ধর্ম শিক্ষা বইতে পড়ছিলাম নবী ইব্রাহিমের কথা। তিনি নাকি ছোটবেলায় আসমানের দিকে তাকাইয়া তারাদের দেখতেন আর ভাবতেন, এইগুলা নিশ্চয়ই কেউ না কেউ তৈরি করছে। এইরূপ ভাবতে ভাবতে তিনি একসময় তার বিশ্বাসের খোঁজ পান, আল্লাহর দিদার লাভ করেন।
ওইসময়ে এই চিন্তাটা ইন্টারেস্টিং লাগত। আসমান এবং সেইদিকে তাকাইয়া আমরা যে তারকারাজি দেখে, এইগুলা আমাদের কিছু প্রশ্নের দিকে ঠেইলা দেয়। যেইরকম দিত প্রাচীন কালের মানুষদের।
মানুষের মধ্যে জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে এই চিন্তা আসা স্বাভাবিক যে, জীবনের অর্থ কী। আমার যে লাইফ আছে, বা সকলের লাইফ মিলে যে এই জগত সংসার এর উদ্দেশ্য কী।
এর এক আধ্যাত্মিক উত্তর আছে। যেই উত্তরের কেন্দ্রে ঈশ্বর আল্লাহ ভগবান। ধর্মীয় ব্যাখ্যা। বলা হয়, সেই পরমপিতা সব সৃষ্টি করেছেন, তার থেকেই আসা এবং তার কাছেই মহাযাত্রা। মাঝখানে এই ক্ষণকালের জীবন।
পৃথিবীর মহান ধর্মগুলা এই কেন্দ্রীয় থিসিসের উপর ভিত্তি করে মানুষরে দুনিয়াতে ভালোভাবে চলার, মিলেমিশে চলার দিক নির্দেশনা দেয়।
মূলত, এই দুনিয়াতে কীভাবে চলতে হবে, এই সমস্যার মীমাংসা করতেই আসলে ধর্ম ব্যাখ্যাটা দিতে যায়, ধর্মের মূল উদ্দেশ্য এটা না যে, জীবনের মিনিং, বা কোথা থেকে কী আসলো এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেয়া। এইজন্য এইরকম কোন যৌক্তিক বিবরণ ওইখানে নাই, তার চেষ্টাও নাই। যা আছে, তা কেবল দুনিয়াতে কিভাবে চলতে হবে তার নির্দেশনা দিতেই।
দুনিয়ায় মানুষের “জীবনের অর্থ কী” সমস্যার সমাধান, আধ্যাত্মিক ভাবে অর্থাৎ ধর্মপন্থায় হলো, আল্লাহ ভগবান ঈশ্বর বা কোন সুপ্রিম দেবতায় বিশ্বাস করা।
এই বিশ্বাস স্থাপন মূল, এটা হলে জীবনের অর্থ কী এই সমস্যার সমাধানের ভিত্তি স্থাপিত হয়। বিশ্বাসের লেজ ধরে আসে নানা নিয়ম কানুন, কর্মফল, এবাদত, পূজা, আরাধনা, নির্বাণ ইত্যাদি ইত্যাদি, এগুলা মানতে মানতে বিশ্বাসী তার জীবনের অর্থ বের করেন।
কিন্তু, এই অর্থে সকলের বিশ্বাস নাই। এবং এই স্পিরিচুয়াল পন্থায় অর্থ বের করতে চান না সবাই।
প্রাচীন গ্রীসে সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো এইরকম দার্শনিকেরা ভার্চ্যুয়াস লাইফরে গুরুত্ব দিতেন। তাদের জন্য লাইফের অর্থ ছিল ভার্চ্যুয়াস লাইফ লিড করা। একজন মানুষ যখন যৌক্তিক এবং ভার্চ্যুয়াস লাইফ লিড করবে, তখন তার ভেতরে একটা তৃপ্তি আসবে, ওই অবস্থা অর্জনই তারা করতে চাইতেন। সকলে যে একইরকম চিন্তা করেছিলেন তা না, কিন্তু, সাধারণ ভাবে বলা যায় এই চিন্তা প্রধান ছিল।
প্রাচীন দার্শনিক এপিকিউরাস মনে করতেন জীবনের উদ্দেশ্য হইল সুখ বাড়ানো ও দুঃখ কমানো। একইভাবে আধুনিক কালে বেন্থাম মিল ইত্যাদি দার্শনিকও মনে করেন, জীবনে সুখ বাড়ানো এবং দুঃখ কমানোই উদ্দেশ্য। এই মতরে বলে উপযোগবাদ।
আধুনিক কালে, বিশেষত যখন গ্যালিলিও প্রথম বুঝাইতে পারলেন পৃথিবী সকল কিছুর কেন্দ্রে না তখন ধর্ম কেন্দ্রিক জীবন ব্যাখ্যার পদ্বতিটা ধাক্কা খায়। এরপর থেকে অন্যভাবে ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।
ব্যাপারটা এইরকম, যখন বুঝা গেল পৃথিবী কেন্দ্রে না, তখন ঈশ্বর দুনিয়া তৈরি করেছেন, চালাইতেছেন এই যুক্তিটা দূর্বল হয়ে যায়। মানুষরে তখন অন্য ব্যাখ্যা খুঁজতে হয়, এই লাইফের অর্থ কী বের করতে।
অস্তিত্ববাদীরা বললেন, লাইফের আসলে ওইরকম কোন অর্থ নাই। গড তৈরি করে দিছেন, ইত্যাদি নাই। মানুষরে তার লাইফে কাজ ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অর্থ তৈরি করে নিতে হবে।
জ্য পল সার্ত্রে, আলবেয়ার কাম্যু ও ঔপন্যাসিক ফিওদর দস্তয়েফস্কির লেখায় এই মত প্রতিভাত হয়।
পরে কাম্যু অন্যভাবে এক ব্যাখ্যা দেন। যার নাম দেয়া হইছে এবসার্ডিজম। যেইখানে কথা হইল, লাইফ এবসার্ড, এর কোন অর্থ নাই। অর্থ খোঁজার চেষ্টাও অর্থহীন। মানুষের জন্য ভালো উপায় হইল, এই লাইফের এবসার্ডনেস মেনে নেয়া, অথেনটিক্যালি নিজের জীবন যাপন করে যাওয়া। এর মাঝেই মিনিং বা অর্থ খুঁজে নেয়া।
কাম্যু মিথ অফ সিসিফাস থেকে সিসিফাসের উদাহরণ টানছিলেন। সিসিফাস ছিল এক রাজা। কোন এক কারণে গ্রীক মূল দেবতা জিউস তারে শাস্তি দেন। শাস্তিটা হইল এক পাহাড়ের উপরে পাথর টেনে তুলতে হবে। তোলার পর এই পাথর নিচে পড়ে যাবে। সিসিফাস আবার তুলবে। এটাই তার শাস্তি, অনন্তকাল এটা চলবে।
কাম্যু তার ব্যাখ্যায় বলেন মানুষের জীবন এইরকম, সিসিফাসের পাথর তোলার মত, অর্থহীন। কিন্তু, এর মাঝেই সিসিফাসরে আনন্দ খুঁজে নিতে হয়, এই এবসার্ড কাজের মধ্যে। কারণ তার কাছে অন্য কোন উপায় নাই।
দেবতা জিউসের শাস্তি দানের মধ্যে সূক্ষ্ম এক বুদ্ধির প্রমাণ মিলে। আধুনিক কালের রিসার্চে দেখা গেছে, যেটা ড্যান আরিয়ালির লেখাতে মিলে, একজন মানুষ যখন কাজ করে, এবং দেখতে পায় তার কাজ কোন অর্থ তৈরি করতেছে না, তখন সে ডি মোটিভেটেড ফিল করে। এই ডি মোটিভেটেড ফিল করাইয়াই সিসিফাসরে শাস্তি দিতে গেছেন জিউস, শারীরিক কষ্ঠ এতে বহুগুণে বর্ধিত হয়। এনার্কিস্ট ডেভিড গ্রেভার তার বুলশিট জবে বলেন, আধুনিক কালে মানুষদের জবের অনেকগুলাই, গ্রেভারের অনুমানে ২০ থেকে ৫০%, অর্থহীন। এরা বুঝতেছেন তাদের কাজ দুনিয়াতে মিনিংফুল কোন কন্ট্রিবিউশন করতেছে না।
যখন মানুষ বুঝতে পারে যে ঐশ্বরিক কোন অর্থ নাই, উদ্দেশ্য নাই জীবনের, তখন আরো কিছু সমস্যা সামনে আসে, যেমন, তাইলে আমরা ভালো কাজ কেন করব? বা ভালো কেন থাকব? নৈতিকতার ভিত্তি তাইলে কী, বা নৈতিক থাকা কেন জরুরী।
কোন অর্থ যেহেতু নাই, তাই নৈতিকতার ভিত্তিও নাই, অতএব, কোন কিছুরই কোন ভ্যালু নাই। এইরকম একটা হতাশাময় অবস্থা তৈরি হতে পারে, এরে অনেকে নায়ালিজম নামে ডাকেন, কীয়ের্কেগার্ড এই অবস্থার নাম দিছিলেন মডার্ন আয়রনি।
এই নিহিলিজম বা নায়ালিজমের অবস্থার কথা যখন আসে তখন জর্মন দার্শনিক ফ্রেডরিখ নীতশের কথা আসবে। তিনি যেহেতু আর্গুমেন্ট দিয়া গেছেন খ্রিস্ট ধর্মের ভ্যালু ও নৈতিকতার যে ভিত্তি ধরা হয়, তা ভুয়া, তাই, অনেকে ভাবেন তিনি হয়ত নায়ালিজমের দার্শনিক। আসলে নিহিলিজম একটা বড় টার্ম, যার বিভিন্ন ধরনের ব্যবহার হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং নীতশে এর গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ করেছেন।
নীতশের কথায়, নিহিলিজমের সমস্যা খ্রিস্টান ভ্যালু সিস্টেমের বা আব্রাহামিক ধর্মেরই সমস্যার অন্যপিঠ। নায়ালিস্টরা কেন হতাশ হয়? কারণ তারা আবিষ্কার করে ধর্মে সত্য নাই, বা কোন সত্যই নাই। এই সত্য না থাকারে তারা মানতে পারে না। ফলে অর্থহীনতার বোধে আক্রান্ত হয়। তারা পুরানা ভ্যালু সিস্টেমরেই আঁকড়াইয়া ধরে বলে হতাশায় ভুগে।
খ্রিস্টান বা আব্রাহামিক ভ্যালু সিস্টেম মনে করে এই জীবনের পরে এক অনন্ত জীবন আছে, যার প্রস্তুতি হইল এই জীবন। মৃত্যুর মধ্য দিয়া সেই অনন্ত জীবনে প্রবেশ করতে হয়। আবার, মানুষের বাচ্চা উৎপাদনের প্রক্রিয়ারে তারা একধরনের পাপ হিশাবে দেখে, এবং নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, যেমন আদিপাপের কনসেপ্ট, এইগুলারে নীতশে প্রধান ভ্রান্তি হিশাবে ধরে নিছিলেন।
নীতশে বলেন, এই ভ্যালু সিস্টেমরে র্যাডিক্যালি ও ক্রিটিক্যালি পুনর্বিচার করতে হবে। তিনি বিং এবং সত্যরে অভারকাম করতে বলেন, এবং এগুলারে অভারকামের মাধ্যমেই বিকামিং এর জগতে প্রবেশ করা যায়। এইভাবেই তার উবারম্যানশ “ম্যানরে” অতিক্রম করে উবারম্যানশ হয়। এই লাইনে বলতে গিয়া নীতশে বলেন, সক্রেটিস এবং তার উত্তরসূরি দার্শনিক যারা ভার্চ্যুয়াস লাইফের কথা বলে গেছেন, এরা ছিলেন ভেতর থেকে নিহিলিস্ট, এবং এন্টাই লাইফ। নীতশে আব্রাহামিক ধর্মের ভ্যালু সিস্টেমরে যেইরূপ ঘৃণা করতেন, সক্রেটিসের দার্শনিকতারেও একইভাবে এটাক করেছেন।
পুনঃবিচারের কথা যখন আসলো, তখন দার্শনিক রেনে দেকার্তের এক থট এক্সপেরিমেন্টের কথা আনা যায়, যার আপডেটেড ভার্সন করেছেন দার্শনিক হিলারি পুটনাম। ব্রেইন ইন দ্য ভ্যাট, ধরা যাক, ব্রেইনরে রাখা হইছে একটা জায়গায়, বাঁচাইয়া রাখা হচ্ছে, আরেকদিকে ওই ব্রেইনরে কোন সুপার কম্পুটার এক রিয়ালিটি দেখাইতেছে। এমন অবস্থায়, এই ব্রেইন কি বুঝতে পারবে যে, তার রিয়ালিটি আসলে রিয়াল না?
একই লাইন ধরে, আমরা যে ওই ব্রেইন ইন দ্য ভ্যাট অবস্থায় না, অর্থাৎ, আমরা কীভাবে বুঝতে পারব আমাদের যে রিয়ালিটি তা রিয়াল কি না?
এটা দেকার্তের ইভিল ডেমন থট এক্সপেরিমেন্টের আপডেটের রূপ, এবং দেকার্তে এর এক সমাধানও বের করেছিলেন।
তার কথা হচ্ছে, সব কিছুরে সন্দেহ করতে হবে। অন্তত জীবনের কোন এক পর্যায়ে একজন লোকের সকল কিছুরে নিয়া সন্দেহ করা উচিত। দেকার্তে একবার তার বাসার পেছনে চেয়ারে বসে পাইপ খাইতেছিলেন, পায়ে স্যান্ডেল, তিনি লেখতেছেন, এই যে আমি এই পাইপ খাইতেছি, আসলে কি এইটা আমার হাতে আছে, বা আমার পায়ে কি স্যান্ডেল আছে? তার সন্দেহবাদের ধরণ এই ছিল এই।
তিনি কেন সন্দেহ করতে বললেন? কারণ যেহেতু আমাদের বাস্তবতা রিয়াল কি না তা জানার কোন উপায় নাই, ফলে জ্ঞানেরও কোন উপায় নাই, অতএব, যে একটা জিনিশ একজন লোক করতে পারে তা হইল সন্দেহ। এর মাধ্যমে অন্তত একটা ব্যাপারে জানা যায়, তার নিজের অস্তিত্ব আছে, তা না হইলে সন্দেহ করে কে। এইজন্য দেকার্তে বলেন, আই থিংক, দেয়ারফর, আই এম।
দার্শনিকদের এই আলাপ আলোচনার ফাঁকে, আমরা যেমনে দুনিয়ারে দেখি, এইভাবে কিছু আলোচনা করতে পারি জীবনের মিনিং নিয়া। দার্শনিকদের যে আলোচনা তা কোনোদিক দিক দিয়েই শেষ হবার মত নয়।
এই রফিক ও বাবুলের গল্পটা পড়েন।
রফিক ও বাবুল দুই বন্ধু।
ছোটবেলায় তারা খেলনা নিয়া আলাপ করত। পরস্পর খেলনা বিষয়ে প্রতিযোগিতা ফীল করত। যাদের খেলনা নাই সেইসব বন্ধুদের নিয়া কথা বলে মজা পাইত।
প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হইয়া আলাপ করতো কে কোন ঘরের নামতা পারে, কে বৃত্তি পাবে এইসব নিয়া। যারা পারে না তাদের কথা বলে আনন্দ পাইত।
ফাইভ পাশ করার পর তাদের চিন্তা ও আলোচনায়, কোন স্কুলে ভর্তি হবে। বন্ধুরা যে স্কুলে ভর্তি হইতেছে ওই স্কুলে যাইতে হবে, নাইলে কীভাবে জীবন যাপন করবে এই চিন্তায় ঘুম হয় না।
হাই স্কুলে ভর্তির পর যারা বাজে স্কুলে ভর্তি হইছে, এদের কথা বলে তারা মজা নিত। যারা তাদের চাইতে ভালো স্কুলে ভর্তি হইছে, এদের ওই স্কুল যে আসলে অত ভালো না এই যুক্তি দিয়া পরস্পর মজা পাইত, যদিও মনে মনে প্রতিযোগিতা ফিল করত।
ক্লাস এইটে উঠে, বৃত্তি নিয়া আলাপ করত। কে পাবে কে পাবে না।
নাইনে উঠার পর এসএসিতে জিপিএ ফাইভ পাবে কি না, কে পাবে কে পাবে না।
এসএসসি পাশের পর কোন কলেজে ভর্তি হবে। নামী কলেজ না হলে মুখ দেখানোর উপায় নাই।
এইচএসসি ঘনাইয়া আসলে জীবনের সব চাইতে বড় চাওয়া জিপিএ ফাইভ পাইতেই হবে।
এইচএসসি পাশের পর, মেডিকেল বা বুয়েটে চান্স পাইতেই হবে। নাইলে কোন ভালো বিশ্ববিদ্যালয়। কারও কাছে মুখ দেখানো যাবে না অন্যথা হইলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়া, ভালো জিপিএ তুলতে হবে। শেষ বছরে গিয়া, ভালো জার্নালে পেপার পাবলিশ করতে হবে, জিআরই দিয়া বিদেশ যাইতেই হবে মাস্টার্স করতে এইসব তাদের টপিক।
বিদেশ গিয়া তাদের আলাপ, মাস্টার্স শেষে চাকরি পাইতে হবে। যারা আসতে পারে নাই তাদের কথা বলে তখন তারা মজা পায়।
চাকরী পাবার পর বিয়া করতেই হবে। তখন তাদের মাঝে মাঝে কথা হয়, কথা শুরুই হয়, বিয়া করবি কবে দিয়া।
বিয়া করার পর আরও ব্যস্ত দুইজন। তখন কদাচিৎ কথা হয়, তারা কার কী বাচ্চা বা বাচ্চা হইছে কি না, নিবে কি না এই নিয়া আলাপ করে। অন্যদের ব্যাপারে- কার বউ কিরকম এবং কোন জায়গায় কী শুনছে, কার বউ তারে কনট্রোল করে রাখে, কে বউ পিটায়, কার বউ তারে পিটায় ইত্যাদি তাদের মজার আলাপের বিষয় তখন।
বাচ্চা হবার পর বাচ্চাদের স্কুল নিয়া আলাপ করে। মাঝে মধ্যে বাড়ি গাড়ির আলাপ করে। কিন্তু একটু ধীরে সুস্থে করে যাতে অন্যে আবার কি না কি মনে করে। অন্যদের মধ্যে যারা বেশী বাড়ি গাড়ি করতেছে তাদের সাথে প্রতিযোগিতা ফিল করে, এদের নিয়া খারাপ কথা বলে। যেমন টাকা করছে কিন্তু দুই নম্বর, বা তার বউ তো খারাপ। যারা করতে পারে নাই তাদের কথা বলে আনন্দ পায়।
এরপর রফিক ও বাবুল বুড়া হয়ে অবসর নিয়ে ফেলে। এখন তারা কথা বলে নিজেদের বাচ্চারা কোথায় কী করতেছে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে, কোন কোম্পানিতে, হাতি ঘোড়া মারতেছে কি না, কার বাচ্চা কোন দিকে নষ্ট হইছে এইসব বিষয়ে।
এরপর রফিক ও বাবুল মরে যায়।
মরার পরে তাদের কথা হয়, একরকম, হঠাত হঠাত। তখন তারা কথা বলে, ওই জানোস, আমি তো বহু কষ্ঠে ছয় নম্বরে চান্স পাইয়া গেছিরে ভাই। অই যে একবার প্রাইমারি স্কুলে থাকতে একটা পোলারে দশ মার্কের অংক দেখাইছিলাম, এই নিঃস্বার্থ উপকারের পুণ্যে পার পাইয়া গেছি। অল্পের জন্য গুলি কানের পাশ দিয়া গেছে।
অন্যজন বলে, আমারও সেইম অবস্থা। হিশাবের সময় আমি তো ভাবছিলাম সব শেষ। পরে দেখলাম আমার বউ যে জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান খুলছিল, ওইটাতে বছরে কিছু টাকা দিতাম, এর পুণ্যেই ৫ নাম্বারে চলে আসছি।
তাই নাকি। আর কারো খবর পাইছস?
হ, ওই আমাদের লগে যে পড়তো মামুন, টাকলা মামুন, পাট রপ্তানী করতো, এরে দেখছি ৫ নাম্বারে। তার মুখে শুনলাম জোয়ার্দার, হাসান, বউ পিটাইন্না জাকির এরা চান্সই পায় নাই। আগুনে জ্বলতেছে।
অর্থাৎ, তখনো রফিক ও বাবুল, কথা বলে নিজেরা কই আছে, এবং তাদের পরিচিত ও বন্ধুরা কে ভালো অবস্থানে ও কে খারাপ অবস্থানে আছে এই নিয়া।
এই হচ্ছে আমাদের রফিক ও বাবুলের কথাবার্তার জীবন চিত্র।
এই গল্পে রফিক ও বাবুল প্রতিক্ষেত্রে অন্যদের নিয়া আলাপ করতেছে বা তুলনা করতেছে এইটা প্রধান বিষয় না।
খেয়াল করেন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রফিক ও বাবুলের কাছে বিভিন্ন জিনিশ গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠতেছে। এইগুলা তখন তাদের মিনিং দিচ্ছে। তাদের মরার পরের কাল্পনিক পার্টটা বাদ দিয়ে।
এই মিনিংগুলাই আসলে রফিক ও বাবুলের লাইফের মিনিং। জীবন সায়াহ্নে নানা সময়ে আসা মিনিংগুলা মিলেই তার মোট একটা মিনিং হবার কথা।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রফিক ও বাবুলের জীবনে এই মিনিং গুলা কারা তৈরি করে দেয়?
একটা ক্লাস ফাইভের বাচ্চারে বৃত্তি পাইতে হবে বা ভালো রেজাল্ট করতে হবে বা এসএসসির ছাত্র ছাত্রীরে জিপিএ ফাইভ পাইতে হবে, এইসব মিনিং কারা তৈরি করে দেয়? এগুলা জাস্ট উদাহরণ, অন্য যেকোন বিষয় ধরতে পারেন।
একটা দেশ যদি ধরেন, এই দেশের কর্তাব্যক্তি কারা? রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী এম্পী, আমলা, টিভি পত্রিকার মালিক, সাংবাদিক, লেখক, বড় ব্যবসায়ী, শিল্পী এরাই তো? এইসব জায়গায় প্রতিষ্ঠিত যারা আছেন, তারা কমবেশী চল্লিশের উপরে বয়েসের। এরাই সমাজে মিনিং তৈরি করার কাজ করেন।
ধরা যাক, এক লোক বাপ হইছেন, ভালো বাপ হইতে বা তিনি যে বাপ হইছেন এইটা বুঝতে বুঝতে তার চল্লিশ বয়েস হবে। তিনি তখন বাচ্চারে আইন কানুন রীতি নীতি শেখাবেন।
চল্লিশের উপরের বয়েসের লোকেরা চল্লিশের নিচের বয়সীদের জন্য মিনিং তৈরি করার কাজ করেন।
কিন্তু নিজেরা আবার বুঝতে পারেন যে, কোন কিছুরই মিনিং নাই।
তিনি পোলারে শেখাবেন সদা সত্য কথা বলিবে, কিন্তু নিজে অভিজ্ঞতায় দেখেছেন এইটা কাজের পন্থা না, ফলে এইটাতে তিনি বিশ্বাস করেন না। আবার, তিনি এইটা পুরা অবিশ্বাস করে এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতেও পারেন না কারণ ততদিনে তার উপর দায়িত্ব চলে আসছে যে, নতুনদের জন্য মিনিং তৈরি করে দিতে হবে। যারা এই সামাজিক দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন, বিশেষত দেখা যাবে এদের বাচ্চা কাচ্চা নাই, তারা নিজেদের ডি-ক্লাসড দাবী করে এই মিনিং চক্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন, এবং তারা পালটা আরেকটা মিনিং অথবা মিনিংলেসনেস/নিহিলিজম প্রচার করতে পারেন সহজে।
এভলুশনারি দিক থেকে দেখলে, সামাজিক এইসব মিনিং তৈরি, সিগনালিং, সোশ্যাল স্ট্যাটাসের গেইম, এগুলা সারভাইভালের এক টুল হিশাবে সমাজে তৈরি হয়েছে। এগুলার মাধ্যমে মানুষ তার সারভাইভালের সম্ভাবনা তথা ক্ষমতা বাড়ায়।
এখন, এতো লেখার পরেও এই লেখায় এমন কিছু আসলো না যেখান থেকে জীবনের মিনিং কী ব্যাপারটা একেবারে স্পষ্ট হবে, এবং আপনি সেই স্পষ্টতা লইয়া ঘরে যাবেন, নিজের লাইফরে বুঝতে পারবেন। তবে, এই ব্যাপারটা হয়ত স্পষ্টভাবেই আসছে যে, জীবনের মিনিং বিষয়ক কথাবার্তা একেবারে স্পষ্ট কিছু না। নানাদিক থেকে এটারে দেখা যায়, এবং দার্শনিকেরা ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে দেখেই ভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করতে গেছেন। তবে এখন, আরেক রকমভাবে দেখা যাক।
একজন ব্যক্তি ধরা যাক বুঝতে পারলেন তার ধর্মীয় যে সত্য ওইটা ঠিক না, ফলে তার মিনিং হারাইয়া গেল। তিনি দেখতে পারলেন সমাজের যেসব আচার বিচার আছে, ওইগুলাও অত সত্য কিছু না। একটা অর্থহীনতার বোধে তিনি আক্রান্ত হইয়া গেলেন, এবং হতাশায় পড়ে গেলেন। ভাবলেন যেহেতু অর্থই নাই কোন কিছুর তাহলে কেন কিছু করব। এই অবস্থা তার জন্য ভালো নয়।
ব্যক্তির জীবনের মিনিং এককভাবে কোন গ্র্যান্ড মিনিং, এবং এর ভেতরেই থাকতে হবে এমন কিছু নয়, যে সেটা ভুল হলেই সব কিছু ভেঙ্গে পড়তে হবে। আমরা বাস্তবে দেখি একজন ব্যক্তি পড়ালেখা করেন বিদ্যালয়ে, খেলাধুলা করেন, প্রেম বিয়া সংসার করেন, বাচ্চা কাচ্চা হয়, তিনি তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করেন, মাতা পিতার প্রতি দায়িত্ব পালন করেন, দেশের সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করেন, চাকরী বাকরী ব্যবসা করেন, টাকা কামান, ক্রিয়েটিভ কাজ করেন, আধ্যাত্মিক কাজ করেন ইত্যাদি।
এইসব বিভিন্ন অংশের ক্ষেত্রে তার পারিপার্শ্ব ও চিন্তা ভিন্ন হয়। যেমন, তিনি টাকা বানাইতে গেছেন ফাইনানশিয়াল মার্কেটে, ওইখানে তিনি যে উদ্দেশ্য ও মাইন্ডসেট নিয়া কাজ করবেন, মাতাপিতার প্রতি বা বাচ্চাদের প্রতি সাংসারিক দায়িত্ব পালনে একই উদ্দেশ্য নিয়া করবেন না। আবার তিনি বন্ধুবান্ধবের সাথে যে উদ্দেশ্য ও মাইন্ডসেট নিয়া মেশেন, একই উদ্দেশ্য ও মাইন্ডসেট নিয়া তার জব করেন না।
ব্যক্তির জীবনের এই আলাদা আলাদা অংশ আলাদা আলাদা মিনিং তৈরি করে তার জন্য। এইগুলার সমন্বিত রূপেই তার লাইফের মিনিং তৈরি হয়। এইখানে বুঝার ক্ষেত্রে মানুষের কিছু সমস্যা হয়,
এক – যখন সে এই আলাদা আলাদা অংশগুলার আলাদা স্ট্র্যাকচার ধরতে পারে না, সব গুলাইয়া ফেলে।
দুই – আলাদা অংশগুলা কানেক্টেড হইয়া যে তার লাইফের সমন্বিত মিনিং তৈরি করে এটা যখন বুঝতে পারে না। কোন এক অংশে জিতাই সমগ্রটা জিতা ধরে নেয়।
তিন – যখন সে মনে করে সমাজ ও কালচার যেভাবে চাপাইয়া দিছে, ওইভাবেই বিভিন্ন অংশগুলা ফাংশন করে এবং ঐভাবেই তার এইগুলারে মানতে হবে।
চার – যখন সে ভ্রান্তভাবে ভাবতে থাকে কোন এক অংশে সফলতা হইল একক কোন বড় লক্ষ্যে পৌঁছানো, এবং নিয়মিত স্তর বাই স্তর উন্নতিরে বুঝতে পারে না।
প্রথম সমস্যার ক্ষেত্রে, কোন এক অংশে ধাক্কা খাইলে, ভুল প্রমাণিত হইলে, ধরা যাক প্রেমে ধোঁকা খাইল, তার মনে হয় পুরা লাইফের মিনিংটাই ভুল। অথবা, অনেক খুঁজেও চাকরী পাইতেছে না, ফলে সে হতাশ হইয়া সব ছাইড়া দিল। অথবা, একইভাবে সব অংশরে দেখতে গেল, একইভাবে ডিল করতে গেল।
দ্বিতীয় সমস্যার ক্ষেত্রে, সে কোন একদিকে বেশী গুরুত্ব দিয়া অন্যগুলার ইগনোর করতে থাকে, তার মনে হইতে থাকে এক অংশে ভালো হইলে অন্য অংশও ভালো হবে। যেমন, সে টাকা বানাইতে বেশী গুরুত্ব দিতেছে কিন্তু তার সংসাররে ইগনোর করতেছে, ফলে পরে দেখা যাইতেছে সংসারে তার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেছে। বা এমনভাবে টাকা বানাইতেছে যা তার ক্যারেক্টার নষ্ট করে দিতেছে, সে ধান্দাবাজ হইয়া উঠতেছে ও মানুষের ক্ষতি করতেছে।
এইখানে একটা কাহিনী উল্লেখ করা যায়।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট জর্ডান পিটারসন একবার হকি খেলা দেখতে গিয়েছিলেন, তার ছেলের টিমের খেলা। ছেলের বয়স তখন ১২। তার ছেলে ভালো খেলত কিন্তু দলে আরেকজন ছিল যে ছিল বেশি ভালো হকিতে। কিন্তু সে অন্যান্যদের সাহায্য করত না।
সেই ম্যাচে পিটারসনের ছেলের দল হারে। যদিও ওই ভালো খেলতে পারা ছেলেটি স্কোর করেছিল।খেলা শেষে ছেলেটি হকি স্টিক দিয়ে ফিল্ডে আঘাত করতে করতে বলছিল যে রেফারিং কত বাজে হয়েছে, খেলা কত আনফেয়ার হয়েছে।
ছেলেটির বাবা এগিয়ে গেলেন। তিনি গিয়ে ছেলেটির সাথে যোগ দিলেন। বলতে থাকলেন খেলা কত আনফেয়ার হয়েছে। পিটারসনের ভাষ্যে এর চাইতে খারাপ প্যারেন্টিং আর হয় না।
মানুষ তার ছেলেমেয়েদের ভালো করতে বলে, “তুমি জিতলে না হারলে সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হল তুমি কীভাবে খেললে।”
কিন্তু এই কথার অর্থ কি তা যেমন বাচ্চারাও বুঝে না, বাবা মাও বুঝেন না। কারণ জিতার জন্যই তো খেলে তারা।
জর্ডান পিটারসন অন্যভাবে বিষয়টাকে দেখতে বলেন, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য একটা খেলায় জিতা না, বরং সম্ভাব্য সব খেলার সেট এ জিতা। সম্ভাব্য সব খেলার সেটে জিততে হলে আপনাকে একটা খেলায় জিতলেই হবে না। এমনভাবে খেলতে হবে যাতে আপনি আরও বেশি বেশি খেলার সুযোগ পান, আমন্ত্রিত হন।
তাই যখন কেউ বলেন তার বাচ্চাকে, তুমি জিতলে না হারলে তা নয়, কীভাবে খেললে তা বড় কথা, এর অর্থ হল, এমনভাবে তুমি খেলবে যাতে জিতো, কিন্তু এমনভাবে জিতবে যেখানে তোমার দলের সদস্যরা তোমার সাথে আরো খেলতে চাইবে, তোমার বিরুদ্ধ দল তোমার সাথে আরও খেলতে চাইবে, আর এভাবেই তুমি আরো বেশি বেশি খেলায় আমন্ত্রিত হবে।
মানুষের লাইফ কোন পার্টিকুলার গেইম হয় না, অনেক অনেক গেইমের সেট থাকে। একজনকে ব্যবসায় টাকা উপার্জন করলেই হয় না, তার ব্যক্তিগত হ্যাপিনেস থেকে শুরু করে আরো অনেক গেইম থাকে, টাকা উপার্জনের গেইমের সাথে। এবং বেশি গেইমে জিততে হলে সে কিভাবে খেলছে তা গুরুত্ব বহন করে।
আবার, এইখানে আরেকটা বুঝার মত এক জিনিশ আছে। ব্যক্তিরে সমাজ ঠিক করে দেয় নানা গেইম, যেমন তার চাকরী করতে হবে, বিয়া করতে হবে, বাচ্চা নিতে হবে, ইত্যাদি। এগুলার মধ্যে ব্যক্তি নিজে তার চাহিদা, পছন্দমত গেইম নিতে পারে, বাদও দিতে পারে। যেমন কেউ বাচ্চা লাইক করে না, সে বাচ্চা নিবে না। এই অবস্থায় সমাজ যদি বলে সে বাচ্চা নেয় নাই, তাই সে ব্যর্থ বা তার টাকা হইয়া কি হইল, এইরকম না বিষয়টা। মিনিং এর বিচার বাইরে থেকে আসবে না। যেহেতু মিনিংটা ব্যক্তি ভেতর থেকে তৈরি করতেছে, তাই তার বিচারেই তার মিনিং হবে। সবাইরে সমাজের ঠিক করে দেয়া সব গেইম খেলতে হবে এমন কোন নিয়ম নাই।
অর্থাৎ, যদি সে ঠিক করে ফ্যামিলি, বাচ্চা, টাকা এইসব গেইমে সে আছে, কিন্তু সবগুলারেই একই গেইম ভাইবা টাকার গেইমে বেশী ফোকাস দিয়া ফেললো, এবং এতে ফ্যামিলি সম্পর্ক দুর্বল হইল, সেখানে তার গেইমগুলার আলাদত্ব না বুঝাটা সমস্যার হয়। কিন্তু সে যদি কোন একটা গেইমই না খেলে, তাহলে সেইটা তার কাছে কোন মিনিং তৈরি করে না।
তৃতীয় সমস্যার ক্ষেত্রে, ব্যক্তির লাইফের এই বিভিন্ন অংশ সমাজ ও কালচার অনেকাংশে ঠিক করে দেয়। যেসব মানুষ কোন চিন্তা না করে এগুলা মেনে নেয়, তারা সমাজের রুলেই এগুলা খেলতে থাকে। কিন্তু, ব্যক্তির মিনিং এর সম্ভাবনা বাড়ে যখন সে নিজের রুল তৈরি করতে পারে ও এই বিভিন্ন অংশরে নিয়া পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারে। যেমন, একজন লোক চাকরী করে, কিন্তু চাকরী তার ভালো লাগতেছে না। তখন সে তার পছন্দের কোন একটা বিষয় নিয়া সাইড প্রজেক্ট শুরু করলো। সে নতুন একটা অংশ তৈরি করল। ধরা যাক, সে উপন্যাস লেখা শুরু করলো। বা, একটা ব্যবসা উদ্যোগ নিলো। এইটা হচ্ছে এক্সপ্লোর করা। কারণ আমাদের যে দুনিয়া আছে, যে বাস্তবতা আছে ওইটা আমাদের সামনে কি রাখছে লুকাইয়া তা পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া আমরা জানতে পারব না।
এক্ষণে উল্লেখ করি, বিখ্যাত টেক উদ্যোক্তা স্টিভ জবস তার এক লেকচারে বলতেছিলেন, ছোট থেকে বড় হইতে থাকলে শুনবেন মানুষেরা কইতেছে জীবন যেমন আছে ঐরকমই। কিছুই বদলাবে না। চাকরি করো, কিছু টাকা জমাও, সন্তান উৎপাদন করো। এইটাই লাইফ। জীবনের এক পর্যায়ে আপনি টের পাইবেন এইটা ঠিক না, অন্য মানুষেরা আপনারে যে বলতেছে ভালো চাকরি, টাকা জমানো কিছু, সন্তান উৎপাদন ইত্যাদি, এগুলাই লাইফ, এইটা খুবই লিমিটেড লাইফ চিন্তা – এর বাইরেও বিশাল লাইফ আছে। আপনার চারপাশের যে দুনিয়া, কত কিছু, এইগুলা এমন মানুষেরা তৈরি করছে যারা আপনার চাইতে প্রতিভাবান না। আপনেও চাইলে লাইফরে নিয়া খেলতে পারেন, চাইলে চেইঞ্জ করতে পারেন, প্রভাবিত করতে পারেন, এমন কিছু বানাইতে পারেন যা অন্যেরা ব্যবহার করবে। লাইফের একদিকে খোঁচা দিলে, পুশ করলে অন্যদিকে যে তার প্রভাব মিলে, এইটা যখন বুঝতে পারবেন, তখন অন্য এক লাইফ আবিষ্কার হবে। এইটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তখন লাইফ যে একটা জিনিশ যেইখানে বাস কইরাই যাইতে হবে তা নইড়া উঠে।
সকল অংশ নিয়া এইরকম এক্সপ্লোর করার, তার ভালো না থাকলে, বোরিং বা হতাশ ফিল করলে সে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারে।
চতুর্থ সমস্যায়, ধরা যাক একজনের মহিলার বাচ্চা জন্ম নিছে আজ। তার লক্ষ্য হইল বাচ্চাটা বড় হয়ে খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবে। এখন, আপনি বাচ্চাটারে নিয়ে নিলেন ও চল্লিশ বছর পরে বাচ্চাটারে মায়ের কাছে ফেরর দিলেন, বাচ্চাটা তখন কোন এক বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামই অধ্যাপক। এই মায়ের কাছে কি এইটার কোন মিনিং হবে? কোন মা কি এইরকম চাইবেন? এইখানে ব্যাপারটা হইল, বাচ্চা আস্তে আস্তে বড় হবে, কথা বলা শিখবে, বিছনায় হাগবে মুতবে, প্রথম স্কুলে যাবে, খেলাধুলা করবে, কলেজে যাবে, ইউনিভার্সিটিতে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি বিভিন্ন স্তর বাই স্তর যে পরিক্রমা, এইগুলাই আসলে মা বাপরে মিনিং দেয়। তিনি বড় লক্ষ্য রাখছেন তার ছেলে বিজ্ঞানী বা পাইলট হবে, কিন্তু এক লাফে ওইটা হইয়া গেলে, এবং ভেতরের স্তরগুলা নাই হইয়া তাদের লাইফের মিনিং কমে যায়।
মিনিং বিষয়ক এই আলোচনায় প্রথমে মিনিং এর বিভিন্ন ধরণ, দেখার ভঙ্গি ও উপর থেকে জীবনরে মিনিং দেবার প্রচলিত পদ্বতিরে বুঝার চেষ্টা ছিল। যেমন, একটা বিশাল বিল্ডিং বানাবেন, তাই প্রথমে আপনি ছাদ বানাইছেন। এখন এই চাদের নিচেই বানাবেন ঘর। সবার জন্যই এই ছাদ আগে দিয়ে দেয়া হইছে। মানুষেরা নানা কসরত করতেছেন এই ছাদের নিচে নিজেদের বিল্ডিং বানাইতে ও ফিট করতে।
আর শেষের অংশে অন্যভাবে দেখা হইল, যেখানে উপর থেকে কোন মিনিং নাই। বরং নিচ থেকে আস্তে আস্তে অংশ অংশ মিনিং তৈরি হতে হতে সামগ্রিক মিনিং তৈরি হয়। বিল্ডিং এর উদাহরণ থেকে দেখলে, আগে ফাউন্ডেশন, পিলার, এক লেভেল থেকে আরেক লেভেল, ওই লেভেলের নানা অংশ, উদ্ভূত অবস্থায় বাস্তবতা বিচারে কোন কাজে প্রাধান্য – এইগুলার মাধ্যমে নির্মাণ। সকলের বিল্ডিং এর চেহারা এক রকম হবে না, এবং এইগুলার মধ্যে তুলনার জায়গাও নাই। কারণ কোন একক স্ট্যান্ডার্ড নাই, প্রত্যেকেই নিজেদের বুঝ, চাহিদা, পছন্দমত নিজেদের মিনিং এর ইমারত নির্মাণ করে গেছেন।
—-
এই লেখার প্রথম অংশ লেখি নভেম্বর ২৮, ২০২৩ সালে। দ্বিতীয় অংশ নভেম্বর ২৮, ২০২৪ সালে।