সম্পর্কঃ গিভার না টেইকার আপনি?

প্রায় প্রত্যেক পরিস্থিতিতে মানুষে মানুষে যেসব সম্পর্ক হয়ে থাকে, সেগুলিকে নিম্নোক্ত ভাবে ভাগ করা যায়ঃ

১। উইন-উইন

২। উইন-লস

৩। লস-লস

 

উইন উইনঃ

এই ধরনের পরিস্থিতিতে বিদ্যমান পক্ষগুলোর সবাই লাভবান হয়, কারো কোন ক্ষতি হয় না। তাই এ ধরনের সম্পর্ক থাকে দীর্ঘস্থায়ী, এবং সুস্থ। উইন উইন সম্পর্ক তৈরী করার জন্য প্রত্যেককেই অন্যেরটার ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হয়। যেসব ম্যারেজে জামাই-বউ এই উইন-উইন সম্পর্ক তৈরী করতে পারেন তাদের ম্যারেজ হয় দীর্ঘস্থায়ী, এবং সফল। যেসব ব্যবসায় পার্টনাবৃন্দ উইন-উইন সম্পর্ক তৈরী করেন তাদের সম্পর্ক সহজে ভাঙ্গে না। ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই উইন-উইন সম্পর্ক হচ্ছে বেস্ট।

 

উইন-লসঃ

এই ধরনের পরিস্থিতে বিদ্যমান এক পক্ষের লাভ হয়, অন্য পক্ষের ক্ষতি হয়। এখানে অন্যের কথা মাথায় রেখে কাজ করেন না উইনার পক্ষ, তিনি নিজের আখের গুছানোতেই ব্যস্ত। নিজের স্বার্থই তার কাছে প্রধান। যেসব ম্যারেজ ভেঙ্গে যায়, যেসব ব্যবসায়ীক পার্টনারশীপ ভেঙ্গে যায়; তাদের প্রত্যেক সম্পর্ক খুঁজলে এই উইন-লস সম্পর্ক দেখা যেতে পারে। এটি পরিহারযোগ্য।

 

লস-লস

এই ধরনের ক্ষেত্রে কোন পক্ষই লাভবান হতে পারে না, সবারই ক্ষতি হয়। সম্পর্কে এমনও হয় যে সব পক্ষই স্বার্থচিন্তামগ্ন, এবং সব পক্ষই জানে যে অন্য পক্ষ স্বার্থ চিন্তায় আচ্ছন্ন। ফলে তারা ঠিকমত অংশগ্রহন করে। কেবলমাত্র স্বার্থই সবার উদ্দেশ্য থাকে ফলে লাভের বস্তু আর কিছু উৎপন্ন হয় না। ফলে,  সবারই লস হয়। এটা এক ক্ষেত্রে।

অন্য ক্ষেত্রে ধরা যাক, কোন প্রতিযোগীতার বিরোধ। এক্ষেত্রে স্বার্থ নয়, অন্যকে বিনাশ করাই হয় একে অপরের লক্ষ্য। ফলে নিজের নাক কেটে তার যাত্রা ভঙ্গ করতেই পিছপা হন না বিদ্যমান পক্ষবৃন্দ। কিন্তু নিজের নাক কাটলে তিনি নাক হারালেন, অন্যের যাত্রা ভঙ্গ হলো। দু’জনেরই লস, তাই এটি লস-লস সম্পর্ক। এটি অবশ্যই পরিহারযোগ্য।

ছবিঃ প্রফেসর এডাম গ্র্যান্ট

অরিজিনালস, অপশন-বি, এবং গিভ এন্ড টেইক বইয়ের লেখক সাইকোলজিস্ট এডাম গ্র্যান্ট ইন্টারেকশনের ক্ষেত্রে তিন ধরনের মানুষ আছে বলে ভাগ করেছেন। এরা হলোঃ

১। গিভারঃ যারা অন্যের উপকার করতে আগ্রহী। অর্থাৎ দেয়াই তাদের কাছে ভালো লাগে। এরা অন্যরে সাহায্য করে, নলেজ শেয়ার করে, উপকার করে। সময়, স্কিল, কানেকশন শেয়ার করে।

আমি একবার ফেইসবুকে দেখেছিলাম, এক ব্যক্তি যে মার্কেটিং, টেক স্টার্টাপ ইত্যাদি নিয়ে কাজ করছে। বিখ্যাত মোটিভেশন স্পিকারের সাথে ছবি টবি দেয় (তখন মোটিভেশনাল স্পিকারদের ধুয়ে দেয়া শুরু হয় নি)। সে একবার গোস্বা করে লিখেছে ফেইসবুকে তার এসব বড় মানুষের সাথে কানেকশন দেখে অন্যেরা এদের এড দেয়। তার ইন্ড্রাস্টির এক বড় ভাই এটার নাম দিয়েছেন নেটওয়ার্ক হ্যাকিং। এই ধরনের মানসিকতা গিভার মানসিকতা নয়, এটা স্বার্থপর টেইকার মানসিকতা।

 

২। টেইকারঃ এরা খালি নিজেরটা নিয়ে ভাবে। এবং সব সময় নিজেই পেতে চায় অন্যের কাছ থেকে। দলগত কাজে সব সময় কাজের ক্রেডিট নিয়ে নিতে চায়।  তারা সব সময় হিসাব করতে থাকে নিজে কী পেল। সে কী দিল, তা নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। সে কেবল পেতে চায়, একসময় এই অবস্থা সাইকোপ্যাথের পর্যায়ে পৌছে।

 

৩। ম্যাচারঃ গিভার এবং টেইকারের সংমিশ্রণ এরা। এরা টিট ফর ট্যাটে বিশ্বাসী। আপনি তার সাথে গিভারের মত ব্যবহার করলেও সেও আপনার সাথে গিভারের মত ব্যবহার করবে। আবার কেউ টেইকারের মত ব্যবহার করলে তার সাথে সে হবে টেইকার।

 

গিভার-গিভারের সম্পর্ক সবচেয়ে ভালো। এখানে উইন-উইন সিচুয়েশন তৈরী হয়। ম্যাচারদের সাথেও গিভারদের সম্পর্কও ভালো হয়, উইন-উইন।

 

এডাম গ্র্যান্ট ডাটা নিয়ে দেখেছেন কর্মক্ষেত্রে ম্যাচারদের সংখ্যাই বেশী।

ছবি এডাম গ্র্যান্টের টেড টক থেকে।

 

তার রিসার্চের আরো ইন্টারেস্টিং কিছু ফলাফল আছে। যেমনঃ

১। দেখা গেছে সফলতার সবচেয়ে নিচের স্তরে আছে কিছু গিভারেরা।

২। এবং সফলতার সবচেয়ে উপরের স্তরেও আছে গিভারেরা।

 

অর্থাৎ, গিভার কেবল দিয়েই যায়, এবং যেসব গিভার টেইকারদের মধ্যে পড়ে যায় তাদের অবস্থান নিচের দিকে হয়।

আবার কর্মক্ষেত্রে যেহেতু ম্যাচারদের সংখ্যা বেশী তাই গিভাররা ম্যাচারদের সাথে পড়ে বেশী, ফলে গিভিং এর বদলে গিভিংই পায়। এতে তারা বেশী সফল হয়।

সবচেয়ে মারাত্মক অবস্থা হয় টেইকারদের। তারা গিভারদের ঠকিয়ে ফেলে ঠিকই, কিন্তু ম্যাচারদের হাতে কঠিনভাবে ধরা খায়। গ্র্যান্ট বলেন, টেইকাররা অনেক সময় দ্রুত উপরে উঠে যেতে পারে চাতুরী (অন্যের পা চেটে) দ্বারা কিন্তু তাদের পতনও হয় দ্রুত।

পক্ষান্তরে, গিভারদের উত্থান স্ট্যাবল। কারণ তারা দিয়েই এসেছে। তাদের এই দেয়া পুরো পরিবেশটাকেই ভালোর দিকে বদলে দেয়।

একটি কোম্পানি বা দলবদ্ধ কাজের ক্ষেত্রে টেইকার থাকা মানে কোম্পানির ক্ষতি। একটা ফুটবল দলে দুজন স্ট্রাইকারের একজন টেইকার হলেই সে প্রচুর সুযোগ নষ্ট করবে নিজে গোল দেয়ার চেষ্টা করে এবং অন্যজনকে পাস না দিয়ে। ফলে পুরো দলেরই ক্ষতি।

আবার টেইকারদের সংস্পর্শে এসে ম্যাচাররা টেইকারদের মত আচরন করবে টেইকারদের সাথে। এতেও দলের ক্ষতি।

আর টেইকার বেশী থাকলে, সেই অবস্থায় গিভাররা পড়ে যায় নিচে। তাই গ্র্যান্টের মতে কোম্পানিতে মানুষ নেয়ার সময় টেইকারদের চিহ্নিত করতে হবে এবং বাদ দিতে হবে। তা না হলে ক্ষতি।

টেইকাররা ব্ল্যাক হোলের মত, তারা সব শক্তি শোষন করতে থাকে সিস্টেমের। পক্ষান্তরে গিভারদের ভূমিকা আলো ছড়ানো সূর্যের মতো।

ছবিঃ এডাম গ্র্যান্টের টেড টক থেকে।

এডাম গ্র্যান্ট আরেকটু ভাগ করেছেন দুই ধরনের গিভার ও দুই ধরনের টেইকার সামনে এনে। এক ধরনের গিভার আছে যারা ভালো ব্যবহার করবে ফলে আপনার ভালো লাগবে, আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন এরা গিভার। অন্য ধরনের গিভার অত ভালো ব্যবহার করবে না,  আচরণ দেখে আপনার মনে হতে পারে সে টেইকার কিন্তু আসলে সে গিভার এবং দিতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করে।

টেইকারদের ক্ষেত্রে এক ধরনের টেইকার আছে যাদের দেখলেই আপনি বুঝবেন সে টেইকার। আচরনে সে তা বুঝিয়ে দেয়। এ ধরনের টেইকার সহজে চিহ্নিত করা যায় এবং এদের থেকে দূরে থাকা সহজ। আরেক ধরনের টেইকার আছে যারা মুখে ভালো, কিন্তু ভেতরে স্বার্থপর। এরা সামনে ভালো ব্যবহার করবে, দেখাবে সে একজন গিভার কিন্তু পেছনে ঠিকই টেইকারের মত তার স্বার্থটা আদায় করতেই ব্যস্ত থাকবে।  এদের চিহ্নিত করা কঠিন।

 

ফন্ট বড় করুন-+=