বাঙালীর সাইকোলজি কেমন

এই বাংলার মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে একটা জেনারালাইজড আইডিয়া থাকলে আপনে বুঝতে পারবেন, এরা কী করতে পারে ও এদের প্রতি কী আশা রাখা উচিৎ, এবং নিজেরে কীভাবে পজিশন করা উচিৎ। আমি এই ধারণাটি পেয়েছিলাম অধ্যাপক আহমদ শরীফের লেখায়। এই লেখায় রইল আমার কমেন্টারি, সাইকোএনালিসিস সহ।

এই অঞ্চলের মানুষদের গভীরে প্রোত্থিত আদর্শ হচ্ছে দেহাত্মবাদ। এরা স্থূল জীবনবাদী। চোখের সামনের জীবন, এর সুখ, আনন্দ ভোগের বাইরে কিছু এরা মানে না। সমাজ ও সমষ্টি এদের চিন্তায় নাই। এদের চিন্তায় কেবল ব্যক্তি, সে নিজে।

দেখবেন, ইতিহাসে এরা কোন মহৎ আর্ট ও সূক্ষ্ম স্থাপত্য তৈরি করে নাই যা দীর্ঘকাল টিকে থাকবে, যেরকম আমরা পাশ্চাত্যে দেখে থাকি।

এদের, মূল দর্শন কী, যেগুলা এই মাটি থেকে তৈরি? অনার্য সাংখ্য, যোগ ও তন্ত্র। সাংখ্যের প্রাণ রসায়নের চর্চা সে করেছে, যোগের আয়ুবর্ধক, এবং তন্ত্রের শক্তিবর্ধক চর্চা। এইগুলাই তার ধর্ম দর্শন আধ্যাত্মবাদ ও জীবন সাধনা। এই জীবনের নিরাপত্তা, সুখই তার প্রধান জিজ্ঞাসার বিষয় ছিল।

এই বর্ণশংকর জাতিতে বড় সব আধ্যাত্মবাদী ধর্মের আগমন ঘটেছে। বৌদ্ধ ধর্ম, উত্তর ভারত থেকে আর্য ধর্ম, এবং আরবের ইসলাম ধর্ম। মজার বিষয় হইল, তিনটারে তারা কালক্রমে একইভাবে সাইজ করেছে। নিরীশ্বরবাদী বৌদ্ধ ধর্মকে বানিয়েছে মন্ত্রযান, কালচক্র যান, ব্রজযান ও সহজযান, ঢুকিয়ে ফেলেছে অসংখ্য দেব দেবতা। আর্য ব্রাহ্মণ্যধর্মে স্থানিক দেবতা, উপদেবতা ঢুকিয়ে লৌকিক রূপ দিয়ে ফেলে। দেব দেবতার তীব্র বিরোধী আরেক ধর্ম ইসলাম আসলে, ওইটারে নানা রূপ পীর পূজায় ভরিয়ে ফেলে, ইসলামের পিউরিটান আন্দোলন ফরায়েজি-ওহাবি আন্দোলনের আগে ওইটাই ছিল মূল ধারা। এবং এসব পীর তো আসলে, উপদেবতা। এখনো, এই ২০২৫ সালেও, পীরের মুখের সুপারি খায় লোকেরা, পা ধোয়া পানি খায়।

এইসব পীর, উপদেবতা তারা ধরে এই বাহ্যিক জীবনে কষ্ট ছাড়া সুখ লাভের আশায়।

এই তিন বড় শক্তিশালী ধর্মরে একইভাবে সাইজ করে নিজেদের ফর্মে নিয়ে যাওয়া দেখে বুঝতে পারা যায়, এই অঞ্চলের লোকেরা তাদের মূল ইহলৌকিক, কর্মবিমুখ ভোগবাদী আদর্শে কতোটা অনুরক্ত।

বাংলার লোক ও বাউলগান দেখেন। সবই দেখবেন দেহাত্মবাদী। দেহের চৈতন্যই মূল, এর বাইরে কিছু নাই। এখানে জগত ব্রহ্মাণ্ড। এরা ভোগমোক্ষবাদী, যেমন ব্রজযানী সহজযানীরাও ছিল আত্মকল্যাণ ও আত্মমোক্ষে নিবেদিত যোগতান্ত্রিক।

বাংলার ভাবান্দোলন শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব সহজিয়া গানে গানে প্রেমবাদে কোন সামাজিক বেটার আইডিয়া নাই। এগুলা আত্মকেন্দ্রিক বৈরাগ্যবাদ। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রভাব ছিল মারাত্মক।

বাঙ্গালীর মূল চরিত্রের সাথে যায় বলে বাঙালী এর মূল গ্রহণ করেছে। আত্মকেন্দ্রিক বৈরাগ্যবাদী ও পরান্নজীবীতা। নিজের কল্যাণের জন্যই বৈরাগী হবে কিন্তু অন্যের দানে ও ভিক্ষায় জীবন অতিবাহিত করবে।

বাঙালীর চরিত্রে এই দ্বিচারিতা জাজ্বল্যমান – যে ভোগ করতে চায়, প্রচুর সুখ চায়, কিন্তু কষ্ট করতে চায় না। ফলে তার কাছে পথ দুইটা, এক ভিক্ষা করা, অন্যের অন্ন খেয়ে জীবন অতিবাহিত করা। দুই, চাঁদাবাজি করা, ব্যাংক মেরে খাওয়া, করাপশন করা। দুইটাই এই সমাজের প্রধান আন্ডারলাইং পেশা।

ধর্ম দর্শনের ক্ষেত্রে বাংলায় যেসব মহাপুরুষেরা এসেছেন, এরা যেসব মোক্ষবাদ, নির্বাণবাদ, প্রেমবাদ, সেবাবাদ – ইত্যাদি প্রচার করে গেছেন নানা শাস্ত্র ও নিজেদের বুদ্ধিতে – এর কোন কিছু বৃহত্তর সমাজের কোন কল্যাণ আনে নাই। বাঙালী ব্যক্তিগত লাভ ও লোভে পরিচালিত হয়। এইজন্য আজীবন সে বিদেশী শাসিত থেকেছে। ইভেন, ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতার পরে একাংশ করেছে দিল্লীর গোলামি, আরেক অংশ করাচির দাসত্ব, ধর্মীয় জাতীয়তার নামে। কারণ তাদের জাতি হিশেবে কোন একক স্পিরিট তৈরি হয় নাই।

বাঙলার লোকদের স্পিরিটরে আমি বলব, স্কিজোফ্রেনিক। এর মূলে আছে তার দেহাত্মবাদী, আত্মকেন্দ্রিক বৈরাগ্যের দর্শন। নিয়ত খণ্ড খণ্ড হইতে থাকায় তার স্পিরিট কখনো একীভূত হতে পারে না। কোন এক্সট্রিম মুহুর্তে সাময়িক একাট্টা হয়, বৃহৎ কর্মেও উদ্যত হয় কিন্তু সম্পন্ন করতে পারে না। কারণ পরিস্থিতি স্থির হয়ে গেলে ওই উত্তেজনা কমে যায় যা তাদের খণ্ডিত স্পিরিটকে সাময়িক ভাবে একরূপে এনেছিল।

তারা দ্রুত নিজেদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়। নিজের স্বার্থ কেন্দ্রিক, ভোগ, লোভ ও লাভ কেন্দ্রিক শর্ট সাইটেড চিন্তা করতে থাকে। সামগ্রিক জনমানুষের কল্যাণ ব্যতিরেকে বৈরাগ্য দর্শনের মত আধিভৌতিক আদর্শবাদের কথা বলতে থাকে।

ফন্ট বড় করুন-+=