মানুষের সম্পর্ক লইয়া

এখন একটু চিন্তা করা যাক মানুষে মানুষে সম্পর্ক লইয়া। আমাদের সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র, ইতিহাস সকল কিছুর কেন্দ্রে আছে মূলত মানুষে মানুষে সম্পর্ক। সম্পর্কের নানা ধরণ, নাম, গভীরতার নানা মাত্রা ইত্যাদি আছে, কিন্তু দিন শেষে মানবজাতির অস্তিত্বের এই ক্ষুদ্র একক, সম্পর্কের কিছু জায়গা সকল ক্ষেত্রে এক।

একজন ব্যক্তির প্রথম সম্পর্কে যাই, তার মায়ের সাথে সম্পর্ক। তিনি তার মায়ের ভেতরে থাকেন, তিনি তার মায়ের অংশ হিশেবে থাকেন। ভূমিষ্ট হইলে তিনি আলাদা হন, কিন্তু মা ও তার শেয়ারড পজেটিভ অংশ থাকায় তাদের সম্পর্ক গভীর হয়। তিনি তখন কথা বলতে পারেন না, বুদ্ধিবৃত্তিও তার হয় নাই, কিন্তু সম্পর্কটা শুরু হইয়া যায় এক শেয়ারড অস্তিত্বের মাধ্যমে।

পিতার লগে সম্পর্কেও শেয়ার করা অংশ থাকে।

ভাই বোনের লগে সম্পর্কেও। অর্থাৎ, সম্পর্কের জন্য শেয়ারড কিছু জিনিশ থাকতে হবে। যেইটা দুইজনেরই।

পারিবারিক ক্ষেত্রে এটা প্রথমত বায়োলজিক্যাল। এইটার উপর ভর করেই তাদের সম্পর্কের ভিত্তি রচিত হয়।

বন্ধুবান্ধবের লগে সম্পর্কে সাধারণত দেখা যায় একই ধরণের মন মানসিকতা ও সামাজিক শ্রেণীর লোকজন পরস্পর বন্ধু হন। তাদের কিছু শেয়ারড ধ্যান ধারণা থাকে।

রোমান্টিক সম্পর্কেও, প্রেমে বা বিয়ায়, তারা কোন এক শেয়ারড জিনিশ তৈরি করেন। ওইটারে কেন্দ্র করেই সম্পর্ক আবর্তিত হয়।

আর দূরের সম্পর্কের দিকে গেলে, যেমন আপরিচিত দুইজন, এক পথচারী ও ভিক্ষুকের সম্পর্ক। কেন পথচারী একজন ভিক্ষুকরে ভিক্ষা দেন? বা, ভিক্ষুক কেন পথচারীর কাছে ভিক্ষা চাইতে পারেন অবলীলায়? তাদেরও একটা শেয়ারড জিনিশ আছে, একটা ভ্যালু বা বিশ্বাস। ওই সামাজিক পরিমণ্ডলে তারা ওই বিশ্বাসটারে মেনে নিছেন ও সত্য বলে মানেন।

বা, ফেসবুকে একজন লেখক ও তার লেখা পড়তে থাকা অন্য লেখক ও পাঠকের সম্পর্ক। এইখানেও কিছু শেয়ারড জিনিশ থাকে, কিছু অনলাইন আচার ব্যবহারের নীতি তারা মেইন্টেইন করে চলেন।

আবার ধরা যাক, ভিন্ন মতের দুইজন রাজনৈতিক দলের ফুট সোলজারের কথা, তারা একে অন্যরে দেখতে পারেন না। তাদের সামাজিক পরিমণ্ডলেও তাদের ভেতরে এক সম্পর্ক আছে, তারা পারস্পারিক শত্রুতায় কতদূর যাবেন, এটা তা নির্ধারণ করে দেয়।

কিন্তু, সম্পর্ক স্থির হয় না। ফ্লুয়িড হয়, দেখা যায়, সম্পর্ক একসময় একরকম ছিল, পরে অন্যরকম হয়ে যায়। কারণ সম্পর্ক একটা জীবন্ত জিনিশ, যেহেতু এখানে থাকা প্লেয়াররাও জীবন্ত। উপরের উদাহরণের দুই বিরোধী ফুট সোলজারের সামাজিক বাস্তবতায়, একসময় ছিল শত্রুতায় গালাগালি পর্যন্ত যাওয়া যাবে। পরে ওইটা মারামারি পর্যন্ত চলে যাইতে পারে। অথবা, লরেন্স বিষ্ণুই এর ক্ষেত্রে যা হইছিল, বিরোধী দলের লোকজন তার গার্লফ্রেন্ডরে নাকি আগুনে পুড়াইয়া ফেলে।

সম্পর্ক তখন খারাপের দিকে বদলে যায়।

প্রতিটা সম্পর্কে যুক্ত মানুষদের আন্তঃক্রিয়ায় দুইটা জিনিশ হইতে পারে। এক, তাদের শেয়ারড মিনিং, পজেটিভিটি ও আস্থা বিশ্বাস বাড়তে পারে। দুই, শেয়ারড নেগেটিভিটি, তথা ক্লেদ বাড়তে পারে। যেগুলা হইতে পারে সন্দেহ, ঈর্ষা, বিদ্বেষ, ব্যক্তিস্বার্থ ইত্যাদি ইত্যাদি, সবগুলারে ক্লেদ নাম দেয়া গেল।

যদি শেয়ারড মিনিং বাড়ে তাহলে তাদের সম্পর্ক শক্ত হইতে থাকে। আর উলটাটা, অর্থাৎ, ক্লেদ বাড়তে থাকলে সম্পর্ক দূর্বল হইতে থাকে। দূর্বল হইয়া পজেটিভ থেকে মাঝামাঝি নিউট্রাল স্টেজ অতিক্রম করে নেগেটিভিটিতে চলে যাইতে পারে, ওই সম্পর্করে আমরা শত্রুতা বলি। ক্লেদ যত বেশী শত্রুতা তত বেশী।

সম্পর্ক ভালো গভীর করতে হইলে মানুষের ফোকাস দেয়া উচিৎ শেয়ারড মিনিং, পজিটিভিটি বাড়ানোর দিকে ও ক্লেদ কমানোর দিকে। এবং এইটা প্রতিটা আন্তঃক্রিয়ায়।

ফন্ট বড় করুন-+=