by

জোকারের দর্শন

কনরাড ভেইড। ১৯২৮ সালের আমেরিকান সাইলেন্ট ফিল্ম 'দ্য ম্যান হু লাফস' এ। এটি পরিচালনা করেন জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট নির্মাতা পল লেনি। এটি ভিক্টর হুগোর একইনামের উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে নির্মান করা হয়।

the man who laughs

প্রকাশবাদ বা এক্সপ্রেশিনিজমের আবির্ভাব ঘটে ১৯১৫ সালে জার্মান চিত্রকলা, সাহিত্য, ভাস্কর্য ইত্যাদিতে। প্রকাশবাদে মানুষের বাইরের রূপের বদলে ভেতরের রূপের বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রায়ই চিত্রিত হয় অতি ক্ষমতাধর, ভয়ানক, সমাজবিরোধী চরিত্র।

কনরাড ভেইড এর চরিত্রটি ২০০৮ সালে ক্রিস্টোফার নোলান নির্মিত দ্য ডার্ক নাইট ফিল্মের জোকার চরিত্রের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ডার্ক নাইটের জোকার চরিত্রগত দিক থেকে একজন নায়ালিস্ট (বা নিহিলিস্ট)। নায়ালিজমের বাংলা নিরর্থবাদ। মানুষের জীবনের কোন অর্থ নাই। সামাজিক নিয়ম, রীতি নীতির কোন অর্থ নাই।

জোকার মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক কোন আইন বা নিয়ম মানে না, সে কোন অথরিটি মানে না, মানুষের নৈতিকতা এবং প্রতিষ্টিত সব নীতিকে সে বলে ব্যাড জোক। সে নিজেকে “এহেড অব দ্য কার্ভ” অর্থাৎ বক্ররেখার সামনের অংশ মনে করে। তার কথা হল, যদি কোন অথরিটি না থাকে এবং যখন স্বার্থের উপর আঘাত আসে তখন তথাকথিত সভ্য মানুষেরা বন্য হয়ে উঠবে।

joker

জোকারের এই চিন্তা বা দৃষ্টিভঙ্গী পলিটিক্যাল দার্শনিক থমাস হবসের স্টেটস অব ন্যাচারের মত। থমাস হবস একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী পোষন করতেন অথরিটিবিহীন জনসমষ্টি নিয়ে। তার সোশ্যাল কনট্রাক্ট থিওরীকে বলা হয় পশ্চিমা পলিটিক্যাল ফিলোসফির ফাউন্ডেশন। সোশ্যাল কনট্রাক্ট থিওরীর আগে জনপ্রিয় ছিল ডিভাইন রাইট থিওরী।

ডিভাইন রাইট থিওরী মতে ঈশ্বর রাজাকে দেশ শাসনের অধিকার দিয়েছেন। সুতরাং মানুষের উচিত রাজাকে মানা। রাজাকে অমান্য করলে ঈশ্বরকে অমান্য করা হয়।

থমাস হবস নিজে ছিলেন এথিস্ট। ঈশ্বরের ধারনায় তার বিশ্বাস ছিল না। তাই ডিভাইন রাইট থিওরীর বিপরীতে তিনি দিলেন সোশ্যাল কনট্রাক্ট থিওরী। অর্থাৎ রাজা কে কোন ঈশ্বর ক্ষমতা দেন নি, রাজাকে ক্ষমতা দিয়েছে মানুষ। ক্ষমতা দিয়েছে কারণ রাজাবিহীন সমাজ হয়ে যাবে বিশৃঙ্খল। সমাজের নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যই রাজার সাথে মানুষের এই সোশ্যাল কনট্রাক্ট।

ডার্ক নাইটের জোকার এই ধারণা পোষণ করে। সে দুটি ফেরীতে বোমা রেখে গোথামের মানুষকে একটি পরীক্ষার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।

জোকারের এই পলিটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গীর বাইরে সে অস্তিত্ববাদী নায়ালিস্ট। অস্তিত্ববাদী চিন্তা মানুষের নিজের অস্তিত্বকে ঘিরে। অস্তিত্ববাদ, নায়ালিজম বা এবসার্ডিজমের রুট যে দার্শনিকের লেখায় ছিল তিনি হচ্ছেন ডেনমার্কের সোরেন কীর্কেগার্ড। এরপরে দস্তয়ভস্কি, নীৎসে, সাত্রে, আলবেয়ার ক্যামু ইত্যাদি নাম আসবে। নায়ালিজমের উপরে নীৎসের কাজ বেশী। ডার্ক নাইটের জোকার নীৎসে প্রভাবিত।

kierkegaard pic
ছবিঃ সোরেন কীকেগার্ড

সোরেন কীকেগার্ড মানুষের নিজস্ব সত্তাকে বেশী গুরুত্ব দিতেন। একজন মানুষের নিজস্ব আবেগ, অনুভূতিই তার জীবনের অর্থ নির্দেশ করে, ধর্ম, সমাজের রীতিনীতি নয়। সোরেন কীকেগার্ড নিজে ছিলেন একজন খ্রিস্টান দার্শনিক এবং বিরোধীতা করে গেছেন হেগেলিয়ান আইডিয়ালিস্টদের।

ডার্ক নাইটের জোকারও নিজেকে গুরুত্ব দেয়। তার কাছে সমাজ, সংস্কার, অথরিটির কোন মূল্য নেই। সে এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তার নিজস্ব পন্থায়। নিজস্ব পন্থায় বলতে অস্ত্রসহ, বোমা ইত্যাদি নিয়ে। কীকেগার্ড যে বুর্জোয়া সোসাইটির রীতি নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বলেছেন সেটা জোকার করে অস্ত্রহাতে। কীকেগার্ডের এই চিন্তা খুবই গুরুত্বপূর্ন। আমি এই কীকেগার্ডের এই ধারণায় প্রভাবিত হয়ে গ্যাডফ্লাই নামক একটি গুপ্ত সংঘটনের চিন্তা করেছিলাম (রকমারীতে বইটি আছে)।

সোরেন কীকেগার্ড তার কনসেপ্ট অব আয়রনীর সেকেন্ড পার্টে মডার্ন আয়রনী বলে যে জিনিসটার উল্লেখ করেন সেটাই আধুনিক নায়ালিজম।

নিরর্থবাদ আধুনিক মানুষের একটি ইউনিভার্সাল সমস্যা। আগে মানুষেরা মনে করত তারা খুব গুরুত্বপূর্ন। তাদের উপরে আছেন দেবতা কিংবা দেবতারা। সেসব দেবতারা তাদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। তারা মনে করত পৃথিবী সব কিছুর কেন্দ্রে এবং তাদের প্রত্যেকের জীবনের উপর চোখ রাখছেন আকাশের দেবতা। এই ধারণার ফলে তারা নিজেদের উপর আলাদা গুরুত্ব আরোপ করত এবং তাদের জীবনের একটি অর্থ ছিল নিজেদের কাছে। তারা তাদের এবং সব মানুষের জীবনকে মনে করত দেবতাদের আশীর্বাদ প্রাপ্ত এবং দেবতাদের বৃহত্তর পরিকল্পণার অংশ।

কিন্তু ধীরে ধীরে বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে এসব ধারনার পরিসমাপ্তি ঘটল। মানুষ বুঝতে পারল এই মহাবিশ্বে তাদের আবাসস্থল পৃথিবী একটি অগুরুত্বপূর্ন এবং খুব সাধারণ মানের গ্রহ।

এই বিশালতার সাপেক্ষে একজন মানুষ অতি ক্ষুদ্র এবং অতি অগুরুত্বপূর্ন। তার নিজস্ব স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্খা, ভয়, ইউনিভার্সিটি ডিগ্রী, দুঃখ, কষ্ট ইত্যাদি মহাবিশ্বের কাছে তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর, একেবারেই মূল্যহীন। কেউ তার দিকে লক্ষ্য করছে না দূর আকাশ থেকে কিংবা অলিম্পাসের চূড়া থেকে। সে কোন বৃহত্তর পরিকল্পণার অংশ না। তার আবাসভূমি পৃথিবী একদিন তুচ্ছ গ্রহের মতই নিঃশেষ হয়ে যাবে। একদিন তার জীবনদায়িনী সূর্য প্রাকৃতিকভাবেই ত্যাগ করবে শেষ নিঃশ্বাস।

এই চিন্তা আধুনিক মানুষের মনে নায়ালিজমের বীজ বপন করে। তার তুচ্ছতা এবং তার জীবন যাপন ও চারপাশের অগুরুত্বপূর্নতা। প্রতিটি আধুনিক মানুষের মধ্যে তাই নায়ালিজমের সূত্র আছে। তবে সে এই বিষয়ে যে  সব সময় সচেতন তা বলা যায় না, হয়ত সে এটাকে অবচেতনে বহন করে। ডার্ক নাইটের জোকার সেটা স্পর্শ করেছে। সে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন, মানবজীবনের অর্থহীনতাকে ছুঁয়ে গেছে। জোকারের চারিত্রিক কার্যকলাপের পরে দর্শকের মনে জীবনের অর্থ, সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক রীতি নীতির অর্থ কিংবা অর্থহীনতা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্নের উদয় হতে পারে। আধুনিকতার এই সমস্যাকে আধুনিক মানুষ অনুভব করতে পারে। এই কারণেই জোকার একজন ভিলেন হয়েও নায়ক ব্যাটম্যানের চাইতে বেশি জনপ্রিয়। এবং পুরো ফিল্ম জগতের মধ্যে একটি জনপ্রিয়তম চরিত্র। অবশ্যই এতে স্ক্রিপ্ট রাইটার, পরিচালক এবং অভিনেতা হিথ লেজারেরও ভূমিকা আছে, জোকারের দর্শনের বাইরে।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *