রাশিফল যে কারণে ভুয়া

১। রাশিফলে যেসব ক্লেইম করা হয়, তা যেকোন ব্যক্তির সাথেই মিলবে। খালি আপনি রাশির নাম না দেইখা সব পইড়া যাইয়েন। দেখবেন প্রত্যেকটাই আপনার সাথে মিলে। কারণ এখানে একটা কৌশল ব্যবহার করে ঝাপসা ভাষায় বলা হয়। যেমন, আপনি মাঝে মাঝে একা থাকতে পছন্দ করে, বিনোদনের জন্য অনেকটা সময় নষ্ট হতে পারে – এই দুইটা নিলাম সরাসরি রাশিফল থেকে। কার সাথে মিলবে না? সবার সাথেই মিলবে। এটারে বলে বারনাম ইফেক্ট।

২। ১৯৮৫ সালে ন্যাচার জার্নালে শন কার্লসনের এক গবেষণা প্রকাশিত হয়। কোনটা কার না জানাইয়া এস্ট্রলজারদের ব্যক্তিত্ব মিলাইতে বলা হয়। এই ব্লাইন্ড টেস্টে তাদের পারফর্মেন্স র‍্যান্ডম অনুমানের চাইতে ভালো হয় নি। অর্থাৎ, সাইন্টিফিক মেথডে কার্যকারীতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ।

৩। প্রায় একই মুহুর্তে একই জায়গায় জন্মানো যমজদের রাশিচক্র একই হবার কথা। কিন্তু তাদের ব্যক্তিত্ব ও জীবন ভিন্ন ভিন্ন হতে দেখা গেছে।

৪। এখন আধুনিক কালে মা বাপ, ডাক্তার জন্মের সময় ঠিক করেন সুবিধামত। এর মানে দাঁড়াইল, কোন এক ডাক্তারের সময়সূচী অনুযায়ী ডেট বা সময় বদলানো হইলে, ওই ডাক্তার ব্যক্তিটির ব্যক্তিত্বই বদলে দিলেন!

৫। আবার রাশিফল বলে জন্মমুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জন্ম কখন হয়? মাথা বের হলে? পুরো শরীর বের হলে? নাড়ি কাটলে? প্রথম শ্বাস নিলে? এক মিনিটের তফাতে কি ভাগ্য বদলায়?

৬। বৃহস্পতি বা গ্রহ নক্ষত্র কত কত দূরে অবস্থিত। বিশাল মহাবিশ্বে আমাদের গ্রহ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। আমাদের চাইতে বহুদূরের কোন গ্রহের প্রভাব থাকবে, অসংখ্য প্রজাতির মধ্যে এক দুপেয়ে প্রজাতির নবজাতকের উপরে? যেই জন্মে ওই গ্রহের চাইতে উপস্থিত ডাক্তারের প্রভাবই বেশী। এবং কীভাবে, কোন তরঙ্গ মারফত ওই দূরের নক্ষত্র মহাশয় প্রভাব বিস্তার করে যান, তার কোন ব্যাখ্যা নাই।

৭। যে নক্ষত্রপুঞ্জের কথা বলা হয় তা মানুষের কল্পনা। রাশিগুলো আসলে নক্ষত্রপুঞ্জের নাম। এই নক্ষত্রগুলো পরস্পর থেকে সাধারণ দূরে না, আলোকবর্ষ দূরে। তারা একটা দল না, শুধু পৃথিবী থেকে দেখলে কাছাকাছি মনে হয়। প্রাচীন মানুষ আকাশে মেষ বা সিংহের ছবি কল্পনা করেছে।

৮। পৃথিবীতে ধরা গেল ৮০০ কোটি মানুষ, রাশি ধরা গেল ১২টা। প্রতিটা রাশিতে প্রায় ৬৫-৭০ কোটি মানুষ। একই দিনে সব বৃশ্চিক রাশির মানুষের “প্রেমে সফলতা আসবে” বা “আর্থিক সমস্যা হবে”? এটা পরিসংখ্যানগতভাবেই অসম্ভব। আবার বিভিন্ন অঞ্চলে রাশি ভিন্ন ভিন্ন ভাবে নির্ধারণ করা হয়। এক অঞ্চলের রাশিতে যার ব্যক্তিত্ব সাহসী, অন্য অঞ্চলের রাশিতে হইতে পারে উলটা।

৯। রাশিফল কখনো নির্দিষ্ট কিছু বলে না। “সতর্ক থাকুন,” “সুযোগ আসতে পারে,” “সম্পর্কে জটিলতা হতে পারে” এইগুলা এমনভাবে লেখা যে পরে যাই ঘটুক, মিলিয়ে নেওয়া যায়। যেটা ভুল প্রমাণ করা যায় না, সেটা সত্য প্রমাণও করা যায় না।

১০। মানুষ যা বিশ্বাস করে, তার সপক্ষে প্রমাণ খোঁজে, বিপক্ষেরটা ভুলে যায়। রাশিফল মিললে মনে থাকে, না মিললে ভুলে যায়। এভাবে যেকোনো কিছুকে “সত্য” মনে করানো যায়।

১১। মানুষের জন্য ক্ষতিকর হয়, যখন মানুষ তার ব্যর্থতার জন্য রাশিফলে দোষ খুঁজে। সে জাস্টিফিকেশন পায়। এটা এক ধরণের শান্তি, আবার এটা মানুষরে নিজের দোষ দেখতে দেয় না। ফলে তার গ্রো করার পথ রুদ্ধ হয়, যা তাকে আরো ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যায়। এবং ব্যর্থ হইতে থাকলে এর স্বপক্ষেও সে আবার রাশিফলে প্রমাণ পায়। অন্যদিকে, রাশিফলে পজেটিভ কিছু থাকলে, মানুষ ইন্সপায়ার্ড হইতেও পারে। ভালো কিছু হইলে, এর প্রমাণও পায় রাশিফলে। কনফার্মেশন বায়াসের এক মহা ডিব্বা।

এবং এইটা এক বিশাল ব্যবসাও। সামগ্রিক জ্যোতিষ মার্কেট সাইজ ২০২৪ সালে প্রায় ১৪.৩ বিলিয়ন ডলার। তুলনা করে বুঝতে, বাংলাদেশের প্রাইমারি শিক্ষা বাজেট ৩-৪ বিলিয়ন ডলার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে ম্যালেরিয়া নির্মূলে বছরে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার।

দশ লক্ষ কোটি কোটি কোটি নক্ষত্র মহাবিশ্বে। এক লক্ষ কোটি কোটি কোটি সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহ। মিল্কিওয়ে ১ লক্ষ আলোকবর্ষ চওড়া। পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। এই অকল্পনীয় বিশালতার মধ্যে, একটা সাধারণ গ্যালাক্সির একটা সাধারণ নক্ষত্রের তৃতীয় গ্রহে, একটা নির্দিষ্ট স্তন্যপায়ী প্রজাতির এক সদস্য যখন তার মায়ের জরায়ু থেকে বের হয়, ঠিক সেই মুহূর্তে সূর্য আকাশের কোন কাল্পনিক অঞ্চলে ছিল, সেটা তার চরিত্র ও ভাগ্য নির্ধারণ করে।

মানুষের কল্পনা প্রতিভা মহাবিশ্বের বিশালতার চাইতেও বিশাল।

“”The fault, dear Brutus, is not in our stars, but in ourselves….”

ফন্ট বড় করুন-+=