by

উপযোগবাদ ও দশজনরে বাঁচাইতে একজনরে মারা বিষয়ে

ধরা যাক, একটা ট্রেন বা ট্রলি আসছে। ট্র্যাক/রাস্তা বদলানোর সুইচ আপনার হাতে। ট্রলি সামনের দিকে সোজা গেলে পাঁচজন লোক মারা যাবে। আর আপনি সুইচ দিয়ে ট্র্যাক বদলালে অন্য রাস্তায় গিয়ে একজন লোক মারা যাবে।

এখন আপনি কী করবেন?

ট্রলি থামানো/বন্ধ করার সুযোগ নেই।

এই সমস্যাটি প্রথম উপস্থাপন করেন ব্রিটিশ দার্শনিক ফিলিপ্পা ফুট ১৯৬৭ সালে। এরপর থেকে এই সমস্যাটি বিভিন্ন ভার্সনে বহুল ব্যবহৃত হয়। উক্ত পরিস্থিতিতে একজন লোক যে সিদ্ধান্ত নিবেন তা তার “ভালো এবং “মন্দের” বিচার নির্দেশ করে।

আমেরিকান মোরাল দার্শনিক জুডিথ থমসন এই সমস্যাটিকে আরো জটিল করেন। তিনি বলেন, ধরা যাক আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। ট্রলি এগিয়ে যাচ্ছে এবং সামনে পাঁচজন লোক মারা যাবে। আপনার পাশে আছে একজন বিশাল স্থূলকায় লোক। তাকে রাস্তায় ঠেলে দিয়ে আপনি ট্রলি থামাতে পারেন। তখন পাঁচজন লোক বেঁচে যাবে। এই অবস্থায় আপনি কী করবেন?

দেখা গেছে সুইচ বদলানোর ক্ষেত্রে প্রায় নব্বই ভাগ মানুষই সুইচ বদলে একজন মানুষ হত্যা করে পাঁচজনকে বাচানোর পক্ষে থাকেন।

কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, স্থূলকায় লোকটিকে ঠেলে দিয়ে পাঁচজনকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে বেশীরভাগ লোকই রাজী হন না।

ঘটনা আরো জটিল হয়, যদি বলা হয় দুটি রাস্তার একদিকে আছে পাঁচজন লোক আর অন্যদিকে আছে আপনার সবচাইতে প্রিয়জন। এক্ষেত্রে যারা একজন ব্যক্তিকে খুন করে পাঁচজনকে বাঁচিয়েছিলেন, তারা একইভাবে সুইচ বদলাবেন কি?

জুডিথ থমসন আরেক রকম ভাবে এই সমস্যাটিকে উপস্থাপন করেন। ধরা যাক, আপনি একজন খুব ভালো সার্জন। আপনার কাছে পাঁচজন রোগী এসেছে যারা পাঁচটি অর্গান এর জন্য মারা যেতে বসেছে। এখন আপনি আরেকজন লোক আপনার কাছে এলো চেক আপের জন্য, আপনি দেখলেন এর সব অর্গানই ভালো। এবং ধরা যাক ঐ সব মরতে বসা লোকদের সাথে ম্যাচও করল রক্তের গ্রুপ ট্রুপ ইত্যাদি। এখন আপনি কি এই যুবক সুস্থ লোকটির অর্গান নিয়ে ঐ পাঁচজন মরতে বসা লোককে বাঁচাবেন?

এইসব সমস্যার ক্ষেত্রে উপযোগবাদী নৈতিকতা বলে যে, সর্বোচ্চ ভালো যেটার দ্বারা হয় সেটা করতে হবে। ইউটিলিটি বা উপযোগ বাড়ানোই ইউটিলিটারিয়ানিজম বা উপযোগবাদের কথা।

কোন কাজের নৈতিকতা অর্থাৎ নৈতিকভাবে তা ঠিক না বেঠিক তা নির্ধারিত হয় এর ঐ কাজের ফল কী হবে তার দ্বারা।

কনসিকুয়েন্স বা ফলাফল নির্ভর এই নৈতিকতার বিভিন্ন ফর্মের মধ্যে আছেঃ

ইউটিলিটারিয়ানিজম বা উপযোগবাদঃ হিউম্যান ওয়েলফেয়ার/ ওয়েলবিং বাড়ানোই (সর্বোচ্চ) এর উদ্দেশ্য।

হেডোনিজমঃ সুখবাদ। সুখ বাড়ানোই এর উদ্দেশ্য।

উপযোগবাদ সুখবাদ বা ইগোইজম থেকে ভিন্ন। ইগোইজমে যিনি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অর্থাৎ মোরাল এজেন্ট তার স্বার্থই প্রধান।

কিন্তু উপযোগবাদে ব্যক্তির সুখের চাইতে সামষ্টিক সুখকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এখানে যিনি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অর্থাৎ মোরাল এজেন্ট অন্য সবার মতোই একজন, নিজেকে আলাদা গুরুত্ব তিনি দিতে পারেন না।

 

পিটার সিংগারঃ একমাত্র নৈতিক পরম নীতি হলো, আমাদের তাই করা উচিত যা এই কাজের প্রভাব বলয়ের ভিতর থাকা সবার জন্য সর্বোচ্চ ভালোটা নিয়ে আসবে। - সাক্ষাৎকারে পিটার সিংগার

 

ট্রলি ভিত্তিক নৈতিক সমস্যায় উপযোগবাদী নৈতিকতায় একজনকে মেরে পাঁচজনকে বাঁচানোই নৈতিক। অর্থাৎ, সুইচ বদলানো। এমনকী নিজের প্রিয় লোক থাকলেও।

উপযোগবাদের প্রবক্তা হিসেবে বলা হয় দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম এবং স্টুয়ার্ট মিলের কথা। বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম বড় একজন দার্শনিক পিটার সিংগার উপযোগবাদী।

উপযোগবাদ মূলত বড় দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের নৈতিকতা দর্শনের বিপরীত চিন্তা। ইমানুয়েল কান্টের নৈতিকতা অনুযায়ী কিছু জিনিস মানুষ কখনো, কোন অবস্থাতেই করতে পারবে না। যেমন, মানুষ খুন করা। চুরি করা। এমন কাজ একজন করতে পারেন না যা সর্বক্ষেত্রে নিয়ম হিসেবে চালু হোক তা তিনি চান না। ধরা যাক, আপনি চুরি করলেন, এবং আপনি কি চাইবেন চুরি সর্বক্ষেত্রে নৈতিকভাবে চালু হোক? তখন অন্য আরেকজন আপনার কাছ থেকে চুরি করবে, আরেকজন করবে আরো একজনের কাছ থেকে। সামাজিক শৃঙ্খলা থাকবে না। এজন্য কেউই চুরি নৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত হোক চাইবেন না। ফলে কান্টিয়ান নৈতিকতায় এটি অনৈতিক।

যারা ব্যাটম্যান এর ফিল্ম দেখেছেন তারা জানেন ব্যাটম্যান জোকারকে হত্যা করার প্রচুর সুযোগ পেলেও তাকে হত্যা করে না। ব্যাটম্যানের এই কাজ কান্টিয়ান নৈতিকতা অনুসরণ করে।

ব্যাটমান উপযোগবাদী হলে প্রথম সুযোগেই জোকারকে মেরে ফেলত।

 

সব তত্ত্বেরই সমালোচনা থাকে, উপযোগবাদেরও আছে। প্রধান সমালোচনাগুলি হলোঃ

১। কাজের ভবিষ্যত ফলাফল কী হবে তা অনুমান করা কঠিন। [এই ব্লগের নলেজ শেয়ারিং গ্রুপ এক্সপ্লোরিং ন্যাচারাল স্টুপিডিটিতে ট্রলি সমস্যা দিয়ে প্রশ্ন করার পর কিশোর পাশা ইমন তার উত্তর দেবার সময় উপযোগবাদের এই সমস্যা ধরে ফেলতে সক্ষম হন। তার কথা ছিল একজন লোককে যে মারব, পাঁচজনকে বাঁচাতে, এই একজন ঐ পাঁচজনের চেয়ে দুনিয়ার বেশী উপকার যে করতে পারবে না, তার গ্যারান্টি কী? আসলে এই গ্যারান্টি নেই। ভবিষ্যতের গ্যারান্টি দেয়া সম্ভব নয়।]

২। কখনো এমন সিদ্ধান্ত মানবতার বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে।

 

পিটার সিংগার একজন উপযোগবাদী দার্শনিক। তার কিছু মহৎ নৈতিক চিন্তা ইফেক্টিভ অল্ট্রুইজম এর উন্নতিতে বেশী প্রভাব রেখেছে, তা বৈশ্বিক দারিদ্র, প্রাণী অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রচুর অবদান রেখে চলেছে।

ট্রলির যে সমস্যা তা চিন্তা পরীক্ষা হিসেবেই যে আগামীতে থাকবে, এমন নয়। স্বয়ংক্রিয় বা স্বচালিত গাড়ি তৈরীর কাজ চলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের ফলে ভবিষ্যতে হয়ত স্বচালিত গাড়িই দেখা যাবে, এই গাড়িরা উক্ত পরিস্থিতিতে পড়লে কি সিদ্ধান্ত নেবে? তাদের কোডে বা বুদ্ধিমত্তার কী নির্দেশনা সেট করে দেবে মানুষ, এবং এই নির্দেশনা সেট করার নৈতিক ভিত্তি হিসেবে তারা কান্টিয়ান নৈতিকতা মানবে না উপযোগবাদী নৈতিকতা? এসব গুরুত্বপূর্ন প্রশ্নই।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *