"মানুষের এতো নপর-চপর কিন্তু যখন ঘুমোয়, তখন যদি কেউ দাঁড়িয়ে মুখে মুতে দেয়, তো টের পায় না, মুখ ভেসে যায়। তখন অহংকার, অভিমান, দর্প কোথায় যায়?"- রামকৃষ্ণ

অন্যের মত পরিবর্তন ও নিজে কোন মতের উগ্র সমর্থক না হবেন কী প্রকারে

বিভিন্ন সময়ে আমরা নানা জনের সাথে তর্কে লিপ্ত হই। এটি খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। ব্যবসায় পার্টনারদের মধ্যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে, পরিবারের লোকজনদের মধ্যে পারিবারিক কোন সিদ্ধান্তে অথবা কোন তাত্ত্বিক বিষয়ে বন্ধুদের সাথে আমাদের দ্বিমতের শুরু হতে পারে।

যদি দেখা যায় আপনার বন্ধু বা পরিচিতজন উগ্রভাবে কোন একটা পদ্বতির পক্ষে, আপনি এর বিপক্ষে। আপনি নিশ্চিত আপনার মত ঠিক, আপনার বন্ধু যে মত দিচ্ছে তা উগ্রপন্থা এবং ভুল। কিন্তু আপনার বন্ধু তার সিদ্ধান্তে স্থির ও অবিচল।

এখন তাকে কীভাবে আপনি তার যুক্তির ভুল দেখিয়ে দিবেন?

প্রথমত, সে যে আপাদমস্তক ভুল যুক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে তা দেখানোর চাইতে তাঁকে বুঝান আপনি বুঝতে পারছেন তার অবস্থান। আপনি বুঝতে পারছেন সে যে দিক দিয়ে দেখছে সেইদিক থেকে দেখলে তার অবস্থান অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এই দিকের বাইরেও অন্য আরো দিক আছে। যেসব দিক সে দেখতে পাচ্ছে না বলেই সে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। এরপর অন্য যেসব দিক থেকে তার সিদ্ধান্তটি ভুল তা তাকে দেখিয়ে দিন।

এক্ষেত্রে সে বুঝতে পারবে সে পুরো ভুল করে নি, কেবল সবদিক দেখতে ব্যর্থ হয়েছে। যেহেতু সবদিক দেখতে না পাওয়ার ভুল যে কেউ করতে পারে তাই এতে সে আহত হবে না। এবং সে অধিক সহিষ্ণু ভাবে নতুন মত গ্রহন করতে পারবে।

ব্যবসায় বা পারস্পারিক স্বার্থ সংস্লিষ্ট জায়গায় হুট করে যুক্তি না উড়িয়ে দিয়ে, এভাবে তার যুক্তির ভুল দেখিয়ে দেয়া ভালো ব্যাপার। এতে আপনারা দুজনে বা সবাই মিলে অপেক্ষাকৃত ভালো সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারবেন। সম্পর্কও তিক্ত হবার সম্ভাবনা কমে যাবে।

এই ধারনাটি ১৭ শতকের ফ্রেঞ্চ দার্শনিক, গণিতজ্ঞ, আবিষ্কারক ব্লেইজ প্যাসকেলের। আধুনিক সাইকোলজিস্টেরাও এর কার্যকারীতা দেখতে পেয়েছেন।

প্যাসকেল

ছবিঃ ব্লেইজ প্যাসকেল, ছবি সূত্রঃ উইকিমিডিয়া কমনস

মানুষ যুক্তিতে ভুল হলেও তা আঁকড়ে ধরে থাকে। আপনি যদি প্রথমেই তাঁকে আক্রমণে যান তাহলে সে তার প্রতিরক্ষার সব অস্ত্র নিয়ে দুর্গ গড়ে তুলবে। আপনি যুক্তি দিয়ে, নিরেট সত্য তুলে ধরলেও সে তার মত পরিবর্তন করবে না তখন আর।

কিন্তু যখন আপনি প্রথমে স্বীকার করে নিবেন তার ভালো পয়েন্টগুলো এবং যেসব দিক দিয়ে সে ঠিক, সেইসব দিকগুলো তখন সে হয়ে উঠবে সহযোগীতামূলক। তার যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষামূলক ভাব আসবে না। ফলে, আপনার দেয়া যুক্তি ও দেখানো দিকগুলো সে সহযোগীতামূলক দৃষ্টিতে দেখবে এবং গ্রহনে অধিক আগ্রহী হবে।

 

উগ্রদের মত পরিবর্তনে যা করতে পারেন

 

উগ্রভাবে রাজনৈতিক বা অন্য কোন ধরনের মত যারা লালন করে তারা ইল্যুশন বা বিভ্রান্তিতে অবস্থান করে। তারা সেই বিভ্রান্তিতে থেকেই তাদের মতের পক্ষে অবস্থান নেয়। আপনি পালটা যুক্তি দিলে সে আপনাকে আক্রমণ করবে। আপনার মত শুনবেই না, নেয়া তো দূরের কথা।

পাহাড়

তার মত পরিবর্তনে আপনি যদি সত্যিকারভাবে আগ্রহী হন, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করুন তার মত বা পদ্বতি কীভাবে কাজ করবে। তাকে যদি দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে কীভাবে সে তা পরিচালনা করবে।

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সে প্রথমবারের মত ভাবতে শুরু করবে তার মত কীভাবে কাজ করবে। তখন সে নানা সমস্যার মধ্যে পড়বে। সে অল্প অল্প বুঝতে সক্ষম হবে, সে যেরকম ভেবেছিল এই মত সবদিক দিয়ে একশোভাগ ঠিক, এমন নয়।

লীডস স্কুল অব বিজনেসের গবেষক ফিলিপ বারনাখ ও আরো কয়েকজন গবেষক এ নিয়ে গবেষনা করেছিলেন। তা প্রকাশ হয় এপিএস সাইকোলজিক্যাল সাইন্স জার্নালে। সেখানে তারা বলেছেন, উগ্রভাবে যারা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ বা পলিসি বিশ্বাস করে তারা আসলে সেই পদ্বতি কীভাবে কাজ করবে সে সম্পর্কে জানে না, কিন্তু তাদের মনে হয় তারা জানে। একে বলে ইল্যুশন অব এক্সপ্লেনেটরী ডেপথ। তাদের যখন সেই পদ্বতি কীভাবে কাজ করবে তা ব্যাখ্যা করতে বলা হয় তখন ঐ পদ্বতি সম্পর্কে তারা কত কম জানে, তা তারা বুঝতে শুরু করে। ফলে, তারা উগ্রমতের অবস্থান থেকে অপেক্ষাকৃত মডারেট অবস্থানে সরে আসতে থাকে বা এর সম্ভাবনা তৈরী হয়।

পাহাড়

 

 

নিজে কোন মতের উগ্র সমর্থক না হবার উপায়

মানুষের আরো কিছু সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার আছে যা তাকে কোন মতের পক্ষে উগ্রভাবে অবস্থান নিতে সাহায্য করে। এইসব ব্যাপারগুলি মানুষকে নানা ভুল সিদ্ধান্ত ও সামাজিক, অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়। এগুলো জানা থাকলে এবং এদের সম্পর্কে সচেতন থাকলে একজন ব্যক্তি কোন মতের পক্ষে উগ্রভাবে না দাঁড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করে নিতে পারেন।  উগ্রভাবে কোন মতের সমর্থকদের সাইকোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যঃ

১। সাধারনত ঐসব মানুষেরা তার নিজের কম জানা বা মূর্খতা সম্পর্কে সচেতন নয় (ক্রুগার এবং ডানিং; ১৯৯৯)।

এটি ব্যবসা বা কোন সিদ্ধান্ত গ্রহনে অতিরিক্ত মাত্রায় ক্ষতিকর।  অভার কনফিডেন্স বা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের বায়াসকে শক্তিশালী করে।

চার্লি মাঙ্গার বলেন, আপনার আইকিউ যদি হয় ১৫০ আর আপনি মনে করেন ১৬০ তাহলে আপনি একটা দুর্যোগ। এর চাইতে অনেক ভালো যদি আইকিউ ১৩০ হয় এবং তা ১২০ মনে করা। চার্লি মাঙ্গারের লেকচারঃ জীবনে ব্যর্থ হবার নিশ্চিত উপায় পড়তে পারেন।

২। তারা যে মতের সেই মত সমর্থন করে এমন তথ্যই কেবল খুজতে থাকে ( নিকারসন; ১৯৯৮)।

এ সম্পর্কে পড়ুন কনফার্মেশন বায়াস বিষয়ে। আমরা কোন মত সমর্থন বা ঠিক মনে করলে এর সপক্ষে থাকা যুক্তি, ঘটনা ইত্যাদিই চোখে পড়ে বেশী।

৩। নিজেরা এমনভাবে তথ্য প্রসেস করে যাতে নিজের বর্তমান অবস্থানই আরো শক্ত হয় (লর্ড, রস এবং লেপার; ১৯৭৯)।

সাধারনত মানুষ যা পছন্দ করে সে সম্পর্কে খারাপ অনেক তথ্য সে দেখেও দেখে না। যে জিনিস অপছন্দ করে সে সম্পর্কে অনেক ভালো জিনিসও তার চোখে পড়ে না। সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে এই বায়াস তাকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়।

৪। তাদের সাথেই মিশে যাদের মত তার মতো (ল্যাজার্সফ্যাল্ড এবং মেরটন; ১৯৫৪)।

স্মার্ট হবার একটা উপায় বা সবচেয়ে কার্যকর উপায় নিজের চাইতে স্মার্ট মানুষের সাথে মেশা। আপনি যদি মনে করেন রুমের সবচাইতে স্মার্ট লোক আপনি তাহলে রুম ত্যাগ করুন। তাদের সাথে মিশুন, তাদের লেখা পড়ুন; যারা আপনার চাইতে স্মার্ট। আপনার মত ও চিন্তাকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে রাখুন। পড়তে পারেনঃ স্মার্ট হইবার বাফেট নিয়ম

৫। উগ্রভাবে  কোন মতের সমর্থনকারী লোক মনে করে অন্য মানুষেরাও মত সমর্থনের ক্ষেত্রে তার মতো উগ্র (ভবেন, জাড, শারমান; ২০১২)।

কোন মতের উগ্র সমর্থনকারী সবাইকে ভাবে তার মত উগ্র। অন্যদের তাই সে তীব্রভাবে আক্রমন করতে পিছপা হয় না। অন্যের যুক্তি শোনার তোয়াক্কা করে না। অন্যদের সম্পর্কে সে ভাবে, তার আয়নাতে দেখা প্রতিবিম্বের উপর ভিত্তি করে। ফলে অন্যের অবস্থান নিরপেক্ষভাবে বিচারের সুযোগ থাকে না তার।

Share
মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করে একে আগ্রহী পাঠকের সামনে যেতে সাহায্য করুন।

Related Posts

Comments are closed.