by

মাঙ্গারিজমঃ জীবনে দুর্দশা ডেকে আনার অব্যর্থ উপায়

এই সিরিজের নাম মাঙ্গারিজম। মাঙ্গারিজমে চার্লি মাঙ্গার ও তার চিন্তা নিয়ে লেখব। চার্লি মাঙ্গার বার্কশায়ার হ্যাথওয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিলিনিয়ার, এবং ফিলানথ্রপিস্ট। তার আরেক পরিচয় তিনি ওয়ারেন বাফেটের বন্ধু। চার্লি মাঙ্গার, তার জ্ঞানসাধনা ও জীবন দর্শন তুলে ধরা হবে মাঙ্গারিজমের প্রতিটি পোস্টে।

চার্লি মাঙ্গার অনেক স্পিচ বা বক্তৃতা দেন। এর একটি ১৯৮৬ সালের ১৩ জুন দিয়েছিলেন হার্ভার্ড স্কুলে দিয়েছিলেন, যা পুওর চার্লিজ অলমান্যাক বইয়ে চ্যাপ্টার চারে আছে। সেই চ্যাপ্টারে মাঙ্গারের এগারোটি বক্তৃতা যুক্ত আছে।

মাঙ্গার এই বক্তৃতা ইনভার্স করে দেন। কোন কিছু ইনভার্স করে দেখা মাঙ্গারের চিন্তার এক বিশেষ বৈশিষ্ঠ্য। তিনি গণীতবিদ জাকোবির উক্তি স্মরণ করেন। জাকোবি সব সময় বললন, ইনভার্স, ওলওয়েজ ইনভার্স।

সফল কীভাবে হওয়া যাবে তা বুঝার চাইতে কীভাবে অসফল হওয়া যাবে তা বুঝাটা হচ্ছে ইনভার্স করে সফলতা বুঝা।

চার্লি মাঙ্গার
চার্লি মাঙ্গার

মাঙ্গার তার বক্তৃতা জনি কারসনের একটি বক্তৃতার উপর ভিত্তি করে সাজান। জনি কারসন একজন বিখ্যাত কমেডি অভিনেতা। তার বক্তব্যের নাম ছিল জীবনে দুঃখ দুর্দশা আনার অব্যর্থ উপায়। সেখানে তিনি তিনটি উপায়ের কথা বলেন।

১। সুখের জন্য বা মুড পরিবর্তনের জন্য কোন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ গ্রহণ। সোজা কথায় সুখের জন্য মাদকাসক্ত হওয়া।

২। হিংসা।

৩। রিসেন্টমেন্ট বা কেউ আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করল, তার প্রতি তীব্র অসন্তোষ, রাগ দীর্ঘদিন ধরে রাখা। এটি নিজের দুর্দশা ডেকে আনার জন্য দারুণ। মাঙ্গার বলেন, যারা এই রিসেন্টমেন্টের মাধ্যমে নিজের জীবনে দুর্দশা আনতে চান তারা ডিজরেইলী রিসেন্টমেন্ট থেকে পরিত্রাণ পেতে যা করেছিলেন তা কখনো করবেন না।

ডিজরেইলী একজন লেখক এবং যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার জীবনে অনেকেই তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিল। তিনি তাদের নাম কাগজে লিখে একটা ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলেন। অনেক দিন পর পর তিনি কাগজগুলো দেখতেন। তখন সেইসব মানুষদের অনেকে হয়ত মারা গেছে, তিনি এই ভেবে মজা পেতেন যে তার কিছু করার দরকার হলো না। পৃথিবীই তার শত্রুদের শাস্তি দিল। এটা তিনি করতেন রিসেন্টমেন্ট থেকে উদ্ভূত প্রতিশোধ স্পৃহার যন্ত্রণা এবং ক্ষতি থেকে বাঁচতে।

কারসন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তার এই বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

চার্লি মাঙ্গার আরো কয়েকটি উপায় যোগ করেন  যার মাধ্যমে যে কেউ অব্যর্থভাবে জীবনে দুঃখ দুর্দশা ডেকে আনতে পারবে। সেগুলো হলোঃ

১। আনরিলায়েবল বা অনির্ভরযোগ্য হওয়া।

আনরিলায়েবল বা অনির্ভরযোগ্য অর্থাৎ আপনি যদি এমন হন কেউ আপনার উপর নির্ভর করতে পারে না, ধরা যাক দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তিরা যেমন, তা হলে বাকী সব গুণাবলী কোন কাজে আসবে না। খরগোশ আর কচ্ছপের সেই দৌড়ের গল্পের মত। খরগোশ ছিল দায়িত্বজ্ঞানহীন। মাঙ্গারের কথায়, কেউ দায়িত্বজ্ঞানহীন অনির্ভরযোগ্য হলে ধীরে দৌড়ানো কচ্ছপ, ক্র্যাচে হাটা কচ্ছপ, এমনকী শামুকেরাও তাকে দৌড়ে হারাবে।

অলসতা এবং অনির্ভরযোগ্যতা জীবনে দুর্দশা ডেকে আনার শক্তিশালী দুই উপায়।

২। খালি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই শেখা।

মানুষ যেসব ভুল করে দুর্দশায় পড়ে যেমন ব্যবসায় লস, ভুল ইনভেস্টমেন্ট, মাতাল হয়ে গাড়ি চালিয়ে দূর্ঘটনা ইত্যাদি সবই একইরকম। এই ধরনের সব ঘটনাগুলা এক। তারা আলাদা কিছু নয়। তাই অন্যের অভিজ্ঞতা থেকেও শেখা যায়। মাঙ্গার বলেন, কোন স্টিলের বেড়ায় বিদ্যুৎ প্রবাহীত হচ্ছে, এতে প্রস্রাব করলে কী হবে তা প্রস্রাব করে দেখতে হয় না। আগে যারা করেছিল তাদের কী হয়েছে সেটা জানলেই হয়।

তাই কেবল নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার পন করলে কপালে দুর্দশা আছে। অতি বোকারাই এই পন করে থাকে। বুদ্ধিমান ও যৌক্তিক মানুষেরা ইতিহাস দেখেন, অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেন। অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার নানা উপায় আছে। এর মাঝে সবচেয়ে ভালো একটি উপায় ভালো বই পড়া। ভালো বইতে থাকে মানুষের অভিজ্ঞতার নির্যাস।

৩। জীবনের দুর্দশা আসতে থাকলে সেখানে উপস্থিত থেকে একের পর এক তাকে আমন্ত্রণ জানানো।

জ্ঞানী, ভালো ও বুদ্ধিমান মানুষের জীবনেও দুর্দশা আসে। সব কাজ ঠিক মত করে গেলেও খারাপ সময়ে পতিত হতে পারেন কেউ। এপিকটেটাসের মত বড় দার্শনিক, তার এপিটাফে লেখা আছে, এখানে ঘুমিয়ে আছেন এপিকটেটাস, একজন দাস, বিকলাঙ্গ, দারিদ্রের সর্বোচ্চ সীমায়, কিন্তু ছিলেন দেবতাদের প্রিয়। তাই জ্ঞানী, বুদ্ধিমান, যৌক্তিক হলেই যে দুর্দশা আসতে পারে না এমন নয়। দুর্দশা বা খারাপ সময় আসতে থাকলে সেখানে বার বার উপস্থিত হয়ে তাতে আরো নিমজ্জ্বিত হবার চেষ্টা করা উচিত নয়। বরং তা থেকে বেরোবার চেষ্টা করাটাই দরকার।

৪। ইনভার্স না করে বুঝতে যাওয়া।

গনিতবিদ জাকোবি’র কথা “ইনভার্স, ওলওয়েজ ইনভার্স।” অর্থাৎ সব কিছু বুঝতে হবে ইনভার্স করার মাধ্যমে। এতে যা সহজে বুঝা যায় না তাও বুঝা সম্ভব হবে। যেমন, কী করলে সফল হওয়া যায় তা না দেখে ইনভার্স করে দেখতে হবে কী করলে আপনি সফল হবেন না। তারপর সেই কাজগুলো করা থেকে বিরত থাকলেই আপনি সফল হয়ে যাবেন।

 

এই কাজগুলো করতে পারলে, বা এদের মধ্যে একটি দু'টি যে কেউ তার জীবনে দুর্দশা ডেকে আনতে পারেন। আপনারা কাজে লেগে যান।

Share

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.