হিমুর মনস্তত্ত্ব

সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্যারিশমাটিক চরিত্র হিমু। হিমু একজন যুবক, যার ভালো নাম হিমালয়। তার বাবা, যিনি একজন মানসিক রোগী ছিলেন; তিনি ছেলেকে মহামানব বানাতে চেয়েছিলেন। হিমুর গল্পগুলিতে হিমু কিছু অদ্ভুত কাজ করে, অতিপ্রাকৃতিক কিছু শক্তি তার আছে বলে মনে হয়, কিন্তু সে কখনো তা স্বীকার করে না, এ নিয়ে প্রশ্নের মুখে সে রহস্যময় হাসি হাসে।

হিমু

এই চরিত্রের প্রায় গল্পই সম্ভবত হিমুর নিজস্ব বয়ানে লেখা। হিমুর পোশাক হলুদ পকেটবিহীন পাঞ্জাবি, খালি পায়ে সে হেঁটে বেড়ায়, এবং সে রাতে হাঁটে, সে অদ্ভুতভাবে ভবিষ্যতবানী করে মানুষকে ভড়কে দেয়। সে প্রচুর হাঁটে, ঘরে দরজা জানালা খোলা রাখে রাতেও। এইরকম দৃষ্টি আকর্ষনকারী বৈশিষ্ট্য আর কাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় বা কারা এরকম নানা আচরনের মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষন করতে চান?

সাধারনত কোন কাল্টের নেতা বা পীর  এরকম অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য দেখিয়ে জনগণকে আকৃষ্ট করতে চান।

হিমুর মধ্যে জনগনকে আকৃষ্ট করার তীব্র প্রবনতা আছে। সে মানুষকে তার কথায় “ভড়কে” দিতে পছন্দ করে। হিমুর প্রায় কাহিনীতেই দেখা যায় কিছু মানুষ তার অন্ধ ভক্ত হয়ে যায়। তার খালাত ভাই বাদল তার এক অন্ধ ভক্ত। হিমু তার প্রতি মানুষদের এই অন্ধ ভক্তি পছন্দ করে, উপভোগ করে এবং সে তার ক্যারিশমা দেখিয়ে এই ভক্তির পরিমাণ আরো বাড়িয়ে তুলে।

হিমুর কাহিনীগুলিতে আসলে ভিলেন কারা? যারা হিমুর অতিপ্রাকৃতিক গুনগুলিতে বিশ্বাস করে না। এদের সাথে হিমুর অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হয় আসলে, এবং কাহিনীর পরিক্রমায় এদের কেউ কেউ তার ভক্তে পরিনত হয়।

অবিশ্বাসীদের অবিশ্বাস এবং কাল্ট নেতার অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার মাধ্যমে কারিশমা দেখানো, এই দ্বন্দ্ব কাল্টের দ্বন্দ্ব; কাল্ট নেতা এইরকম দ্বন্দ্বে অবিশ্বাসীদের হারিয়ে ভক্তদের আরো বেশী ভক্তি অর্জন করতে চান, এবং যখন তা হিমুর কাহিনীতে উপস্থাপিত হয় তখন দর্শক কারা বা কাদের কনভিন্স করতে চায় হিমু?

বাস্তব জীবনের পাঠকদের।

হিমু কি এই কাজটি করতে পেরেছে বা এই কাজে সে কি সফল?

জনগনের একটা অংশের উপর সে দারুণ প্রভাব ফেলতে পেরেছে। বাস্তব জীবনে তার কিছু ভক্ত হলুদ পাঞ্জাবী পরে, খালি পায়ে ঘুরে বেড়ায়, হিমু দিবস ইত্যাদি পালন করে। অর্থাৎ, হিমু ক্যারিশমার যে কাল্ট এফেক্ট তা কিছুটা হলেও পড়েছে, অবচেতনে হলেও। বাংলা সাহিত্যের অন্য কোন চরিত্রের ক্ষেত্রে এমন দেখা যায় কি? না, তার কারণ হয়ত অন্য কোন চরিত্রের এই ধরনের ধর্মগুরু’র কাল্ট এফেক্ট নেই।

এক্ষেত্রে বাস্তব জীবনের এক ধর্মগুরু জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তির কথা স্মরণ করা যায়। তার হাজার হাজার ভক্ত ছিল। ১৮৭৫ সালে আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত থিয়োসোফিক্যাল সোসাইটি, যারা একটি ধর্মীয় কাল্ট এবং বিশ্বাস করত মানবতার মুক্তির জন্য দু’জন শিক্ষক এর আগে এসেছেন, এক- শ্রী কৃষ্ণ এবং দুই-যিশু। ১৯০৯ সালে চৌদ্ধ বছরের কৃষ্ণমূর্তির মধ্যে তারা আবিষ্কার করে মানবতার শিক্ষকের তৃতীয় অবতার। তারা তাকে মানবতার শিক্ষকরূপে তৈরী করে। কৃষ্ণমূর্তির হাজারো অনুসারী হয়, কিন্তু ১৯২৯ সালে কৃষ্ণমূর্তি থিয়োসফিস্টদের সাথে তার সব সম্পর্ক ত্যাগ করেন। তিনি প্রচার করতে থাকেন মানুষকে তার নিজের ভিতরেই সত্য খুঁজতে হবে, কোন ধর্মগুরুতে নয়। তার এই মত আরো জনপ্রিয় হয়, তিনি আরো বেশী জনপ্রিয় হয়ে উঠেন, তার অনুসারী সংখ্যা আরো বাড়ে। ১৯৮৬ সালে মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন অন্যতম একজন জনপ্রিয় এবং বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা।

ছবিঃ জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি

এই কৃষ্ণমূর্তির শিশুকালে তার মা মারা যান। ছোট ভাই বোন কয়েকজন মারা যায়। মায়ের মৃত্যু কৃষ্ণমূর্তিকে দারুণভাবে আঘাত করে। তার পুরো জীবনে এর প্রভাব ছিল। তিনি মাতৃত্বের অভাব বোধ করতেন এবং অন্য মহিলাদের মা ডাকতেন। প্রায়ই তিনি তার মৃত মাকে দেখতে পেতেন বলে তিনি বলতেন। শিশুকালে মা হারানোর এই ট্রমা কৃষ্ণমূর্তির যেমন ছিল, হিমুরও তেমনই ছিল।

হিমুর যে শিশুকাল তাকে বলা যায় মারাত্মক ডিস্টার্বড চাইল্ডহুড। তার বাবা ছিলেন একজন মানসিক রোগী। এবং হিমুর কাহিনীগুলিতে এমন আভাস দেয়া আছে যে তার বাবাই তার মাকে খুন করেছেন; কারণ তার মা ছেলেকে মহামানব বানানোর ক্ষেত্রে বাঁধা দিতে পারেন।

অর্থাৎ, হিমুর বাবা ভয়াবহ রকম মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। এর ভয়াবহতা হয়ত বুঝা যায় না হুমায়ূন আহমেদের হালকা হাস্যরস মিশ্রিত ভাষার কারণে। কিন্তু একটু চিন্তা করলেই দেখা যায়, ঘটনা মারাত্মক, এবং হাস্যরসের ব্যাপার নয় কোনমতেই। হিমুর বাবা একটা খুনী সাইকো।

হিমুর একটা কাহিনীতে আছে, ছোটবেলায় হিমু একটা টিয়ে পাখিকে খাচায় রেখেছিল, তার পাখিটা খুব প্রিয় ছিল। হিমুর বাবা গলা টিপে সেই পাখিটা মেরে ফেলেন তার সামনেই।

এই দুইটি ঘটনাতেই স্পষ্ট বুঝা যায় কী ধরনের মানসিক টর্চারের ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে শিশু হিমালয়কে।

হিমুর কাহিনীগুলি মাতৃরূপী কিছু চরিত্র আসে, যেমন মাজেদা খালা। হিমু মাতৃ মমতার ভয়ানক কাঙাল, যার কারণ শিশুকালে তার মা হারানোর ট্রমা। হিমুর একটি কাহিনীতে এক পতিতা তাকে কয়েকটি বাদাম দেয়। হিমু এই মমতাকেও উপেক্ষা করে যায় নি, খুবই গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছে।

এবং আমার ধারণা রূপার সাথে হিমুর যে মিল হয় না, এর কারণও হিমুর মাতৃ মমতার আকাঙ্খা। হিমু এই জিনিসটা জানে, তাই সে চায় না রূপা তা জানুক। ফলে পূর্নভাবে রূপার সাথে মিলন সে চায় না।

এর সাথে বাস্তবের একটা ঘটনা মেলানো যায়। ঘটনাটি ড্যানিশ দার্শনিক সোরেন কীয়ের্কেগার্ডের। সোরেন কীয়ের্কেগার্ডের শিশুকালে তার মা মারা যান, তার ভাইবোন কয়েকজন মারা যান। এবং তার বাবা নিজে এক ধরনের অপরাধবোধে ভুগতেন, তাই তার শিশু পুত্র কীয়ের্কেগার্ডকে কঠিন খ্রিস্টান শাসনের মধ্যে রেখেছিলেন। কীয়ের্কেগার্ডের অন্যসব শিশুদের মত কাপড় পরার অধিকারও ছিল না।

কীয়ের্কেগার্ড

ছবিঃ সোরেন কীয়ের্কেগার্ড

কীয়ের্কেগার্ডের ডায়রি বা জার্নাল পড়লে দেখা যায় তার বাবা কীভাবে তার শিশুকালকে দূর্বিসহ করে তুলেছিলেন। আবার এই কীয়ের্কেগার্ডই বলেছেন তার সব কিছুই তার বাবার জন্য হয়েছে। কীয়ের্কেগার্ডের লেখায়ঃ

I Owe Everything to my Father

এখানে হিমুর সাথে কীয়ের্কেগার্ডের অসাধারন মিল। হিমুও দেখা যায় তার বাবার অদ্ভুত কার্যাবলীর কথা উল্লেখ করলেও বাবাকে দোষারূপ করে না। বাবাকে সে তার গুরুর মত উপস্থাপন করে। এবং তার বাচনে মনে হয় সে তার বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ।

কীয়ের্কেগার্ড একবার একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। মেয়ের নাম রেজিনা ওলসেন। তিনি মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেন, মেয়ের বাবাকে দেন। তারা এক পর্যায়ে রাজী হন। এংগেজমেন্ট হয়। কিন্তু এরপরই কীয়ের্কেগার্ড এংগেজমেন্ট ভেঙ্গে দেন। রেজিনা আত্মহত্যার ভয় দেখান, রেজিনার বাবা লোকলজ্জ্বার ভয় দেখান কিন্তু কীয়ের্কেগার্ড তার মত বদলান নি। তিনি রেজিনাকে বিয়ে করেন নি এবং আর কাউকেই বিয়ে করেন নি। তার লেখায় দেখা যায় পুরো জীবনই তিনি রেজিনাকে ভালোবেসেছেন। বলা হয়ে থাকে আর কোন পশ্চিমা দার্শনিকের উপরে কোন নারীর এমন প্রভাব পড়ে নি।

কীয়ের্কেগার্ডের রেজিনাকে এই দূরে সরিয়ে দেয়া আর হিমুর রূপাকে দূরে সরিয়ে রাখার মিল আছে। কারণ আমরা যতটুকু জানি, তারা দু’জনই তাদের আবেগের দিক থেকে অসৎ নন।

আমার ধারনা কীয়ের্কেগার্ড তার উপরে তার চাইল্ডহুড ট্রমার প্রভাবটা বুঝতে পেরেছিলেন এবং এজন্যই তিনি রেজিনাকে তার জীবনের সাথে জড়াতে চান নি। হিমুর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই বলে আমি মনে করি।

কিন্তু হিমু কি সত্যি সত্যি এমন যাদুকরি ক্ষমতার অধিকারী? এবং তার চেয়ে বড় কথা হিমু যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে সেটাই কি তার প্রকৃত চিত্র?

এর উত্তরে আবার হিমুর শিশুকালের দিকে তাকাতে হবে।

যখন একটি শিশু বাচ্চা অবস্থায় থাকে, তখন থেকেও তার ভিতরে সম্পর্কের জন্য একটি টান উপস্থিত থাকে। জার্মান দার্শনিক মার্টিন বুবার তার আই এন্ড দউ তে তা এভাবে উল্লেখ করেছেনঃ

“The innateness of the longing for relation is apparent even in the earliest and dimmest stage. Before any particulars can be perceived, dull glances push into the unclear space toward the indefinite; and at times when there is obviously no desire for nourishment, soft projections of the hands reach aimlessly to all appearances, into the empty air towards the indefinite.”

শিশুর এই যে আত্মিক প্রেরণা শুরু হয় তার মায়ের সাথে সম্পর্ক তৈরীর মাধ্যমে এবং চারিদিক দেখার এবং সৃষ্টির স্বাভাবিক প্রবৃত্তির জন্য। একটি বাচ্চা জন্ম থেকেই ক্যারিশম্যাটিক। তার হাসি বা স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্ম মানুষকে তার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। তার মা এবং অন্যেরা এগুলি লক্ষ্য করেন এবং তাকে ভালোবাসেন; অর্থাৎ সে পর্যাপ্ত মনযোগ পায় অন্যের। কিন্তু শিশুকালে কোন বাচ্চা যদি এগুলি থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তার মনযোগ পাবার আকাঙ্খাটি অতৃপ্ত রয়ে যায়। এবং পরিণত বয়েসে তা আরো শক্তিশালী হয়ে দেখা দিতে পারে, তখন ঐ ব্যক্তিটি নিজেকে “ক্যারিশম্যাটিক” ভাবে উপস্থাপন করার তাগিদ অনুভব করে। সে বৃহত্তর মানবতার সাথে নিজেকে ‘একাত্ম’ করতে যেতে পারে ধর্ম, রাজনীতি, সাহিত্য, গান বা ফিল্মে।

দার্শনিক বুবারের আত্মজীবনীকার মরিস ফ্রীডম্যান জানান, বুবারের দর্শন চিন্তা বিচ্ছুরিত হয়েছে তার শিশুকালের মারাত্মক ট্রমা থেকে। তিন বছর বয়েসে তার মা হারিয়ে যান। অনেক অনেক বছর পরে বুবার তার দেখা পেয়েছিলেন।

ক্যারিশমা

একই ধরনের ডিস্টার্বড চাইল্ডহুড দেখা যায় চার্লি চ্যাপলিন, এডলফ হিটলার, চার্চিল এবং আরো অনেকের। সাইকোলজিস্ট ডেবিড আবারব্যাখ ডিস্টার্বড চাইল্ডহুডের শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন এবং সাহিত্য, শিল্প, ধর্ম ও রাজনীতির জগতে ক্যারিশমাটিকদের জীবন ও কাজ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন তাদের শিশুকালের ট্রমাগুলির প্রভাব তাদের পরবর্তী জীবনের ক্যারিশমাটিক আচরনে ছিল প্রভাববিস্তারী।

এই প্রেক্ষাপট থেকে যদি হিমু চরিত্রটিকে দেখা যায় তবে তার রহস্যময় আচরনের একটা ব্যাখ্যা দাড় করানো যায়। হিমুর রহস্যময় আচরণগুলি বা মানুষকে ভড়কে দেবার প্রবণতা অথবা অন্যদের ভক্তি পাওয়ার প্রবণতা তার চাইল্ডহুড ট্রমারই প্রভাব, এবং খুব সম্ভবত সে নিজেকে তার নিজের বয়ানে যেভাবে উপস্থাপন করে সে তেমন নয়।

চার্লি চ্যাপলিনের বড় ট্রমাটি ছিল তার মায়ের পাগল হয়ে যাওয়া এবং এই ব্যাপারটি তার সারা জীবনের চিন্তা ও কাজে প্রভাব বিস্তার করেছে। তার আত্মজীবনী শুরুই হয়েছে এই লাইন দিয়ে, “আমার মা উন্মাদ হয়ে যান যখন আমি বালক।” এর আগে তার যখন এক বছর বয়স তখন তার মা ও বাবার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। পরবর্তীতে তার বাবা মারা যান। এরপরে একসময় তার মা পুরোপুরি পাগল হয়ে যান। চার্লি চ্যাপলিনের ছেলে চ্যাপলিন জুনিয়র এভাবে লিখেনঃ

“Motherless and fatherless - perhaps those words sum up the greatest lack my father felt in childhood.”

চ্যাপলিন এক ধরনের অপরাধবোধে ভুগতেন, তিনি মনে করতেন তার জন্যই তার মা পাগল হয়ে গেছেন। তিনি মনে করতেন তিনি এর জন্য দায়ী। এছাড়া তিনি তার মাকেও দোষারূপ করতেন পাগল হয়ে তাকে এভাবে ফেলে চলে যাবার জন্য।

চার্লি চ্যাপলিন

ছবিঃ চার্লি চ্যাপলিন

মায়ের মৃত্যুর পর চ্যাপলিন সিটি লাইটস ফিল্মের কাজ শেষ করেন। তার ফিল্মের গল্পগুলিতে ঘুরেফিরে দেখা যায় দুর্দশাগ্রস্ত এক মেয়েকে তিনি দুর্দশা থেকে বাঁচাচ্ছেন, এই ফিল্মের গল্পটিতেও তাই। এই ফিল্মের গল্পে চ্যাপলিনের চরিত্র দ্য ট্রাম্প একটি অন্ধ ফুল বিক্রেতা মেয়ের প্রেমে পড়ে। সে অন্ধ মেয়েটিকে বুঝায় সে খুব ধনী লোক। এবং একসময় জানতে পারে একটি অপারেশনের মাধ্যমে মেয়েটি চোখের আলো ফিরে পেতে পারে। ট্রাম্প টাকা জোগাড়ের জন্য বিভিন্ন কার্যাবলী করে এবং এগুলির মাধ্যমে ফিল্ম এগুতে থাকে। টাকা সংগ্রহ এবং মেয়েটিকে তা দেবার পরে চুরির দায়ে ট্রাম্পকে জেলে নেয় পুলিশ। এদিকে অপারেশন হয়, মেয়েটি চোখের আলো ফিরে পায়। ট্রাম্প জেল থেকে ছাড়া পায়।

সে ফুলের দোকানের পাশ দিয়ে যাবার সময় মেয়েটিকে দেখে, মেয়েটি ফুলের দোকান দিয়েছে। মেয়েটি দেখে তাকে চিনতে পারে না। সে পরিচয় দেয় না, চলে যেতে চায়। কিন্তু তার দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল যে মেয়েটি দৌড়ে আসে এবং তার হাতে কয়েন ও ফুল গুঁজে দেয়। এবং স্পর্শের মাধ্যমে মেয়েটিকে তাকে চিনে ফেলে। এই দৃশ্যটিকে ফিল্ম ইতিহাসের সেরা একটি দৃশ্য ধরা হয়।

চ্যাপলিনের চাইল্ডহুড ট্রমা, তার সেই অপরাধবোধ ফিরে এসেছে তার ফিল্মের গল্পগুলিতে। তিনি দুর্দশাগ্রস্ত নারীকে বাঁচাতে চেয়েছেন তার অনেক ফিল্মে। হিমুকে মহামানব বানানোর জন্যই হিমুর বাবা হিমুর মকে মেরেছিলেন। এর জন্য খুব সম্ভবত হিমুও ছোটকাল থেকে এক ধরনের অপরাধবোধে ভুগত।

হিমু চরিত্রের যে ক্যারিশমাটিক আচরণ, তার মনযোগ আকর্ষনের তীব্র ইচ্ছা এগুলি হচ্ছে ছোটকালে সে যে মনযোগ পায় নি, তার সেই অতৃপ্ত মনযোগ আকাঙ্খার ভিন্নরূপ প্রকাশ। তার মাকে হারানোর ট্রমা এবং মাতৃত্ব মমতার আকাঙ্খা অতি তীব্র; মা’র মৃত্যুর জন্য তার ভেতরে অপরাধবোধও কাজ করে। এর ফলেই রূপা বা অন্য কোন মেয়ের সাথে সে পূর্নভাবে মিলিত হতে পারে না, সে দূরে দূরে থাকে। তার মায়া থেকে এই দূরে থাকা আসলে নিজের ভেতরের শিশু হিমুর নিরাপত্তাহীনতা লুকিয়ে রাখার প্রয়াস।

এবং হিমুর কাহিনীগুলির ট্র্যাজেডিটা হচ্ছে, রূপা হিমুকে বুঝতে পারে নি।

 

রেফারেন্স, এবং অন্যান্য

সাইকোলজিস্ট ডেবিড আবারব্যাখ মানুষের জীবনে তার শিশুকালের ট্রমার প্রভাব নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। এর মাঝে একটি বই ক্যারিশমা নিয়ে। বইটি’র নাম ক্যারিশমা ইন পলিটিকস, রিলিজিয়ন এন্ড মিডিয়া; প্রাইভেট ট্রমা, পাবলিক আইডিয়ালস। বইটিতে তিনি ক্যারিশমা এবং এর উপর চাইল্ডহুড ট্রমার প্রভাব নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। তিনি চার্চিল, জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি, চার্লি চ্যাপলিন, এডলফ হিটলার, কবি বিয়ালিক ইত্যাদি লোকদের জীবন ও চাইল্ডহুড ট্রমা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন। এই বই পড়তে গিয়ে আমার হিমু চরিত্রটির কথা মনে হয়। একসময় আনন্দ নিয়ে হিমু পড়েছি। তাই এই ধারনার প্রেক্ষিতে হিমু চরিত্রটিকে দেখার ইচ্ছা জাগ্রত হয়, এবং আমার মনে হয়েছে চরিত্রটিকে এদিক থেকে দেখলে যথেষ্ট বুঝা সম্ভব।

এই লেখায় যেসব কোটেশন আছে তা আবারব্যাখের বইতে আছে, ফলে রেফারেন্স হিসেবে তার বইটাই থাকলো। সেখানে আবার আলাদা বিবলিওগ্রাফি রয়েছে। আর দার্শনিক সোরেন কীয়ের্কেগার্ডের কাহিনীটি তার যেকোন জীবনীতেই পাওয়া যাবে। আবারব্যাখের বইতে কীর্কেগার্ড নিয়ে আলোচনা নেই। কীয়ের্কেগার্ডের চাইল্ডহুড বিষয়ে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘কীয়ের্কেগার্ডঃ থিংকিং খ্রিস্টিয়ানিটি ইন একজিজস্টেনশিয়াল মোড’ নামে সিলভিয়া ওয়ালশ এর বইতে পাওয়া যাবে।

Share
আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। লিংক শেয়ার করুন কারণ তাতে অন্যরা পড়ার সুযোগ পাবে

One Comment

  1. তানিম
    June 18, 2017 at 10:11 pm

    অসাধারণ বিশ্লেষণ!

Leave A Comment