্ছে গুলির দাগ ও রক্ত
একজন লোক পাওয়া গেল যাকে প্রত্যক্ষদর্শী বলা যায়
সে একজন বৃদ্ধ ভিক্ষুক, নাম ডিলান টমাস
ভিক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে সে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল
গুলির শব্দ ও আর্তচিৎকারে জেগে উঠে
কিন্তু সে কিছু দেখে নাই
কারণ সে অন্ধ

খোরশেদ আলম তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে
সে নস্ত্রাদামুসে হাত রেখে বলে
যাহা বলিব সত্য বলিব
ট্রুথ, হোল ট্রুথ, নাথিং বাট ট্রুথ
অতঃপর সে গড়গড় করে বলে যেতে থাকে
এজরা পাউন্ড, উইলিয়াম ব্লেইক, এলিওট, প্লাথ, গিন্সবার্গ, লোরকা
খোরশেদ আলমের মাথা ধরে গেল
সে অন্ধ ভিখারিকে দু পয়সা দিয়ে সরে যেতে চায়
কিন্তু বৃদ্ধ লোকটাকে থামায় সাধ্য কার
সে যেন তখন অন্ধ হোমার

অগত্যা খোরশেদ আলম তার সামন থেকে সরে আসে
ও লাশের সামনে দাঁড়ায়
সেই শেষরাতে, ল্যাম্পপোস্টের আলোতে মৃতদেহটিকে তার কবিতার মত মনে হয়
কিন্তু মেয়েটিকে কে খুন করল বা কেন তা জানা যায় না
অথবা মেয়েটি কে

রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল করছে না
ছোট শহর ঘুমিয়ে গেছে
খোরশেদ আলম ঘড়ি দেখে ও পাশের ড্রেনের কাছে যায়
সেখানে মানুষের মুতের বাসী গন্ধে বাতাস ভারী
এরই মাঝে খোরশেদ অদ্ভুত জিনিসটি পায়
ওয়াটার সাপ্লাই এন্ড স্যানিটেশন এক কপি
বইটি হাতে নিয়ে উলটে পালটে সে খুনের সাথে সেটিকে মেলাতে যায়

একটা গাড়ি এসে থামে
কালো গাড়ি
এর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে এজিদ মিস্ত্রাল
খোরশেদ আলমের সামনে সে হেটে আসে
পিছনে দু’জন লোক, অস্ত্রধারী
খোরশেদ আলম নিজের পকেটে হাত দিয়ে পিস্তল বের করতে যায়
গ্লক ২৭
কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে আসে ক্যাডবেরী চকলেট
পিস্তল সে ভুল করে ফেলে এসেছে
বুদ্ধিমান ডিটেক্টিভ খোরশেদ আলম চকলেটের খোসা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাতে কামড় দেয়
এজিদ মিস্ত্রাল এগিয়ে আসে আর বলে, এসব কী হচ্ছে অফিসার?
শহরে এত খুন হচ্ছে আপনারা কী করছেন? কাঁধে কাক নিয়ে ঘুরে বেড়ালেই কি কাজ হবে?
খোরশেদ আলম কথা বলে না
কাক বিদ্বেষী এজিদ মিস্ত্রালের সাথে তার কোন কথা নাই
তাদের শত্রুতা বেশ পুরনো
যখন মিস্ত্রাল নানাবিদ প্রকাশ্য কুকর্ম করে বেড়াত তখন কয়েকবার তাদের সংঘর্ষ হয়
এজিদ মিস্ত্রালের কাক নিধন প্রকল্পও খোরশেদ আলমের উপর এক ধরনের প্রতিশোধ নেবার জন্য
এমনই মনে করে সবাই
কারণ খোরশেদ আলম কাক ভালোবাসে
আর এজিদ মিস্ত্রাল শহরের সব কাক শেষ করে দিতে চায়

---
থ্রিলার কবিতা
জুন ১৭, ২০১৭

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *