by

নারকোজ কি দেখার মতো সিরিজ?

কলম্বিয়ান ড্রাগ লর্ড পাবলো এমিলিও এস্কোবার গাভিরিয়ার উপর ভিত্তি করে নির্মিত হইছে নারকোজ সিরিজ। প্রথম সিজনে দশ পর্ব। প্রতি পর্বই ঘন্টাখানেকের মত।

ল্যাটিন আমেরিকা নিয়ে আমাদের দেশের শিল্প সাহিত্যের লোকদের আগ্রহ অনেক। ল্যাটিন আমেরিকা, ম্যাজিক রিয়ালিজম, গার্সিয়া মার্কেজ এইসব শব্দ সাহিত্যের লোকেরা অহরহই ব্যবহার করতে থাকেন। বাংলা একাডেমী যে সাহিত্য পত্রিকা করে তার এই বছরের ফেব্রুয়ারী সংখ্যা করেছে কেবল লাতিন আমেরিকার সাহিত্য নিয়া। সেখানে তারা বর্হেস, ফুয়েন্তেস, মার্কেজ, ইয়োসা এবং ইন্টারেস্টিংলী রুলফোর লেখা নিয়া আলোচনা করছেন। সংখ্যাটা আমার ভালো লাগে নাই অবশ্য।

narcos

ল্যাটিন আমেরিকায় কেন ম্যাজিক রিয়েলিজমের জন্ম নিল এই প্রশ্নের উত্তর নারকোজ সিরিজের শুরুর পর্বেও দেয়ার চেষ্টা করা হইছে।

“There's a reason magical realism was born in Colombia. It's a country where dreams and reality are conflated; where, in their heads, people fly as high as Icarus. But even magical realism has its limits.

অবাস্তব ঘটনাগুলা যখন বাস্তবে স্বাভাবিকভাবে ঘটতে থাকে গল্পে তখন তারে বলে ম্যাজিক রিয়ালিজম। পাবলো এস্কোবার গাভিরিয়া এই ক্ষেত্রে আরেক ম্যাজিক রিয়ালিজমের শ্রষ্টা। সাহিত্যে ম্যাজিক রিয়ালিজমের অন্যতম সেরা লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ছিলেন কলোম্বিয়ান, এবং এই কলোম্বিয়াতেই বাস্তবতায় ম্যাজিক রিয়ালিজম তৈরী হয়েছে পাবলো এস্কোবারের হাতে। অন্তত নারকোজ সিরজের বক্তব্য এমনই।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ একবার বলেছিলেন, আপনারা যেটারে ম্যাজিক রিয়ালিজম বলেন তাই আমাদের এখানে বাস্তবতা। এখানে তা স্মরণ করা যায়।

নারকোজঃ পাবলো এমিলিও এস্কোবার গাভিরিয়া Click To Tweet

কলোম্বিয়ান ড্রাগ ট্রাফিকিং, পাবলো এস্কোবারকে ধরতে আমেরিকান ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সীর তৎপরতা, কম্যুনিস্টদের বিরুদ্ধে সিআইএ’র অবস্থান, কলোম্বিয়ান আভ্যন্তরীন বিষয়ে আমেরিকার হস্তঃক্ষেপ ইত্যাদি নানা ধরনের আকর্ষনীয় বস্তু আছে নারকোজে। ফলে নারকোজ দেখার মত সিরিজ তা বলা যায়।

গতবছর অনেক মাফিয়া মুভি, সিরিজ দেখা হইছিল। বিশেষত আমার অপ্রকাশিত ক্ল্যাসিক, মাফিয়া থ্রিলার অমানব লেখার জন্যই মূলত। এছাড়া আগে পরে আরো যেসব মাফিয়া মুভি দেখা হইছে নারকোজ তাদের থেকে আলাদা কিছু না।

গুডফেলাজ, স্কারফেইস, দ্য গডফাদার, ক্যাসিনো, ডনি ব্র্যাস্কো, দ্য আনটাচেবল, দ্য ডিপার্টেড, গেমোরাহ, সোনাটাইন, সপ্রানোজ ইত্যাদির সাথে কিছু ক্ষেত্রে মিল আছে নারকোজের। এছাড়া আমেরিকান মাফিয়াদের নিয়ে ডকুমেন্টারী ক্রাইম ইঙ্কঃ দ্য ট্রু স্টোরি অব মাফিয়া দেখা থাকলেও নারকোজকে পরিচিত মনে হবে অনেক। অন্যান্যদের সাথে এই সিরিজের অনেক পার্থক্যের মধ্যে একটি হলো এর স্পীড অনেক বেশী, যেখানে মাফিয়া সিরিজ সাধারণত স্লো হয়।

Omanob.front

ছবিঃ মুকুল

এই নারকোজ সিরিজ বা এই ধরনের মুভি আমাদের একটা প্রশ্নের মুখে নিতে পারে যে কেন আমরা এগুলা দেখতে দেখতে খারাপ লোকগুলারে সাপোর্ট দিতে থাকি? নারকোজে নায়ক কিন্তু পাবলো এস্কোবার গাভিরিয়া, যে ফিল্মেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। কিন্তু দর্শকদের মত হইতে পারে তার বউয়ের মতই, হি হ্যাজ হিজ রিজনস।

এর উত্তরে ফ্রয়েড বলবেন এইটা অবচেতনের ইচ্ছাপূরণ। আমাদের ইড চায় তার সব ইচ্ছা পূরণ হোক। কিন্তু সামাজিক বিধিনিষেদের কারণে পারে না। ফলে যখন ফিল্মে দেখে, তখন সে ঐ লোকরেই সাপোর্ট দিতে থাকে যে সমাজের রীতি নীতির বিরুদ্ধে গিয়া নিজের ইচ্ছাপূরণ করতেছে, ইড এখানে এই লোকের স্ট্রাগলরে তার নিজের স্ট্রাগল হিসাবে ফিল করে।

কার্ল গুস্তাব ইয়্যুং বলবেন, এটা আমাদের লুকায়িত প্রকৃতি বা হিডেন ন্যাচার যাকে বুঝা আমাদের জন্য খুব দরকার। একজন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হলে। কিন্তু এর সাথে ভাল বুঝাপড়া যেমন একে ভালোভাবে ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়, খারাপ বুঝাপড়া তেমনি ক্ষতির দিকে নিয়া যায়।

আমার মনে হয়, এইসব ফিল্মে প্রধান চরিত্র হিসেবেই থাকে পাবলো এস্কোবারের মত লোকেরা। ফলে পুরা ফিল্মে অন্যান্যদের চাইতে তার অভিনয় ভালো থাকে, বেশী সময় তারে দেখা যায়, এবং নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই থাকে। এইসব ফিল্মের রাইটারেরা তার অর্জিত জ্ঞান বা জীবনদৃষ্টির যা আমাদের দিতে চান বা আমাদের সাথে শেয়ার করতে চান তা তিনি এই প্রধান চরিত্রের মাধ্যমেই করে থাকেন প্রধানত। ফলে এই চরিত্রদের জন্য আমাদের মধ্যে একটা শ্রদ্ধার জায়গা তৈরী হয়।

এছাড়া, আমরা এইসব চরিত্রের একটা পারিবারিক দিক দেখি, একটা ইমোশনাল দিক দেখি তাদের। সপ্রানোজ, নারকোজ বা গডফাদার, সবখানেই। আমরা দেখি যে, একটা কুত্তারে  আরেকজন গুলি করে মেরে ফেলায় পাবলো এস্কোবার উদ্বিগ্ন হয়। আমরা দেখি তার মা’রে আসতে দেখে সবচেয়ে বড় ড্রাগ লর্ড পাবলো এস্কোবার সিগারেট ফেলে দেয়। আমরা এস্কোবারের দেশ নিয়া, মানুষ নিয়া স্বপ্নের সাথে পরিচিত হই। এইসব জিনিস আমাদের টাচ করে।

সামাজিক যে রীতি নীতির বিরুদ্ধে পাবলো এস্কোবার বা এরকম লোকেরা যায়, সেই সামাজিক রীতির ধারকদের দেখানো হয় স্বৈরাচারী বা শক্তিশালী অথরিটি হিসাবে। নারকোজে অবশ্য দারুণ ব্যালেন্স রাখা হইছে। প্রেসিডেন্ট গালান চরিত্রে অভিনয়কারী অভিনেতাকে আল পাচিনোর মত লাগে। শক্তিশালী অথরিটির বিরুদ্ধে থাকতে চায় মানুষ প্রকৃতিগত ভাবেই। তবে সমাজে বিরুদ্ধে যাইতে পারে না জীবন যাপনে সমস্যা হবে এই ভয়ে। এই ধরনের ফিল্মে তথাকথিত খারাপ লোকেরা, আমাদের মোরাল সাইডরে টাচ করে তার কাজের একটা জাস্টিফিকেশন তৈরী করে নেয়।

নারকোজ ডিইএ এজেন্ট স্টিভ মারফির বর্ননায় চলে, সেখানে সে একবার স্বীকার করে নেয় যে কোনটা ভালো এবং কোনটা খারাপ তা আপেক্ষিক। স্টিভ মারফি একসময় পাবলো এস্কোবারের লা ক্যাথেড্রাল থেকে পাঠানো বার্তাবাহক কবুতর মেরে ফেলে; তখন দর্শকেরা একটা মোরাল ক্রাইসিসের মুখোমুখি হতে পারেন। গুড এবং ব্যাডের আপেক্ষিকতা একটা ফিলোসোফিক টোন দিয়ে দিছে ফিল্মটাতে।

এই ডিইএ এজেন্ট এস্কোবারের পিছনে ছুটতে ছুটতে তার নিজের চরিত্রেও হিংস্রতা নিয়ে আসে। নারকোজে এটাও দেখানোর চেষ্টা করা হইছে, যেন ফ্রেডরিক নীচার সেই বানীর প্রতিফলন;

যারা দানবের সাথে যুদ্ধ করেন তাদের খেয়াল রাখতে হবে নিজেরা যেন দানবে পরিণত না হন। যদি দীর্ঘক্ষণ আপনি অতল গহবরের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাহলে সেও আপনার দিকে তাকাবে। (বিয়ন্ড গুড এন্ড এভিল, এফোরিজম, ১৪৬)।

 

Share

1 Comment


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *