দার্শনিক পিটার সিংগারের উত্তর

এইসময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন একজন দার্শনিক পিটার সিংগার। তিনি জন্মেছেন ৬ জুলাই ১৯৪৬ সালে, অষ্ট্রেলিয়ায়। প্রানীদের অধিকার, এবং দান করাকে মানুষের নৈতিক দায়িত্ব পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে সেক্যুলার দৃষ্টিকোন থেকে তিনি উটিলিটারিয়ানিজমের (উপযোগবাদ) এর বিস্তৃত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন তার প্রবন্ধ ও বইগুলিতে। অপরাধবোধ ও তার প্রয়োজনীয়তা নামক লেখায় তার কথা আমি উল্লেখ করেছিলাম, সেই লেখা থেকেই তার বিখ্যাত চিন্তা পরীক্ষাটি এখানে আনছি আবারঃ

ধরা যাক, একজন লোক তার দামী কাপড় ও জুতা পরে যাচ্ছেন একটি পুকুরের পাশ দিয়ে। পুকুরে একটি শিশু ডুবে যাচ্ছে। আশপাশে কোন মানুষ নেই। তিনি শিশুটিকে বাঁচাবেন কি না? বাঁচাতে গেলে তার কাপড় ও জুতা নষ্ট হবে। আর না বাঁচাতে গেলে শিশুটি মারা যাবে।

অধিকাংশ লোকই এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, তারা বাঁচাবেন শিশুটিকে। এবং না বাঁচানোটি অনৈতিক হবে।

সিংগার তখন বলেন, তাহলে আপনি যে বেশী টাকা দিয়ে দামী জুতা ও দামী কাপড় কিনছেন সেই টাকাটা কোন দাতব্য সংস্থায় দান করে দিন যারা পৃথিবীর দুর্গত সব এলাকায় মানুষের জন্য কাজ করছে। আপনার এই টাকা একটি নয়, কয়েকটি শিশুর হয়ত জীবন বাঁচাবে।

পিটার সিংগারের যুক্তি হলো, পৃথিবীর দুর্গত যেসব এলাকায়, দূর্ভাগ্যপীড়িত যেসব মানুষ বাঁচার জন্য যুদ্ধে রত তাদের সাহায্য করা উচিত অপেক্ষাকৃত সৌভাগ্যবানদের, বিলাসী জীবন যাপনে টাকা না উড়িয়ে।

মানুষের জীবনে কোন অর্থ তৈরীর জন্য সবচেয়ে সেরা উপায় হলো মানবতার বড়ো একটা কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত করা। তা হতে পারে এনিম্যাল রাইটস, আর্ত মানবতার সেবা, বা পরিবেশ রক্ষা ইত্যাদি।

পিটার সিংগারকে প্রশ্ন করেছিলেন যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার পাঠকেরা। তিনি সেসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। ১০ সেপ্টেম্বর ২০০৬ সালে তা প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে প্রশ্নোত্তরগুলি নিয়ে এখানে বাংলায় অনুবাদ করে দিয়েছি। সব প্রশ্ন নেই নি। আর প্রশ্নকর্তা পাঠকদের নামও নেই নি, শুধু প্রশ্নটা নিয়েছি। পিটার সিংগারের উত্তরগুলি থেকে তার প্রধান চিন্তা সম্পর্কে আইডিয়া পাওয়া যাবে, পাওয়া যাবে নতুন ভাবার মত কিছু বিষয়ও।

পিটার সিংগার

 

পিটার সিংগারের উত্তর

#মানুষ ভিত্তিক অধিকার ধারণা অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মনে করা কী স্ববিরোধীতা নয়? অবশ্যই এটা এবসার্ড মানুষের কনসেপ্ট প্রাণীদের উপরে প্রয়োগ করা, যে কনসেপ্ট সেই প্রাণী কখনো বুঝবেই না।

পিটার সিংগারঃ অবশ্যই না। শিশুরা এবং বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষেত্রে অধিকার যখন প্রযোজ্য হয়, তখন অন্য প্রাণী যারা এই অধিকারের কনসেপ্ট বুঝতে পারে না তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে কোন বাঁধা নেই। যিনি কাজটি করছেন (মোরাল এজেন্ট) তাকেই নৈতিকতার কনসেপ্ট বুঝতে হবে। যাকে আমরা অধিকার দিচ্ছি সে তা না বুঝলেও চলবে।

#আপনি যদি ক্ষুধার্ত থাকেন আর মাংসই আপনার কাছে বেঁচে থাকার জন্য একমাত্র খাদ্য, তখন কি খাবেন?

পিটার সিংগারঃ হ্যাঁ। সব কিছুই নির্ভর করে কনসিকুয়েন্স অর্থাৎ পরিস্থিতি বা পরিণতির উপরে। আপনার স্বাদ ভালো লাগে বলে মাংস খাওয়ার চাইতে বাঁচার জন্য খাওয়া সম্পূর্ন আলাদা জিনিস।

#কেন আমরা প্রাণীদের অধিকার দেব যখন আমরা ওদের উপর দায়িত্ব-কর্তব্য নিয়ে নিয়েছি? যেমন ওদের দেখাশোনা করা, প্রজাতি সংরক্ষণ ইত্যাদি। এখন যদি আমরা ওদের অধিকার দিয়ে দেই তাহলে বনে জঙ্গলে শিকারীর হাত থেকে ওদের বাঁচানোর দায়িত্ব কি থাকবে আমাদের?

পিটার সিংগারঃ দূর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের যেসব দায়িত্ব-কর্তব্য আছে প্রাণীদের উপর, তা পালনের কাছাকাছিও আমরা আসতে পারি নি। আমরা যদি তা পালন করতাম তাহলে খামারে মিলিয়ন মিলিয়ন প্রাণীদের উপর এই দুর্দশা আমরা ডেকে আনতাম না। কোন কারণ ছাড়াই, একমাত্র কারণ আমাদের ওদের মাংস ভালো লাগে বেশী অন্য প্রানীর মাংসের চাইতে, এবং আমাদের জন্য নিরাপদে মাংস সরবরাহ করতে। আর বন জঙ্গলে শিকারী হাত থেকে শিকারকে যদি আমরা রক্ষা করতে যাই তাহলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। শিকার হিসেবে যে প্রানী আছে তার সংখ্যা তখন বেড়ে যাবে, খাদ্যাভাব দেখা দেবে তাদের।

#আমরা কি কুকুর ও সিংহকে মাংস খাওয়া থেকে বিরত রাখব?

পিটার সিংগারঃ কুকুর আমাদের সাথে থাকে, মাংস না খেয়েই সে ভালোভাবে থাকতে পারে। আর সিংহের ক্ষেত্রে, আগের প্রশ্নেই বলেছি তা করা যাবে না।

#আপনি আমাদের মাংস খেতে মানা করেন আবার ঝিনুকের ব্যাপারে আপনার আপত্তি নেই, তা কেন? আপনার মতে কি ঝিনুকের অনুভবক্ষমতা নেই?

পিটার সিংগারঃ তাদের মস্তিষ্ক বা কেন্দ্রিয় স্নায়ুতন্ত্র নেই। তাই এটা চিন্তা করা কঠিন যে তারা অনুভব করতে পারে। তারপরেও আপনার আপত্তি থাকলে খাবেন না।

#আমাদের নৈতিক-মঙ্গল (মোরাল ওয়েল-বিং) পুনরোদ্ধারের জন্য ভেজিটেরিয়ান ডায়েটে ( নিরামিশাষী) যাওয়াই কি প্রথম পদক্ষেপ?

পিটার সিংগারঃ আমি এই পদক্ষেপ আমাদের নৈতিক-মঙ্গলে কী প্রভাব ফেলে তাতেই বেশী আগ্রহী। ভেজিটেরিয়ান হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ন ধাপ, একইসাথে প্রাণীদের উপর এর প্রভাবের জন্য এবং পরিবেশ দূষণ কমাতে এর প্রভাবের জন্য। গ্রীন হাউজ গ্যাসের নির্গমন কমাতে একজন সাধারন মানুষ সর্বোচ্চ যে কাজটি করতে পারে তা এটিই, এমন দেখা গেছে।

#ভেজিটেরিয়ান হবার কারণে আমি সমালোচনার মুখোমুখি হলে কোনটি সবচেয়ে কার্যকর জবাব যা আমি ব্যবহার করতে পারি?

পিটার সিংগারঃ তাদের জিজ্ঞেস করুন কেন তারা ভেজিটেরিয়ান নয়।

#আপনি বলেছেন যদি দশটি স্বাস্থ্যবান গরু ও একজন স্বাস্থ্যবান মানুষের মধ্যে যেকোন এক ভাগকে গুলি করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়, আপনার জন্য তা হবে কঠিন। কেন?

পিটার সিংগারঃ আমি তা কখনো বলি নি। উপরন্তু, আমি লিখেছি  যে স্বত্তা অতীত এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে সচেতন, এবং যে ভবিষ্যত নিয়ে পরিকল্পণা করে তাকে হত্যা বেশী খারাপ হবে। সাধারণ মানুষের এমন পরিকল্পনা থাকে, কিন্তু আমার মনে হয় গরুর তা থাকে না। সাধারণ মানুষের পরিবার বন্ধু বান্ধব থাকে, তারা তার জন্য বেশী এবং লম্বা সময়ব্যাপী দুঃখ প্রকাশ করে, যেমনটি গরুরা অন্য গরুদের জন্য করে না। (তবে অবশ্যই গরু তার বাছুরকে দীর্ঘদিন মনে রাখে যখন মায়ের কাছ থেকে বাছুরকে কেড়ে নেয়া হয়, এজন্য ডেইরি ফার্মের পণ্যে মারাত্মক নৈতিক সমস্যা রয়েছে।)  আমাকে যদি সত্যি এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাহল আমি গরুগুলিকেই  হত্যা করব।

# চিড়িয়াখানা কি অনৈতিক?

পিটার সিংগারঃ অধিকাংশ চিড়িয়াখানাই অনৈতিক কারণ তারা প্রানীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাদের বিনোদনের জন্যে ওদেরকে বন্দী করে রাখে। কিন্তু তারা যদি প্রানীদের স্বার্থকে প্রথমে রাখে, এবং এরপর আমাদের প্রানীদের পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ করে দেয়, তাহলে তা অনৈতিক নয়।

# আপনি কি প্রতিবন্ধী বাচ্চাকে হত্যা করবেন?

পিটার সিংগারঃ হ্যাঁ, যদি এটা ঐ বাচ্চা এবং তার পরিবারের জন্য মোটের উপর ভালো হয়। অনেক মানুষ একে শকিং মনে করে কিন্তু তারাই মহিলাদের এবর্শন (ভ্রুণ হত্যা) এর অধিকারকে সমর্থন করে।  যারা এবর্শনের বিরুদ্ধে তাদের একটি মতের সাথে আমি একমত যে, আইন নয়, নৈতিক দিক থেকে ফিটাস এবং নতুন জন্ম নেয়া বাচ্চার বড় কোন পার্থক্য নেই।

#আপনার গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস নাৎসীদের হাতে হলোকাস্টে মারা গেলেন, আবার আপনাকেই নাৎসীদের সাথে তুলনা দেয়া হয়, এই বিষয়টা আপনার কেমন লাগে?

পিটার সিংগারঃ আপত্তিজনক ও হতাশাজনক বিষয় এটি। এটা দুঃখজনক যে মানুষেরা আমার মত এবং নাৎসীদের বিশ্বাস নিয়ে এত কম বুঝে।

#আপনি কি মানুষকে উপদেশ দেন তার আয়ের পাঁচ ভাগের এক অংশ চ্যারিটিতে দান করে দিতে?

পিটার সিংগারঃ আমি এখন পাঁচ ভাগের এক ভাগ এর চাইতেও বেশী দেই। তবে সাধারনত আমি বলি আয়ের দশ শতাংশ দিতে। অবশ্যই এটা ব্যক্তি পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। কিন্তু যেখানে এই পৃথিবীতে এত এত লোক দারিদ্রের কারণে মারা যাচ্ছে সেখানে আয়ের দশ শতাংশ অক্সফাম, ইউনিসেফ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠাণে দেয়া নৈতিক শিষ্ঠাচার।

#স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ( ফ্রী উইল) আছে কি? এটা কি কেবল মানুষের জন্য না অন্য প্রানীদেরও আছে?

পিটার সিংগারঃ অধিবিদ্যকতার গভীরে (ডিপ মেটাফিজিক্যাল) গেলে, মুক্ত ইচ্ছা নেই বলেই আমি মনে করি। কিন্তু আমরা এবং কিছু প্রাণীরা পছন্দ করতে পারি, এবং এটাই যথেষ্ট; এর ফল যাই হোক না কেন।

# আপনার করা সবচেয়ে বড় অনৈতিক কাজটি কী?

পিটার সিংগারঃ নিজের পেছনে বেশী খরচ করে ফেলা, যখন অন্যের সে টাকা অনেক বেশী দরকার ছিল।

# আপনি কি বলবেন আপনার নৈতিক মূলনীতিটা হলো সবচেয়ে কম ক্ষতি করা? তখন প্রশ্ন উঠে কীভাবে আমরা তুলনা করব কোনটা কম ক্ষতি আর কোনটা বেশী ক্ষতি?

পিটার সিংগারঃ না, আমার মনে হয় আমাদের উচিত ক্ষতি কমাতে চেষ্টা করা, তা অবশ্যই কম ক্ষতি করার চেয়ে ভিন্ন। বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির তুলনা করা সহজ নয়, কিন্তু আমাদের সর্বোচ্চটা দিতে হবে।

#নৈতিক পরম কিছু কি আছে? থাকলে তা কি, এবং কেন তা পরম?

পিটার সিংগারঃ একমাত্র নৈতিক পরম নীতি হলো, আমাদের তাই করা উচিত যা এই কাজের প্রভাব বলয়ের ভিতর থাকা সবার জন্য সর্বোচ্চ ভালোটা নিয়ে আসবে।

#আপনার দর্শন অনেক ভারী মনে হয়, মজার জন্য আপনি কী করেন?

পিটার সিংগারঃ হাইকিং এ যাই, এবং ভীড় থেকে দূরে সরে যাই।

#জর্জ বুশের মত লোকদের ব্যাপারে আমরা কী করব যারা নিজের স্বার্থের জন্য যুক্তি বা সত্য কিছুরই ধার ধারে না?

পিটার সিংগারঃ তারা যে এরকম তা অন্যদের দেখতে দিন, তাহলেই তারা ভোটে পরাজিত হবে।

#উটিলিটারিয়ানিজমে (উপযোগবাদ) আপনার অবদানের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, যার জন্য এই বিষয়টি এখন "শিশু হত্যা দর্শন" নামে পরিচিতি পেয়েছে। আপনি কি মনে করেন এই ইনফ্যান্টিসাইড (শিশু হত্যা) দিয়ে আপনি ভালো প্রভাব বাড়াচ্ছেন?

পিটার সিংগারঃ  ইনফ্যান্টিসাইড (শিশু হত্যা) কখনোই আমার প্রধান ফোকাস ছিল না। এটা আমার কাজের খুবই ক্ষুদ্র অংশ। আমার প্রতিপক্ষ এবং মিডিয়ার প্রধান ফোকাস এটি।

#কেন আমি নৈতিক হবো?

পিটার সিংগারঃ বেশ, এই বিষয়ে আমি আসলে একটি আস্ত বইই লিখেছি, "কীভাবে জীবন যাপন করতে হয়? (হাউ টু লিভ)"। কিন্তু এক বাক্যে বলতে গেলে, শুধু নিজের জন্য বাঁচার চাইতে এই পৃথিবীকে আরো ভালো করার কাজে অবদান রাখলে, দীর্ঘ সময় ব্যবধানে এতে আপনি বেশী পূর্ণতা অনুভব করবেন।

Share
আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। লিংক শেয়ার করুন, তাতে অন্যরা পড়ার সুযোগ পাবেন।

Related Posts

Leave A Comment