"মানুষের এতো নপর-চপর কিন্তু যখন ঘুমোয়, তখন যদি কেউ দাঁড়িয়ে মুখে মুতে দেয়, তো টের পায় না, মুখ ভেসে যায়। তখন অহংকার, অভিমান, দর্প কোথায় যায়?"- রামকৃষ্ণ

কৌতুহল

DOG

 

কৌতুহল

 

ভূসি কেনার জন্য ফখরুল আলম তেরা মিয়া যখন ঘর থেইকা বাইর হন তখন তার সাদা পাঞ্জাবীর পকেটের কালো মানিব্যাগ দেখা যাইতেছিল এবং সেই মানিব্যাগের ভিতরে অনেক যত্নে রাখা, একটা মাইয়ালোকের ছবি কোনভাবেই বাইর থেইকা দেখা যাইতেছিল না। রাস্তার পাশে দাঁড়াইয়া থাকা খয়েরী রঙের কিশোর কুত্তা ফখরুল আলম তেরা মিয়ারে ভালোভাবে পর্যবেক্ষন করতে গিয়া যখন তার পাঞ্জাবীর পকেটের দিকে তাকাইল এবং দেখতে পাইল সেইখানে কালা মানিব্যাগ দেখা যাইতেছে তখন কুত্তার সিক্সথ সেন্স তারে জানাইয়া দিল এই মানিব্যাগের ভিতরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে। কুত্তাজাতীয় প্রাণীদের সিক্সথ সেন্স প্রবল হইয়া থাকে। একটা কথা আছে কেউ যদি কোন মানুষের পিছন হইতে ঘাড়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকাইয়া থাকে তাহলে ওই মানুষ এইটা আবছাভাবে বুঝতে পারে এবং হঠাৎ ই ঘুইরা তাকায়। এর কারণ হইতে পারে মানুষের তাকানোর লগে কোন ধরনের তরঙ্গের বিস্তার বা কনার বিচ্ছুরন হয় এবং এই তরঙ্গ বা কনা অন্য মানুষরে জানাইয়া দেয় যে কেউ একজন আপনার ঘাড়ের দিকে তাকাইয়া আছে। একটা কুত্তা বা অন্য প্রাণী তাকাইয়া থাকলেও একই জিনিস হইতে পারে কারণ মানুষ মূলত কুত্তা বা অন্য প্রাণীদের চেয়ে আলাদা কিছু না।

কুত্তা যখন ফখরুল আলম তেরা মিয়ার পাঞ্জাবীর পকেটের মানিব্যাগের দিকে তাকাইয়া এর ভিতরে কি আছে তা নিয়া ভাবতেছিল তখন ফুখরুল আলম নিজের ডাইন হাত পকেটে ঢুকায়া মানিব্যাগ এ হাত দিয়া আবার বাইর কইরা নিলেন। তিনি যে দেখছেন কুত্তা তার মানিব্যাগের দিকে তাকাইয়া জটিল চিন্তা করতেছে এইটা না। না দেইখাই তিনি হাত দিলেন পকেটে এবং চেক করলেন। এইটারেও ষষ্ট ইন্দ্রিয় বলা যায়। সব মানুষের ষষ্ট ইন্দ্রিয় থাকে যেইটা সাধারনের ক্ষেত্রে কখনো কখনো কাজ করে, কখনো করে না। আর যারা এইটারে নিয়া চর্চা কইরা শার্প বানাইয়া ফেলেন তাদের কথা ভিন্ন।

ফখরুল আলম তেরা মিয়া গেটের বাইরে দাঁড়াইয়া আসমানের দিকে তাকাইলেন। পরিস্কার আসমানে কিছু সাদা মেঘ ভাইসা যাইতাছে যেগুলারে মনে হইতেছে পথ ভুল কইরা ভুল এলাকায় ঢুইকা যাওয়া একদল রাজহাঁস যারা কি করবে কোথায় যাবে এ নিয়া দ্বিধাদন্দ্বে আছে। ফখরুল আলম দোকান থেইকা ভুসি কেনার জন্য হাটা শুরু করলেন। কিছু দূরে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো কুত্তাটাও তার পিছন পিছন আসতে শুরু করল, কারণ মানিব্যাগের ভিতরে কোন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে এই ব্যাপারে সে নিশ্চিত। সে একটা প্রবল আত্ববিশ্বাসী কিশোর কুত্তা। তার কৌতুহল অদম্য। সে তার বাঁকা লেজ নাড়াইতে নাড়াইতে তেরা মিয়ার পিছন পিছন আসতে শুরু করল।

ফখরুল আলম তেরা মিয়া মানুষ হিসাবে উদাসীন ধরনের। তার বয়স বাষট্টি বছর। ভুসি কেনার জন্য বের হইয়াও তার চিরাচরিত উদাসীন স্বভাবের পরিবর্তন হইল না। তিনি ছোট মুদি দোকানটার পাশে গিয়া, বৈদ্যতিক খুঁটির (যারে খাম্বা বলে ডাকা হয়) গায়ে হেলান দিয়া একটা ক্যাপস্টেন সিগারেট ধরাইয়া কি যেন চিন্তা করতে লাগলেন। পর পর তিনটা সিগারেট শেষ কইরা তিনি মুদি দোকানটায় গেলেন। ভুসির কথা মনে থাকতেই কিইনা ফেলা দরকার। দোকানের সামনে দুই দিকে বেঞ্চি পাতা। তাতে লোকজন বইসা চা খায়, পান খায়, বিড়ি সিগারেট ফুঁকে।

ফখরুল আলম তেরা মিয়া যখন দোকানে গেলেন এবং ঠিক করলেন বলবেন, মতি, এক প্যাকেট ভুসি দাও, ঠিক তখন পিছন থেইকা ক্ষীন কন্ঠে শামসুজ্জামান শামসু বইলা উঠল, চাচা, আপনার পাঞ্জাবীর পিছে এইগুলা কি?

ফখরুল আলম ঘাড় ঘুরাইয়া বুঝতে পারলেন শামসু বলতেছে তার পাঞ্জাবীর পিছনে কিছু আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কি?

শামসু চায়ের কাপে আরেকটা চুমুক দিয়া কইল, কি যেন, মনে হয় লাগছে কিছু।

ফখরুল আলম বললেন, কি লাগছে? কি রঙ?

শামসু এইবার একটু ভালোমত দেইখা কইল, চাচা, হইলদা হইলদা আবার সাদা সাদা।

 

ফখরুল আলম বিরক্ত হইলেন। এইগুলা আবার কই থেকে লাগল। তিনি নিজে পিছনে হাত দিয়া দেখলেন ভেজা ভেজা। হাত নাকের কাছে আইনা দেখলেন কড়া গন্ধ।

 

বেঞ্চির পাশে আরো চাইর পাঁচ জন লোক বসে ছিল। তাদের সবার দৃষ্টি এখন ফখরুল আলম তেরা মিয়ার পাঞ্জাবীর দিকে। পিছনে লাগানো বস্তুটা কি এইটা জানাই তাদের প্রধান লক্ষ্য এই মুহুর্তে। একজন বুড়া মতন লোক পানের পিক মাটিতে ফেইলা বললেন, মনে অয় কাউয়ার গু। দাঁড় কাউকার গু এমন সাদা আর হইলদার ভিতরে হয়। হুইঙ্গা দেখছো নি তেরা মিয়া?

 

ফখরুল আলম তেরা মিয়া আরো বিরক্ত হইলেন। তিনি বললেন, হ দেখছি। কাউয়ার গু না। কড়া গন্ধ।

 

পাশের বেঞ্চিতে বসা আরেক লোক, উনার মাথায় ঠাক এবং হাতে লাল চায়ের কাপ ছিল, বললেন, তাইলে কাউয়ার গু না। কাউয়ার গুয়ের গন্ধ কড়া না, পাইনসা।

 

দোকানদার মতি বলল, তাইলে মনে অয় চাচা এইটা পানের পিক আর চুন টুন এইসব। লোকজন পান খাইয়া লাগাইয়া গেছে।

 

উপস্থিত সবাই এই কথারে যুক্তিযুক্ত মনে করল। একজন উইঠা গিয়া পাঞ্জাবীর পিছন দিক কাছ থেইকা দেইখা বলল, হ মতি ঠিক কইছে। চুন টুন পিক এইগুলাই।

 

ফখরুল আলম তেরা মিয়া রাইগা গেলেন। পান খাইয়া খুঁটির গায়ে চুন লাগাইয়া, পিক ফেইলা যায় কারা! তিনি রাগ এবং বিরক্তি মাখা কন্ঠে বললেন, দেখছেন চুদির ভাইদের কাম! হালারা পান খাইব আবার দুনিয়ার সব জায়গায় পানের গু ফেলব। এই পাড়ায় ভদ্রলোকের বাস অসম্ভব হইয়া পড়তেছে।

 

 

ফখরুল আলম তেরা মিয়ার এই কথায় যেন আকাশ হইতে রাশি রাশি নিস্তব্দতা হঠাৎই কোন পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া লাফ দিয়া নাইমা পড়ল মুদি দোকান এবং তার সামনে। সবাই চুপ হইয়া একে অন্যের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে শুরু করলেও ফখরুল আলমের সেসবে কোন লক্ষ ছিল না। পরিস্থিতি দ্রুত অস্বাভাবিক হইয়া গেল এবং স্বাভাবিক করতে মুদি দোকানদার মতিউর রহমান, যার ডাক নাম মতি, দ্রুতই বলল, চাচা কি কিছু নিতে আইছিলেন?

মতি এই প্রশ্ন করল কারণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা তার জন্য দরকার। তার দোকানে কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনা ব্যবসার জন্য ভাল হবে না। একজন ব্যবসায়ীকে নিজের পছন্দ অপছন্দের উপরে উঠে অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি সামলে নিতে হয়। শহরের গলির এই সাধারন মুদি দোকানদার ও এই জিনিসটা জানে। কিছু শিক্ষা মানুষের ভিতরে এমনি এমনি গ্রো করে। এইটাও সেইরকম কিছু।

তবে মতির এই চেষ্টা সফল হইল না। বুড়া মোদাচ্ছের আলী গলা খাকারি দিয়া বইলা উঠলেন, কি কইলা তুমি তেরা মিয়া? তুমার পিছে কি কেউ পানের পিক লাগাইয়া দিছে?

 

ফখরুল আলম এই কথার কোন উত্তর না দিয়া মতিউর রহমান মতি রে বললেন , মতি , এক প্যাকেট ভুসি দেও।

 

বুড়া মোদাচ্ছের এইবার বললেন একটু জোরের সাথে, কথা কানে যায় না নি? মিয়া তোমার পিছে ত কেউ পিক লাগায় নাই। খুঁটির লগে ঘষাঘষি কর ক্যান গিয়া?

 

মধ্যবয়স্ক জমিরুদ্দিন চায়ের কাপ রাইখা বললেন, আর ভদ্রলোকামি শিখাও কেন? তুমি ক্যামন ভদ্রলোক? তুমার জন্যই ত মিয়া আমাদের এই পাড়ায় থাকা দায় হইয়া পড়ছে। পুলাপানের কাছে মুখ দেখাইতে পারি না আমরা।

 

শামসুজ্জামান শামসু যোগ কইরা বইলা উঠল, চাচা এমন ভদ্রলোক যে তার জন্য তার মাইয়া পোলা বউ আইজ বাড়ি ছাড়া।

 

 

ফখরুল আলম তেরা মিয়া এদের কারো কোন কথার উত্তর দিলেন না। ভুসির প্যাকেট হাতে নিয়া তিনি মানিব্যাগ বাইর করলেন। তার পিছন পিছন আগের ওই কুত্তাটা আইসা দাঁড়াইয়াছিল। কুত্তার ভিতরে উত্তেজনা। যে জিনিসটার জন্য সে অপেক্ষা করতেছে সেই জিনিসটা আইসা পড়ছে।

ফখরুল আলম টাকা দিলেন। ফেরত টাকার জন্য অপেক্ষা করতেছেন তখন কুত্তার মনে হইল যে মানিব্যাগ অনেক উপরে। সে যদি এইখানে দাঁড়াইয়া থাকে তাইলে কিছুতেই দেখতে পারবে না যেই গুরুত্বপূর্ণ জিনিস দেখার জন্য সে নিজের কাজ ফালাইয়া এইখানে ছুইটা আসছে সেইটা। কিন্তু তার ভেতরে কে যেন তাগিদ দিয়া চলতেছে তারে দেখতেই হইব। সুতরাং উপয়ান্তর না দেইখা কুত্তা ফখরুল আলম তেরা মিয়ার মানিব্যাগ লক্ষ্য কইরা লাফ দিল। ফখরুল আলমের অসতর্ক হাতে কুত্তার মুখ এবং পায়ের আঘাতে মানিব্যাগ নিচে পইড়া গেল। সবাই ভ্যাবাচেকা খাইয়া গেলেন ঘটনার আকস্মিকতায়।

মানিব্যাগ পড়ছে গিয়া একেবারে সবার মাঝখানে। সবাই মানিব্যাগে তাকাইয়া দেখলেন সেইখানে জ্বল জ্বল করতেছে একটা কমবয়সী মানবীর মুখ। যারে কিছুদিন আগেই বিয়ে করেছেন তেরা মিয়া। কিশোর কুত্তাও দেইখা নিল এবং দেইখাই দৌড় দিল। ফখরুল আলম শশব্যস্ত হইয়া মানিব্যাগ তুইলা নিয়া রাগের সাথে বললেন, বান্দির পুত!

 

বেঞ্চিতে যারা বইসা ছিলেন তাদের হতভম্ব এবং নিরব ভাব কাইটা গেল নিমিষেই। তারা শব্দ কইরা হাইসা উঠলেন সবাই। তাদের সেই হাসি অজস্র তীরের ফলার মত ফখরুল আলম তেরা মিয়ার শরীরে বিদ্ধ হইতে লাগল।

দ্রুত বেগে ফখরুল আলম তেরা মিয়া বাকী টাকা না নিয়াই বাড়ির দিকে হাটা শুরু করলেন।

 

মতি চিৎকার কইরা বলল, চাচা , বাকী টাকা নিয়া যান।

 

ফখরুল আলম তেরা মিয়া পিছন ফিরেও তাকালেন না।

 

 

 

ছবিঋণঃ Michelle Woodward

 

 

Share
মূল্যবান সময় ব্যয় করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখার স্বত্ত্ব লেখক কতৃক সংরক্ষিত, কপি করবেন না। ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করে একে আগ্রহী পাঠকের সামনে যেতে সাহায্য করুন।

Related Posts

Leave A Comment