সিলেক্টোরেট তত্ত্বের আলোকে রাজনৈতিক ক্ষমতারে বুঝা

এই লেখাটি পলিটিক্যাল সাইন্টিস্ট ব্রুস বুয়েনো দে মেসকিটার দুইটা বইয়ের আইডিয়ার উপর ভিত্তি করে ক্ষমতা ও বাংলাদেশের রাজনীতিরে বুঝার প্রচেষ্টা। বই দুইটা দ্য লজিক অব পলিটিকাল সারভাইভাল, এবং দ্য ডিক্টেটরস হ্যান্ডবুক। দ্বিতীয়টা প্রথমটার এক সহজ ভার্সনও বলা যায়। আমি মনে করি রিয়াল গেইম আসলে কী হচ্ছে, তা সবার বুঝা জরুরী, তা সে যে দলই করুক না কেন। এতে সে তার পজিশন ঠিকঠাক মত এলাইন করতে পারবে, এবং চাইলে দেশের জন্য ভালোও করতে পারবে। কিন্তু সে যদি বুঝেই না আসলে কী গেইম হচ্ছে, তাহলে সে শুধুই ঘুটির মত ব্যবহৃত হবে।

শুরুতেই বলে নেয়া ভালো, এই পুরা তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড়াইয়া আছে এই অনুমানের উপর যে, নেতা ক্ষমতায় থাকতে চায়, এবং নিজের স্বার্থই দেখে।


সিংহাসনই শাসককে চালায়

দ্য ডিক্টেটর’স হ্যান্ডবুকের লেখক পলিটিক্যাল সাইন্টিস্ট ব্রুস বুয়েনো দে মেসকিটা এবং এলিস্টার স্মিথ। এই বইয়ের মূলকথা বুঝা দরকার ডিক্টেটরশীপে ও গণতন্ত্রে ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে হলে।

এখানে রুলাররা রুল চালায় না, বরং ক্ষমতার রুলেই রুলার চলে। এইজন্য ইউটোপিয়ান স্বপ্ন দেখানো বিপ্লবীরাও বাজে ডিক্টেটর হয়। তারা সিংহাসন নেয় চালাতে, কিন্তু সিংহাসনই তাদের চালায়।

কেউ একা শাসন করতে পারে না। তার কিছু মূল (key) পিপল লাগে। এই মূল পিপলই তার ক্ষমতায় থাকার জন্য জরুরী। এরা তার হয়ে কাজ করে। আইন বানায়, প্রশাসনের কাজে থাকে, আইন শৃঙ্খলার কাজে থাকে। তাই শাসকের প্রধান কাজ থাকে এই মূল পিপলরে খুশি ও লয়াল রাখা।

গণতন্ত্রে আরেক ধরণের পিপল থাকে, যারা বিপুল সংখ্যক লোক, তার পক্ষে ভোট দিয়েছে। কিন্তু এদের সে পুরা খুশি রাখতে পারবে না। এরা বিশাল ও এদের চাহিদা অনেক। তাছাড়া এরা পরবর্তীতে অন্য পক্ষকে সমর্থন দিতে পারে। এবং এদের জন্য খরচ করা কাজ, যেমন হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, রাস্তাঘাট ইত্যাদি নির্মান, এর সুফল অন্য দল ক্ষমতায় আসলে নিতে পারে। (উদাহরণ, গত শেখ হাসিনা আমলে পদ্মাসেতুসহ যা মেগা প্রজেক্ট হইছে, এর ফল এখনকার শাসক পাবে।)

এদের জন্য খরচ করা হচ্ছে শাসকের জন্য অপচয়। তাও সে অল্প খরচ করে এদের খুশি রাখে। এদের সে ভাগ ভাগ করে, এবং কিছু ভাগকে ভর্তুকি ও অন্যান্য সুবিধা দেয়। যেমন কৃষিভর্তুকি, বা অন্য পেশাজীবীদের দেয়া সুবিধা, কোটা। (উদাহরণ শেখ হাসিনা আমলে মুক্তিযোদ্ধা কোটা)।

এছাড়া, এই জনগণ যাতে প্রোডাক্টিভ কাজে নিয়োজিত হতে পারে এজন্য শাসককে খরচ করতে হয়। কারণ প্রোডাক্টিভ কাজ বেশী হলে ট্যাক্স বেশি হবে। ট্যাক্স বেশি হলে সে তার মূল কি পিপলদের বেশী অর্থ দিয়ে খুশি রাখতে পারবে।

এছাড়াও কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেও তার খুশি রাখতে হয়। কারণ প্রভাবশালী ব্যক্তির কথার প্রভাব থাকে জনগণের উপরে। তাকে হাতে রাখলে অনেক ভোট নিশ্চিত। এজন্য ডিক্টেটরের মত সরাসরি টাকা না দিলেও চুক্তি, পুরস্কার, সম্মান বা অন্য কোন ভাবে সুবিধা সে দিয়ে থাকে।

বিপ্লবে ক্ষমতা থেকে জনগণের এক দল ডিক্টেটরকে সরিয়ে ফেললো, এমন ক্ষেত্রে ভেতরের চিত্র হলো সেনাবাহিনী তা হতে দিয়েছে। এখানে বাইরে থেকে দেখলে জনগণের এক অংশ ক্ষমতা নিয়েছে। কিন্তু মূল চিত্র হলো শাসকের প্রধান পিপলরা তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিল না। তাই তারা তাকে সরিয়ে দিয়ে নতুন শাসক বসিয়েছে। জনগণের বিপ্লব এখানে সামনে দৃশ্যায়ন হয় কেবল।

নতুন শাসককেও পুরাতন শাসকের নিয়মে চলতে হয়। তার নতুন কি (key) পিপলদের সন্তুষ্ট করে চলতে হয়। তাদের সাথে নিয়ে বিপ্লব করেছিল তাদের সম্পদের ভাগ দিতে হয়।

এভাবেই ক্ষমতা তার নিয়মে চলে। কোন আন্দোলনে ক্ষমতা কীভাবে রিয়েক্ট করবে এবং একে দমন করতে কোন পর্যন্ত যেতে পারে তা বুঝতে হলে দেখতে হবে যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে তারা ক্ষমতাতন্ত্রের মূল পিপল কি না। যদি মূল পিপল হয় তাহলে ক্ষমতাতন্ত্র তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে চাইবে।

(এই উপরের অংশটি আমি প্রথম লেখি ২০১৮ সালের ৮ এপ্রিল। ২০২৪ কোটা আন্দোলনে, সরকার কীভাবে দমন করবে ইত্যাদি আগে আগে বলার ক্ষেত্রে, এই ফ্রেম ওয়ার্কটাই ব্যবহার করেছিলাম। আমার মাথায় ছিল, এরা তো ক্ষমতায় থাকার জন্য সরকারের মূল পিপল না, তাই এদের শক্তহাতেই দমন করবে।)

সিলেক্টোরেট তত্ত্ব বা দ্য লজিক অব পলিটিকাল সারভাইভাল

পারসোনিফিকেশন অব ইভিল আমি পছন্দ করি না। জুলাইয়ের পরে যখন শেখ হাসিনারে কেন্দ্র করে এইটা হইতেছিল, ডাস্টবিন বিপ্লব হয় বইমেলায়, তখন এই বিষয়ে ছোট পোস্টও দিছিলাম। পছন্দ করি না কারণ, এইটা এক ম্যানিপুলেশন, যা আম পাবলিকরে সত্য দেখতে দেয় না। একটা আবেগে ডুবাইয়া রাখে। কিন্তু আলো যেমন ক্রমে আসে কমলকুমারের উপন্যাসে, তেমনি সত্য ক্রমে প্রকাশিত হয়, এবং পাবলিকেরা হতাশ হয়, যে ভাগাড়ে ছিল ওই ভাগাড়েই থাকে, অবস্থার উন্নয়ন হয় না।

একজন নেতা ভালো না খারাপ এইটা দিয়া কিছু হয় না। আসল কথা হইলো তার ইনসেনটিভস কোন দিকে। মানে নেতার লাভ-ক্ষতির হিসাব কোন দিকে যাইতেছে।

কেবল এবং কেবলমাত্র, জনগণের ভালো তখনই হয় যখন নেতার ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণরে দরকার হয়। বড় গণতন্ত্রে এইটা হয়, তাই সেখানে মানুষ ভালো থাকে। যেসব দেশে ছোট কিংমেকার জোটই সরকার নির্বাচন করে ফেলতে পারে, সেসব দেশে নেতার জনগণরে দরকার নাই, তাই সেখানে মানুষ কষ্টে থাকে।

যেখানে সবার ভোট লাগে, সেখানে সবার খেয়াল রাখা হয়।

বাংলাদেশে দেখেন ২০১৪ সালের পর থেকে যখন নির্বাচন কারচুপিপূর্ণ হইয়া গেল, সরকারের জনগণরে আর দরকার রইল না। ফলে কী হইল? দুর্নীতি বাড়ল, ব্যাংক লুট হইল, মেগা প্রজেক্টে খরচ ফুলে ফেঁপে উঠল। কারণ নেতার টিকে থাকা তখন জনগণের ভোটের উপর না, র‍্যাব-পুলিশ-প্রশাসন-সেনার উপর। তাদের সুবিধা দিয়াই সরকার টিকে থাকলো। লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদও একবার বলেছিলেন ২০১৯ সালে, রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। এরকম বক্তব্য আরো মিলবে, যেখানে সাংসদরা বলতেছেন, দেশ চালাচ্ছে আমলা জগত শেঠেরা। সচিবালয়ের পিয়ন পর্যন্ত তাদের দাম দেয় না। প্রধানমন্ত্রী তাদের বসিয়ে রেখে ডিসিদের সাথে আলাপ করেন।

এই চিত্র দুনিয়ার ইতিহাসে বার বার দেখা গেছে। তাই, একজন ব্যক্তিরে ভালো বা খারাপ হিশাবে দেখাইলে মূল সমস্যা আড়াল করা হয়, আর মূল সমস্যা সমাধান না হইলে, অবস্থা ভালো হবে না, নেতা ভালো হইলেও না।

নেতারা নিজের ভালোটাই চায়, তাই তারা সেইটাই বানায় যেইটা তাদের সাপোর্টাররা চায়। এই ‘সাপোর্টার’ মানে সব সময় দেশের সব নাগরিক না। যারা তারে ক্ষমতায় বসাইছে ও রাখছে, মূলত তারা।

পলিটিকাল সাইন্টিস্ট ব্রুস বুয়েনো দে মেসকিটা রাজনীতির মাঠে কারা খেলে তা এভাবে ভাগ করছেন।

ভোটাধিকারবঞ্চিত: এদের কোনো ক্ষমতা নাই। এরা ভোট দিতে পারে না। বিপ্লব ছাড়া এদের কিছু করার নাই। হাসিনা সরকারের আমলে এরা ছিল আম পাবলিক।

সিলেক্টোরেট: এরা নেতা বাছাইয়ে অংশ নিতে পারে, অন্তত নামে হইলেও। গণতন্ত্রে এরা সব ভোটার, একনায়কতন্ত্রে এরা হইতে পারে সেনাবাহিনী বা দলের সদস্যরা। গত শেখ হাসিনার হাইব্রিড এক নায়ক তন্ত্রে ইলেকশন কিন্তু ঠিকই হইছে। অনেক অভিনেতা অভিনেত্রী, এবং লীগের সমর্থক ভোট দিছেন, আঙ্গুলে কালিসহ পোস্ট দিছিলেন। যদিও সবাই জানে এই ভোট দেয়া ভুয়া, তাও এই নাটক দরকার হয় এক নায়কতন্ত্রে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান, এবং এরশাদও একই কাজ করেছিলেন। তারা ইলেকশন করতেন সিলেক্টারেট বড় করতে।

জিতাইয়া আনা জোট (উইনিং কোয়ালিশন): এরা আসল খেলোয়াড় তাড়িনিখুড়ো। সিলেক্টোরেটের যে অংশটা নেতারে ক্ষমতায় রাখে, তারাই এই জোট, নাম দেয়া যায় কিং মেকার জোট। এরা বিশেষ সুবিধা পায়। এদের যথেষ্ট সংখ্যক যদি অন্য নেতার দিকে যায় তাহলে বর্তমান নেতার দিন শেষ। নেতা এবং এদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক থাকলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। আগের অংশে বলেছি কেন একনায়ক ইলেকশন করেন, যদিও তিনি জানেন এই ইলেকশনের দরকার নাই। এই ইলেকশন করা হয় সিলেক্টারেট বড় করতে, ও এই কিং মেকার জোটরে চাপে রাখতে। তাদের দেখাইতে, যে আমার জনসমর্থন আছে, আমি কিন্তু চাইলে তোমারে উইনিং কোয়ালিশন থেকে বাদ দিতে পারব।

নেতা বা ক্ষমতাসীন প্রধান: ইনি আসলে কে ও তার কাজ কী? ইনি হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি সম্পদ জোগাড় করেন, কর এবং অন্যান্য মাধ্যমে এবং আর বিলি বণ্টন করেন। এইটাই তার কাজ। বড় ও ভালো গণতন্ত্র হইলে, যেহেতু পাবলিকের ভোটে জিতে আসতে হবে তাই পাবলিকরে তিনি সুবিধা দেন, তাদের মধ্যে সম্পদ বণ্টন করেন। আবার, গণতন্ত্র না থাকলে, তিনি উইনিং কোয়ালিশন, অর্থাৎ কিং মেকার জোটরেই বেশী সুবিধা নেন, ও নিজে নেন। পাবলিক কষ্টে থাকে। এর উদাহরণ কী আর বলতে হবে? নিশ্চয়ই আপনার জানার কথা, কারণ অল্প ব্যতিক্রম বাদে, আপনেই সেই কষ্টে থাকা পাবলিকদের একজন, যার কাছ থেকে নেয়া হইছে, দেয়া হয় নাই। আপনি এই গেইমের লুজার।

চ্যালেঞ্জার: যে ক্ষমতা নিতে চায়। সে বিজয়ী জোটরে বোঝাইতে চায় “তোমরা আমার দিকে আসো, বেশি সুবিধা পাইবা।” এখানে আমরা বুঝতে পারব, কেন বিএনপি লাস্ট দশ বছরে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে পাত্তা পায় নাই। কারণ কিং মেকার তো পাবলিক ছিলোই না। ভোটাভোটি ছিল জাস্ট নাটক। ফলে, বিএনপি এইদিকে ফোকাস দেয় নাই। বরং বহির্বিশ্বে এবং দেশের অভ্যন্তরে কিং মেকারদের কাছে গেছে, তাদের বুঝাইতে চেষ্টা করছে।

সহজভাবে এই ডায়াগ্রাম দেখায় কে শাসক নির্বাচন করে

শেখ হাসিনার পতন হইল, কারণ তার উইনিং কোয়ালিশন খুব ছোট ছিল, কিছু উচ্চ পর্যায়ের সেনা, কিছু মন্ত্রী, র‍্যাব-পুলিশ-প্রশাসন – এরাই মূল সুবিধা পাইছে। এবং তিনি ভোটাধিকার বঞ্চিত করে রাখছিলেন বিশাল সংখ্যক মানুষরে। তাদের কাছে বিপ্লব ছাড়া অন্য কোন পথ ছিল না।

শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুও হয় একই কারণে। ১৯৭২ সালে কিং মেকার জোট অনেক বড় ছিল, বলা যায় সারা দেশের মানুষ। ৭২ থেকে ৭৪ পর্যন্ত দেশের দূর্ভিক্ষ, অব্যবস্থানায় জোট ছোট হইতে থাকে। ১৯৭৫ সালে মুজিব স্থায়ী ভাবে উইনিং জোট ছোট করে ফেললেন।

মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা ভাবল, আমরা যুদ্ধ করলাম, কিন্তু রক্ষীবাহিনী সব সুবিধা পাইতেছে। সেনাবাহিনীরে পাশ কাটানো হইতেছে। লীগের এক অংশ ভাবল বাকশালে আমাদের জায়গা কই? খন্দকার মোশতাক এদের একজন ছিলেন।

যখন বিজয়ী জোট ছোট হয় কিন্তু আগের জোটের সদস্যরা এখনো ক্ষমতার কাছাকাছি থাকে তখন ক্যু হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। মুজিব জোট ছোট করছেন ঠিক, কিন্তু পুরান যারা ক্ষমতাবান ছিল, তাদের পাওয়ারহীন করতে বা নিরস্ত্র করতে পারেন নাই। ফলে তারা নিজরাই আরেকটা জোট বানাইছে ও নেতারে হত্যা করছে।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন এই নতুন জোটে। এবং তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের ভুল থেকে শিক্ষা নিলেন। তিনি তার উইনিং কোয়ালিশন জোটের ক্ষেত্রে জোট বড় করার চেষ্টা করলেন। মুক্তিযোদ্ধা, ইসলামপন্থী, এমনকি সাবেক পাকিস্তানপন্থী, সবাইরে কিছু না কিছু দিছিলেন তিনি। এইটা তার শক্তি ছিল, জনপ্রিয়তা ছিল। এর জন্য কিছুদিন বেশী শাসন করতে পারছিলেন।

কিন্তু এখানে আরেক সমস্যা হয়, বড় জোট মানে সুবিধা ভাগ হইয়া যাওয়। তার জোটের কিছু অফিসার ভাবল, আমরা কম পাইতেছি। মঞ্জুর গ্রুপ এইরকমই ছিল। ফলাফল হিশাবে, জিয়ার মৃত্যু হয়।

এখানে ইন্টারেস্টিং কেইস সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল হুসেইন এরশাদ। তিনি মারা যান নাই। কারণ, তার সার্ভাইভালের বুদ্ধি বেশী ছিল, তিনি ছিলেন মারাত্মক ধূর্ত। তিনি এক পর্যায়ে বুঝতে পারেন উইনিং কোয়ালিশন ভেঙ্গে যাচ্ছে, তারে আর সাপোর্ট দিবে না সেনাবাহিনী। তখন তিনি নেগোসিয়েশন করে এগজিট নেন। শেখ হাসিনাও একই জিনিশ করতে পারতেন, কিন্তু শেষ পর্যন্তও বুঝতে পারেন নাই উইনিং কোয়ালিশন ভেঙ্গে গেছে, তারে আর সাপোর্ট দিবে না তারা। তবে, এইটা ভালো তারে বুঝাইয়া শেষ পর্যন্ত ইন্ডিয়া সরানো গেছে, অন্যথায়, অবস্থা আরো খারাপ হইতে পারতো।

গণতান্ত্রিক সরকার ভালো কারণ যত বেশী সংখ্যক মানুষের উপর নির্ভর করবে নেতার ক্ষমতায় যাওয়া, ততো সে পাবলিকের পক্ষে কাজ করবে। এবং ভায়োলেন্স এড়াইয়া চলবে। যেমন, শতভাগ গণতন্ত্র থাকলে জুলাই ২০২৪ এ শেখ হাসিনা ছাত্র ও সাধারণ মানুষের উপর কখনোই গুলি চালাতেন না। তিনি জানতেন, এদের উপর গুলি চালালে পাবলিক ভোট দিবে না। ফলে আমি ক্ষমতায় থাকতে পারব না। কিন্তু যেহেতু তার উইনিং কোয়ালিশন ছিল ছোট জোট, দেশের অভ্যন্তরে আর্মি, প্রশাসন, এবং দেশের বাইরে ভারতের সমর্থন, তাই, তিনি ভাবছেন, এদের এইভাবে দমন করলে কিছু যায় আসে না।

যখন নেতা অল্প মানুষের উপর নির্ভর করে ক্ষমতায় আরোহণের জন্য, তখন পাবলিকের কোন উন্নতি হবে না।

আরব্য রজনীর গল্পে আপনারা বিশাল শাণ শওকত, ধন রত্ম ভাণ্ডার, বিলাস ব্যসন দেখেছেন। এইরকম বাস্তব ছিল উমাইয়া আর আব্বাসীয় খিলাফতে তাদের উইনিং কোয়ালিশন ছিল ছোট। ক্ষমতায় যাইতে অল্প লোকদের উপর নির্ভর করতে হইত নেতার।

স্পেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত খেলাফতে ছিল ছোট জোট এবং বড় সিলেক্টোরেটের আদর্শ নমুনা।

সিলেক্টোরেট এখানে ছিল আরব যাযাবররা, প্রথম দিকে সংখ্যাক কম লাখ দুয়েক মাত্র, পরে কয়েক মিলিয়ন হয়। খলিফার দরকার ছিল দুই দলের সমর্থন: গভর্নর-জেনারেল-প্রশাসক, আর উলামা বা ধর্মীয় নেতা।

এবং, ইসলামি ধর্মীয় ব্যবস্থা ছিল বিকেন্দ্রীভূত। খলিফার যে কোন কিছুসংখ্যক উলামার সমর্থন হইলেই চলত। তাই উলামারা খলিফার জোটে ঢুকতে প্রতিযোগিতা করতেন!

অন্যদিকে বাইজেন্টিয়ামে ছিল এর উল্টা, সম্রাট হইতে হইলে অর্থোডক্স চার্চের প্রধানের সমর্থন লাগত। মানে সিলেক্টোরেট ছোট ও নির্দিষ্ট। অর্থোডক্স চার্চ কেন্দ্রীভূত, ফলে নিজেই একক পাওয়ার। সে সমর্থন না দিলে কাজ হবে না তাই তারা অনেক বেশী পাওয়ার হোল্ড করতো। এইজন্য পরবর্তীতে চার্চের সাথে রাজার দ্বন্দ্ব লাগে, ও শাসন থেকে ধর্ম আলাদা করা হয়। যেটা ইসলামে হয় নাই, কারণ ইসলামি ব্যবস্থায় শাসকরে বিকেন্দ্রীভূত ধর্মীয় সিস্টেম কখনো চ্যালেঞ্জ করতে পারে নাই, বরং শাসকের অধীন থেকেছে। যেসব উলেমা পক্ষে বলছেন তারে নিয়া পাশে বসাইছেন খলিফা।

ফলাফল কী হইল? খেলাফতে নেতা বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতেন, আবার বিদ্রোহও বেশি হইত। খলিফা নিজের এবং উইনিং কোয়ালিশনরেই বেশী ধন সম্পদ ও সুবিধা দিতেন। ৯১৮-৯১৯ সালে সরকারি রাজস্ব ছিল ১৫.৫ মিলিয়ন দিনার, এর মধ্যে ১০.৫ মিলিয়ন খরচ হইত শুধু খলিফার প্রাসাদেই!

শেখ হাসিনার শাসন কি মাসকিটার বইয়ের পারফেক্ট উদাহরণ ছিল?

এই সিলেক্টোরেট তত্ত্বের পাঁচটা মূল নিয়ম মাসকিটা এবং তার সহলেখরা উল্লেখ করেন। যেগুলির প্রত্যেকটি শেখ হাসিনা তার শাসনামলে মেনে চলেন।

১। বিজয়ী জোট যত ছোট হবে, তত কম মানুষ খুশি রাখতে হয়।

হাসিনা জোট ছোট রাখছেন। উপরের শ্রেণীর সেনা, র‍্যাব-পুলিশ প্রধান, কিছু মন্ত্রী, এস আলম-বেক্সিমকো।

২। বড় সিলেক্টোরেট রাখো, যাতে অবাধ্যদের বদলানো সহজ হয়।

জোটের কেউ যদি বিদ্রোহ করে, তারে সহজে রিপ্লেস করতে পারতে হবে। এইজন্য বড় পুল দরকার।

এইজন্যই ভুয়া নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। নামে ১১ কোটি ভোটার আছে। এখন আপনি যদি জোটে থাকেন, আপনি জানেন, আপনি গেলে এই ১১ কোটি থেকে আরেকজন আসবে। তাই মাথা নিচু কইরা থাকেন। এছাড়া, হাসিনা বয়স্কদের সরাইয়া ইয়াংদের নিয়ে বলয় তৈরি করেন। বর্ষীয়ান লীগার নেতাদের চাইতে ইয়াং এমপি উপদেষ্টারা তার বেশী লয়াল ছিল।

৩। টাকার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখো। বন্ধুদের মধ্যে বিলি বণ্টন করো।

রাজস্ব, ঠিকাদারি, ব্যাংক লোন, সব তোমার হাত দিয়া যাইতে হবে। তাহলে সবাই তোমার মুখাপেক্ষী থাকবে। ব্যাংক লুটের লাইসেন্স দিলেন এস আলম-বেক্সিমকোরে, সরকারি ঠিকা দিলেন দলীয় ব্যবসায়ীদের, সেনাবাহিনীরে দিলেন জাতিসংঘ মিশন, সেনা কল্যাণ ব্যবসা, পুলিশ-র‍্যাবরে দিলেন ঘুষ-চাঁদার অবাধ সুযোগ। অবস্থা এমন ছিল যে, কোন বিচার বা সিরিয়াস ইস্যুতে পাবলিকরেও ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করতে হইত।

৪। বন্ধুদের এত বেশী দিও না যাতে তারা তোমারে ফেলে দেয়। দাও, কিন্তু এক সীমার মধ্যে, যাতে তারা তোমার উপর নির্ভরশীল থাকে।

খুব বেশি দিলে তারা স্বাধীন হইয়া যাবে, তোমারে ফেলে দিবে। খুব কম দিলে তারা অসন্তুষ্ট হবে, অন্যের দিকে যাবে। মাঝামাঝি রাখতে হবে। এস আলমরে লুট করতে দিলেন, কিন্তু পুরা ব্যাংকিং সেক্টর দেন নাই, সেনাবাহিনীরে সুবিধা দিল, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা না, বরং তাদের হাতিয়ার হিশেবে ব্যবহার করা হইল, আয়নাঘর বানানো হইল তাদের দ্বারা। মন্ত্রীদের চুরি করতে দিল, কিন্তু এত না যে তারা হাসিনা ছাড়া চলতে পারে। দিনশেষে সবার কিন্তু তার দিকে তাকাইয়া থাকতে হইত।

৫: বন্ধুদের টাকা নিয়া জনগণরে দিও না।

জনকল্যাণ করতে গিয়া যদি জোটের টাকা কাটো, জোট তোমারে ফেলে দিবে। হাসিনা এটা করেন নাই। এইজন্য, স্বাস্থ্য-শিক্ষায় বাজেট কম ছিল, কিন্তু সেনাবাহিনী-পুলিশের বাজেট বেশি। গরিবদের ভাতা কম, কিন্তু মেগা প্রজেক্টে কমিশন বেশি। পদ্মা সেতুর খরচ কয়েকগুণ হইল, ইভেন মানুষের কাছ থেকে টাকা তোলা হইল মোবাইল সারচার্জের মাধ্যমে, এ পর্যন্ত ২৫০০ কোটি টাকা তুলেছে পাবলিকের কাছ থেকে। সেতুর খরচ যে বাড়ল, কিছু বাস্তবিক কারণ থাকতে পারে, কিন্তু এমনিতেই ব্যয় অস্বাভাবিক বেশী ছিল। বাড়তি টাকা কই গেল? ওই জোটের পকেটেই!

হাসিনা পাঁচটা মূলনীতি দারুণভাবে মানছেন। কিন্তু পরে তার কনফিডেন্স এতো বেড়ে যায় যে, মানুষের উপর মারাত্মক চাপ প্রয়োগ করছেন, দমন পীড়ন করছেন। তিনি চাইছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ইউজ করে এক স্থায়ী, লয়াল সিলেক্টোরেট অংশ বানাইতে, লং টার্মে টিকে থাকার জন্য। কিন্তু পাবলিক আর সইতে পারে নাই। তাই জনবিস্ফোরণে তার পতন হইছে। মাসকিটা এবং তার সহলেখকেরা এখন ৬ষ্ঠ রুল এড করতে পারেন, পাবলিকরে আবার বেশী চাপ দিও না। ওরা সংখ্যায় বেশী। দেয়ালে পিঠ ঠেকলে বিগড়ে যাবে।

উপসংহারঃ

কোনো নেতা একা শাসন করে না। সবচেয়ে অত্যাচারী স্বৈরশাসকও তার মূল সমর্থকদের সমর্থন হারালে টিকতে পারে না। যেমন, এখানে উদাহরণ শেখ হাসিনা। তবে, উনার পতনের পরে কি অবস্থার খুব একটা উন্নতি হইল?

মাসকিটা লেখছিলেন, অসংখ্য বিপ্লবী নেতা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সাম্যের প্রতিশ্রুতি দেয়। শান্তি আর সমৃদ্ধির কথা বলে। কিন্তু প্রায়ই দেয় দুর্নীতি, দারিদ্র্য আর হতাশা।

যেটা হাসিনা পতনের পর বাংলাদেশে হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিছে। কারণ, শুধুমাত্র নেতা বদলাইছে। নতুন নেতা আসছে।

যাদের ব্যবহার করে এই বিপ্লব বা অভ্যুত্থান হইছে, এরা ভোটাধিকার বঞ্চিত মানুষ। এদের ভেতরে ক্ষোভ ও হতাশা ছিল, তাই তারা মাঠে নামছে। মাসকিটা লেখেন, তারা মানব ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। তারা প্রায়ই বিপ্লব আর যুদ্ধের কামানের খোরাক হয়।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হইলে, তাদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যাবে। দেখা যাবে, আবার উইনিং কোয়ালিশন, আর্মি, প্রশাসন, প্রথম আলো, বাইরের দেশ ইত্যাদি নেতারে ক্ষমতায় নিতেছে। আর নেতা ক্ষমতায় নিজেরে, নিজের লোকদের, এবং তার উইনিং কোয়ালিশনরে সুবিধা দিয়া যাচ্ছেন।

নেতার ইনসেন্টিভ যেদিকে থাকবে, তিনি ঐদিকে কাজ করবেন। ক্ষমতায় যাইতে পাবলিকের ভোটের উপর নির্ভর করতে হইলে পাবলিকের জন্য কাজ করবেন।

সিস্টেম ঠিক করে, অর্থাৎ গণতন্ত্র আইনা আপনি নেতার আসনে জেবুরে বসান, দেশ ভালো চলবে। কিন্তু সিস্টেম ঠিক না করে আপনি কোন সাধুরে আইনা বসাইলেও কাজ হবে না, জনগণের দূর্ভোগ কমবে না।

কোন ইউটোপিয়ান মতাদর্শ নাআমাদের প্রধান দায়িত্ব হইল, দেশে পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।

ফন্ট বড় করুন-+=